মুনীর চৌধুরীর টাইপযন্ত্র: বাংলায় লেখার বিপ্লবের নেপথ্য নায়ক
আমরা যখন স্মার্টফোনের কাঁচের স্ক্রিনে দ্রুত আঙুল চালিয়ে প্রিয়জনকে বাংলায় শুভকামনা জানাই। কিংবা ল্যাপটপে বসে ইন্টারনেটে বাংলা কন্টেন্ট খুঁজি। একবারও কি ভেবে দেখি এই অক্ষরগুলো কতটা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে আজ আমাদের হাতের মুঠোয় এসেছে? আজকাল ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলা লেখা আমাদের কাছে এতটাই স্বাচ্ছন্দ্যের যে এর পেছনে লুকিয়ে থাকা কয়েক দশকের দীর্ঘ লড়াই আর গবেষণার ইতিহাস আমাদের অনেকেরই অজানা। ১৯৫০-এর দশকে যখন বাঙালির মায়ের ভাষাকে যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে বদলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল, তখন অকুতোভয় এক ভাষাসৈনিক ও বিজ্ঞানী রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যন্ত্রের জন্য ভাষা বদলাতে হবে না। যন্ত্রকেই বাংলার উপযোগী করতে হবে। সেই দূরদর্শী মানুষটি ছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী। বাংলা ভাষায় আজ আমরা যেভাবে অনায়াসে কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে লিখছি, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও উদ্ভাবনের ইতিহাস। এই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নায়ক হলেন ভাষাবিজ্ঞানী, নাট্যকার ও শিক্ষাবিদ শহীদ মুনীর চৌধুরী। তাঁর উদ্ভাবিত বাংলা টাইপরাইটার লেআউট মুনীর অপটিমা বাংলা টাইপিংয়ের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রে একটি তথাকথিত ‘পাকিস্তানি ভাষা-সংস্কৃতি’ গড়ে তোলার প্রয়াস শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে বাংলাকে আরবি হরফে লেখার প্রস্তাব, শিক্ষা ব্যবস্থায় আরবির প্রাধান্য আরোপ—এসব উদ্যোগ মূলত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে খণ্ডিত করার প্রচেষ্টা ছিল। এমন সময়েই বাংলা বর্ণমালার শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার লড়াইয়ে প্রযুক্তির ভূমিকা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫০-এর দশকে রেমিংটন কোম্পানি বাংলা টাইপরাইটার বাজারে আনলেও তা বাংলা ভাষার জটিল যুক্তাক্ষর ও স্বরচিহ্ন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি। যুক্তাক্ষর টাইপ করতে বারবার হসন্ত ব্যবহার টাইপের গতি কমিয়ে দিত। কেউ কেউ তো এই সীমাবদ্ধতার অজুহাতে বাংলা বর্ণমালাই বদলে ফেলার প্রস্তাব দেন। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৬৩ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে অধ্যাপক মুহম্মদ এনামুল হকের আহ্বানে মুনীর চৌধুরী বাংলা টাইপরাইটারের একটি ব্যবহারবান্ধব লেআউট তৈরির দায়িত্ব নেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল টাইপরাইটারের সুবিধার জন্য বাংলা ভাষাকে নয়, বরং যন্ত্রকেই বাংলার উপযোগী করতে হবে। মুনীর চৌধুরী বাংলা ভাষার ব্যবহৃত বর্ণ ও যুক্তাক্ষরের frequency analysis করেন। প্রমথ চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইব্রাহীম খাঁসহ বিভিন্ন লেখকের লেখা ও পত্রিকার সম্পাদকীয় থেকে হাজার হাজার বর্ণ বিশ্লেষণ করে দেখা হয়—কোন বর্ণ কতবার ব্যবহৃত হয়। দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত চিহ্ন ‘া’, তারপর ‘ে’ ও ‘র’। এই তথ্যের ভিত্তিতে তিনি এমন একটি লেআউট তৈরি করেন, যেখানে বেশি ব্যবহৃত বর্ণগুলো সহজে ও কম আঙুল নড়াচড়ায় টাইপ করা যায়।
মুনীর অপটিমা: এক যুগান্তকারী লেআউট। মুনীর চৌধুরী প্রস্তাব করেন ৪২টি কী-বোর্ডের একটি নকশা, যার সাহায্যে বিশেষ বোতাম ব্যবহার করে মোট ৮৪টি বর্ণ ও চিহ্ন টাইপ করা যাবে। এতে:
- যুক্তাক্ষর টাইপ করা সহজ হয়
- কম কী চাপেই বেশি অক্ষর লেখা সম্ভব হয়
- টাইপের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে
এই নকশাই পরে ‘মুনীর অপটিমা’ নামে পরিচিত হয় এবং দীর্ঘদিন বাংলা টাইপরাইটারে ব্যবহৃত হয়। টাইপরাইটার থেকে কম্পিউটার যুগে আশির দশকে কম্পিউটারে বাংলা লেখার উদ্যোগ নেন প্রকৌশলী সাইফ শহীদ। তাঁর হাত ধরে আসে প্রথম কম্পিউটার উপযোগী বাংলা লেআউট ‘শহীদলিপি’ (১৯৮৫)। পরে মোস্তফা জব্বারের নেতৃত্বে আসে জনপ্রিয় ‘বিজয়’ কিবোর্ড, যা দীর্ঘদিন অফিস-আদালতে ব্যবহৃত হয়েছে। এই শতাব্দীর শুরুতে মেহেদী হাসান খানের উদ্যোগে তৈরি হয় ফ্রি ফোনেটিক কিবোর্ড ‘অভ্র’। রোমান হরফে লিখে বাংলায় রূপান্তরের সুবিধা সাধারণ মানুষের জন্য বাংলা টাইপিংকে করে তোলে আরও সহজ ও সর্বজনীন। এভাবেই মুনীর চৌধুরীর শুরু করা যাত্রা এক নতুন পূর্ণতা পায়।
মুনীর চৌধুরী (১৯২৫–১৯৭১) ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্যসমালোচক ও ভাষাবিজ্ঞানী। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য কারাবরণ করেন এবং জেলখানায় বসেই লেখেন অমর নাটক কবর। তাঁর অনন্য কীর্তির মধ্যে অন্যতম হলো বাংলা টাইপরাইটারের কিবোর্ড উদ্ভাবন (১৯৬৫)। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিনি শহীদ হন বাংলা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন হিসেবে। আজ আমরা যখন স্মার্টফোনে মুহূর্তেই বাংলায় লিখে ফেলি তখন হয়তো জানিও না এই সহজতার পেছনে রয়েছে মুনীর চৌধুরীর মতো মানুষের শ্রম, মেধা ও দূরদৃষ্টি। বাংলা টাইপিংয়ের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন উদ্ভাবক নন এক বিপ্লবের স্থপতি। মুনীর চৌধুরীর শুরু করা সেই ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ আজ ডিজিটাল বাংলাদেশের এক বিশাল আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে আমাদের দায়িত্ব বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চা বজায় রাখা এবং এই ভাষাকে বিশ্ব দরবারে আরও আধুনিক ও সমৃদ্ধভাবে তুলে ধরা। মুনীর চৌধুরীর মতো অগ্রজদের স্বপ্নকে সার্থক করার এটাই হবে শ্রেষ্ঠ উপায়। তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
--- বাউল পানকৌড়ি
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ১৪ ডিসেম্বর: ১৯৭১-এর গণহত্যায় নিহত জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ: পাক হানাদার ও রাজাকারদের গণহত্যার নৃশংসতার ইতিহাস জানার বইয়ের তালিকা
