মুক্তিযুদ্ধের প্রথম গোলন্দাজ ইউনিট ও এক অকুতোভয় রণকাহিনি
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল গেরিলা আক্রমণের ইতিহাস নয় এটি ছিল একটি সুসংগঠিত এবং কৌশলী সামরিক যুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্রের বিপরীতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান শক্তি ছিল অদম্য সাহস। তবে শত্রুর শক্তিশালী বাঙ্কার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিতে প্রয়োজন ছিল ভারী কামানের। সেই রণকৌশলগত প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম আর্টিলারি ইউনিট মুজিব ব্যাটারি'।বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু সাহসী গেরিলা আক্রমণ কিংবা সম্মুখসমরের কাহিনি নয়। এ ইতিহাসে রয়েছে ভারী অস্ত্রের সুনিপুণ ব্যবহার, কৌশলগত গোলাবর্ষণ এবং সুসংগঠিত সামরিক পরিকল্পনার অনন্য দৃষ্টান্ত। সেই ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হলো মুজিব ব্যাটারি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম আর্টিলারি ইউনিট। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ভারসাম্য বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ফুল ফেজ যুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ছিল অত্যাধুনিক অস্ত্র ও ভারী কামানে সুসজ্জিত। আমাদের বীর মুক্তিবাহিনীর প্রধান শক্তি ছিল সাহস দেশপ্রেম ও গেরিলা কৌশল। কিন্তু শত্রুর সুসংগঠিত প্রতিরক্ষা বাংকার ও সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করতে আর্টিলারি বা ভারী অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিসীম। এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় বাংলাদেশের প্রথম গোলন্দাজ ইউনিট মুজিব ব্যাটারি। মুজিব ব্যাটারি কেবল একটি সামরিক ইউনিট ছিল না, এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক বিধ্বংসী ঘোষণা। সীমিত সম্পদ নিয়ে কীভাবে সুসংগঠিত সামরিক শক্তি গড়ে তোলা যায়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এই ইউনিট। বাংলাদেশের আধুনিক গোলন্দাজ বাহিনীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী এই ‘মুজিব ব্যাটারি’ আমাদের সামরিক ইতিহাসের এক অবিনাশী অহংকার।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নামকরণ
১৯৭১ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ বাহিনী থেকে পালিয়ে আসেন প্রায় ৮০ জন বাঙালি সৈনিক। তারা ত্রিপুরায় এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। এই বাঙালি গোলন্দাজদের সংগঠিত করে একটি কার্যকর আর্টিলারি ইউনিট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা ক্যাপ্টেন আবদুল আজিজ পাশা। ভারতীয় সহায়তায় তিনি ৩.৭ ইঞ্চি মাউন্টেন গান (পুরোনো কিন্তু কার্যকর কামান) সংগ্রহ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। অবশেষে ২২ জুলাই ১৯৭১ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কোনাবান অঞ্চলে ৬টি কামান নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম আর্টিলারি ইউনিট। এই ঐতিহাসিক ইউনিটের নামকরণেও রয়েছে গর্বের গল্প। ৯ আগস্ট ১৯৭১, ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে একটি চিঠি লেখেন (স্মারক নম্বর: বিডি/০০২২/জি)। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের ছেলেরা ৩.৭ ইঞ্চি মাউন্টেন গানের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে। ১০ আগস্ট এই কামান উদ্বোধনের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি এর নাম দিয়েছি মুজিব ব্যাটারি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারেই এই ইউনিটের নামকরণ করা হয় মুজিব ব্যাটারি যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর প্রতি সামরিক বাহিনীর গভীর শ্রদ্ধার প্রতিফলন।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জনবল
মুজিব ব্যাটারির কাঠামো ও অস্ত্রশক্তি। মুজিব ব্যাটারিতে ছিল ৩.৭ ইঞ্চি মাউন্টেন গান মাত্র ৬টি। একটু পুরনো ১৯৪২–১৯৪৬ সালে তৈরি। প্রতি মিনিটে গোলা নিক্ষেপ করা যেতো সর্বোচ্চ ৫টি এবং সর্বোচ্চ পাল্লা ছিল প্রায় ৬,৪০০ মিটার। প্রতিটি কামান পরিচালনায় প্রয়োজন: ৯ জন দক্ষ মুক্তিবাহিনির সদস্য দরকার হত। এই কামানগুলো প্রথমবার ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীতে যুক্ত হয় ১৯২০ সালে এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে। মুজিব ব্যাটারির প্রাথমিক দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুল আজিজ পাশা ও সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট কাইয়ূম। পরবর্তীকালে ক্যাপ্টেন আনোয়ারুল আলমও এই ইউনিটের নেতৃত্ব দেন। কে ফোর্স গঠিত হলে মুজিব ব্যাটারিকে কে ফোর্সের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।
রণাঙ্গনে গর্জন: উল্লেখযোগ্য অভিযানসমূহ
প্রতিষ্ঠার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই মুজিব ব্যাটারির কামান রণাঙ্গনে গর্জে ওঠে। এই ইউনিটের নিখুঁত গোলাবর্ষণ মুক্তিবাহিনীর জন্য এক নতুন কৌশলগত শক্তি যোগ করে। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ও অভিযান ছিল কাইয়ুমপুর ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। কসবা ১৩–২২ অক্টোবর ১৯৭১। সালদানদী ১৫ নভেম্বর ১৯৭১। আখাউড়া ১ ডিসেম্বর ১৯৭১। নাজিরহাট ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। এই যুদ্ধে শত্রুর বাংকার অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস করে মুজিব ব্যাটারি মুক্তিবাহিনীর বিজয়কে ত্বরান্বিত করে। স্বাধীনতার পর মুজিব ব্যাটারি ১ এপ্রিল ১৯৭২ পুনর্গঠিত হয়ে ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি হিসেবে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে গড়ে ওঠে বাংলাদেশের আধুনিক গোলন্দাজ বাহিনীর ভিত্তি।
স্বাধীনতার পর: উত্তরাধিকার ও বর্তমান অবস্থান
২০১১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল বিজয় কুমার সিং শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে মুজিব ব্যাটারির কামান বাংলাদেশকে হস্তান্তর করেন। যা পরবর্তীতে ২০ ডিসেম্বর ২০১১ বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরে ‘মুজিব ব্যাটারি কর্নার’ উদ্বোধন করে রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীরা সেখানে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ঐতিহাসিক কামান প্রত্যক্ষ করতে পারেন। মুজিব ব্যাটারি শুধু একটি সামরিক ইউনিট ছিল না ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সংগঠিত ভারী অস্ত্রশক্তি। রণাঙ্গনের সাহস কৌশল ও দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রতীকের নীরব কিন্তু বিধ্বংসী শক্তি। বাংলাদেশের গোলন্দাজ বাহিনীর পথিকৃৎ হিসেবে মুজিব ব্যাটারির ভূমিকা চিরগৌরবময় ও অবিস্মরণীয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে এই ইউনিটটি '১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি' হিসেবে কুমিল্লায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১১ সালে ভারত সরকার শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে এই ঐতিহাসিক কামানগুলো বাংলাদেশকে ফেরত দেয়। বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘরে 'মুজিব ব্যাটারি কর্নার'-এ এই বীরত্বগাথার সাক্ষী হিসেবে কামানগুলো সংরক্ষিত আছে।
আধুনিক গোলন্দাজ বাহিনীর পথিকৃৎ
মুজিব ব্যাটারি কেবল একটি সামরিক ইউনিট ছিল না, এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক বিধ্বংসী ঘোষণা। সীমিত সম্পদ নিয়ে কীভাবে সুসংগঠিত সামরিক শক্তি গড়ে তোলা যায়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এই ইউনিট। বাংলাদেশের আধুনিক গোলন্দাজ বাহিনীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী এই ‘মুজিব ব্যাটারি’ আমাদের সামরিক ইতিহাসের এক অবিনাশী অহংকার।

