বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ৭১-এ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের দোসররা বাঙালি জনগণের উপর নির্মম গণহত্যা চালায়। এ হত্যাযজ্ঞে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয় এবং কোটি মানুষ শরণার্থী হয়। গণহত্যা শুধু মানুষের প্রাণহানি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজের প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, কুষ্টিয়া ও দেশের অন্যান্য শহরে সেনাবাহিনী প্রায়শই নগর এবং গ্রামে আগুন, হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও লুটপাট চালিয়েছে। অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচিত এই নৃশংস অভিযান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ধাপ হিসেবে জনগণের ওপর ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনী শুধু সরাসরি হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়নি, বরং রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর বর্বর নিপীড়ন চালিয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায় এ হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে শুরুতে অজ্ঞ ছিল; তবে ধীরে ধীরে ছবিসহ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা আন্তর্জাতিক জনমতের আলোচনায় আসে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামের ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আমরা পেলাম একটি স্বাধীন দেশ ও স্বাধীন পতাকা, কিন্তু এর সঙ্গে রয়ে গেল অজস্র বাঙালির আত্মত্যাগের ইতিহাস।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস একদিকে যেমন বীরত্ব ও আত্মত্যাগের তেমনি অন্যদিকে তা দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসদের দ্বারা পরিচালিত ভয়াবহ গণহত্যার এক মর্মন্তুদ দলিল। ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাসে বাঙালি জাতির উপর যে অকল্পনীয় বর্বরতা, হত্যা, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। যা মানব ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মানুষের যন্ত্রণার এই ইতিহাস কেবল আবেগ দিয়ে অনুধাবন করা যায় না। এর সঠিক ও প্রামাণ্য বিবরণ জানা প্রয়োজন। এই নৃশংসতার পেছনের কারণ, এর ভয়াবহতা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর প্রতিক্রিয়া জানতে হলে আমাদের ভরসা রাখতে হয় সেই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণী, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের প্রতিবেদন এবং ঐতিহাসিক গবেষকদের লেখা গ্রন্থের উপর। এই গ্রন্থগুলো কেবল কিছু তথ্য নয়, বরং এটি বাঙালির অস্তিত্বের দলিল, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য।
আজকে থাকছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সংঘটিত গণহত্যার নৃশংসতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে এমন কিছু অপরিহার্য ও ঐতিহাসিক বইয়ের নাম। যে বইগুলোর মাধ্যমে আপনি সেই সময়ের নির্মম সত্য জানতে পারবেন এবং স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারবেন। জানা থাকলো বই গুলোর নাম। কোন না কোন অলস সময়ে সংগ্রহ করে পড়ার জন্য নোট রাখতে পাড়েন। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীণতা বিরোধীেদের প্রকৃত পরিচয় জানাতে বই গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
১. একাত্তরের গণহত্যা যমুনার পূর্ব-পশ্চিম
লেখক: শফিউদ্দিন তালুকদার
প্রকাশনী: কথাপ্রকাশ
২. সিলেটে গণহত্যা
লেখক: তাজুল মোহাম্মদ
প্রকাশনী: সাহিত্য প্রকাশ
৩. গণহত্যা ১৯৭১ বিশ্ব সিভিল সমাজের প্রতিবাদ
লেখক: মুনতাসীর মামুন
প্রকাশনী: মাওলা ব্রাদার্স
৪. ১৯৭১ গণনির্যাতন - গণহত্যা কাঠামো বিবরণ ও পরিসর
সম্পাদনা: আফসান চৌধুরী
প্রকাশনী: কথাপ্রকাশ
৫.বাংলাদেশের গণহত্যা
লেখক: ড. রমন কুমার বিশ্বাস
প্রকাশনী: রয়েল পাবলিকেশন
৬. বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ
লেখক: তপন কুমার দে
প্রকাশনী: প্রকাশক, রাবেয়া বুকস্
৭. গণহত্যা ৭১
লেখক: অধ্যাপক আবু সাইয়িদ
প্রকাশনী: অনন্যা
৮. রেলওয়েতে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা
লেখক : মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক
প্রকাশনী : নালন্দা
৯. মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ : ১৯৭১
লেখক: আহম্মেদ শরীফ
প্রকাশক: ১৯৭১ : গণহত্যা - নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট
১০. ১৯৭১ সালের চুকনগর গণহত্যা
সম্পাদনা: মুনতাসীর মামুন
প্রকাশনী: সুবর্ণ
১১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও গণহত্যার ইতিহাস
লেখক: লেফটেন্যান্ট ইমরান আহমেদ চৌধুরী বিইএম
প্রকাশনী: দোআঁশ
১২. একাত্তরের গণহত্যা:রাজধানী থেকে বিয়ানীবাজার
লেখক: আজিজুল পারভেজ
প্রকাশনী: ঐতিহ্য
১৩. বরিশালের গণহত্যা - প্রেক্ষিত: ৭১ এর ওয়াপদা বধ্যভূমি
সম্পাদনা: পথিক মোস্তফা
প্রকাশনী: পথিমিতা প্রকাশন, বরিশাল
১৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যা: ১৯৭১ (জগন্নাথ হল)
সম্পাদনা: রতনলাল চক্রবর্তী
প্রকাশনী: আগামী প্রকাশনী
১৫. ১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ বুদ্ধিজীবী
লেখক: মিলটন কুমার দেব
প্রকাশনী: কথাপ্রকাশ
১৬. ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন গ্রন্থপঞ্জি
লেখক: হাসিনা আহমেদ
প্রকাশক: ১৯৭১ : গণহত্যা - নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট
১৭. ১৯৭১ সাঁকোয়া গণহত্যা-নির্যাতন ও বধ্যভূমি
লেখক: জ্যোৎস্নারা খাতুন
প্রকাশক: ১৯৭১ : গণহত্যা - নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট
১৮. ৭১ এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ
লেখক: ডা. এম এ হাসান
প্রকাশনী: তাম্রলিপি
১৯. ১৯৭১ সালে দিনাজপুরে গণহত্যা
লেখক: লে. কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক
প্রকাশনী: শুধুই মুক্তিযুদ্ধ
২০. একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাহিনী
লেখক: মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান
প্রকাশনী: জয় প্রকাশন
২১. বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে
লেখক: মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি
প্রকাশনী: আগামী প্রকাশনী
২২. মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী
স্মৃতি । জীবন । যুদ্ধ
সম্পাদনা: আনিসুল হক
প্রকাশনী: প্রথমা প্রকাশন
২৩. একাত্তরে গণহত্যা বৃহত্তর রাজশাহী জেলা
লেখক: মোঃ এনামুল হক
প্রকাশনী: কথাপ্রকাশ
২৪. ১৯৭১ : অজানা গণহত্যা
পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের দালিলিক অনুসন্ধান
লেখক: জি. এম. ফয়সাল আলম
প্রকাশনী: অন্বেষা প্রকাশন
২৫. মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতনের দলিল
সম্পাদনা: বিপ্রদাশ বড়ুয়া
প্রকাশনী: বাংলাপ্রকাশ
২৬. উত্তরের গণহত্যা ১৯৭১
লেখক: মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক
প্রকাশনী: কথাপ্রকাশ
২৭. চা বাগানে গনহত্যাঃ ১৯৭১
লেখক: অপূর্ব শর্মা
প্রকাশনী: সাহিত্য প্রকাশ
২৮. ১৯৭১ সালে কুমিল্লায় গণহত্যা
লেখক: লে. কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক
প্রকাশনী: শুধুই মুক্তিযুদ্ধ
২৯. ১৯৭১ সালে ফরিদপুরে গণহত্যা
লেখক: লে. কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক
প্রকাশনী: শুধুই মুক্তিযুদ্ধ
৩০. বাড়িয়ার গণহত্যা-১৯৭১ (গাজীপুর)
লেখক: আলেক রোজারিও
প্রকাশনী: তরফদার প্রকাশনী
গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালের গণহত্যা, নির্যাতন ও গণকবরগুলো চিহ্নিত, নথিভুক্ত ও সংরক্ষণ করার একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা উদ্যোগ। যা ৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট পরিচালনা করছে। এ জরিপের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের স্থানগুলো শনাক্ত করে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ঘটনার বিবরণ, মানচিত্র, ছবি ও নানান দলিল সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৪২ জেলায় প্রায় ২১,৮৫৬টি গণহত্যা, বধ্যভূমি, গণকবর ও নির্যাতনকেন্দ্র চিহ্নিত হয়েছে, এবং গবেষকদের ধারণা ৬৪ জেলার কাজ সম্পন্ন হলে এই সংখ্যা ৩০ হাজারেরও বেশি হতে পারে। ড. চৌধুরী শহীদ কাদেরসহ অনেক গবেষক চট্টগ্রাম, খুলনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার ওপর পৃথক গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের স্থানভিত্তিক ইতিহাসকে আরও সুসংগঠিত করেছে। এই জরিপ শুধু শহীদদের ত্যাগের প্রামাণ্য দলিলই নয় বরং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস জানানো এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গণহত্যার বাস্তবতা তুলে ধরার এক অমূল্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই বইগুলো কেবল ইতিহাস নয়। বাঙালি জাতির টিকে থাকার এক মর্মন্তুদ দলিল। ১৯৭১ সালের গণহত্যার নৃশংসতা অনুধাবন করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর সত্য তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই গ্রন্থগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে স্বাধীনতা কত বড় আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। আর এই স্মৃতিই আমাদের জাতিকে ভবিষ্যতে যেকোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রেরণা জোগাবে।
