১৯৮৫ সালে প্রকাশিত 'আর হলো না বাড়ি ফেরা' কাব্যগ্রন্থের 'তাহেরের স্বপ্ন' কবিতায় কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখার কারণে একটি মহলের প্ররোচনায় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে আমার পুরস্কার বাতিল করানো হয়েছে-- কবি মোহন রায়হান
কবি মোহন রায়হান: দ্রোহ ও রাজপথের কণ্ঠস্বর
মোহন রায়হান বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্যাঙ্গন ও রাজপথের এক উজ্জ্বল কবি ব্যক্তি। ১৯৫৬ সালে সিরাজগঞ্জের এক রাজনৈতিক ও জনহিতৈষী পরিবারে জন্ম নেওয়া এই কবি একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের নেতা এবং বাংলা সাহিত্যের একজন শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। শৈশব থেকেই রাজনৈতিক সচেতন মোহন রায়হান ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অসামান্য ত্যাগের জন্য তিনি বারবার কারাবরণ ও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা তাকে গণমানুষের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাহিত্যচর্চায় তিনি যেমন ধারালো ও দ্রোহী, সাংগঠনিকভাবেও তেমনি দক্ষ। জাতীয় কবিতা পরিষদ ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ বা ‘ফিরে দাও সেই স্টেনগান’-এর মতো কাব্যগ্রন্থগুলোতে ফুটে উঠেছে তার প্রতিবাদী সত্তা। সাহিত্যের পাশাপাশি জনকল্যাণেও তার অবদান অনস্বীকার্য; বিশেষ করে হৃদরোগের বিকল্প চিকিৎসায় সাওল হার্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা এবং বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
🟢 পুরস্কার স্থগিতের নাটকীয় ঘটনা
সাম্প্রতিক সময়ে তার পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হলেও, দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও রাজনীতিতে মোহন রায়হান এক অদম্য ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন। ২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেল ২৬ ফেব্রুয়ারি। পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়া, মহড়ায় অংশ নেওয়া এবং সশরীরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার পরও মঞ্চ থেকে ডাক পেলেন না কবি মোহন রায়হান। কবিতা বিভাগে মনোনীত এই কবির পুরস্কার শেষ মুহূর্তে স্থগিত করায় দেশজুড়ে এখন তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড় বইছে।
🟢 কাব্যগ্রন্থ আর হলো না বাড়ি ফেরা:
প্রকাশ ও প্রেক্ষাপট (১৯৮৫) স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্মিত এক প্রতিবাদী কাব্যগ্রন্থ। কবিতা সূমহ:
প্রচ্ছদ || আর হল না বাড়ি ফেরা || কালো কিষানের গান || বুনো-শুয়োরের-ট্রাক || বৃক্ষ || জোছনার ভেতরে বাড়ি ফেরা || দিনপঞ্জি || বুনো স্মৃতি || হরতাল || শ্রেণী || তোমাকে দেখতে চাই || নাম রেখেছি সাহস || তোমার || গভীর গোপন || তোমার সংসার ঘরগেরস্থালি || এক ইঞ্চিও সোনার মাটি কাউকে দেব না || সবুজ বাগানে || আসছে মানুষ আসছে || কারাগার ’৮৪ || তাহেরের স্বপ্ন || যখন আমি ফেরেশতা ছিলাম || মাফ করে দাও || মায়াবিনী গোল্লায় যা || এক দুই তিন || চতুর রমণী || কেউ বলেনি || কিসের ভয় দেখাও || ভালোবাসা অন্যরকম অন্যকিছু || সাহসী মৃত্যু || রওশন এরশাদ-এর প্রতি খোলা চিঠি || মিছিল
🟢 তাহেরের স্বপ্ন : কবিতা
যিনি আবু তাহের কর্নেল
যিনি ফাঁসিমঞ্চে হাসলেন
তিনি এখন লজ্জায়
কালো হন, প্রতিদিন আমার স্বপ্নের মধ্যে।
গতকাল ভোররাতে আমাকে সে
নিয়ে গেল দেশের একটি সেনাবাসে
ইশারায় খুব আস্তে আস্তে তাঁর ক্র্যাচে
হেঁটে হেঁটে সারি সারি জোয়ানের
কবরের পাশে দাঁড়ালেন।
অনেকের গলায় ফাঁসির চিহ্ন
কারো বুক গুলিবিদ্ধ, কারো দেহ থেঁতলানো,
তারা প্রত্যেকেই হঠাৎ জেগে উঠল
অভিবাদন জানাল পেশাগত কায়দায়;
তাহের তাদের প্রত্যেকের সাথে করমর্দন ক’রে,
আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমি বিপুল উৎসাহে
আনন্দে তাদের প্রতি হাত এগিয়ে দিলাম
কিন্তু তারা প্রত্যেকে আমাকে প্রত্যাখ্যান ক’রল;
ঘৃণায় তাদের চোখ মুখ ভুরু নাক কুঞ্চিত হল।
অপমানে আমি চিৎকার ক’রতে গেলে
তাহের আমার মুখ চেপে ধরলেন;
সরে আসলেন আমাকে নিয়ে।
হাঁটতে হাঁটতে ভোরের রুপালি হাওয়ায়
বুক ভরে নিয়ে আমরা এলাম শেরেবাংলা নগর,
বিরাট চত্বর পেরিয়ে মূল্যবান পাথরে
নির্মিত কবরটির কাছে আসতেই লাফ দিয়ে দাঁড়ালেন
একজন জেনারেল, থরথর কাঁপন শুরু হল তার
হাতজোড় করে ক্ষমাভিক্ষা করলেন;
মুদু হেসে তাহের তখন তার কাঁধ স্পর্শ করলেন
বিনীত বন্ধুর মতো, নতজানু জেনারেল
তাহেরের প্রতি হস্ত প্রসারণ করলেন;
কিন্তু তাহের ভ্রƒক্ষেপ করলেন না বরঞ্চ কঠিন
শক্ত হল তাঁর চোয়াল, ঘৃণায় উপচে পড়ল চোখ।
সেখান থেকে লাল-সালু-ঘেরা এক মঞ্চে
নিয়ে এলেন আমাকে তিনি; ‘তাহের, তোমায় লাল সালাম’
হাজার জনতার ভিড়ে; তাহের তোমায় লাল সালাম
স্লোগানে ফেটে গেল আকাশ-বাতাস,
কয়েকজন ধবধবে পা’জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত
থলথলে গাল নেতা এগিয়ে এলেন তাঁর দিকে; একজন
তাঁর চোখের চশমা খুললেন, একজন তাঁর ভরাট কণ্ঠের
গম্ভীর আওয়াজ জনতার কণ্ঠে মিলিয়ে দিলেন।
কিন্তু তাহের তাদের প্রত্যেককে পাশ কাটিয়ে
ধীরপায়ে তাঁর কাঠের ক্র্যাচ ঠুকে ঠুকে
মাইকের সামনে এগিয়ে গেলেন,
বিশাল জনসমুদ্র মুহূর্তে নীরব হ’য়ে গেল।
তাহের শুধু কান্নায় ভেঙে প’ড়ে বললেন :
স্বাধীনতাযুদ্ধে আমার একটি পা শুধু উড়ে গেছে
কিন্তু আমি খোঁড়া নই
অথচ তোমরা পা থাকতেও পঙ্গু।
দ্রোহ, রাজপথ ও স্বপ্ন: মোহন রায়হান ও তাহেরের স্বপ্ন
মোহন রায়হানের জীবন ও সাহিত্য কখনোই রাজপথ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। তাঁর তাহেরের স্বপ্ন কবিতাটি কেবল অতীত ইতিহাসের এক কাব্যিক দলিল নয়, বরং এটি সমকালীন রাজনীতির এক দর্পণ আজও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে কম্পন ধরায়। ২০২৬ সালের বাংলা একাডেমি পুরস্কারের মঞ্চে তাঁর অনুপস্থিতি এবং শেষ মুহূর্তে পুরস্কার স্থগিত হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, একজন প্রকৃত কবির কলম যখন শাণিত হয় তখন তা যুগ পার হলেও রাষ্ট্র ও নির্দিষ্ট মহলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুরস্কার না পাওয়া হয়তো তাঁর সাহিত্যিক অর্জনে কোনো আঁচড় কাটবে না, বরং এই বিতর্ক তাঁকে আরও একবার গণমানুষের বিদ্রোহী কবি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করল। কবিতার সেই অমোঘ পঙ্ক্তির মতোইযিনি আদর্শের জন্য লড়েন, তিনি শারীরিকভাবে নিগৃহীত হলেও আদতে খোঁড়া নন বরং আদর্শহীন সমাজই প্রকৃত পঙ্গুত্বের শিকার।
