বাংলার অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার মারিনো রিগন: যে বিদেশির হৃদয়ে ছিল লালন, রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশ


রবীন্দ্রনাথ বসবাস ক‌রে আমার মাথায়
লালন আছে অন্তরে।
খ্রিস্টের চিরশান্তির বাণী 
রবীন্দ্র চিন্তা আর লালনের আধ্যাত্মিক চেতনার মঙ্গল চিন্তা 
আমাকে নিবেদিত করেছে বাংলার মানুষের কল্যাণে। 

উপরের কথা গুলো ছিলো এ দে‌শে জন্ম না নি‌য়েও বাঙা‌লি না হ‌য়েও, বাংলা‌কে বাংলাদেশকে ‌ বাংলাভাষাকে বাংলার মানুষ‌দের‌কে বাংলার গ্রাম‌কে হৃদ‌য়ের সব‌চে‌য়ে গভী‌রে স্থান দেয়া বাংলাদেশের এক অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার মারিনো রিগনের মনের কথা। যিনি ১৯২৫ সালের ৫ জানুযারি ইতালির ভিসেনজার ভিলেভারলাতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে ২৮ বছর বয়সে একজন মিশনারি হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেই শুরু তাঁর বাংলাকে ভালবাসা বাংলার মাটির ঘ্রানের সাথে জড়িয়ে যাওয়া। এই বন্ধনে ফাদার মারিনো রিগন তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় উৎসর্গ করেছিলেন বাংলার মানুষের সেবায় ও শিক্ষার আলো বিস্তারে। তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল সতেরোটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যা আজও গ্রামীণ শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি ছিলেন মুক্তিবাহিনীর একজন সহযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর অবদান ও সাহসিকতার জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা খেতাবে সম্মানিত করা হয়। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রতি সকল অবদানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে  তাঁকে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করেন।  মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য ২০১২ সালে তাঁকে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।


বাংলার অকৃত্রিম বন্ধুর শেষ ইচ্ছের কথা প্রথমে রাখতে চাচ্ছি। ২০০১ সালে ফাদার মারিনো রিগন হৃদরোগে আক্রান্ত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকেরা জানান তাঁর উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। খবরটি ইতালিতে থাকা তাঁর ভাই-বোনদের কাছে পৌঁছে যায়। তারা অনুরোধ করেন ফাদার যেন ইতালিতে এসে উন্নত চিকিৎসা গ্রহন করেন। ফাদার মারিনো রিগন রাজি ছিলেন না। তাঁর ইচ্ছে ছিলো বাংলাদেশেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাই। অসুস্থতার কারনে ভাই বোনদের আবেগের কাছে হার মানতে হয় তাঁকে। তবে তিনি প্রথমেই শর্ত দিয়ে রাখেন অস্ত্রোপচারে যদি মৃত্যু হয় তাঁর মরদেহ যেন বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ঈম্বরের ইচ্ছায় অবশেষে তিনি ইতালিতে গিয়ে সফল অস্ত্রোপচার করান এবং সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসেন প্রিয় বাংলাদেশে। যে দেশটিকে তিনি নিজের মাতৃভূমির মতো ভালোবেসে ছিলেন।নিজেকে বাংলাদেশি পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। 

ফাদার মারিনো রিগান

তার বার বছর পর ২০১৪ সালে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন এবং চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেলেন ফাদার রিগন। ২০১৪ সালে তাঁর ভাই ইতালিতে নিয়ে যেতে মোংলায় আসেন। ইতালিতে মৃত্যু হলে তার মরদেহ মোংলার সেন্ট পলস গির্জার পাশে সমাহিত করতে হবে এই শর্তে তিনি ভাইয়ের সঙ্গে যেতে রাজী হন। ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর ইতালিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরন করেন। ২৪ অক্টোবর ইতালির একটি ক্যাথলিক গির্জায় তার শেষকৃত্য হয়। এসময় তার কফিনটি ঢেকে দেয়া হয়েছিলো আমাদের লাল-সবুজের পতাকায়। তাঁর পরিবার একটি বছর সময় নিয়েছিলো তার শেষ ইচ্ছার ঠিকানা নির্ধারনের ঐকমত্যে পৌঁছাতে। পরিবারের সদস্যরা সবাই সম্মত হন এবং ঠিক এক বছর পর ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর ফাদার মারিনো রিগানের মরদেহ নিয়ে আসা হয় বাংলাদেশের মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়া গ্রামের। সেন্ট পলস গির্জার তাঁকে সমাহিত করতে। বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিন জাতীয় পতাকায় আবৃত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন করা হয়।

ফাদার মারিনো রিগান

তিনি চলে গেছেন কিন্তু বাংলার মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা আজও জীবন্ত তিনি এই বাংলায়ই রয়ে গেলেন। বাংলা‌দে‌শের মু‌ক্তিযোদ্ধের পূ‌র্বের আর প‌রের স্বাধীন বাংলা‌দে‌শের আন‌ন্দের ক‌ঠিন সম‌য়ের অকৃ‌ত্রিম বন্ধু ফাদার মা‌রিনো রিগান। শ্রদ্ধাঞ্জ‌লি শ্রদ্ধা আর ভালবাসা গ্রহন করুন ফাদার। 

ফাদার মারিনো রিগান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কে ফাদার মারিনো রিগন।তাঁর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা মনে করতেন। সে সময়টায় তিনি ছিলেন গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর মিশনপল্লীর প্রধান। মিশনপল্লীতে একটি ছোট চিকিৎসাকেন্দ্র যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিতেন। তাঁর চিকিৎসা সুস্থ হয়েছিলেন বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দিন আমাদের বীর বিক্রম। যিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ফাদারের মানবিকতা ও সাহসকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন সারাজীবন। আমা‌দের স্বা‌ধিনতা যু‌দ্ধে তার সেবা আর মানবতার অবদা‌নের শেষ নেই। এক‌টি ঘটনার কথা বলি। হেমা‌য়েত বা‌হিনীর প্রধান অ‌সিম সাহসী বীর মক্তিযোদ্ধা হেমা‌য়েত উ‌দ্দিন বির‌বিক্রম।মু‌‌ক্তি‌যুদ্ধ চলাকালিন সম‌য়ে মু‌খের চোয়া‌লে গুলি‌বিদ্ধ হন। তাঁ‌কে গোপনে নি‌য়ে আসা হয় ফাদা‌রের হাসপাতালে। ফাদা‌রের সাথে অন্যান্য সাহায্যকা‌রি যারা ছি‌লেন তারা ব‌লে ফে‌লে এ‌কে বাচা‌নোর কোনভা‌বে সম্ভব নয়। ফাদার মা‌রিনো রিগান ঈশ্বরের নাম‌ নি‌য়ে অস্ত্রপাচার শুরু ক‌রতে নির্দেশ দেন। ঈশ্বর থা‌কেন সকল বীর‌দের অন্ত‌রে। তাঁর সেবায় সুস্থ হ‌য়ে উ‌ঠেন পা‌কিস্তা‌নি হানাদার আর রাজাকারদের কা‌ছে ভ‌য়ের আ‌রেক নাম হেমা‌য়েত উ‌দ্দিন আমা‌দের বির‌বিক্রম। এই রকম অজস্র আহত মু‌ক্তি‌যোদ্ধা আবার শ‌ক্তি ফি‌রে পে‌য়ে‌ছিলো তার সেবায়।

ফাদার মারিনো রিগান

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ফাদার নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। যা বাঙালির রক্তাক্ত ইতিহাসকে প্রামাণ্যভাবে তুলে ধরে। তাঁর দিনলিপির কিছু অংশ স্মরণীয়। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। আজ বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। সৃষ্টি হয় নতুন একটি দেশ বাংলাদেশ। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল। মুক্তিবাহিনীর একটি লঞ্চ নদীপথে টেকেরহাট থেকে গোপালগঞ্জে যাচ্ছিল। লঞ্চে উড়ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। নদীর ঘাটে শত শত জনতার চিৎকারে আকাশ বাতাস মুখরিত ‘জয় বাংলা জয় বাংলা। আমাদের লঞ্চের পতাকা উড়িয়ে আমরা উদযাপন করলাম। নতুন লঞ্চের নাম দিলাম মুক্ত বাংলা। বিকেলে ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল মাঠে মিলিত হলো। তারা সারিবদ্ধ হয়ে কুচকাওয়াজ করল এবং ফাঁকা গুলি করে বিজয়ের আনন্দ উদ্‌যাপন করল। মাঠে শত শত লোক উপস্থিত ছিল। আমাকে কিছু বলতে বলা হলো। আমি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার লাইনগুলো আবৃত্তি করলাম বল বীর / বল উন্নত মম শির। নতুন স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে বানিয়ারচর ধর্মপল্লীতে আমরা নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলাম। ফাদার রিগনের এই নিঃস্বার্থ সেবা, সাহস এবং মানবিকতা আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অমর দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। ফাদার তাঁর ডায়েরি ২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে দিয়েছিলেন।

ফাদার মারিনো রিগান

ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে থেকে ফাদার মারিনো রিগন হয়ে উঠেছিলেন মনে-প্রাণে খাঁটি বাঙালি। বাংলা ভাষা শিখতে গিয়ে তিনি প্রেমে পড়েন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির। অনুবাদ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চল্লিশটি বই, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন ও লালন সাঁইয়ের বহু রচনা। তাঁর প্রিয় উক্তি ছিল “রবীন্দ্রনাথ থাকেন আমার মগজে, আর লালন বাস করেন আমার অন্তরে।”বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য প্রচারে তিনি ইতালিতে নিয়ে যান নকশিকাঁথা ও বাউলগান। শুরু হয় এভাবে মোংলায় ফাদার মারিনো রিগনের সহযোগী ছিলেন পল ললিত সরকার। তাঁর কাছ থেকেই ফাদার সংগ্রহ করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পণ্ডিতমশাই’। বইটি পড়তে গিয়ে অনেক কিছুই বুঝতে পারতেন না তখন ললিত সরকার তাঁকে ব্যাখ্যা করে দিতেন। ধীরে ধীরে রিগনের ভাষাজ্ঞান বাড়তে থাকে, আর বাংলা সাহিত্যের প্রতি গড়ে ওঠে গভীর অনুরাগ। একসময় তিনি পড়ে ফেলেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল ও জসীম উদ্দীনের বহু রচনা। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তাঁর জীবন ও চিন্তাভাবনায় ঘটে যায় এক রকম রূপান্তর। নিজের সেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে তিনি শুরু করেন অনুবাদকর্ম রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে পাঠান তাঁর ভাই-বোন ও বন্ধুদের কাছে। ১৯৬৪ সালে ইতালিতে প্রকাশিত হয় তাঁর অনুবাদ করা গীতাঞ্জলি।বাংলা থেকে সরাসরি ইতালীয় ভাষায় অনূদিত প্রথম সংস্করণ। বইটি ইতালিতে সমাদৃত হয় এবং ফাদার মারিনো রিগন হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদেশি অনুবাদক। পরবর্তী সময়ে তিনি অনুবাদ করেন রবীন্দ্রনাথের প্রায় ৪০টি গ্রন্থ, যা ইতালীয় পাঠকসমাজে বাংলা সাহিত্যের এক নতুন জগৎ উন্মোচন করে। কবি জসীম উদ্‌দীনের নক্সীকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট সহ আরো কিছু কবিতা ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেন ফাদার রিগন। এ ছাড়া লালনের গানসহ এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের বেশ কিছু কবিতা অনুবাদ করেন তিনি।লালনের জীবনদৃষ্টি ফাদার রিগনকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে। লালনের গানের ভেতরে তিনি আবিষ্কার করেন এক অদৃশ্য আধ্যাত্মিক জগৎ। যেখানে নেই ধর্মের বিভেদ, আছে শুধু মনের মানুষের অনন্ত সন্ধান। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ভিনদেশি এক বাউল। যাঁর হৃদয়ে মিশে যায় পূর্ব ও পশ্চিম ধর্ম ও মানবতা  জ্ঞান ও অনুভূতির এক অপূর্ব সংলাপ। আমার প্রিয় লালন গী‌তি (I CANTI DI LALON) নামে বই‌য়ের মাধ্য‌মে ফাদার মা‌রিনো রিগান প্রায় তিনশো  ফকির লালন সাঁইয়ের  গা‌নের অনুবাদ ক‌রেন ইতা‌লিয়ান ভাষায়।

ফাদার মারিনো রিগান

ফাদার মারিনো রিগন ছিলেন আমাদের পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কবি জসীম উদ্দিন ১৯৭৩ সালে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই দিনের স্মৃতি তাঁর বহু লেখায় কথায় উঠে এসছে বারবার। 




--- বাউল পানকৌড়ি
সংগ্রাম থেকে লাল সবুজের পতাকার ইতিহাস--Click to Read
স্বাধীনতার শব্দসঙ্গী কল-রেডী--Click to Read




Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url