জাগ্রত বিবেক ও শব্দসৈনিক শওকত ওসমান
শওকত ওসমান (১৯১৭–৯৮) বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সমকালমনস্ক ও জীবনবাদী কথাশিল্পীদের অন্যতম। সমাজ ও সময়ের প্রতি দায়বদ্ধ লেখক হিসেবে তিনি আমৃত্যু লিখে গেছেন সত্য ন্যায় ও মানবতার পক্ষে। তাঁর রচনায় ৫২ ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯ গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি জাতীয় আন্দোলন ও সংকটমূহুর্ত এক বিশেষ শিল্পমাত্রা অর্জন করেছে। জাতির দুঃসময়ে তিনি ছিলেন একজন জাগ্রত দায়িত্বশীল সাহিত্যসৈনিক। একাত্তরের ভয়াবহতা ও পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর কলমকে শক্তিশালী অস্ত্রে রূপান্তরিত করেছিলেন। যুদ্ধের সময়কার এবং যুদ্ধোত্তর রচনাগুলোতে সেই সচেতনতা ও প্রতিবাদী সত্তা অত্যন্ত স্পষ্ট।
কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমি করে চারটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস রচনা করেছেন-
জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৯১)
দুই সৈনিক (১৯৭৩)
নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩)
এবং জলাংগী (১৯৭৪)
এই উপন্যাসগুলোতে তিনি সময়ের নির্মম বাস্তবতা, মানুষের মনস্তত্ত্ব, মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও জাতির চেতনার উদ্বোধনকে গভীর শিল্পমননে উপস্থাপন করেছেন। আজকের এই লেখা মূলত সেই উপন্যাসগুলোর প্রতি পাঠকের আগ্রহ ও উৎসাহ বাড়ানোর প্রয়াস মাত্র। মুক্তিযুদ্ধকে নতুন প্রজন্মকে নতুন করে জানতে হবে কারণ ইতিহাস ভুলে যাচ্ছি আমরা। ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তি আজও ছায়ার মতো ফিরে আসতে চায় শকুনের মতো সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও প্রকৃত ঘটনাগুলো জানা থাকলে তাদের মুখোশ চিনতে এবং তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে কোনোই সংশয় থাকে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অটুট রাখতে সত্য ইতিহাস জানা ও তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া তাই আমাদের দায়িত্ব।
জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১)
জাহান্নাম হইতে বিদায় উপন্যাসটি ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় বসে লেখা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত হওয়া যুদ্ধকালীন বাস্তবতা নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের একেবারে প্রথম দিককার দৃশ্যপট, মানুষের মানসিকতা, সংগ্রামের টানাপোড়েন এবং শরণার্থী জীবনের কঠিন বাস্তবতা স্পষ্টভাবে চিত্রিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত জাহান্নাম হইতে বিদায় শওকত ওসমানের একাত্তরের প্রথম উপন্যাস। লেখক তখন নিজেই শরণার্থী পরবাসে অবস্থানরত। উপন্যাসের ভূমিকায় তিনি স্বীকার করেছেন একাত্তরের ভয়াবহ পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেওয়া একটিমাত্র উপন্যাসে অসম্ভব। তাই তিনি বিভিন্ন রচনায় সময়টিকে বিচিত্র দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছেন। বইটির নামই ইঙ্গিতবাহী। তৎকালীন পাকিস্তানি দমন-পীড়নের বাংলাদেশ যেন সত্যিই এক জাহান্নাম পরিনত হয়েছিল। এই জাহান্নাম থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার কাহিনিই ফুটে উঠেছে প্রধান চরিত্র মাস্টার সাহেব গাজী রহমানের শরণার্থী হয়ে দেশত্যাগের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতি সম্পর্কে সচেতন একজন বাঙালি নাগরিকের চোখে যুদ্ধকালের বাস্তবতা এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
দুই সৈনিক (১৯৭৩)
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস দুই সৈনিক। প্রধান চরিত্র মখদুম মৃধা। যিনি একজন অন্ধ মুসলিম লীগ নেতা। পাকিস্তানের প্রতি তার অন্ধ আনুগত্য প্রশ্নাতীত। মৃধা বিশ্বাস করে হিন্দু ও আওয়ামী লীগই পাকিস্তান ধ্বংসের চক্রান্ত করছে। গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী এলে মৃধা তাদের আপ্যায়নে গদগদ হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই আপ্যায়নের পরেই কাহিনি ভিন্ন খাতে মোড় নেয়। দুই সামরিক কর্মকর্তা মৃধার দুই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। অপমান-বঞ্চনায় ভেঙে পড়ে মৃধা আর পরদিন তার মৃতদেহ পাওয়া যায় কাঁঠালগাছে ঝুলন্ত। এই উপন্যাসে শওকত ওসমান দেখিয়েছেন সাম্প্রদায়িকতা অন্ধ আনুগত্য এবং রাজনৈতিক বিভ্রম কীভাবে মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩)
১৯৭৩ সালে প্রকাশিত নেকড়ে অরণ্য মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরিচালিত এক নারীবন্দি শিবিরের ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। এটি উপন্যাস নয় বরং স্মৃতিচিত্রধর্মী বর্ণনা। যেখানে চরিত্রের বিস্তার নেই,আছে শুধুই নির্যাতনের নির্মম সত্য। একটি গুদামঘরে বন্দি শতাধিক নারী প্রতিদিন পাকিস্তানি সেনাদের পাশবিক নির্যাতনের মুখোমুখি। কেউ আত্মহত্যা করছে, কেউ মৃত্যুর অপেক্ষায় নিস্তব্ধ। এদের মাঝেই আনা হয় এক বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাকে, যার ওপরও চলে নির্মম অত্যাচার। এই গ্রন্থ যুদ্ধাপরাধের এক ভয়াবহ অধ্যায় তুলে ধরে যা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। রাজাকারদের ঘৃনা করতে ও রাজাকারদের কাহিনি জানতে বইটা পড়া উচিৎ।
জলাংগী (১৯৭৪)
জলাংগী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসটি ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটি গ্রাম্য কৃষক পরিবারের শহুরে পড়ুয়া ছাত্র জমিরালীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ঘটনা এবং তার পরিবারের চালচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কাহিনী শুরু হয় জামিরালির গ্রামে ফেরার মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় শহরের কলেজ-ভার্সিটি বন্ধ হয়ে গেলে জামিরালি বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে গ্রামে। পরিস্থিতি এরপর দ্রুত বদলে যায়। দেশে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। হানাদার বাহিনীর বর্বরতার খবর যেমন পৌঁছে বাঁকাজোলে তেমনি শোনায় মুক্তিবাহিনীর বীরত্বের কাহিনিও। দেশের জন্য লড়াইয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তীব্র হয়ে ওঠে জামিরালির মনে। কিন্তু ফয়েজ মৃধা ও নাসিমন বিবির একমাত্র ছেলে বলে তাকে ছাড়তে চান না বাবা-মা। দ্বিধায় পড়ে তাঁর প্রেয়সী হাজেরাও। অবশেষে একরাতেই পালিয়ে দেশমাতৃকার টানে যুদ্ধের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে জামিরালি। এদিকে হানাদার বাহিনী হঠাৎ আক্রমণ করে বাঁকাজোল গ্রাম। অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, হত্যা কিছুই বাকি রাখে না তারা। রেহাই পান না জামিরালির বাবা-মাও। ইসলামি রাষ্ট্রের দাবিদার সেই মানুষগুলোর দাফনও সম্ভব হয় না মেঘনার স্রোতে ভেসে যেতে হয় নিথর দেহগুলোকে। প্রায় ছয় মাস পরে গ্রামে ফিরে জামিরালি জানতে পারে তার জন্য আর কেউ অপেক্ষায় নেই। অতঃপর তিনি খুঁজতে যান তাঁর প্রেয়সী হাজেরাকে কাজির চর গ্রামে। সেখানে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে তিনি। তাকে তুলে দেওয়া হয় বিভীষিকার আরেক নাম মেজর হাশেমের কাছে। শুরু হয় নির্মম নির্যাতন।
শওকত ওসমান শুধু একজন কথাসাহিত্যিক নন তিনি ছিলেন সমাজসচেতন, মানবিক ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। মুক্তিযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িকতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা, মানবাধিকার সবই তিনি নিজের লেখনীতে ধারণ করেছেন। তাঁর রচনায় যেমন আছে ইতিহাসের দলিল তেমনি আছে শিল্পরস ও মানবতার বাণী। সব মিলিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ জীবনবাদী সাহিত্য স্রষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস গুলো সবার হোক পাঠ্য।




