স্বপ্নবাজি: প্রেম, প্রতিবাদ আর স্বপ্নের সংক্রমণ
সঞ্জীব চৌধুরী বাংলা সংগীত জগতের এমন এক কালজয়ী নাম। যার প্রতিটি সুর ও শব্দে মিশে ছিল প্রেম, প্রতিবাদ আর সামাজিক দায়বদ্ধতা। দলছুট ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা একজন ছিলেন। আর ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার এবং সাংবাদিক। ১৯৬৪ সালে জন্ম। ছাত্রজীবন থেকেই বাম রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন যা পরবর্তীকালে তাঁর সংগীতে শহুরে দ্রোহ এবং মানবিকতার এক অনন্য মিশেল তৈরি করে। মাত্র ৪২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি খুব বেশি কাজ করে যেতে না পারলেও, তাঁর সৃষ্টিগুলো বাংলা সংগীতের ইতিহাসে গভীর ও স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি বিদায় নিলেও তাঁর গান আজও তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে এবং সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখায়। ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র একক অ্যালবাম স্বপ্নবাজি। যা তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন ও গভীর জীবনবোধের এক অনন্য দলিল। আজকে থাকছে তাঁর স্বপবাজি অ্যালবামের সব কথা।
🎵 সঞ্জীব চৌধুরী –স্বপ্নবাজি 📀 অ্যালবাম তথ্য
অ্যালবামের নাম: স্বপ্নবাজি
প্রকাশকাল: ২০০৫
রেকর্ড লেবেল: সংগীতা
মোট গান: ১০ টি
সংগীত : বাপ্পা মজুমদার
আলোকচিত্র: David Barikder এবং Moin (Drik)
শব্দ মিশ্রণ: চারু
শব্দ গ্রহণ: চারু ও রনি
রেকর্ডিং স্টুডিও: মিউজিকম্যান
স্টুডিও ক্র : মুনির ও কমল।
🎸 যারা বাজিয়েছেন
বাপ্পা মজুমদার-- কি-বোর্ড, গিটার, রিদোম প্রোগ্রামিং
রোজ-- রিদোম প্রোগ্রামিং।
১.রিকশা • ২. বাড়িফেরা • ৩. কথা বলবো না • ৪. হাওয়া • ৫. নেশা • ৬. বয়স ২৭ • ৭. সমুদ্রসন্তান • ৮. কোথাও বাঁশি • ৯. একটি চোখে কাজল • ১০. স্বপ্নবাজি ।
সঞ্জীব জবানি
রাত ভেঙে বাড়িফেরা। ঢাকার রাতজাগা নিশিপাওয়া সবাই আমার বন্ধু। পরম আত্মীয়ের মতো পৌছে দেয় বাড়ির আঙিনায়। নিশিরাতের হাঁকডাকে বিরক্ত হয় ঘুমওলা মানুষ। গলা বাড়িয়ে ঘুমঘুম চোখে গেরস্থ মানুষজন জিজ্ঞেস করে-কে যায? সব কথার উত্তর হয় না, উত্তর দিতে নেই। তবু মনে মনে বলি-আমি, বন্ধুগণ, আমি। স্বপ্নগুলো সংক্রমিত হোক সকলের মাঝে।
মন-ক্যামেরায় অটোফ্ল্যাশ। রিকশায় রূপসী। কামু তাতে কিভাবে মজেছিল? আপনিও কি মজেননি? হায়, ঢাকা থেকে রিকশা বুঝি উঠেই যাচ্ছে। তবুও বেঁচে থাকুক নস্টালজিক সেইসব চমকে উঠা হঠাৎ-স্মৃতি।
বাতাস লেগে উড়ছে যে চুল
উড়ছে আঁচল সাদা সাদা ফুল
বাতাস লেগে উড়ছে যে চুল
উড়ছে আঁচল সাদা সাদা ফুল
রিক্সায় দ্রুত রিক্সায় দ্রুত চলে গেলে কেনো?
কেনো আমার হলে না।
বাড়িফেরা/ কথা: প্রজ্ঞা নাসরিন/ সুর: বাপ্পা
সবাই কি বাড়ি ফিরতে পারে? তারপরও বাড়ি ফেরার আনন্দটুকু জেগে থাকুক। সেই অনুভূতিকেই কথায় ধারণ করেছেন প্রজ্ঞা নাসরিন। আর সুর? দ্যা গ্রেট বাপ্পা!
যাই পেরিয়ে সকাল দুপুর রাত
যাই পেরিয়ে নিজের ছায়া বাড়িয়ে দেয়া হাত
রাত জাগা পথ তাতে ছুঁয়েছে কি এমন
ছোঁয়া যায় তবে পথ নিরবধি (নিরবধি)
যাই পেরিয়ে এই যে সবুজ বন
যাই পেরিয়ে ব্যস্ত নদী অশ্রু আয়োজন।
কথা বলবো না কথা: জুলফিকার রাসেল/ সুর: সঞ্জীব
বিদেশী একটি গানের আদলে গানটির সুর আপনা আপনি একদিন তৈরি হয়ে গেলো। অনুজপ্রতিম জুলফিকার রাসেল রাতভর ঝিমুনির মধ্যে তাতে কথা বসালো। এভাবেই গানটি আপনাদের কাছে।
কথা বলবো না আগের মতো কিছু নেই
পিছু ডাকবো না পিছু ডাকার কিছু নেই
সর্বনাশী ঝড় বুকে উড়ে যাবার কিছু নেই
আগুনে পুড়েছি এ হাত বাড়িয়ে
পুড়ে যাবার কিছু বাকী নেই
কথা বলবো না আগের মতো কিছু নেই।
হাওয়া/ কথা: টোকন ঠাকুর/ সুর: সঞ্জীব
কবি টোকনের দেখা পাওয়াই কঠিন বিষয়। আর তাকে দিয়ে গান লেখানো? সে আরো দুরূহ। কিন্তু একদিন সেই ডুমুরের ফুল টোকন চার-চারটি গান নিয়ে আমার কাছে হাজির। অবাক কাণ্ড- প্রতিটি গানের বিষয়বস্তুই হচ্ছে ‘হাওয়া’! সেই হাওয়া সিরিজ থেকে আপনাদের জন্য সামান্য একটু হাওয়া...!
হাওয়ারে তুই বাঁজা নুপুর
হাওয়ারে তোর পায়ে ঘুঙ্গুর
হাওয়ারে তুই বাঁজা নুপুর
হাওয়ারে তোর পায়ে ঘুঙ্গুর
গানের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে
মন খারাপ সেই একলা দুপুর
গানের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে
বিষণ্ণ এক একলা দুপুর।
নেশা/ কথা: কামরুজ্জামান কামু/ সুর: সঞ্জীব
গোটা জীবনটাই বুঝি পলায়নপর ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দেয় মানুষ। রাস্তায় গড়াগড়ি যাচ্ছে হাড়জিরজিরে শিশু। আমরা দেখেও দেখি না। এতটাই ভোঁতা আমাদের অনুভূতি আর মরে পড়া অন্তর। খুলে যাক অন্তর্চক্ষু।
মাতাল সুর্য হো
মাতাল সূর্য মাতাল রাত্রি মাতাল বাতাস বহে রে
মাতাল বুকের পাঁজর আমার মাতাল অশ্রুধারারে
আরে নেশায় আরে নেশায়।
আরে নেশায় আমার যাচ্ছে বয়ে যায় বয়ে বেলা রে
আরে নেশায় আরে নেশায়।
বয়স ২৭/ কথা: আনিসুল হক/ সুর: সঞ্জীব
বন্ধুরা, আমার বয়স কিন্তু আসলে ১৮! ভরা বর্ষায় নদীর বয়স যেমন ১৮, জ্যোৎস্নার বয়স যেমন ১৮ তেমনি সার্টিফিকেটের হিসাব-নিকাশ উড়িয়ে দিয়ে আমার বয়সও ১৮। আর ২৭? সেতো আমার হিসাব নয়, সে হিসাব এ গানের রচয়িতা কবি আনিসুল হকের! মূল কবিতার অংশবিশেষ গান হিসাবে গাওয়ার অনুমতি দেওয়ার জন্য কবির কাছে কৃতজ্ঞ।
আমার বয়স হলো সাতাশ
আমার সঙ্গে মিতা পাতাস
তোর দু’হাত চেপে ধরি
চাই এটুকু মাত্তরি
আমার বন্ধু ছিল আকাশ
কেন দ্বিধার চোখে তাকাস
আমি মেঘের ছোট ছেলে
কোলে আমাকে আজ পেলে।
সমুদ্রসন্তান /কথা ও সুর: সঞ্জীব
সবকথা বলতে নেই। কিছু কথা উহ্য থাকা ভালো। এ গানের কথা
আর সুর ছুঁয়ে যাক শুধু তাকেই যে জানে সেই গোপন কথা, যার কাছে জমা আছে সমুদ্রের দু’একটি ঢেউ।
বুক জুড়ে এই বেজান শহর
হা হা শূন্য আকাশ কাঁপাও
আকাশ ঘিরে শংখচিলের
শরীর চেরা কান্না থামাও,
আকাশ ঘিরে শংখচিলের
শরীর চেরা কান্না থামাও
সমুদ্র কী তোমার ছেলে
আদর দিয়ে চোখে মাখাও।
কোথাও বাঁশি/ কথা: গিয়াস আহমেদ/ সুর: সঞ্জীব
প্রথম আলো’র সাংবাদিক গিয়াস আহমেদের ভেতরে বাস করে এক কবি-মন। এগানের কথা যেমন স্বতঃস্ফূর্ত তেমনি তার সুরও। সুর করতে করতে মনে হয়েছে- আমার অন্তরের কথা গিয়াস জানলো কিভাবে!
আমি তো অচিনপুর তেরো নদী সমুদ্দুর দূরে,
ছিলাম অতল ঘুমো ঘোরে
ভেবেছি জানবে না লোক, আমাকে ছোঁবে না শোক,
ভেবে নেব কেউ কোথাও রোদ্দুরে হাসছিলো
আমার ছিল বন্ধ কপাট অন্ধ বাতাস হাসছিল
কোথাও বাঁশি বাজছিলো হাওয়ারা খুব হাসছিলো
আমার ছিল বন্ধ কপাট অন্ধ চোখে রাত ছিল।
একটি চোখে কাজল/ কথা: জাফর আহমদ রাশেদ/ সুর: বাপ্পা/সঞ্জীব
কবি জাফর আহমদ রাশেদের কবিতার আমি একজন ভক্ত পাঠক। তার একটি কবিতা এত ভালো লেগে গেলো যে আপনা আপনিই তাতে সুরও বসে গেলো। বন্ধুগণ, গানটির অর্ধেক সুর আমার, বাকি অর্ধেক বাপ্পার। হৃদয় দিয়ে এ গানের সুর আমরা করেছি। আপনাদের ভালোলাগাতেই আমাদের আনন্দ।
একটি চোখে কাজল আর অন্য চোখ সাদা
তুমি গভীর ঘুমে আমার শুধুই গলা সাধা
একটি চোখে কাজল আর অন্য চোখ সাদা
তুমি গভীর ঘুমে আমার শুধুই গলা সাধা।
রাত পোহালো কাল আজ সূর্য এলো খাটে
পথে নামার পথ কত গৃহী এসে কাটে।
স্বপ্নবাজি / কথা ও সুর: সঞ্জীব চৌধুরী
সে এক সময় ছিল। ৮০ থেকে ৯০ জুড়ে স্বৈরাচারী দমন-পীড়ন আর হত্যা। আমাদের স্বপ্নগুলো বুঝিবা লুঠ হয়ে গেলো। আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে কণ্ঠে তুলে নিতে হলো গান। ‘স্বপ্নবাজি’ সেই সময়েরই ফসল। ৮৭-র কোনো এক ডিসেম্বরে গানটি প্রথম লেখা এবং গাওয়া। সে কেবলই রাস্তায় রাস্তায়। কমরেড তাজুল ইসলাম। আদমজীতে স্বৈরাচারের দোসররা নির্মমভাবে স্রেফ পিটিয়েই তাকে মেরে ফেলেছিল। বিচার হয়নি। কর্ণেল তাহের। মুক্তিযুদ্ধের নির্ভীক সৈনিক। জীবন দিয়েছেন ফাঁসির কাষ্ঠে। এই দু’জন আমাদের স্বপ্নের প্রতীক হিসেবেই গানটিতে এসেছেন। আবৃত্তিকাররা ইতিমধ্যে বহুবার এটি আবৃত্তি করেছেন। তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। অ্যালবামে গানটির সামান্য কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে বাস্তব কারণেই। গানটি উৎসর্গ করছি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সকল শহীদের অমর স্মৃতির প্রতি। কতো কিছুইতো হারিয়ে যায়, তবুও বেঁচে থাকে স্বপ্ন। আমাদের স্বপ্নগুলো দীর্ঘজীবী হোক।
পৃথিবীতে শান্তি রক্ষিত হোক
আকাশে শান্তি, বাতাসে শান্তি
ওহো শান্তি রক্ষিত হোক
বিশৃঙ্খলাকারীকে ধরিয়ে দিন
আমাকে চুপ করতে হয়
চুপ করিয়ে দেয়া হয়
তবু
তবু বন্ধুগণ..
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই।
নাম উল্লেখমাত্রই কেন জানি গুরুত্বপূর্ণ নামগুলো বাদ পড়ে যায়। তাই নাম উল্লেখ না করেও সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে ঋণী।
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই | পৃথিবীতে শান্তি রক্ষিত হোক
কনসার্ট ফর ফাইটার্স- সঞ্জীব চৌধুরী
