বাংলা ব্যান্ড ও অ্যালবামের ধারাবাহিক গল্প: পর্ব-১ – চাইম, উইনিং, তীর্থক, ইন ঢাকা, রকস্ট্রাটা ও পেপার রাইমের যাত্রাপথ

বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাসে নব্বই দশক ছিল রঙিন এক অধ্যায়। সেই সময়কালের কিছু পথিকৃৎ ব্যান্ড আজও আমাদের মনে অম্লান ছাপ রেখে গেছে। এই পর্বে  ছয়টি প্রারম্ভিক ব্যান্ডের যাত্রাপথের গল্প থাকবে: চাইম, উইনিং, তীর্থক, ইন ঢাকা, রকস্ট্রাটা এবং পেপার রাইম।  


উইনিং (Winning) : 

বাংলাদেশি ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে উইনিং জনপ্রিয় একটি ব্যান্ড। ১৯৮৩ সালের ১ জানুয়ারি ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু হয়, আর নব্বইয়ের দশকে এসে তারা দেশের ব্যান্ড সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। প্রথম দিকে ব্যান্ডটির সদস্য ছিলেন হায়দার হোসেন, মিতুল, রঞ্জন, শেলী, রানা ও ফাহিম। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যান্ডে আসে নানা পরিবর্তন। ১৯৮৫ সালে বাবু ও রেজা যোগ দেন, ১৯৮৬ সালে বিপ্লব যুক্ত হন কিবোর্ডে। কিছুদিনের জন্য নগর বাউলের জেমসও তাদের সাথে অনুশীলন করেন। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় তাদের স্বনামধন্য প্রথম অ্যালবাম “উইনিং। 


এই সময়েই ব্যান্ডটি বড় কনসার্টগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তিন বছর পর, ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম “অচেনা শহর”। যা তাদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সাফল্যমণ্ডিত কাজ হিসেবে ধরা হয়। তবে নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে ব্যান্ডে ভাঙন শুরু হয়। সদস্যরা ব্যক্তিগত ব্যস্ততা, বিদেশে পড়াশোনা ও পেশাগত কারণে একে একে সরে যান। তবুও ব্যান্ডটি টিকে থাকে এবং ২০০০ সালে শেরাটনে অনুষ্ঠিত নেসক্যাফে আনপ্লাগড কনসার্টে তারা ব্যাপক সাড়া তোলে। ২০০৩ সালে কানাডায় প্রবাসী সদস্যদের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় “উইনিং প্রবাসে”। সেই সময় বাংলাদেশেও প্রকাশিত হয় তাদের আরেকটি অ্যালবাম। দেশ-বিদেশে কনসার্ট ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে উইনিং ব্যান্ড নতুনভাবে পরিচিতি পায়। বর্তমানে ব্যান্ডটির সক্রিয় সদস্যরা হলেন: চন্দন, কিরণ, রঞ্জন, পল, শমী ও অ্যালিস (শারিফ)। প্রকাশিত অ্যালবাম: উইনিং (১৯৯১), অচেনা শহর (১৯৯৪), উইনিং প্রবাসে (২০০৩)।

রকস্ট্রাটা (Rockstrata): 
  
বাংলাদেশের হেভি মেটাল অগ্রদূত বাংলাদেশের প্রথমদিকের হেভি মেটাল ব্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম রকস্ট্রাটা। মাত্র একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেও তারা পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য হার্ডরক ব্যান্ডের কাছে প্রেরণা হয়ে আছে। ১৯৮৫ সালে যাত্রা শুরু করা রকস্ট্রাটা তাদের একমাত্র অ্যালবাম “রকস্ট্রাটা” প্রকাশ করে ১৯৯০ সালে, সারগামের প্রযোজনায়। অ্যালবামের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে রক্তে ভেজা মাটি, আর্তনাদ, সামান্য দুঃস্বপ্ন, শান্তির স্বপ্ন, নির্বাসন, নিউক্লীয়ার স্বাধীনতা এবং মুক্তি দাও। 


ব্যান্ডের সদস্যরা ছিলেন: মুশফিক আহমেদ (ভোকাল), ইমরান হোসেন (গিটার), মইনুল ইসলাম (গিটার), আরশাদ আমিন (বেইস গিটার ও ভোকাল) এবং মাহবুব-উর-রশিদ (ড্রামস)। ৮০’র শেষ ও ৯০’র শুরুর দিকে তারা একাধিক সফল কনসার্টে অংশ নিলেও পরে অধিকাংশ সদস্য উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে চলে যান এবং ব্যান্ডের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। মাহবুব-উর-রশিদ পরবর্তীতে মাইলস-এর ড্রামার হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন।

পেপার রাইম (Paper Rhyme):

বাংলাদেশের পপ-রক ব্যান্ড ইতিহাসে পেপার রাইম (Paper Rhyme) একটি বিশেষ নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক এই ব্যান্ডটি গঠিত হয় ১৯৯২ সালের ২৪ জানুয়ারি। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা ছিলেন আহমেদ সাদ (ভোকাল, হারমোনিকা), নাসের হক (কী-বোর্ড), রাশেদ ইকবাল (গিটার), অনিন্দ্য কবির অভিক (ড্রামস, পারকাশন) ও শুমন জামান (বেজ)। তারা সবাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং নিয়মিত গানচর্চা করতেন ক্যাম্পাস ও শিক্ষক কোয়ার্টার এলাকায়। প্রথমবার লাইভ পরিবেশনা হয় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এরপর ধীরে ধীরে তারা নাম পান কনসার্টের মঞ্চে। ব্যান্ডের ব্যবস্থাপনায় শুরুতে ছিলেন বিল্লাল এবং পরে শাকিল। ১৯৯৬ সালে সাউন্ডটেকের ব্যানারে প্রকাশিত হয় তাদের আত্মশিরোনামযুক্ত একমাত্র অ্যালবাম “Paper Rhyme”।


শুধু ক্যাসেট আকারে প্রকাশিত হলেও পরে “Silver Disc” থেকে সিডি ফরম্যাটেও প্রকাশিত হয়। অ্যালবামের অন্ধকার ঘরে, আকাশের কী রং ও এলোমেলো গানগুলো বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে “অন্ধকার ঘরে” নব্বই দশকের অন্যতম আলোচিত গান হয়ে ওঠে। অ্যালবামের পর ব্যান্ডের কার্যক্রম থেমে যায়। সদস্যরা নানা কারণে ছড়িয়ে পড়েন। যদিও ২০০৯ সালে তারা নতুন করে ফিরে আসার চেষ্টা করেন, নতুন সদস্য মিরাজ ও লনিকে যুক্ত করে। ২০১১ সালে অভিক বিদেশ থেকে ফিরে আসেন। তবে ভোকাল আহমেদ সাদের অসুস্থতার কারণে নতুন অ্যালবামের পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং ২০১২ সালে ব্যান্ডটির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। পেপার রাইমের গানগুলোতে ছিল কাব্যিকতা, বিষণ্ণতা এবং গভীর আবেগের প্রকাশ। তারা মূলত পপ-রক হলেও হার্ড রক ও সফট রকের প্রভাবও স্পষ্ট ছিল। নব্বই দশকের শহুরে যুবসমাজের অনুভূতিকে তারা সুরে মেলাতে পেরেছিল। আর এই কারণেই স্বল্প সময়ে ব্যান্ডটি শ্রোতাদের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে যেতে সক্ষম হয়।

তীর্থক (TEERTHAK):

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতে তীর্থক এক অনন্য নাম। ১৯৮৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গানপাগল কয়েকজন তরুণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জন্ম নেয় প্রথম ক্যাম্পাসভিত্তিক ব্যান্ড “অর্ক”। পরে আশিকুজ্জামান টুলু আর্ক নামে ব্যান্ড গঠন করলে “অর্ক”-এর নাম বদলে রাখা হয় “তীর্থক”। অর্থাৎ সংগীতের মহান তীর্থে নিজেদের যাত্রা শুরু করা কয়েকজন তরুণ—এই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। শুরুর দিনগুলো ব্যান্ডের প্রথম সদস্যরা ছিলেন মহসিন, মিনহাজ, যতন, তাপস, পপলু ও বাবুল। তবে শুরুতে তারা ভুগছিলেন মূল ভোকালের অভাবে। ঠিক তখনই দেবদূতের মতো এসে যোগ দেন আইকো, যিনি হয়ে ওঠেন তীর্থকের প্রাণ। তাদের অনুশীলন চলত জাকসু ভবনে। ১৯৯০ সালে ব্যান্ডে ড্রামার হিসেবে বেলাল ও গিটারে রানা যুক্ত হন। প্রথম অ্যালবামের সাফল্য ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় তীর্থকের প্রথম অ্যালবাম “দূয়ারী”। এই অ্যালবামে স্থান পাওয়া ভালো আছি, ভালো থেকো গানটি রাতারাতি জনপ্রিয়তা পায়। সেই বছর পাক্ষিক আনন্দ বিচিত্রা টপ চার্টে মাইলসের প্রত্যাশা–এর সাথে যুগ্মভাবে সর্বাধিক বিক্রিত অ্যালবামের মর্যাদা লাভ করে দূয়ারী। ১৯৯২ সালের শেষ দিকে উপল (লিড গিটার) ও সংগ্রাম (বেজ) ব্যান্ডে যোগ দেন। তীর্থক তখন দেশজুড়ে কনসার্ট, টিভি শো ও বিভিন্ন ইভেন্টে নিয়মিত পারফর্ম করতে থাকে। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় অ্যালবাম “পরাজিত প্রেম”। 


এসময় ব্যান্ডে কিছু পরিবর্তন আসে, ড্রামে সুমন, গিটারে সাময়িকভাবে রকস্ট্রাটার মুশফিক এবং ভোকালে আলফি যুক্ত হন। ১৯৯৯ সালে বের হয় তাদের তৃতীয় অ্যালবাম “রাজকইন্যা”। তবে ২০০০ সালের পর ব্যান্ডের মূল ভোকাল আইকো কানাডায় চলে গেলে, এবং গিটারিস্ট জুবায়ের বাবু যুক্তরাজ্যে পাড়ি দিলে তীর্থকের কার্যক্রম ধীর হয়ে যায়। তীর্থকের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে: ভালো আছি ভালো থেকো, দূয়ারী, চিঠি, তুমিহীনা, নারী, রাজকইন্যা, মানুষ আমি আমার কেন, চুমোয় চুমোয়, পরাজিত প্রেম, এবং বাংলাদেশ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৯২ সালে রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা “ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো” গানটির স্বত্ব তীর্থক উচ্চ সম্মানীর বিনিময়ে পরিবার ও রুদ্র সংসদ থেকে একক রয়্যালিটি সহ পায়। যদিও পরবর্তীতে অসংখ্য শিল্পী গানটি পরিবেশন করেন, তবে মূল সম্মান সেই সময়ে পেয়েছিল তীর্থক। ব্যান্ড লাইন আপ ছিল: ভোকাল: আইকো, লিড গিটার: জুবায়েল বাবু, বেজ গিটার: সংগ্রাম, কিবোর্ড: মহসিন, ড্রামস: বেলাল এবং ম্যানেজার: মিনহাজ।

চাইম (Chime): 

বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক অঙ্গনে চাইম জনপ্রিয় নাম। ব্যান্ডটি মূলত ঈগলস ও এলটন জন–এর সংগীত দ্বারা প্রভাবিত। একই সঙ্গে ফেরদৌস ওয়াহিদ, ভূপেন হাজারিকা, শচীন দেববর্মণ এবং রেঁনেসা ব্যান্ডের সংগীত থেকেও অনুপ্রাণিত। শুরুতে ব্যান্ডটির নাম ছিল ফ্রিজিং পয়েন্ট। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে তারা চাইম নামেই যাত্রা শুরু করে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আশিকুজ্জামান টুলু। 


ভোকাল খালিদের স্বপ্ন ছিল দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যান্ড মিউজিক ইন্সটিটিউট গড়ে তোলা, যাতে নতুন প্রজন্ম সংগীতশিল্পীরা ব্যান্ড সংগীতের সঠিক শিক্ষা পেতে পারে। সদস্যরা ভোকাল : খালিদ (প্রয়াত), লিড গিটার : বাহাদুর, রিদম গিটার : আশিক মোস্তফা, বেজ গিটার : নাদিম, কিবোর্ড : রিয়াজ, ড্রামস : বিপ্লব। অ্যালবাম: চাইম (১৯৮৫), চাচির দুঃখ (১৯৮৭), নারী (১৯৯৬), জন্ম (২০০২),কীর্তনখোলা (২০০৫)।

ইন ঢাকা (In Dhaka):

বাংলাদেশের হেভি মেটাল ঘরানার অন্যতম পথিকৃৎ ব্যান্ড ইন ঢাকা। রকস্ট্রাটা, ওয়ারফেজ ও এসেস-এর সাথে তারা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশের চারটি অগ্রদূত হেভি মেটাল ব্যান্ডের একটি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তাদের প্রথম ও একমাত্র অ্যালবাম “নিঃশব্দ কোলাহল” প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে, সারগাম প্রযোজনায় ক্যাসেট আকারে। অ্যালবামটিতে ছিল ১০টি গান ও ২টি ইন্সট্রুমেন্টাল ট্র্যাক। প্রকাশ ইতিহাস ১৯৯২ – সারগাম থেকে প্রথম ক্যাসেট রিলিজ (১০ গান + ২ ইন্সট্রুমেন্টাল)। ৯০ দশকের মাঝামাঝি – সারগাম প্রকাশ করে “স্পেশাল এডিশন” সিডি (Sargam CD-036), যেখানে মূল ১০টি গান ছাড়াও ছিল আরও ৬টি অনপ্রকাশিত গান, তবে বাদ দেওয়া হয় ২টি ইন্সট্রুমেন্টাল ট্র্যাক। ২০০৮ – সারগাম পুনরায় অ্যালবামটি প্রকাশ করে সিলভার ডিস্কে (Sargam SACD-506), মূল ক্যাসেট কভারের ডিজাইন ও আগের ১২ ট্র্যাক রেখেই।


অ্যালবামের রেকর্ডিং সেশন সম্পন্ন হয়েছিল ১৯৯০-১৯৯১ সালের দিকে, রকস্ট্রাটার প্রথম অ্যালবামের কয়েক সপ্তাহ আগে এবং ওয়ারফেজের প্রথম অ্যালবামের কয়েক মাস আগে। তবে নানা জটিলতা ও বিলম্বের কারণে ১৯৯২ সালে এটি প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে রকস্ট্রাটা ও ওয়ারফেজ তাদের অ্যালবাম ১৯৯১ সালের শেষ দিকে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। অ্যালবামের কাভার নোটে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয় ওয়ারফেজের টিপু, বাবনা ও রাসেল আলীকে। ব্যান্ড লাইনআপ ছিল: মাশুক- লিড গিটার, জয়- লিড গিটার/ভোকাল, তুষার-বেজ গিটার/ভোকাল, Gork- ভোকাল, রঞ্জন- ড্রামস, শান্ত- কিবোর্ড।

--বাউল পানকৌড়ি।
পর্ব-১ এর যাত্রা ছিল শুরু হল মাত্র। পরবর্তী পর্বে থাকছে অন্য ব্যান্ড, অ্যালবামের গান এবং তাদের সঙ্গীত যাত্রার বিশেষ মুহূর্ত। অবশ্যই সঙ্গে থাকুন!

রেনেসাঁ ব্যান্ড : বাংলা ব্যান্ড সংগীতের নবজাগরণ ও সৃজনশীল যাত্রার কথা--Click to Read
কনসার্ট ফর ফাইটার্স ২০০৫ এবং একজন সঞ্জীব চৌধুরী--Click to Read
সমাজের প্রতিচ্ছবি আর প্রতিবাদের সুর: বাংলা ব্যান্ড ইতিহাসের সেরা দশটি গান--Click to Read




Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url