ওগো ভালোবাসা’: অ্যালবাম ইনলে-তে লুকিয়ে থাকা জ্যাজ সংগীতের ইতিহাস
বাংলা সঙ্গীত জগতের বিবর্তনে ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মাকসুদ ও ঢাকা ব্যান্ডের দ্বিতীয় অ্যালবাম ওগো ভালোবাসা একটি কালজয়ী নাম। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রক-জ্যাজ ফিউশন অ্যালবাম হিসেবে স্বীকৃত। দীর্ঘ দুই দশক পরেও এদেশের সঙ্গীত অঙ্গনে একটি অনন্য মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথাগত আধুনিক গানের ধারার বাইরে গিয়ে মাকসুদুল হক জ্যাজ সঙ্গীতের তাত্ত্বিক গভীরতাকে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ও লোকজ সুরের সঙ্গে মেলানোর যে সাহসী নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন, তা ছিল সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে অভাবনীয়। ক্যাসেটের ইনলে কভারে জ্যাজ সঙ্গীতের ইতিহাস ও বর্ণবৈষম্যের লড়াইকে তুলে ধরে তিনি এই শিল্পধারাকে সাধারণ মানুষের হৃদস্পন্দন হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। ১০টি গানের এই সংকলনে জ্যাজ-রক-ফাঙ্ক থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসঙ্গীত, মুর্শিদি ও মারফতি গানের যে অভূতপূর্ব ফিউশন ঘটেছিল, তা কেবল বাণীর গভীরতাতেই নয়, বরং বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ ও প্রকৌশলী কৌশলেও ছিল বিশ্বমানের। যদিও 'রবীন্দ্রনাথ ২০১০' গানটি নিয়ে সেই সময় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তবুও সময়ের আবর্তে মাকসুদের সেই নিরীক্ষাধর্মী অনুমান আজ সত্যে পরিণত হয়েছে। মূলত সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্মিত এই অ্যালবামটি বাংলা গানে আধুনিক ফিউশন সংস্কৃতির পথপ্রদর্শক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজকে থাকছে অ্যালবামটির কাভারে থাকা সকল কথা।
এক নজরে : ওগো ভালবাসা/ মাকসুদ ও dHAKA
অ্যালবাম: ওগো ভালবাসা
ব্যান্ড : মাকসুদ ও dHAKA
প্রকাশকাল: ১৯৯৯
রেকর্ড লেবেল: সিডি সাউন্ড
মোট গান: ১০ টি
সুর ও সংগীত : মাকসুদ ও dHAKA
সংগীত মিশ্রণ: প্রয়াত ইমরান আহমেদ চৌধুরী মবিন।
রেকর্ডিং স্টুডিও: সাউন্ডগার্ডেন
উৎসর্গ: শিল্পী দিপা হক (১৯৫৩-১৯৯৯)
🎧 ট্রাক লিস্ট: ওগো ভালবাসা/ মাকসুদ ও dHAKA
১। ভালবাসা দিবস ৯৯
কথা ও সুর: মাকসুদুল হক || ধাচ: jazz-funk rock fusion
২। কাঁদবে
কথা: যুবরাজ মাহমুদ ঠিকাদার ও মাকসু || সুর: যুবরাজ মাহমুদ ঠিকাদার || ধাচ: jazz-funk rock fusion
৩। গীতিকবিতা-৩ (ওগো ভালবাসা)
কথা ও সুর: মাকসুদুল হক || ধাচ: jazz-funk rock fusion indo classical
৪। অভিশাপের পালা
কথা ও সুর: মাকসুদুল হক || ধাচ: blues funk fusion
৫। রবীন্দ্রনাথ ২০১০ ইং ( না চাহিলে যারে পাওয়া যায়)
কথা ও সুর: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর || ধাচ:jazz-funk rock fusion indo classical
৬। রঙ তামাশার এই ভুবনে
কথা ও সুর: সায়ান আহমেদ || ধাচ: marfati-funk fusion
৭। আমি তার কিছু পাবো কিনা
কথা: অপু ও মাকসুদ || সুর: নাসিরউদ্দিন আহমেদ অপু || ধাচ: bossanova samba funk fusion
৮। গীতিকবিতা-৪ (হে প্রবঞ্চনা)
কথা: মাকসুদুল হক || সুর: তন্ময় || ধাচ: jazz-funk fusion
৯। চিঠি ব্যক্তিগত (অতি জরুরী)
কথা: মাকসুদুল হক || সুর: বিদেশী গান || ধাচ: reggae fink fusion
১০। পিঞ্জর
কথা ও সুর: প্রচলিত || ধাচ: murshidi jazz rock theater
Dhaka সম্পর্কীত: অ্যালবাম কাভার থেকে
অক্টোবর ১৮, ১৯৯৭। FEEDBACK থেকে আমি অব্যাহতি নেওয়ার পর আমরা কয়েকজন মিলে এই band টি গঠন করি। FEEDBACK থেকে আমার সঙ্গে এসেছিল পুরোনো বন্ধু খোকা। যোগ্য এই Bass বাদক বাংলাদেশের band সঙ্গীত আন্দোলনে শরিক হয়ে বিগত প্রায় ২৬ বছর যাবৎ একনিষ্টতার সাথে বাজিয়ে আসছেন ও তার নিজস্ব অবদান রেখেছেন। পাশ্চাত্যিয় ঘরনার Jazz সংগীতে তার নেশা অনেক বছরের। খোকা Dhaka Band এ বাজানো ছাড়াও সদস্য শিক্ষানবীষদের jazz এর তালিম দিয়ে থাকেন।
👉মন২ dHAKA band এর গোল রক্ষক- অর্থাৎ ছন্দের ধারক বা drummer. প্রায় বার বছর ধরে বাংলাদেশ ছাড়া বিদেশে অনেক ক্ষ্যাপ বা gig মেরে বেড়িয়েছেন অনেক নামীদামী শিল্পীদের সঙ্গে। dHAKA ই তার জীবনের প্রথম band. অত্যন্ত বিনয়ী, স্বল্পভঅষী এবং রশিক এই শিল্পীর সম্পৃক্ততা মূলত rock ঘরানার drumming এর সঙ্গে হলেও dHAKA band এ তিনি jazz drummer হয়ে উঠার অপরিসীম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
👉তন্ময় অসাধরন মেধাবী ও সস্থীর গতি সম্পন্ন এবং হাড়ভাঙ্গা শ্রম দিতে অভ্যস্ত, আমাদের এই কৃতি Keyboard বাদক। শৈশবে harmonium হাতাতে হাতাতেই আপনা আপনি তার দখল চলে আসে Keyboard এ। তিনি যে সুর বিন্যাসের দক্ষ তার উজ্জল দৃষ্টান্ত হে প্রবঞ্চনা।
👉Percussion বাদক শাহেদ। প্রায় এক দশক জড়িত ছিলেন মরহুম ফিরোজ সাইয়ের সঙ্গে। বাজনার অভিজ্ঞতাতে তিনি সম্পূর্ন eastern হলে dHAKA য় যোগ দেওয়ারপর আমাদের ব্যান্ডের চাহিদা অনুযায়ী afro-carribean jazz percussion এ গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখছে।
👉পিকলু ব্যান্ডের সবচেয়ে বয়োকণিষ্ঠ সদস্য। পাশ্চ্যাতিয় rock ও heavy metal ঘরানার guitarist ও The Jolly Rogers এর মত দূর্ধর্ষ ব্যান্ড এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট গিটারিস্ট মিনহাজ আহমেদ পিকলু মাত্র ৫২ বছর বয়সে ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ এ ইন্তেকাল করেন। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
👉মাকসুদুল হক পেশায় ইংরেজী ও বাংলা ভাষার গায়ক, কবি, গীতিকার ও freelance প্রাবন্ধিক (নিয়মিত, এই নিষিদ্ধ সময়ে, সাপ্তাহিক চলতিপত্র) dHAKA band এর প্রতিষ্ঠাতা, দলনেতা, প্রধান কন্ঠ শিল্পী ছাড়াও এই প্রথমবারের মত সংগীত পরিচালক এবং শিল্প নির্দেশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলাম। band সংগীতে আমার অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যে ২৬ বছরেরও বেশী। এই album অর্থাৎ সংকলন বা ফিতার poster, calender ও প্রচ্ছদের মলাট অর্থাৎ cover ও inlay card এর সম্পূর্ণ design আমারই করা। design এর ব্যাপারে সময়ের হুমায়ূনের সহযোগিতা আমার এই চেষ্টা হয়তো সার্থক (?) করেছে।
👉 যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত jazz নগরী Kansas City র বাসিন্দা Travis Jenkins। প্রায় ৩৮ বছর থেকে তার নিজ দেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশেও বহু গুণী ও নামীদামী শিল্পীদের সাথে বাজিয়েছেন এবং record করেছেন। বারিধারার Dhaka Jazz Ensemble নামের বিদেশী নাগরিকদের band এ তিনি বাজাতেন। সংগীত শিক্ষকতাই বাংলাদেশে তার মূল পেশা। তিনি Tenor, soprano saxophone, silver flute ইত্যাদি যন্ত্র বাজাচ্ছেন। এ দেশে আসার আগে তিনি Papua New Guinea তে অবস্থান করছিলেন। খ্যাতির চাইতে সংগীতে জীবনের ছাপ রাখার ব্যাপারে যারা বেশী আগ্রহী Travis তাঁদের দলের। তাঁর মত গুণী শিল্পীর সঙ্গে অনেক আগেই পরিচিত হওয়া উচিত ছিল আমাদের।
👉দিল্পী নিবাসি উর্মী || রমা ধানমন্ডির Internationa Music School এর ছাত্রী || ডালিয়া || মেহরীন একাধারে বাংলা ও ইংরেজী উভয় ভাষায় গায়িকা, উপস্থাপিকা || নীতিরঞ্জন তবলা।
🎸 Jazz-rock fusion সম্পর্কিত:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০ বছর আগে পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় বা western classical এর ভিত থেকেই জন্ম হয় আজকের জাজ সংগীতের। আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসরা এই নয়া সংগীত উপস্থাপন করেন। মার্কিনী ইতিহাসের বর্ণবৈষম্যের সেই কলঙ্কময় অধ্যায়; শ্বেতাঙ্গরা তাদের কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের সংগীত ছাড়া আর কোন মানসিক উন্নতির প্রয়াসকে প্রশ্রয় দিত না। সেই কৃষ্ণাঙ্গরাই আজ “বিশ্বসংগীতের” পৃথিবীতে রাখছে অকল্পনীয় অবদান। ক্রীতদাসদের দুঃখ বেদনা ভালবাসা ও কষ্ট সব কিছুরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই সংগীতের মাঝ দিয়ে এবং তা প্রতিফলিত হয় তাদের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক চেতনার মধ্যে। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বৈচিত্র্যপূর্ণ ছন্দ বা rhythm এর impression বা ছাপ পাশ্চাত্য সংগীতের প্রথম দিককার সংগীতজ্ঞদের কাজের নতুন মাত্রা সংযোজন করে। বাকিটা ইতিহাস। মানব জাতির সময় ও ধৈর্য যখন টানাপোড়েন ও পরীক্ষার মুখে, ঠিক তখনই jazz সংগীত ছন্দ, লয়, মাত্রা, উপস্থাপনা ও সুরের আবহাওয়াকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে। দ্রুতলয়, solo, improvisation, যুগলবন্দি, ইত্যাদিতে এগিয়ে নিয়ে আসে এক অভাবনীয় নতুন ধারা। Jazz সেই ‘তখন’ বা ‘এখন’..... কখনই commercial বা বাজারীয় সংগীত ছিল না, যদিও বা jazz কে ভাঙ্গিয়ে অনেক নতুন সংগীত সৃষ্টি হয়, যার অন্যতম rock যা শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের অনুসরণে আবিষ্কার করে।
একদিন কাঁদবে জলে চোখ ভিজবে
মাকসুদ ও ঢাকা | ওগো ভালবাসা
🎸 Jazz আমাদের দেশের শাস্ত্রীয় বা আধা-শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মতো শুধু সম্ভ্রান্ত সমাজদারদের সঙ্গীত নয়, কোন কালেই ছিল না। যেহেতু এ সঙ্গীতের জন্ম কোনো রাজপ্রাসাদের দরবারে হয়নি বা ধনীদের পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। তা সাধারণ মানুষের সব স্তর ভেদ করে এসেছিল বলেই আজ এর বিশ্বজোড়া ব্যাপ্তি ও চাহিদা। মিল শুধু এতটুকুই যে, Jazz আমাদের শাস্ত্রীয় বা আধা-শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মতো; চর্চার খুব অভাব। Jazz তাই সকল বিবেচনায় খুব উঁচু মাপে সঙ্গীত এবং যে কোন সংস্কৃতির উচ্চ মাপের সঙ্গীতের সঙ্গে খুব সহজে ও সফলভাবেই সংমিশ্রণ বা fusion করা সম্ভব। যেমন আমরা করার চেষ্টা করেছি মুর্শিদী, মারফতি এমনকি রবীন্দ্র সংগীতের ছাড়াও আমাদের শাস্ত্রীয় কিছু ধারার সঙ্গে। কথাটা খুব হালকা শোনালেও সত্য, এই Jazz-rock fusion খুব ভাল জাতের আলু যা যে কোন তরকারীতেই মানান সই। এই শতকের শেষে বিশ্ব যখন বর্ন, জাত, স্তর বা ধর্মকে মানুষের যোগ্যতা নির্ণয়ের মাপকাঠি বলে আর মনে করছে না, যখন সংগীত কোন ভৌগলিক সীমারেখা মনে চলছে না, এই পরিবর্তিত পৃথিবী যেখানে কোনো আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সংস্কৃতি নয় বরংচ বিশ্ব সংস্কৃতির বা Global calture এর দিকে এগোচ্ছে, Jazz কে ঠিক তখনই বিশ্ব জুড়ে Semi Classical বা আধা শাস্ত্রীয় সংগীত বলে গন্য করা হচ্ছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী যখন ষাট দশকের আমাদের পথিকৃৎ Beatles এর সংগীতকে আধাশাস্ত্রীয় সংগীত বলে মনে করেছে, দুশ বছর পুরোনো Jazz সংগীতকেও এখানো Semi Classical বা আধা শাস্ত্রীয় বলে গণ্য করা হয়, তাতে এই সত্য প্রমানিত হয় jazz তার নিজস্বতা এতগুলো বছরেও হারিয়ে ফেলেনি। তার মূল কারন এই সংগীত ধারা সময়কে ধারন করেছে নিজেরক একাত্মতা বা অস্তিত্ব,দুই-ই স্বদর্পে বজায় রেখেছে এবং সম্ভভ হয়েছে Jazz এর সংমিশ্রণ বা Fusion শাস্ত্রের দর্শনের কারনে। Jazz-rock fusion কখনই ঐতিহ্যআদি বা রক্ষনশীলদের সংগীত ছিলনা। Jazz-rock fusion খুব গুরুগম্ভীর শোনালেও বাংলা ভাষাভাষীদের কানে বিশেষ করে Band সংগীতের শ্রোতাদের কাছে তেমন নতুন কিছু নয়। কারন Jazz এর আদলে আমি এর আগে অনেক গান সৃষ্টি করেছি Feedback থাকাকালীণ। নিষিদ্ধ-তেও তার প্রমান মেলে। পার্থক্য এইটুকুই যে ওগো ভালবাসা সেই অর্থে সম্পূর্ণ একটি Jazz-rock fusion album, সংকলন বা ফিতা। আমার ধারনা বাংলা সংগীত শ্রোবনের ক্ষেত্রে শ্রোতাদের কাছে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা বলেই বিবেচিত হওয়ার জোড় সম্ভাবনা আছে। আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি এখানেই লিপিব্ধ করলাম। আশা করি আপনারা যা শ্রবন করছেন তা ভাললাগবে। তদুপুরি শুভ শ্রবণ Happy listening!---- মাকসুদুল হক, ঢাকা ও মাকসুদ।।

