‘প্রাপ্তবয়স্কের নিষিদ্ধ’: একটি অ্যালবাম, একটি বিপ্লব ও দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প
মাকসুদুল হক বাংলাদেশের একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। দেশ বিখ্যাত জনপ্রিয় ব্যান্ড ফিডব্যাকের জনপ্রিয় সব গানের স্রষ্টা। ফিডব্যাক ব্যান্ড থেকে অব্যহতি নিয়ে ১৮ অক্টোবর ১৯৯৭ সালে মাকসুদ ও ঢাকা ব্যান্ডের জন্ম। সাথে ছিলেন দীর্ঘদিনের বন্ধু ও ফিডব্যাক ব্যান্ডের বেস গিটারিস্ট সেকান্দার আহমেদ খোকা। এতটুকু জানি মাকসুদ ও ঢাকা ব্যান্ডের দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ অ্যালবাম ওগো ভালবাসা থেকে। অন্যকোন দিন সেই অ্যালবামটার কথা থাকবে। মাকসুদ ও ঢাকা প্রাপ্ত বয়স্কদের নিষিদ্ধ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে জি সিরিজ ব্যানার থেকে। অ্যালবামটার শুরু গল্প থেকে নিচে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই এক অ্যালবামের কতটা এফেক্ট মাকসুদুল হকের উপর পরে ছিল তা তিনি দীর্ঘদিন পর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন। টা পাবলিকলি কোথাও বলেননি। প্রাপ্ত বয়স্কের নিষিদ্ধ অ্যালবামের পর থেকে ২০১৬ পর্যন্ত তাঁর ওপর দিয়ে অনেক ঝড় যায়।কাছের যারা জানতেন তাদের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো বলতো মাকসুদ ভাই কীভাবে বেঁচে আছেন। একটি মহল তখন অ্যালবামটি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। সত্য মানুষ সহজভাবে গ্রহণ করতে চায় না। তাই এ ধরনের গানের জন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এই অ্যালবামের জন্য শো কমে গিয়েছিল। এটা যে শুধু বাইরের লোকেরা করেছে তা নয় যারা তাঁর সঙ্গে গান করেছে তারাও বলেছে মাকসুদকে নেয়া যাবে না। এভাবে কোণঠাসা করে রাখার কারন উগ্রবাদ, মৌলবাদ আর ধর্মান্ধ সেই গোষ্ঠী বুঝাই তো যাচ্ছে। যারা এখন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আসুন জানি মাকসুদ ও ঢাকা ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবামের গান আর সহ শিল্পীদের সব গল্প। অ্যালবামটির আরেক চমৎকার দিক ছিল অ্যালবামটি উৎসর্গ করা হয়েছিল জগৎবিখ্যাত চিত্রশিল্পী এস.এম.সুলতানকে। লেখা ছিল এ সংকলনটি বরেণ্য শিল্পী লাল মিঞার (১৯২৩-১৯৯৪) স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি।
অ্যালবামের : প্রাপ্তবয়স্কের নিষিদ্ধ (মাকসুদ ও ঢাকা)
সংগীতকে আমি স্রেফ পেশা হিসেবেই নিইনি, সারাজীবন এ নিয়ে নিবিষ্ট থেকেছি। বৈচিত্র্য সৃষ্টির প্রতি আমার সবসময় আগ্রহ ছিল। এ সংকলনে যে মেজাজে কি সুরে সে বৈচিত্র্যের ছাপ স্পষ্ট। এছাড়া সংগীত নিয়ে আমি অনেকদিন ধরে যা একান্তভাবে ভেবে এসেছি তার অনেকটা প্রকাশ ঘটেছে এ সংকলনে। এর মধ্য দিয়ে আমি যেমন আমার আনন্দ-বেদনার কথা বলতে চেয়েছি, তেমনি আমার মনের খুব গভীরে যে বিষয়গুলো আগুনের বাড়তি আঁচের মতো ক্রমে দাউ দাউ করে উঠেছে তাও সুরে ধরতে চেয়েছি।" "একজন সচেতন শিল্পী হিসেবে আমি কিছু বিশ্বাস পোষণ করি। অন্যায়, অপকীর্তি, আইনহীনতা ও শাসনযন্ত্রের অসংবেদনশীল ভাবকে সে বিশ্বাস কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। এমনিভাবে গত পঁচিশ বছর ধরে কেবল 'পুরনো বোতলে নতুন সুধা' ঢালার কসরত করা হয়েছে। প্রতিবাদ করার অধিকার একটি বড় রকমের মানবিক অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের অন্তর্গত এবং যাঁরা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ে যাবেন তাঁদের জন্য স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই শঙ্কাহীন মনের অধিকার নিশ্চিত করে দিয়েছেন।
১। উন্মাদনায় কাটে প্রেম
কথাঃ মোশতাক হোসেন দিদার ও মাকসুদ / সুরঃ গৌতম ঘোষ / সংগীতঃ ফোয়াদ নাসের বাবু
“স্বপ্ন বিভোর রাতের শেষে তোমার কথা ভেবে
উন্মাদনায় কাটে প্রেম তোমার খোঁজে
ভোরের আলো আর প্রথম রবির কিরণ দেখে
উন্মাদনায় কাটে প্রেম তোমার খোঁজে
আমার বুকের অনুরণন এ এখন অন্যরকম ”
২। হৃদয়ে গেথে রেখেছি
কথা ও সুরঃ এস এম খালেদ / সংগীতঃ ফোয়াদ নাসের বাবু
“তোমার ঐ নিটোল অধরে যে হাসি আমি দেখেছি
পারি কী তা ভুলে যেতে হৃদয়ে গেঁথে রেখেছি
মিতালী হাওয়া বলে কানে কানে
বসন্ত এলো বলে, হৃদয়ে গেঁথে রেখেছি”
৩। বাংলাদেশ'৯৫
কথাঃ মাকসুদ / সুর ও সংগীতঃ গৌতম ঘোষ
“এ দেশ রক্তে ভেজা অশ্রু ভেজা বাংলাদেশ
আগলে রেখেছি মাগো শত লোভে প্রলোভনে
আমি শত্রু চিনি মাগো তুমি ঘুমাও নির্ভয়ে”
৪। পারওয়ারদিগার
কথাঃ মাকসুদ / সুরঃ সংগ্রহ / সংগীতঃ সেলিম হায়দার
“একি আমরা দেখছি হায় পারওয়ারদিগার
হত্যাকারী আর জেনাকারিরা আজ সেজেছে নব্য পয়গাম্বর
৭১ এর কাফের সরদারকে ক্ষমা করেছে আদালত
রোজ হাসরে তুমি ক্ষমা করবেনা এই আমাদের এবাদত|”
কথা ও সুরঃ মাকসুদ / সংগীতঃ সেলিম হায়দার
“গণতন্ত্র মানে জাতীয় কপালে আছে শুধুই দুঃখ
আরে দেশ জুড়ে চাপাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে কত গন্ডমুর্খ
তাই গণতন্ত্র মানে স্বদেশী আকাশে উড়ে বিদেশী শকুন
তাই গণতন্ত্র মানে সবকিছু বিকিয়ে গোলাম কিনুন”
৬। আবারও যুদ্ধে যেতে হবে
কথা ও সুরঃ মাকসুদ / সংগীতঃ রুবাইয়াৎ
“আয় তোরা আয়, নির্ভয়ে তোরা আয়
মানবো না কোনও নেতা নেত্রী
কিংবা রাজনীতিক দলের সুবিধাবাদী অঙ্গীকার।
আয় তোরা আয়, নির্ভয়ে তোরা আয়
নিরপেক্ষের পক্ষ নিয়ে লড়ে যাবো আমরা লড়াকু জনতা”
৭। জেগে থেকো সারারাত
কথাঃ মোশতাক হোসেন দিদার / সুরঃ এস এম খালেদ / সংগীতঃ আশিকুজ্জামান টুলু
“জেগে থেকো সারারাত জানালায় দাড়িয়ে একা
খুলে রেখো দুটি চোঁখ পাবে তুমি আমার দেখা
আমি যে দেবো ডাক চুপিসারে নীরব আঁধারে
নিয়ে যাবো তোমাকে রাতের অভিসারে-দূরে”
৮। রাই জাগো
কথা ও সুরঃ সংগ্রহ / সংগীতঃ গৌতম ঘোষ
“ও রাই জাগো গো
জাগো শ্যামের মনমোহিনী বিনোদিনী রাই
শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া
শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া যাচ্ছো গো রাই ঘুমাইয়া
ও রাধে, কূল-কলঙ্কের ভয় কি তোমার নাই…গো
ওহ…জয় রাধে”
৯। চলে গেলে
কথাঃ মাকসুদ ও মোশতাক হোসেন দিদার / সুরঃ মাকসুদ / সংগীতঃ সেলিম হায়দার
“আমি আতর গোলাপ আর বকুল মেখেও তোমায়
পারিনি তো হৃদয় হতে তাড়াতে
তবু আশার আলো হঠাত জ্বলে ওঠে বুকে
ডুবে মন কোনো স্বপ্নলোকে
তুমি পথের সাথী হবে, কথা দিয়েছিলে
সে কথা ভুলে গিয়ে পুড়িয়ে আমাকে কোন অনলে
তুমি চলে গেলে”
কথা ও সুরঃ মাকসুদ / সংগীতঃ গৌতম ঘোষ
“আর তাই
আমি কিছু বাঙালির মৃত্যুদণ্ডের দাবি তুলতে চাই
আবার ভাবি মৃত্যুদণ্ড বড্ড হালকা শাস্তি হয়ে যায়।
শেখাবে অনেক কিছু
পায়ের রগ কাটা, হুমকি দেয়া, বোমা ছোড়া
আর ভচাত করে পেটের ভুড়ি সব নামিয়ে ফেলতে
সব কিছু দেওয়ার আশ্বাস দেবে,
দেবে না শুধু শিক্ষা, চাকরি আর শান্তিতে বসবাস করতে
ক্ষমতা নামের শিল্প কারখানায় তৈরী হচ্ছে এক বিশাল ইন্দ্রজাল”
১৯৯৪ সালে এ সংকলনের ধারণাটি আসে মাকসুদুল হকে। সে সময় থেকেই দেশী-বিদেশী প্রতিভাধর সংগীতজ্ঞ, গীতিকার ও শিল্পীর সঙ্গে অ্যালবামের কাজ শুরু করেন। এবার তাদের পরিচয়..."
- গৌতম ঘোষ: ১৯৯৭ সালে দিল্লীতে পরিচয়। গানের কথা ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সময়ে কুলোতে না পারায় দিল্লীতে রেকর্ড করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ফোয়াদ নাসের বাবু কাজ সম্পন্ন করেন।
- ফোয়াদ নাসের বাবু: ফিডব্যাক-এর প্রতিষ্ঠাতা। মাকসুদ বলেন, "তার সঙ্গে আমার কুড়ি বছরের পরিচয়। প্রতি মুহূর্তে আমি কিছু না কিছু শিখেছি।" 'উন্মাদনায় কাটে প্রেম' ও 'হৃদয়ে গেঁথে রেখেছি' গানের সুর বিন্যাস তার করা।
- সেলিম হায়দার: অন্যতম পেশাদার ও কুশলী গিটারিস্ট। ফিডব্যাক-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৯৭ সালে ফিডব্যাক ছেড়ে ব্যক্তিগত কারণে মাকসুদের সাথে যুক্ত হন।
- হ্যারল্ড রশিদ: গিটারিস্ট, চিত্রকর ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তার সম্পাদনায় সিলেট থেকে যুগভেরি কাগজে বেরোয়। তার গিটার বাদন অতুলনীয়। রাই জাগো'র রিদম ও লিড তারই বাজানো।
- আশিকুজ্জামান টুলু: আর্কের দলপতি এবং স্বতন্ত্র সঙ্গীত নির্দেশক। 'জেগে থেকো সারারাত' গানের সুর বিন্যাস টুলুর করা।
- এহসান এলাহী ফান্টি: ফিডব্যাকের কৃতি ড্রামার। দীর্ঘদিনের পরিচিত। ড্রাম প্রোগ্রামিং-এ সহায়তা করেছেন।
- এস এম খালেদ: তরুণ সুরকার ও গীতিকার। 'জেগে থেকো সারারাত' ও 'হৃদয়ে গেঁথে রেখেছি'র সুর তার।
- মোশতাক হোসেন: 'জেগে থেকো সারারাত'র রচয়িতা। 'উন্মাদনায় কাটে প্রেম' ও 'চলে গেলে' গান দুটি মাকসুদ ও মোশতাক যৌথভাবে লিখেছেন।
- রুবাইয়াত ফেরদৌস চৌধুরী: কনিষ্ঠতম সঙ্গীত নির্দেশক। লন্ডন থেকে সংগীতে ডিপ্লোমা করা। 'আবারও যুদ্ধে যেতে হবে' গানটির সঙ্গীত পরিচালনা তার।
- জায়েদ আজম সুমন: প্রচ্ছদ ও ফটোগ্রাফির কাজ করেছেন।
কৃতজ্ঞতা ও অন্যান্য:
কণ্ঠশিল্পী: শম্পা রেজা, ডলি ও পলি সায়ন্তনী 'বাংলাদেশ ৯৫' গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। বিশেষ কৃতজ্ঞতা: জীবনসঙ্গিনী নিবু হক, জয়দেব চক্রবর্তী, সমীর আহমেদ। স্টুডিও: ঢাকার সাউন্ডগার্ডেন স্টুডিওতে রেকর্ডকৃত। মিক্সিং করেছেন মবিন।
‘প্রাপ্তবয়স্কের নিষিদ্ধ’ কেবল একটি গানের সংকলন নয়, নব্বইয়ের দশকের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে মাকসুদুল হকের এক সাহসী প্রতিবাদী ইশতেহার। ফিডব্যাকের চেনা বলয় থেকে বেরিয়ে এসে তিনি এই অ্যালবামের মাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রবাদ, রাজনৈতিক ভণ্ডামি এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে যে কণ্ঠস্বর তুলেছিলেন, তা বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক মোড়। এস.এম. সুলতানকে উৎসর্গ করা এই অ্যালবামে একদিকে যেমন আছে প্রেমের আকুলতা, অন্যদিকে আছে ‘পারওয়ারদিগার’ বা ‘গীতি ভাষণ’-এর মতো চরম সত্য ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা। এই সত্য উচ্চারণের কারণে মাকসুদুল হককে দীর্ঘকাল সামাজিক ও পেশাদার জীবনে কোণঠাসা হতে হয়েছে, হারিয়েছেন অনেক সুযোগ। তবুও গুণী সব সহ-শিল্পীদের নিয়ে তৈরি করা এই কাজটি আজও দেশপ্রেম ও দ্রোহের এক অনন্য দলিল হিসেবে টিকে আছে। এটি প্রমাণ করে যে, একজন প্রকৃত শিল্পী কেবল বিনোদনই দেন না, বরং সময় ও সমাজের আয়না হিসেবে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্যকে তুলে ধরেন।
