নূরুউদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং: বাংলার কৃষক আন্দোলনের প্রথম নবাব

বাংলার কৃষক আন্দোলনের প্রথম নবাব নূরুউদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং। যিনি নূরলদীন নামে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ১৭৮৩ সালে রংপুরে অঞ্চলের কৃষক সমাজ তাঁর নেতৃত্বে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বৃহৎ বিদ্রোহ শুরু করেছিলো। রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলের অত্যাচারী জমিদারদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কারনে তিনি বাংলার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নবাব কৃষকদের নবাব নূরলদীন উপাধি পেয়েছিলেন। সৈয়দ শামসুল হকের সাড়া জাগানো কাব্য নাট্য নূরলদীনের সারাজীবন আমরা সবাই কম বেশি পড়েছি জেনেছি। কাব্য নাটকটির শুরুতে যে দুটি লাইন আমাদের মনকে আন্দোলিত করে শেষ হয় সেই গভীর উচ্চারণে জাগো বাহে কোনঠে সবায়। আজ আমরা সেই নূরলদীনকে স্মরণ করছি যিনি রংপুরের কৃষক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসংখ্য সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নূরলদীন শুধু স্থানীয় কৃষক বিদ্রোহের নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাঙালির স্বাধীনচেতা বীরত্বের প্রতীক। তার নেতৃত্বে ১৭৮৩ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ সপ্তাহব্যাপী রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে একটি অপ্রতিরোধ্য কৃষক লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। এই বিদ্রোহ ইংরেজদের পলাশী পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে চাপের মুখে ফেলে এবং বাধ্য করে রাজস্বনীতি পরিবর্তন করতে। নূরলদীনের আত্মত্যাগ বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে শত শত বছর ধরে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।


১৭৬০ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ শাসনের উৎখাতের জন্য অসংখ্য সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সাধারণ কৃষক, প্রজা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অত্যাচারী জমিদার এবং ইংরেজ শাসকের শোষণ সহ্য করতে পারছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রমরমা অবস্থার মধ্যে তারা চালু করেছিল ইজারাদারি প্রথা, যার মাধ্যমে জমিদাররা কৃষকের ওপর অত্যাচার চালাতেন। রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলের জমিদার দেবী সিংহ ছিলেন এমনই এক অত্যাচারী জমিদার। নূরলদীনের নেতৃত্বে কৃষকরা এই শোষণমূলক প্রথার বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৭৮৩ সালের জানুয়ারিতে রংপুর, দিনাজপুর, কোচবিহার ও জলপাইগুড়ির বিদ্রোহী প্রজারা লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামে অবস্থান করছিলেন। ইংরেজদের সমর্থিত জমিদাররা প্রাণভয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। নূরলদীনের নেতৃত্বে একটি দল মোগলহাটে পৌঁছে। ইংরেজরা দুজন সৈন্যকে কৃষকের পোশাক পরিয়ে নূরলদীনের বাহিনীর পেছনে পাঠায়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল গোয়েন্দাগিরি করা। কিন্তু এক সম্মুখযুদ্ধে নূরলদীন তার প্রধান সহযোগী লালমনি ও দয়াশীলসহ ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে লিপ্ত হন। এক দুর্ভাগ্যজনক মুহূর্তে একজন ইংরেজ সৈন্য নূরলদীনের ওপর অতর্কিতভাবে আক্রমণ করে। নূরলদীন আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, আর দয়াশীল প্রাণ হারান। লালমনি আহত নূরলদীনের সেবা করে তাঁকে তিস্তা নদীতীরবর্তী এলাকায় নিয়ে যান। গভীর রাতে ইংরেজ বাহিনীকে এড়িয়ে নূরলদীনের ফুলচৌকি গ্রামে নেওয়া হয়, যেখানে ১৭৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। এই গ্রামেই তাকে সমাহিত করা হয়।

রংপুর শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দক্ষিণে মিঠাপুকুর উপজেলার ফুলচৌকি গ্রাম। গ্রামটি ঘুরে দেখা যায় ঝোপঝাড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে একটি বিধ্বস্ত ইটের দেয়াল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী এটিই নূরলদীনের বসতভিটার শেষ চিহ্ন। নূরলদীনের মৃত্যুর বহু বছর পর ১৮২২ সালে স্থানীয় জনগণের উদ্যোগে সেখানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়। গ্রামের নাম অনুসারেই এর নামকরণ করা হয় ফুলচৌকি মসজিদ। মসজিদের প্রবেশপথে শায়িত রয়েছেন শহীদ নূরুউদ্দিন মোহাম্মদ বাকের জং। তাঁর কবরের পাশে একটি সাইনবোর্ডও টাঙানো রয়েছে। ফুলচৌকি মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি স্থাপনা। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে মসজিদটির কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। একজন নূরলদীন আজও এই অঞ্চলের অগণিত মানুষের কাছে প্রেরণার উৎস। তাঁর নামেই এখনও আপ্লুত হয় অসংখ্য প্রাণ।

নূরুউদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং

সাব্যসাচি লেখক সৈয়দ শামসুল হক নূরলদীনের জীবন ও সংগ্রামের কাব্যনাট্য রচনা করেছেন। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ কাব্যনাটকে শোষণ, প্রতিরোধ, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের চিত্র সুক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নাট্যচরিত্র ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে এই কাহিনি আজও শিক্ষণীয় ও উদ্দীপনামূলক।



কাল ঘুম যখন বাংলায়
তার দীর্ঘ দেহ নিয়ে আবার নূরলদীন দেখা দেয় মরা আঙিনায়।
নূরলদীনের বাড়ি রংপুরে যে ছিল,
রংপুরে নূরলদীন একদিন ডাক দিয়েছিল ১১৮৯ সনে।
আবার বাংলার বুঝি পড়ে যায় মনে,
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়,
যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়। 
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালের আলখেল্লায়-
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার কন্ঠ বাজেয়াপ্ত ক’রে নিয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়,
যখন আমারই দেশে এ আমারই দেহ থেকে রক্ত ঝড়ে যায়,
ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায়।


নূরলদীনের জীবন ও সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহসিকতা সর্বদা ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকে। রংপুরের ফুলচৌকিতে তার কবর আজও সেই সংগ্রাম আত্মত্যাগ ও বীরত্বের স্মৃতিস্মারক। নূরলদীনের গল্প শুধু ইতিহাস নয়। আমাদের জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত রাখে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জোগায়।



--- বাউল পানকৌড়ি
Zainul Abedin Famine Sketches (দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা) ---Click to Read
চিত্রশিল্পী সুলতানের কৃষকের ক্যানভাস---Click to Read
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url