ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড: স্বাধীনতার পক্ষে বিদেশি এক অবিনাশী আত্মোৎসর্গ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ডের উজ্জ্বল এক নাম। জন্মসূত্রে ওলন্দাজ, নাগরিকত্ব অস্ট্রেলিয়ান কিন্তু মনেপ্রাণে ছিলেন এক নিখাদ বাঙালির বন্ধু। ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল দিনে যখন বাঙালি জাতি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছিল তখন এই মানুষটি শুধু পাশে দাঁড়িয়েই ক্ষান্ত হননি নিজের জীবন বিপন্ন করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার সংগ্রামে। আর এ কারণেই তিনি বাংলাদেশের একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক। যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত বীরদের মধ্যে একজন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও অসামান্য নৈপুণ্যতার কারণে বাংলাদেশ সরকার এই অকৃত্রিম বন্ধুকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব বীর প্রতীক এ ভূষিত করে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর প্রতীক পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় তাঁর নাম ২ নম্বর সেক্টরের গণবাহিনীর তালিকায় ৩১৭ নম্বর। তিনিই একমাত্র বিদেশী মুক্তিযোদ্ধা যিনি সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এই খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন।
১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে জন্ম ওডারল্যান্ডের। জীবন শুরু হয়েছিল জুতা পালিশের মতো সাধারণ কাজ দিয়ে। কিন্তু তাঁর ভেতরের যোদ্ধা চেতনা তাঁকে নিয়ে যায় সামরিক জীবনে। ওলন্দাজ সেনাবাহিনীর রয়্যাল সিগনাল কোরে সার্জেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গেরিলা কমান্ডো হিসেবেও অবদান রাখেন। নাজি বাহিনীর বর্বরতা তাঁর চোখে দেখা। ১৯৭০ সালের শেষদিকে বাটা সু কোম্পানির ম্যানেজার হয়ে ঢাকায় আসেন ওডারল্যান্ড। এর ঠিক বছরখানেক পর শুরু হয় বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধ। নিরহ নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি সেনাদের নির্মমতা দেখে নাজি বাহিনীর বর্বরতার স্মৃতি ফিরে আসে দুঃস্বপ্নের হয়ে। বাংলাদেশে যা দেখছেন তা ছিল তার চোখে ২৯ বছর আগে ইউরোপে দেখা নাজি বর্বরতার পুনরাবৃত্তি। ১৯৭১ সালে ৫ মার্চ টঙ্গীর বাটা কারখানার কাছে মেঘনা টেক্সটাইল মিলের সামনে শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপর ২৫ মার্চের গণহত্যা সবকিছু দেখে তিনি আর নীরব থাকতে পারেননি। তাঁর জীবনের নতুন এক অধ্যায় রচনা করেন ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করে।
বাটা স্যু কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়ায় ওডারল্যান্ডের পশ্চিম পাকিস্তানে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ ছিল। তিনি এই সুযোগকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসের ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল সুলতান নেওয়াজের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে তিনি লেফট্যানেন্ট জেনারেল টিক্কা খান, লেফট্যানেন্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলিসহ বহু ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। নিয়াজীর ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার তাঁকে সম্মানিত অতিথির মর্যাদা এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র দেয়। এই অবাধ সুযোগ ব্যবহার করে তিনি পাকিস্তানীদের গোপন সামরিক সংবাদ সংগ্রহ করে ২নং সেক্টরের ক্যাপ্টেন এ. টি. এম. হায়দার এবং জেড ফোর্সের কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে গোপনে প্রেরণ করতেন। যা শুনলেন তা হচ্ছে গোপন যুদ্ধে ওডারল্যান্ড এই বিদেশির অবিশ্বাস্য সাহসিকতার কথা। তিনি শুধু যে তথ্যই দিতেন এমন না। নানা ভাবে সাহায্যে করছেন কখনও মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য, অর্থ, ওষুধ ও পোশাক সরবরাহ করে। টঙ্গীর গোপন ক্যাম্পে গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়ে। বিস্ফোরক ও অস্ত্র চালনায় পরামর্শ দিয়ে। রেললাইন, ব্রিজ, কালভার্ট ধ্বংসে নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার ছবি তুলে বিশ্বমাধ্যমে পাঠিয়ে বিশ্ব জনমত আদায় করার লক্ষ্যে। বলা যায় এসবই তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের এক অদ্বিতীয় ছায়ানায়ক করে তোলে। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে তিনি আর কেবল তথ্য সংগ্রহে থেমে থাকেননি। সরাসরি যোদ্ধা হিসেবে অংশ নেন অপারেশনে। তাঁর নেতৃত্বে টঙ্গী-ভৈরব রেললাইন ধ্বংস। পাকিস্তানি যোগাযোগ ব্যবস্থায় আঘাত এবং টানা সাহসী কমান্ডো অভিযান মুক্তিবাহিনীকে এগিয়ে নিতে অপরিসীম ভূমিকা রাখে। ২ নং সেক্টরের গণবাহিনীর সক্রিয় যোদ্ধা হিসেবে লড়াই করেন। মুক্তিযুদ্ধের গোড়ার দিকে তিনি কেবল সামরিক কৌশল বা রসদ দিয়েই নয় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা ও গণহত্যার আলোকচিত্র তুলে গোপনে বহিঃবিশ্বের বিভিন্ন তথ্যমাধ্যমে পাঠাতে শুরু করেন। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে তিনি এক বিরাট অবদান রাখেন। বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে তিনি যেন নাৎসি বাহিনীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে তিনি আবার বাটায় যোগ দিলেও বাংলাদেশকে কখনো ভুলতে পারেননি। ১৯৭৮ সালে দেশে ফিরে গেলেও হৃদয়ে বহন করেছেন বাংলাদেশের পতাকা গর্ব আর ভালোবাসার সঙ্গে। ১৯৯৮ সালে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও সনদপত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে ওডারল্যান্ডকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি। তবে তাঁর বীর প্রতীক পদকের সম্মানী পুরোপুরি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে দান করেন। একমাত্র বিদেশি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে এই খেতাবে ভূষিত করেছে। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অত্যন্ত গর্ব ও শ্রদ্ধার সঙ্গে তিনি নিজের নামের পাশে বীর প্রতীক খেতাবটি লিখতে ভালবাসতেন। ২০০১ সালের ১৮ মে, অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তিনি চিরঞ্জীব।
ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক। জাতি ধর্ম বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার পক্ষে লড়াই করা এক মহৎ যোদ্ধা। তাঁর অবদান শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, মানবতার ইতিহাসেও অনন্য। আমরা তাঁকে স্মরণ করি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গর্বের সাথে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, স্বাধীনতার লড়াই শুধু একটি দেশের নয়, এটি মানবতার। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গোপন অভিযান পরিচালনা করেন, মুক্তিবাহিনীকে তথ্য, কৌশল ও রসদ সরবরাহ করেন এবং বিশ্ববাসীর কাছে গণহত্যার সত্য তুলে ধরেন। স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবিনাশী আত্মোৎসর্গ আমাদের ইতিহাসকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি মানবতার লড়াইয়ের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় করে রেখেছে।
--- বাউল পানকৌড়ি
বাংলার অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার মারিনো রিগন--Click to Read
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিটে লুকানো নকশার গল্প--Click to Read
ইউনেস্কো ডকুমেন্টারি হেরিটেজ ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ--Click to Read
বাংলার অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার মারিনো রিগন--Click to Read
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিটে লুকানো নকশার গল্প--Click to Read
Read on mobile
.jpg)