হামিদুজ্জামান খানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য: তালিকা ও প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যকলার ইতিহাসে হামিদুজ্জামান খান এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য নাম। তাঁর শিল্পকর্ম শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রকাশের সাথে ইতিহাস, সংগ্রাম ও মানবিক চেতনার প্রতীক। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য নির্মাণে তিনি যে গভীর দায়বদ্ধতা ও সৃজনশীলতা দেখিয়ে গিয়েছেন তা তাঁকে সমকালীন ভাস্করদের ভিড় থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশপ্তক ভাস্কর্য তাঁর শিল্পীসত্তার এক শক্তিশালী প্রতীক। যেখানে আত্মত্যাগ, অপরাজেয় মনোবল ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আধুনিক ভাস্কর্যভাষায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই ভাস্কর্য এবং হামিদুজ্জামান খানের সামগ্রিক শিল্পচর্চা বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যকলার বিকাশ ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। ধাতু, কাঠ, সিরামিকসহ নানা মাধ্যমে নিরীক্ষাধর্মী ভাস্কর্য নির্মাণের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যচর্চাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল হামিদুজ্জামান খানের শিল্পচেতনার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মত্যাগ, সাহস ও অপরাজেয় মনোবল তিনি বারবার তুলে ধরেছেন তাঁর ভাস্কর্যে। আধুনিক ভাস্কর্যভাষা, প্রতীকী রূপ এবং মানবিক আবেগের সমন্বয়ে হামিদুজ্জামান খান এখানে তুলে ধরেছেন সংগ্রামী মানুষের অবিচল সংকল্প। তাই তাঁর এই শিল্পকর্ম এবং সামগ্রিক ভাস্কর্যচর্চা বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে। আজকে থাকছে কিংবদন্তি ভাস্কর প্রয়াত হামিদুজ্জামান খান এর মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যের একটি তালিকা।
১. ভাস্কর্য: সংশপ্তক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
২.ভাস্কর্য: বিজয়কেতন
ঢাকা সেনানিবাস, ঢাকা
৩.ভাস্কর্য: জয় বাংলা
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী
৪.ভাস্কর্য: স্বাধীনতা চিরন্তন
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
৫.ভাস্কর্য: এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম
মাদারীপুর সদর, মাদারীপুর
৬.ভাস্কর্য: জাগ্রত বাংলা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
৭.ভাস্কর্য: স্বাধীনতা
ফরিদপুর সদর, ফরিদপুর
৮.ভাস্কর্য: হামলা
সিলেট সেনানিবাস
৯. ভাস্কর্য: বঙ্গবন্ধু
ভাস্করের নিজ বাসায়
হামিদুজ্জামান খান (১৬ মার্চ ১৯৪৬ – ২০ জুলাই ২০২৫) ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যকলার অন্যতম পথিকৃৎ। যিনি ফর্ম, বিষয়ভিত্তিক ও নিরীক্ষাধর্মী ভাস্কর্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ভাস্কর নভেরা আহমেদের মাধ্যমে বাংলাদেশে আধুনিক ভাস্কর্যধারার সূচনার পর হামিদুজ্জামান খান তাঁর স্বতন্ত্র শিল্পভাষা এক্সপ্রেশনিজম ও মিনিমালিজমধর্মী নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবিক ট্র্যাজেডি তাঁর শিল্পচেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে স্বাধীনতার পর প্রথম দুই দশকে নির্মিত তাঁর অধিকাংশ ভাস্কর্য ‘একাত্তর স্মরণে’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ, সাহস ও অপরাজেয় মনোবলের প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালে ভাস্কুর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে নির্মিত জাগ্রত চৌরঙ্গী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম ভাস্কর্য এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত সংশপ্তক তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। ব্রোঞ্জ, ইস্পাত, পাথর ও মিশ্র-মাধ্যমে নির্মিত তাঁর ভাস্কর্যে মানব শরীর পাখি ও গতিশীল ফর্মের আধুনিক রূপায়ণ দেখা যায়। ভাস্কর্যের পাশাপাশি তিনি একজন শক্তিশালী জলরঙ ও অ্যাক্রিলিক চিত্রশিল্পীও ছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ও মুস্তফা মনোয়ারের অনুপ্রেরণায় তাঁর চিত্রকলায় নৈসর্গিক ও বিমূর্ত প্রকাশবাদের স্বতন্ত্র ধারা গড়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগে দীর্ঘ শিক্ষকতা ও দেশ-বিদেশে ১৫০টিরও বেশি শিল্পকর্ম স্থাপন ও প্রদর্শন, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল অলিম্পিক স্কাল্পচার পার্কে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এবং গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত হামিদুজ্জামান খান ভাস্কর্য পার্ক তাঁর সুদীর্ঘ শিল্পসাধনার স্মারক। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০০৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। হামিদুজ্জামান খানের শিল্পকর্ম কেবল দৃশ্যমান সৌন্দর্য ইতিহাস, সংগ্রাম ও মানবিক চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের এক স্থায়ী উত্তরাধিকার হয়ে আছে। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
--- বাউল পানকৌড়ি
স্বাধীনতার অগ্নিশিখা সংগ্রাম থেকে লাল সবুজের পতাকার ইতিহাস--Click to Read
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার যত : সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী--Click to Read
মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য: ইতিহাসের জীবন্ত ভাষ্য- বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব--Click to Read
