এম আর আখতার মুকুল ও চরমপত্র: একাত্তরের কণ্ঠযোদ্ধার বীরত্বগাথা ও বইয়ের তালিকা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। স্বজন হারানোর গভীর বেদনা আর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের পরাজিত করার তীব্র সংকল্প। অস্ত্রশস্ত্রে পিছিয়ে থেকেও মুক্তিযোদ্ধারা অদম্য মনোবল ও সাহসের জোরে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। সেই মনোবলকে আরও উজ্জীবিত করেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক অনুষ্ঠান চরমপত্র। অনুষ্ঠানটির রচনা ও উপস্থাপন করেছিলেন সাংবাদিক ও লেখক এম আর আখতার মুকুল। যার পুরো নাম মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল। বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রাম। এই দুই সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এম আর আখতার মুকুল। ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সোপান আর সেই সংগ্রামে মুকুলের অবদান চিরস্মরণীয়। মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালের ৯ আগস্ট বগুড়ার চিংগাসপুরে। তাঁর বাবা বিশিষ্ট সাহিত্যিক সা’দত আলী আখন্দ এবং মা রাবেয়া খাতুন। মুকুলের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ময়মনসিংহে। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষে তার পরিবার বাবার সরকারি চাকরির কারণে দিনাজপুরে চলে আসে। তিনি ১৯৪৫ সালে দিনাজপুর মহারাজা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন এবং পরে দিনাজপুর রিপন কলেজ থেকে আই এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন মুকুল। ১৯৪৮ সালে জননিরাপত্তা আইনে কারাগারে বন্দি হন এবং ১৯৪৯ সালে জেলখানার অভিজ্ঞতা নিয়ে স্নাতক পরীক্ষা শেষ করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ক্লাসে ভর্তি হন এবং খুব দ্রুত ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ শুরু করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুরু করে গণহত্যা। এম আর আখতার মুকুল সীমান্ত অতিক্রম করে মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগে যোগ দেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান চরমপত্র এর লেখক ও পাঠক ছিলেন। চরমপত্র ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মানসিক শক্তির বৃদ্ধির উৎস। তার ধারালো ও ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠ মুক্তিযোদ্ধাদের রণোন্মাদনা সৃষ্টি করত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চরমপত্র পাঠের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি বন্দি মানুষের হৃদয়েও সাহস জাগিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন মুকুল। তিনি কাজ করেছেন সাপ্তাহিক নও বেলাল, পাকিস্তান টুডে, দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক সংবাদ এবং ইত্তেফাক পত্রিকায়। ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ইউডিআই-এর ঢাকার সংবাদদাতা ছিলেন। ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তরের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক হন এবং ১৯৭৫ সালে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রেস কাউন্সিলর হিসেবে যোগ দেন। সর্বশেষ সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন ১৯৮৭ সালে। সাংবাদিকতা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত করে। দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে তিনি ২০০৪ সালের ২৬ জুন মারা যান। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। আজকে থাকছে তাঁর লেখা কিছু বইয়ের তালিকা। বইয়ের কোন রিভিউ নয়। বই গুলো সংগ্রহ করে সঠিক ইতিহাস জানার উৎসাহ প্রদান মাত্র।
১. আব্বা হুজুরের দেশে
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
২. চরমপত্র
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
৩. আমি বিজয় দেখেছি
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
৪. মহাপুরুষ
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
৫. মুজিবের রক্ত লাল
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
৬. জয় বাংলা
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
৭. ভাসানী মুজিবের রাজনীতি
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
৮. জিন্না থেকে মুজিব
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: প্রতিভাস
৯. আমিই খালেদ মোশাররফ
সম্পাদনা: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
১০. একুশের দলিল
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
১১. ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: শিখা প্রকাশনী
১২. চল্লিশ থেকে একাত্তর
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
১৩. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: আগামী প্রকাশনী
১৪. কোলকাতা কেন্দ্রিক বৃদ্ধিজীবী
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
১৫. পূর্ব পুরুষের সন্ধানে
লেখক: এম আর আখতার মুকুল
প্রকাশনী: অনন্যা
মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এম আর আখতার মুকুলের নাম চিরস্মরণীয়। চরমপত্রের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দেওয়া, পুঁথিপত্র বইয়ের দোকান স্থাপন এবং সাংবাদিকতা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অবদান সব মিলিয়ে তিনি এক অনন্য প্রতিভা ও সাহসী মননের প্রতীক।
--- বাউল পানকৌড়ি
সকল কাঁটা ধন্য করে: হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামনতুন প্রজন্মের ধ্রুবতারা ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল: কিশোর সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস
