নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ: গল্পের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ হতে পারেন শ্রেষ্ঠ গাইড
আজকের প্রজন্মের জানতে হবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। স্বাধীনতা বিরোধী আর রাজাকার আলবদর কারা ছিলো। কাদের ঘৃনা করতে হবে। তারা কতটা জল্লাদ নৃশংস ছিলো? এই ইতিহাস জানার সবচেয়ে সহজ হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ এর বই গুলো পড়া। কারন এক বসায় পড়ে শেষ করতে পারবে। কোন বিরক্তির উৎপাদন করবে না। আজকের লেখায় থাকছে সেই সব লেখা মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা। হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধকে শুধু ইতিহাস হিসেবে নয়, মানবিক অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে লিখেছেন একের পর এক অসাধারণ উপন্যাস। প্রতিটি উপন্যাসেই তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা, মানবিক বেদনা ও মুক্তির স্বপ্নকে এক অনন্য শিল্পে রূপ দিয়েছেন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলা সাহিত্য হঠাৎ এক নতুন ভাষা নতুন ঢঙের লেখায় চমকে ওঠে েসেই ঢেউয়ের নাম হুমায়ূন আহমেদ। সহজ ভাষা চৌম্বক গল্প বলার দক্ষতা আর জীবনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ তাঁকে পাঠকের হৃদয়ে স্থান দেয় চিরদিনের জন্য। তিনি ছিলেন নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের অনন্য কথক যেখানে হাসি, কান্না, প্রেম, ভয়, আর অজানা স্বপ্ন মিশে থাকে এক অলৌকিক বাস্তবতায়। তবে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যজগতে যে অংশজুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ। যে যুদ্ধ তাঁর হৃদয়ের গভীরে ছিল, রক্তে ছিল, শিরায় শিরায় বয়ে গেছে।
১. নির্বাসন’ (১৯৮৩)
২. সৌরভ (১৯৮৪)
৩. শ্যামল ছায়া’ (১৯৮৫)
৪. সূর্যের দিন (১৯৮৬)
৫. ১৯৭১’ (১৯৮৬)
৬. আগুনের পরশমণি (১৯৮৭)
৭. অনিল বাগচীর একদিন (১৯৯২)৮. জোছনা ও জননীর গল্প (২০০৫)
নির্বাসন : এক আবেগময় ট্র্যাজেডি
হুমায়ূন আহমেদের ‘নির্বাসন’ উপন্যাসটি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটি মাত্র দিনের কাহিনি। কিন্তু সে দিনের ভেতর লুকিয়ে আছে এক জীবনের ট্র্যাজেডি ও ভালোবাসার নীরব বেদনাগাথা। দিনটি নায়িকা জরীর বিয়ের দিন বাড়িজুড়ে আনন্দ, কোলাহল, উৎসবের রঙে ভরপুর। অথচ সেই বাড়ির দোতলায় নিঃসঙ্গভাবে শুয়ে আছে তার চাচাতো ভাই আনিস। মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে মেরুদণ্ডে গুলিবিদ্ধ হয়ে কোমরের নিচ থেকে পঙ্গু হয়ে পড়া এক সাবেক সেনা অফিসার। একসময় জরী আর আনিস একে অপরকে ভালোবাসত কিন্তু যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা তাদের সম্পর্ককে চিরতরে বদলে দেয়। আনিস জানে তার জীবন নিভে আসছে আর জরীর জন্যও সমাজ ও সময়ের চাপে সামনে অন্য সংসারের পথ খুলে গেছে। আনন্দমুখর বিয়েবাড়ির উৎসব আর আনিসের নিঃসঙ্গ যন্ত্রণার বৈপরীত্যে গল্পটি হয়ে উঠেছে গভীর মানবিক ও আবেগপূর্ণ। লেখক এখানে হতাশা নয় বরং জীবনের সূক্ষ্ম আশাবাদ ও অনুভবকে তুলে ধরেছেন যেমন ছোট্ট টিংকুমনি নামের চার বছরের এক মেয়ে প্রতিদিন এসে আনিসের নিঃসঙ্গ জীবনে এনে দেয় হাসি ও আলো। উপন্যাসে প্রেম কখনও উচ্ছ্বাসে নয় বরং নীরব বেদনায় প্রকাশিত হয়। আনিসের সেই সংযত উক্তি, আমি যুদ্ধের কোনো গল্প জানি না, আমি যুদ্ধের গল্প বলি না। শুধু ব্যক্তিগত নয় বরং এক প্রজন্মের মর্মবেদনার প্রতিধ্বনি। পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদ মধ্যবিত্ত বিয়েবাড়ির আমেজ, আত্মীয়দের ছোটখাটো ঝগড়া, রঙিন বিশৃঙ্খলা ও মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম রসায়নও অনবদ্যভাবে এঁকেছেন। মাত্র চল্লিশ পৃষ্ঠার এই ক্ষুদ্র উপন্যাসিকা পাঠককে একটানা টেনে রাখে তার সহজ অথচ গভীর ভাষায়। ‘নির্বাসন’ মূলত প্রেম, যন্ত্রণা ও হারিয়ে ফেলা জীবনের এক নীরব স্বীকারোক্তি, যেখানে হুমায়ূন আহমেদ দেখিয়েছেন। যুদ্ধ শুধু দেশকে নয়, মানুষের হৃদয়কেও নির্বাসনে পাঠায়। গল্প শেষ হলেও জরীর বিয়ের সানাই আর আনিসের নিঃশব্দ বেদনা পাঠকের মনে দীর্ঘদিন ধরে বাজতে থাকে।
সৌরভ :১৯৭১: যুদ্ধ, যন্ত্রণা ও আশার গল্প
১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ ঢাকায় এক প্রতিবন্ধী নাগরিক শফিকের চোখে দেখা দেশ, যুদ্ধ এবং মানবিক সংগ্রামের গল্প অবরুদ্ধ শহর ১৯৭১। পায়ে সমস্যার কারণে প্রায়ই ক্র্যাচ ব্যবহার করা শফিকের দৈনন্দিন জীবন সহজ নয়, তবু সে সাহস ও দায়িত্বের সঙ্গে নিজেকে বাস্তবতার মধ্যে ধরে রাখে। তার সহকারী কাদের আছে, বাড়ি ভাড়া দেওয়া ভাড়াটিয়ারা আসে-যায়, কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহরে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। একসময় তার ভাড়াটিয়া জলিল সাহেবকে তুলে নিয়ে যায় এবং মৃত্যুর খবর আসে। পরিবারের নিরাপত্তা ও নিজেদের বাঁচার জন্য শফিকের দুলাভাই, স্ত্রী ও বোনকে গ্রামে পাঠানোর চেষ্টা করে, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার রুটিন দেখিয়ে তার বোন ঢাকায় থাকে। কাদের ধরা পড়ে নির্যাতিত হয়, শফিকের বন্ধু রফিক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। এছাড়া পাকিস্তানি মেজরের পরিকল্পনা শফিকের বাড়ির এক বন্ধুকে বাঁচানোর প্রেক্ষাপট তৈরি করে। অবশেষে ঢাকায় গেরিলা অভিযান শুরু হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ ও শফিকরা স্বপ্ন দেখে স্বাধীনতার, জীবনের ও আশার নতুন সূর্যের। এই গল্প এক ব্যক্তি, এক শহর এবং এক জাতির সংগ্রাম ও প্রত্যাশার প্রতিফলন।
শ্যামল ছায়া: রাজাকার হয়েও মানবতার খোঁজে
হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন এক বাস্তবতা উঠে এসেছে। এখানে যুদ্ধের গৌরব নয় বরং মানুষের মনোজগতের টানাপোড়েন, অপরাধবোধ ও মানবিক জাগরণের গল্প বলা হয়েছে। অভাবের তাড়নায় রাজাকারে নাম লেখায় কেরামত ও হাসান আলী। তারা দুজনই সাধারণ গ্রামীণ মানুষ। শুরুতে জীবিকার জন্যই রাজাকার হয় কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের অমানবিক আচরণ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, নারীদের ওপর নির্যাতন এসব দেখে তাদের ভেতরে জন্ম নেয় গভীর অনুশোচনা। হাসান আলী তার জীবনের বেদনা প্রকাশ করে বলে, চেয়ারম্যান সাব কইলেন, হাসান আলী রাজাকার হইয়া পড়। সত্তর টাকা মাইনা, তার উপর খোরাকী আর কাপড়। তার ঘরে খাইয়া মানুষ, তার কথা ফেলতে পারি না। রাজাকার হইলাম কামডা বোধ হয় ভুল হইল। যখন হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেওয়া শুরু হয় তখন কেরামত প্রতিবাদ করে এটা কী কাণ্ড! কোনো দোষ নাই, কিচ্ছু নাই ঘরে কেন আগুন দিমু? কিন্তু সেই প্রতিবাদের পরিণতি হয় নির্মম। পাকিস্তানি সৈন্যরা কেরামতকে হত্যা করে তার লাশ ভেসে ওঠে নদীতে। এই ঘটনার পর হাসান আলী নিজের অপরাধবোধে জ্বলে ওঠে। সে বলে নিজের হাতে আগুন লাগাইলাম সতীশ পালের বাড়ি, কানু চক্রবর্তীর বাড়ি। ইস্, মনে উঠলে কইলজাডা পুড়ায়। আমি একটা কুত্তার বাচ্চা। অবশেষে সে মসজিদে গিয়ে পবিত্র কোরান হাতে প্রতিজ্ঞা করে এর শোধ তলবাম। এর শোধ না তুললে আমার নাম হাসান আলী না। আমি বেজন্মা। এই মুহূর্তেই হাসান আলী চরিত্রটি এক নতুন মাত্রা লাভ করে। রাজাকার হয়েও তার ভেতরে জেগে ওঠে মানবিকতা, অপরাধবোধ আর স্বদেশপ্রেমের আগুন। সে বুঝতে পারে বিনাদোষে মানুষ হত্যা আর ঘরে আগুন দেওয়া কোনো ধর্ম কোনো আদর্শের কাজ নয়। এ তো অমানবিক বর্বরতা। হুমায়ূন আহমেদ এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ শুধু যুদ্ধের গল্প নয় এটি এক নৈতিক জাগরণের গল্প। শ্যামল ছায়ার হাসান আলী রাজাকার হয়েও যে জীবনের প্রশ্নে উত্তীর্ণ হয় তা হচ্ছে মানবিকতা ও দেশপ্রেমে।জন্মভূমির শ্যামল ছায়ায় সে অবশেষে স্নাত হয় শুদ্ধ হয় তার আত্মা। এই আত্মবোধই উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় অর্জন।
সূর্যের দিন: কিশোর চোখে মুক্তিযুদ্ধের সূর্যোদয়
হুমায়ূন আহমেদের সূর্যের দিন উপন্যাসটি ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম দিকের বিক্ষুব্ধ সময়কে অসাধারণভাবে ধারণ করেছে। এটি মূলত কিশোরদের উপযোগী করে লেখা হলেও, এর ভেতরে নিহিত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, ভয়, আশঙ্কা এবং স্বাধীনতার আশাবাদী আলোকরেখা। উপন্যাসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শুরুতে ঢাকার জনজীবনের অস্থিরতা, আতঙ্ক, গুলির শব্দ, কারফিউ, শহর ছেড়ে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো বাস্তবসম্মতভাবে উঠে এসেছে। লেখক অত্যন্ত জীবন্তভাবে চিত্রিত করেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ-“সাত তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দেবেন রেসকোর্স মাঠে। ভোররাত থেকে লোকজন আসতে শুরু করেছে। দোকানপাট বন্ধ। অফিস আদালত নেই। সবার দারুণ উৎকণ্ঠা। কি বলবেন এই মানুষটি? সবাই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে অবশেষে রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা শুরু করলেন। তাঁর মুখ দিয়ে কথা বলে উঠলো বাংলাদেশ। এই দৃশ্যের পরেই আসে ভয়াবহতা, পঁচিশ মার্চ রাতে হৃদয়হীন একদল পাকিস্তানী মিলিটারি এ শহর দখল করে নিল। তারা উড়িয়ে দিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন। জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলের ছাত্রদের গুলি করে মারল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে হত্যা করলো শিক্ষকদের। এক রাতেই এ শহর মৃতের শহর হয়ে গেল। উপরের বর্ণনা থেকেই সহজে বোঝা যায়, তখনকার সময়টি কতটা ভয়ংকর ছিল। লেখক নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন সেই আতঙ্কিত নগরজীবন ও মানুষের অনিশ্চয়তা। উপন্যাসের কিশোর চরিত্রগুলো সাজ্জাদ, খোকন, মুনীর, টুনু, নীলু প্রতিনিধিত্ব করছে সেই সময়কার স্কুলপড়ুয়া তরুণ প্রজন্মকে। তাদের মানসিক দোলাচল, অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা, শহর ছেড়ে নীলগঞ্জে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া এবং পরবর্তীতে সাজ্জাদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ঘটনাগুলো বাস্তবতার নিরিখে ফুটে উঠেছে অনবদ্যভাবে।
১৯৭১: রফিকের আত্মজাগরণের গল্প
হুমায়ূন আহমেদের ১৯৭১ উপন্যাসটির পটভূমি এক নিস্তব্ধ গ্রাম নীলগঞ্জ। দেশের অন্য প্রান্তের মতো এই গ্রামও মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ সময়ের সাক্ষী হয়। একরাতে হঠাৎ পাকিস্তানি সেনারা এসে অবস্থান নেয় নীলগঞ্জ গ্রামের স্কুলঘরে। তাদের সন্দেহ, গ্রামের দক্ষিণে বিরাট জঙ্গলের ভেতর মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি রয়েছে। এই সন্দেহ থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ নির্যাতন ও নৃশংসতার অধ্যায়। রাজাকার রফিক, নীল শার্ট পরা এক তরুণ, তাদের সহযোগিতা করে। তার নির্দেশনায় পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রথমে ধরে আনে গ্রামের মসজিদের ইমাম ও স্কুলের হেডমাস্টারকে। শুরু হয় অকথ্য নির্যাতন। এক সময় পাকিস্তানি মেজর প্রবেশ করে এক বাড়িতে, এবং সেখানেই ঘটে নারীর ওপর পাশবিক ধর্ষণ। তারপর হেডমাস্টারকে দেওয়া হয় এক অমানবিক শাস্তি তার যৌনাঙ্গে ইট বেঁধে তাকে সারাগ্রাম ঘোরানো হয়, তারপর গুলি করে হত্যা করা হয়। এই নির্মম দৃশ্যগুলো প্রত্যক্ষ করতে করতে রফিকের মনে জন্ম নেয় প্রবল ঘৃণা ও অনুশোচনা। পাকিস্তানি সেনাদের প্রতি তার বিশ্বাস ভেঙে পড়ে। ধীরে ধীরে তার ভেতরে জেগে ওঠে প্রতিবাদী চেতনা এক নবজন্মের বোধ। অবশেষে মেজর তার ওপর সন্দেহ করে। তাকে বিলের জলে দাঁড় করিয়ে হত্যা করতে নেয়। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে রফিক বলে ওঠে “মেজর সাহেব, আমার কিন্তু মনে হয় না আপনি জীবিত ফিরে যেতে পারবেন এদেশ থেকে।” এই সংলাপটিই রফিকের আত্মবোধ ও রূপান্তরের প্রতীক। রাজাকার পরিচয়ধারী এই মানুষটি শেষ মুহূর্তে নিজের ভেতরের বাঙালিকে আবিষ্কার করে। উপন্যাসের শেষাংশে রফিক যেন আত্মসাক্ষাৎ লাভ করে সে হয়ে ওঠে এক রূপান্তরিত বাঙালি, মুক্তিযুদ্ধের সত্য চেতনার প্রতিচ্ছবি। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর কুশলী হাতে উপন্যাসটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা, মানুষের নৃশংসতা, আবার সেই সঙ্গে মানবতার জাগরণও। ১৯৭১ শুধুমাত্র এক যুদ্ধের গল্প নয়; এটি এক মানুষের ভেতরকার পরিবর্তন, এক জাতির জাগরণ, আর স্বাধীনতার অনিবার্য আকাঙ্ক্ষার গল্প।
আগুনের পরশমণি: গেরিলাদের গৌরবগাথা
হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস আগুনের পরশমণি। একাত্তরের ভয়াল জুলাই মাসের প্রেক্ষাপটে রচিত। জুলাই মাসের ছ তারিখ উনিশ শো একাত্তর এই বাক্য দিয়েই লেখক আমাদের নিয়ে যান পাকিস্তানি সেনাদের দখলে থাকা আতঙ্কিত ঢাকা শহরে। যেখানে প্রবেশ করে বদিউল আলম নামের এক তরুণ গেরিলা যোদ্ধা। শহরে গেরিলা অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব তার আর আশ্রয়দাতা সাধারণ মানুষ মতিন সাহেব। যিনি স্বাধীন দেশের স্বপ্নে বাঁচেন স্বাধীন বাংলা বেতার শুনে যার রক্ত গরম হয়ে ওঠে। মতিন সাহেবের পরিবার স্ত্রী সুরমা, মেয়ে রাত্রি ও অপালা এবং কাজের মেয়ে বিন্তিকে নিয়ে গঠিত ছোট সংসারে আশ্রয় নেয় বদিউল আলম । প্রথমে সুরমা আপত্তি জানালেও পরে মাতৃত্ববোধে আলমকে আপন করে নেন এমনকি বুঝতে পারেন রাত্রির হৃদয়ে আলমের জন্য জন্ম নিয়েছে কোমল ভালোবাসা। কিন্তু আলমের মনের ভিতর দাউ দাউ করে জ্বলে স্বাধীনতার স্বপ্ন। ঢাকা শহরের গেরিলাদের প্রথম কাজই হবে মানুষের মনোবল ফিরিয়ে আনা। তার দলের সদস্য সাদেক, নূর, নাজমুল, রহমান, গৌরাঙ্গ ও আশফাকের সঙ্গে সে অভিযান চালায়। প্রথম অভিযানে তারা সফল হলেও পরেরবার পাকিস্তানিদের মুখোমুখি হয় সাদেক ও নূর শহীদ হয় আর আলম গুরুতর আহত হয়। আশফাক ধরা পড়ে মেজর রাকিবের হাতে এবং অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেও সঙ্গীদের ঠিকানা ফাঁস না করে নিজের জীবন উৎসর্গ করে। অন্যদিকে আলমের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়। কারফিউয়ের কারণে ডাক্তার আনার উপায় থাকে না পুরো পরিবার উদ্বেগে কাটায় রাত। লেখক উপন্যাসের শেষ রেখেছেন ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতায় আলম বেঁচে ওঠে কি না তা অজানাই থেকে যায়। তবে পাঠকের মনে এক আশাব্যঞ্জক প্রত্যাশা জাগে হয়তো সে বেঁচে গেছে। রাত্রির সঙ্গে তার মিলন ঘটেছে আর স্বাধীনতার সূর্য উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্যে সাধারণ মানুষের সাহস গেরিলাদের আত্মত্যাগ নারী-পুরুষের মানবিক সম্পর্ক এবং প্রেম ত্যাগের আবেগ হুমায়ূন আহমেদ অসাধারণ বাস্তবতা ও সংবেদনশীলতায় এঁকেছেন এই উপন্যাসে। আগুনের পরশমণি শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয় মানুষের ভিতরের আলো বিশ্বাস ও ভালোবাসারও এক অনুপম রূপক।
অনিল বাগচীর একদিন: ১৯৭১: ভয়, শোক ও সাহসের ঢাকা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকার এক নিভৃত মেসে একা থাকা অনিল বাগচীর জীবন ভয়ের সঙ্গে লড়াই এবং সাহসের এক অনন্য মিলনকে প্রতিফলিত করে। ছোটবেলা থেকে ভীতু প্রকৃতির এই হিন্দু যুবককে বড় হতে হতে ভয় এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে। একদিন গ্রাম থেকে আসা চিঠির মাধ্যমে সে জানতে পারে পাকিস্তানি মিলিটারিরা তার বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, এবং বড় বোনকে হেডমাস্টারের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। শোক, আতঙ্ক এবং দুশ্চিন্তার মাঝেও অনিল ছুটি নিয়ে গ্রামে যাত্রা শুরু করে। যুদ্ধকালীন ঢাকার রাস্তায় প্রতিটি কোণায় পাকিস্তানি সেনাদের চেকপোস্ট, সন্দেহজনক মানুষকে গ্রেফতার এবং হিন্দু ও যুবকদের প্রতি বিশেষ নজর—এই সব পরিস্থিতির মধ্যে তার যাত্রা চলতে থাকে। নদীর ধারে তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু তাতেও অনিলের হৃদয়ে ভয় কোনো স্থান পায় না। তার সাহস, স্থিতধৈর্য এবং দেশের প্রতি অটল অনুরাগই তাকে বাঁচিয়ে রাখে, এবং পাঠককে শেখায় যে যুদ্ধ শুধু দেশের জন্য নয়, একেকটি মানুষের ব্যক্তিগত সংকল্প, সাহস এবং মানবিক গুণাবলীর পরীক্ষা নেয়। অনিল বাগচীর গল্প তাই মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্যে সাধারণ মানুষ ও তাদের অন্তর্নিহিত সাহসের এক জীবন্ত চিত্র।
জোছনা ও জননীর গল্প: মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য
২০০৫ সালে প্রকাশিত জোছনা ও জননীর গল্প হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস। যেখানে তিনি নিজস্ব ভাষায় দেশমাতৃকার ঋণ শোধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি সফল সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছেন এবং ইতিহাসে ছড়িয়ে থাকা বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করেছেন। উপন্যাসের সূচনা হয় নীলগঞ্জ হাইস্কুলের আরবির শিক্ষক মাওলানা ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরীকে নিয়ে। যিনি একটি রাজহাঁস নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেন। পরে তিনি স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হন কিন্তু পাকিস্তানি আর্মি তাকে হত্যা করে এবং লাশ স্কুল প্রধান মনসুর সাহেব সমাহিত করেন। গল্পে শাহেদ, আসমানী, গৌরাঙ্গ ও তার পরিবার, পুলিশ ইন্সপেক্টর মোবারক, কলিমুল্লাহ, বিহারি জোহর সাহেব, অধ্যাপক ধীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরীসহ অসংখ্য চরিত্রের জীবনকাহিনি উঠে এসেছে। হুমায়ূন আহমেদ নিজেএবং মুহম্মদ জাফর ইকবাল, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ উপন্যাসে স্বনামে উপস্থিত। তবে সব চরিত্রের মধ্যেই বড় হয়ে ওঠে হুমায়ূন আহমেদের গল্প বলার জাদুকরি কুশলতা। যেখানে পাঠক আগেই আন্দাজ করতে পারে কলিমুল্লাহ আলবদর হবে, ধীরেন্দ্রনাথকে তুলে নিয়ে যাবে, শাহেদ ও আসমানীর মিলন ঘটবে। এ উপন্যাসে সাধারণ মানুষদের গল্পও বিশেষ গুরুত্ব পায় কারণ এদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী। উপন্যাসের শিরোনামই নির্দেশ করে গভীর তাৎপর্য: জননী দেশমাতৃকা, যিনি জোছনার রাতে বীর সন্তানদের কবরের উপর অপরূপ নকশা করে তাঁদের স্মরণ করেন। হুমায়ূন আহমেদ সহজ ভাষা চরিত্রের মুখে সংলাপ ও কাহিনির বাস্তব বুনন ব্যবহার করে পাঠককে মুক্তিযুদ্ধের আবেশে প্রবেশ করান। উপন্যাস সমকালীন তরুণদের মধ্যে অবিনাশী মুক্তিযুদ্ধ চেতনা সঞ্চার করে, যা শুধু ইতিহাসের বর্ণনা নয়; এটি বিশ্বাস, আত্মত্যাগ, গণতন্ত্র এবং ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তরুণদের উজ্জীবিত করে।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যিক কুশলতা এবং গভীর মানবতাবোধের মাধ্যমে আমাদের সামনে ফুটে ওঠে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত ছবি। তাঁর উপন্যাসগুলো শুধু ইতিহাসের পুনঃউল্লেখ নয় বরং সাধারণ মানুষের সাহস, ত্যাগ, ভালোবাসা, এবং সংকল্পের গল্প বলার এক অনন্য উপায়। এই কাহিনিগুলোর মধ্য দিয়ে পাঠক শুধু যুদ্ধের নৃশংসতা দেখেন না বরং মানুষের ভেতরের সাহস, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শক্তিকেও উপলব্ধি করেন। হুমায়ূন আহমেদ কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক, সাধারণ মানুষ থেকে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা সকলের জীবনের ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ সংগ্রামের গল্পকে সংলাপে, দৃশ্যায়নে এবং আবেগে অনবদ্যভাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর লেখায় দেখা যায় প্রেম, ভয়, করুণতা এবং আশা সবই একসাথে মিলে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে পাঠকের মনে অঙ্কিত করে। এই উপন্যাসগুলো বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখায় যে স্বাধীনতা অর্জন শুধুমাত্র রাষ্ট্রের সংগ্রাম নয়; এটি প্রতিটি মানুষের সাহস, আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেমের ফল। হুমায়ূন আহমেদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা এবং তা সম্মান করা অপরিহার্য, যেন আমরা জাতি হিসেবে আমাদের অতীতকে ভালোভাবে বুঝতে এবং আগামীর জন্য শিক্ষণীয় নীতি গ্রহণ করতে পারি। আজ ১৩ নভেম্বর ২০২৫, মহান কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর ৭৭মত জন্মদিনের দিন। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি, সম্মান শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা।।
--- বাউল পানকৌড়ি
সকল কাঁটা ধন্য করে: হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম









