মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য: ইতিহাসের জীবন্ত ভাষ্য- বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রই নয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও চেতনারও প্রাণকেন্দ্র। স্বাধীনতার সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ইতিহাসকে আজও দৃশ্যমান করে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্যসমূহ। এসব ভাস্কর্য একদিকে যেমন শিল্পিত নান্দনিকতার উদাহরণ। ঠিক অন্যদিকে তেমনি তুলে ধরে ১৯৭১-এর বীরত্ব ত্যাগ ও সংগ্রামের সত্য কাহিনি। প্রতিটি ভাস্কর্য যেন পাঠ্যবইয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত দলিল। যার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান, শহীদদের স্মৃতি আর স্বাধীনতার স্বপ্ন নতুন করে উজ্জীবিত হয় প্রতিদিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ভাস্কর্যগুলো শুধু অতীত স্মরণ করায় না সাথে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে জাগ্রত থাকার অনুপ্রেরণাও জোগায়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো একেকটি ইতিহাস সমৃদ্ধ প্রতীক। এগুলো শুধু শিল্পকর্ম নয় মুক্তিযুদ্ধের নানা অধ্যায়কে দৃশ্যমান করে তোলার এক অনন্য মাধ্যম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে এমন ভাস্কর্য যা যুগে যুগে সংগ্রামী মানুষের আবেগ, ত্যাগ ও প্রতিরোধকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্যগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে প্রতিটি শিল্পকর্মের নিজস্ব গল্প ও বার্তা রয়েছে। কোথাও প্রতীকী ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে স্বাধীনতার সংগ্রামী চেতনা। কোথাও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির অমরত্ব আবার কোথাও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা। অনেক ভাস্কর্যই নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনার প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে শুধু সৌন্দর্যমণ্ডিতই করে না সাথে শিক্ষার্থীদের ইতিহাসভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশে ভূমিকা রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্যগুলো ইতিহাসের পাঠকে আরও জীবন্ত করে তোলে এবং ক্যাম্পাসজুড়ে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দেয়। আজকে পর্বে থাকছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ক্যাম্পাসের থাকা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যের পরিচিতি।
১. ভাস্কর্য: অপরাজেয় বাংলা
ভাস্কর: সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ
অবস্থান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (কলা ভবন), ঢাকা
সাল: ১৯৭৯
২. ভাস্কর্য: স্বাধীনতা সংগ্রাম
ভাস্কর: শামীম শিকদার
অবস্থান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ফুলার রোড), ঢাকা
সাল: ১৯৯৯
৩. ভাস্কর্য: স্বাধীনতা সংগ্রাম
ভাস্কর: শামীম শিকদার
অবস্থান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (টিএসসি), ঢাকা
সাল: ১৯৮৮
৪. ভাস্কর্য: সাবাস বাংলাদেশ
ভাস্কর: নিতুন কুণ্ডু
অবস্থান: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী
সাল: ১৯৯১
৫. ভাস্কর্য: বিদ্যার্ঘ
ভাস্কর: শাওন সগীর সাগর
অবস্থান: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (শহীদ হবিবুর রহমান হল), রাজশাহী
সাল: ২০১১
৬. ভাস্কর্য: স্ফুলিঙ্গ
ভাস্কর: কনক কুমার পাঠক
অবস্থান: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (শহীদ শামসুজ্জোহা হল), রাজশাহী
সাল: ২০১২
৭. ভাস্কর্য: জয় বাংলা
ভাস্কর: সৈয়দ মোহাম্মদ সোহরাব জাহান
অবস্থান: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, (বুদ্ধিজীবী চত্বর), চট্টগ্রাম
সাল: ২০১৮
৮. ভাস্কর্য: স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্য
ভাস্কর: শিল্পী মুর্তজা বশির
অবস্থান: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ), চট্টগ্রাম
সাল:
৯. ভাস্কর্য: স্মরণ স্মৃতিস্তম্ভ
ভাস্কর: সৈয়দ সাইফুল কবীর
অবস্থান: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (প্রধান ফটক), চট্টগ্রাম
সাল: ২০০৯
১০. ভাস্কর্য: সংশপ্তক
ভাস্কর: হামিদুজ্জামান খান
অবস্থান: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার), সাভার, ঢাকা
সাল: ১৯৯০
১১. ভাস্কর্য: অদম্য বাংলা
ভাস্কর: গোপাল চন্দ্র পাল
অবস্থান: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা
সাল: ২০১২
১২. ভাস্কর্য: দুর্বার বাংলা
ভাস্কর: গোপাল চন্দ্র পাল
অবস্থান: খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা
সাল: ২০১৩
১৩. ভাস্কর্য: বিজয় ৭১
ভাস্কর: শ্যামল চৌধুরী
অবস্থান: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,ময়মনসিংহ
সাল: ২০০০
১৪. ভাস্কর্য: বিমূর্ত মুক্তিযুদ্ধ
ভাস্কর: শ্যামল চৌধুরী
অবস্থান: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,ময়মনসিংহ
সাল: ২০১৭
১৫. ভাস্কর্য: চেতনা ৭১
ভাস্কর: মোবারক হোসেন নৃপাল
অবস্থান: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
সাল: ২০১১
১৬. ভাস্কর্য: প্রত্যায় ৭১
ভাস্কর: মৃণাল হক
অবস্থান: মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল
সাল: ২০১২
১৭. জয় বাংলা
ভাস্কর: দুলাল চন্দ্র গাইন
অবস্থান: নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী
সাল: ২০১৩
১৮. মুক্তবাংলা
ভাস্কর: রশিদ আহমেদ
অবস্থান: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
সাল: ১৯৯৬
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো শুধু তিচিহ্ন নয়এগুলো আমাদের পরিচয় চেতনা ও গৌরবের ধারক। এসব শিল্পকর্ম ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার মূল্য ও ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয় প্রতিনিয়ত। ভাস্কর্যগুলো সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করা মানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সত্য ও মর্যাদা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া। অন্য কোন পর্বে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য এর স্থান ও পরিচয় তুলে ধরা হবে।
--- বাউল পানকৌড়ি
স্বাধীনতার অগ্নিশিখা সংগ্রাম থেকে লাল সবুজের পতাকার ইতিহাস--Click to Read
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার যত : সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী--Click to Read
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিটে লুকানো নকশার গল্প--Click to ReadRead on mobile
