দেশকে ভালোবাসতে হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে হবে
ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল
বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরী পাঠকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম অবশ্যই মুহম্মদ জাফর ইকবাল। শিশুতোষ গল্প থেকে শুরু করে কিশোর সাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী এবং গণিত বিষয়ক তাঁর বই কেবলমাত্র শিক্ষামূলক নয় বরং আনন্দদায়ক এবং উদ্দীপনামূলক। শুধু কি কিশোর-কিশোরী সব বয়সী পাঠক তাঁর রচনাকে সাদরে গ্রহণ করেন। মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাহিত্যকর্ম পাঠকের মনকে জাগিয়ে তোলে কল্পনাকে প্রসারিত করে এবং জ্ঞানচর্চার সঙ্গে আনন্দও যোগ করে। সাথে এ দেশের স্বাধীনতা বিরোধী আর রাজাকারদের প্রতি ঘৃনা করতে শিখায় আর জানায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এ কারনেই রাজাকার স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বহুবার বিভিন্ন অপবাদ অভিযোগ হাবাজিব বলে জাফর ইকবাল স্যারের কলম বন্ধ করতে চেয়েছে। কারন পাপীস্থানের প্রেত্মাগুলো জানে জাফর ইকবাল ্স্যার লেখার মাধ্যমে শিশু কিশোর থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের কাছে রাজাকার ৭১ এর স্বাধীনতা বিরোধীদের মুখোশ উন্মোচণের করে দিচ্ছে। জানাচ্ছে ওদের সঠিক ইতিহাস।
উপন্যাসগুলোতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল তুলে ধরেছেন যুদ্ধের নৃশংস সময়, মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব, মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিমেয় সাহস এবং একটি জাতির জাগরণের গল্প। এই আলোচনা মূলত পাঠকের মধ্যে তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনাগুলোর প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি করার প্রয়াস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানতেই হবে কারণ আমরা ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি নিজেদের অতীত। ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তি আজও অন্ধকারের আড়ালে সুযোগ খুঁজে ফেরে। ইতিহাসের সত্য অধ্যয়ন জানা থাকলে তাদের ছলচাতুরি সহজেই ধরা পড়ে এবং তাদের প্রতি আমাদের অবস্থান স্পষ্ট হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সঠিক ইতিহাস জানা বোঝা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ক্যাম্প প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। এই বইয়ে তুলে ধরেছেন যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ফজল। এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। বাড়িতে ফেরার পর রাজাকাররা তাকে ধরে নিয়ে যায় হাইস্কুলে স্থাপিত তাদের ক্যাম্পে। মেজর সাহেব ফজলকে রাজাকার হওয়ার শর্তে মুক্তির প্রস্তাব দেন, কিন্তু দেশপ্রেমিক ফজল সেই পথ বেছে নেয় না। শেষ পর্যন্ত তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে মতিউর নামের রাজাকার চরিত্রের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন ধর্মের নামে বিভাজন, হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন এবং গ্রামাঞ্চলে পাকিস্তানি দোসরদের অন্ধ অনুসরণ। এলাকায় হিন্দু শব্দযুক্ত নামগুলো পরিবর্তন করে মুসলিম নাম দেওয়ার ঘটনাগুলো সেই সময়কার বিকৃত মানসিকতার পরিচয় বহন করে। ফজল ধরা পড়ার আগে এক কিশোরী মেয়ের সঙ্গে তার নীরব মুহূর্ত উপন্যাসে এক গভীর আবেগ যোগ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার বছরগুলো পরে মেয়েটি এখন ড. সুরাইয়া তার মেয়ে শারমিনকে সেই দিনের ভয়াবহ গল্প শোনায়। ফজলের শেষ হাসি ও তার চোখের ভাষা আজও তাকে তাড়া করে। ক্যাম্প মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের এক সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী দলিল। মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন স্বাধীনতার পথ রচিত হয়েছিল অসংখ্য ফজলের আত্মত্যাগে, যা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়।
এই বইটি নিয়ে বলার কিছু নাই। সবারই পড়া এবং চলচ্চিত্রে দেখা। শিশু কিশোরদের এই বইটি পড়ার চেয়ে আমার বন্ধু রাশেদ সিনেমাটি দেখাতে উৎসাহ দিচ্ছি। বই পড়ার তো আলাধা মজা বইটিও হাতে দিতে পারেন। রাজাকারদের চিনতে পারবে। আমার বন্ধু রাশেদ উপন্যাসটি হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। ১২-১৩ বছর বয়সী এক কিশোর রাশেদ এই উপন্যাসের মূল চরিত্র। ক্লাস সেভেনে পড়া রাশেদ তার সমস্ত সময় জুড়ে থাকে পাকিস্তানি সেনাদের গতিবিধি লক্ষ করা, রাজাকারদের ভয় দেখানো এবং মুক্তিবাহিনীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করা। রাশেদের সঙ্গে একই বয়সী ইবু, আশরাফ, ফজলু এবং কলেজপড়ুয়া শফিক ও অরু সবাই মিলে যুদ্ধ নামক নির্মম বাস্তবতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলে। যুদ্ধ শুরু হতেই এই কিশোরদের স্বাভাবিক শৈশব থমকে যায়। ঘরের চার দেয়ালের ভেতর বন্দী অবস্থায় থেকেও রাশেদদের মনে জেগে ওঠে স্বাধীনতার স্বপ্ন। রাজাকার ও পাক বাহিনীর নির্মমতা, সাধারণ মানুষের ওপর নৃশংস অত্যাচার দেখে তাদের ভেতরে জন্ম নেয় প্রতিরোধের আগুন। বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও যে দেশকে বাঁচাতে কতটা ভূমিকা রেখেছেএই উপন্যাস তার শক্তিশালী প্রমাণ। জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে একজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে পাক সেনাদের হাত থেকে উদ্ধার করার ঘটনার বর্ণনা পাঠককে শিহরিত করে। রাশেদ যেন প্রতীক হয়ে ওঠে সাহস, বুদ্ধিমত্তা এবং দেশপ্রেমের। তার মতো অগণিত কিশোরের রক্ত ও ত্যাগেই গড়া আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ এই সত্যকে বইটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শীভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস কাঁকনডুবি ২০১৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের গল্প গড়ে উঠেছে শান্ত-নিরিবিলি গ্রাম কাঁকনডুবিকে কেন্দ্র করে। গ্রামের নবকুমার স্কুলের ছাত্র রঞ্জু এবং তার বন্ধু খোকনকে (ডোরা) ঘিরেই গল্প এগিয়েছে। প্রথমে গ্রামের জীবনচিত্র মানুষের সরলতা স্কুলের রুটিন সবই যেন নির্দোষ এক পৃথিবীর ছবি আঁকে। কিন্তু দিনবদলের সাথে সাথে সেই শান্ত গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর আগ্রাসন নেমে এলে পুরো পরিবেশ বদলে যায়। স্কুলের শিক্ষক মজিদ নিজের দল নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন আর ঘটনাচক্রে রঞ্জু ও খোকনও যুক্ত হয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায়। স্কুল দখল করে হানাদাররা ঘাঁটি বানালে রঞ্জুকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে লেখক পাঠককে নিয়ে যান যুদ্ধের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি। যুদ্ধের ভয়াবহ সত্য ও হৃদয়বিদারক উপলব্ধি। উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো মানুষের অনুভূতি, আতঙ্ক, প্রতিরোধ আর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা যা মুহম্মদ জাফর ইকবাল খুব সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন।
আমার বন্ধু রাশেদ এর রাশেদের পর লেখকের সৃষ্ট আরেক স্মরণীয় কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফজল। ফেরা উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মূল ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে তুলে ধরা হয়েছে। পাক হানাদারদের গ্রামে আগমন। ফজলের পলায়ন এবং শরণার্থী হয়ে ভারতের পথে মানুষের অমানবিক কষ্ট। রাজাকারদের নির্মম লুট ধ্বংসযজ্ঞ। ভারতে ট্রেনিং নিয়ে ফজলের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান সবকিছুই গল্পটিকে আরও বাস্তব আরও বেদনাদায়ক করে তোলে। যুদ্ধশেষে ঘরে ফেরা এবং সেই ফেরার পর যুদ্ধোত্তর অভিজ্ঞতাও লেখক অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানানোর জন্য ফেরা হতে পারে এক অসাধারণ বই যেখানে যুদ্ধ, ভয়, দুঃখ, স্বপ্ন এবং বিজয় সবকিছুই ফুটে উঠেছে এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার চোখ দিয়ে।
ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। তিনটি বই খুব সহজ ভাবে শিশু কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং রাজাকার পাকিস্থানি হানাদারদের নির্যতন অত্যাচার সম্পর্কের জানতে পারবে। আমাদের মাতৃভূমির জন্য যে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিলো তার ইতিহাস গভীর আত্মত্যাগের ইতিহাস। অবিশ্বাস্য সাহস ও বীরত্বের ইতিহাস। যখন কেউ এই আত্মত্যাগ আর বীরত্বের কথা জানবে তার বুকে জন্ম নিবে দেশের জন্য গভীর ভালোবাসা আর মমতা। আর মাত্র এক ফর্মার পুস্তিকায় আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরার দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল।ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইটি মাত্র ১৬ পৃষ্ঠার। এই ছোট্ট বইটি শিশুদের জন্য অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো। প্রতিটি পাতায় রঙিন ছবি থাকায় বাচ্চাদের মনোযোগ ধরে রাখা খুব সহজ হয়। বইটি মূলত ছোটদের জন্য লেখা হলেও, বড়রা দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও মানসিক চাপের মাঝেও পড়লে কিছুটা স্বস্তি ও প্রশান্তি পেতে পারেন। এর ভাষা ও উপস্থাপন এমন যে যে কোনো বয়সের পাঠকই কয়েক মিনিটের মধ্যে পড়ে শেষ করতে পারবেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইটি মাত্র ২২ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা বই।বুঝাই যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাস বিস্তারিতভাবে থাকা সম্ভব না। তবে সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোতে সময়কাল অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে একটু একটু করে আলোকপাত করা হয়েছে।যা শিশু কিশোরদের আরো বেশি জানতে সাহায্য করবে উৎসাহ দিবে।
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার জন্য নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে সহজ সুন্দর ও নির্ভরযোগ্য উপায় হলো মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাহিত্য। তাঁর গল্পে যেমন আছে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা তেমনি রয়েছে এক জাতির আত্মত্যাগ আর স্বপ্ন ও মানবিকতার শক্তিশালী বার্তা। রাশেদ, ফজল রঞ্জু কিংবা রতন এই কিশোর নায়কদের চোখ দিয়ে পাঠক বুঝতে পারে স্বাধীনতার মূল্য কত ভয়ংকর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে। ছোটদের জন্য লেখা ১৬ বা ২২ পৃষ্ঠার বইগুলো যেমন ইতিহাসের প্রথম পাঠ হতে পারে। অন্য উপন্যাসগুলো মনে করিয়ে দেয় শেকড়ের কথা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দৃঢ় করতে এবং দেশকে সত্যিকারের ভালোবাসতে হলে এই বইগুলো পড়া আমাদের সবার দায়িত্ব সবার প্রয়োজন। আমাদের ভালবাসা গ্রহণ করুন স্যার।
Read on mobile




