স্বাধীনতার শব্দসঙ্গী কল-রেডী : স্বাধীনতার ডাক পৌঁছে দিয়েছিলো সবার কানে
স্বাধীনতার শব্দসঙ্গী কল-রেডি: স্বাধীনতার ডাক পৌঁছে দিয়েছিলো সবার কানে
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে কল-রেডী নামটি এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। যখনই কল-রেডী নামটি উচ্চারিত হয় তখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী আর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের দৃশ্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কল-রেডী কেবল একটি মাইক্রোফোন বা মাইক সার্ভিস নয় বরং এক জীবন্ত সাক্ষী। আন্দোলন, সংগ্রাম ও স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সূচনালগ্ন সব জায়গাতেই কল-রেডি মাইক্রোফোন ছিল কণ্ঠের শক্তি প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি জয় বাংলার প্রতিধ্বনি ।
মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার মঠবাড়িয়া গ্রামের সহোদর দুই ভাই দয়াল ঘোষ ও হরিপদ ঘোষ। দুই ভাই ১৯৪৮ সালে ঢাকার সূত্রাপুরে আরজু লাইট হাউস নামে একটি দোকান চালু করেন। নামের ইতিহাস হল আরজু লাইট হাউস প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক স্লোগান ছিলে I am Always Ready On Call at Your Service. দুই ভাই কিছু দিন পর নাম পরিবর্তন করে রাখেন কল-রেডী (Call Ready)। কল করে জানালেই আমার রেডী এই হল নামে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলা যায়। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে তারা মূলত লাইটিং ও সাজসজ্জা ভাড়ার কাজ করতেন। বিভিন্ন বিয়ে শাদি ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জার পাশাপাশি গ্রামোফোন ভাড়া দেওয়ার। পরবর্তীতে তারা ভারত থেকে কয়েকটি মাইক আমদানি করেন এবং নিজেরা কিছু হ্যান্ডমাইক তৈরি করেন। যা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ব্যবহারের জন্য ভাড়া দিয়ে থাকতেন। ১৯৫২ সালে ভাষার অধিকারের দাবিতে ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ ও সমাবেশের কারণে মাইক্রোফোনের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কল-রেডী তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করে এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়। চাহিদা বাড়তে থাকায় চীন, তাইওয়ান ও জাপানসহ অন্যান্য দেশ থেকেও মাইক আমদানি শুরু করেন। মহান ভাষা আন্দোলনের কল-রেডী এক নিরব স্বাক্ষী।
কল-রেডী কেবল একটি মাইকের দোকান বা সার্ভিস প্রতিষ্ঠান নয় বরং বলায় যায় একটি সংগ্রামী পরিবারের নাম। যারা বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠকে জনতার হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাদের ঘামের বিনিময়ে ইতিহাসের মঞ্চে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ে কল-রেডীর মাইক্রোফোন ছিল নিরব সাক্ষী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সভা-সমাবেশে এই প্রতিষ্ঠানের মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে অগ্নিঝরা বক্তৃতা দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতারা। সব ছাড়িয়ে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের সাথে কল-রেডিকেও ইতিহাসে চিরস্থায়ী স্থান করে দিয়েছে। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে যে আহ্বান ধ্বনিত হয়েছিল এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম বলা স্বাধীনতা সেই ঘোষনা পৌঁছেছিল লাখো মানুষের কানে। আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করা ঐতিহাসিক সেই অমর কবিতাখানী লাখো মানুষে শোনার জন্য এক সাথে জয় বাংলা বলে স্লোগানে মুখরিত করার দায়িত্ব নিয়েছিল কল-রেডি মাইক সার্ভিস।
৭ মার্চের তিন দিন আগে বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমন্ডি ৩২-এর বাসায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষ, কল-রেডীর দুই কর্ণধারকে। নির্দেশ একটাই সমাবেশে যেন নিখুঁতভাবে মাইকের ব্যবস্থা থাকে। এরপর থেকেই শুরু হয় রাতের আঁধারে প্রস্তুতির কাজ। একশোরও বেশি মাইক লাগানো হয় পুরো জনসমাবেশস্থলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও কিছু মাইক মজুদ রাখা হয় যাতে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়। পাকিস্তানি শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন হরিপদ ঘোষ দয়াল ঘোষ এবং তাদের সহকর্মীরা। রাতের অন্ধকারে মাইক বসানো, কাপড়ে ঢেকে রাখা সবই ছিল জীবন বাজি রাখা এক ইতিহাসের অংশ। পাপিস্থানের শাসকের ভয় উপেক্ষা করে কাজ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। যেকোন সময় হতে পারে তাদের উপর আক্রমণ হতে পারেন গ্রেফতার হতে পারে তাদে ব্যবসা বন্ধ। এতসব উৎকণ্ঠিত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে শুধু টাকার জন্য সাড়া দেয়নি কল-রেডী। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের হুমকির মুখে রাতের অন্ধকারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৭মার্চ প্রায় ১০ লাখ মানুষের ঐতিহাসিক সমাবেশে মাইকের আয়োজন করেছিল কল-রেডী। সমাবেশের দিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণে যান্ত্রিক ত্রুটি যেন না হয় সেজন্য অতিরিক্ত তিনটি মাইক্রোফোন, কিছু হ্যান্ড মাইক ও ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগসহ নিজেরা উপস্থিত ছিলেন। হয়েছিলেন ইতিহাসের অংশ। ভয় ছিল কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ছিল তাদের সাহস।
কল-রেডীর বর্তমান চেয়ারম্যান বিশ্বনাথ ঘোষ। তাঁর কাছে জানা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে রেসকোর্স ময়দানে যে মাইক্রোফোন ব্যবহার করা হয়েছিল তার স্ট্যান্ডটি এখনো সংরক্ষিত আছে তাদের কাছে। তারপর ভাষণে ব্যবহৃত অ্যামপ্লিফায়ার গুলোর মধ্যে সাতটি এবং মাইক্রোফোনের মধ্যে চারটি এখনও অক্ষত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা এগুলো যত্নসহকারে সংরক্ষণ করে আসছেন। আরেকটি তথ্য হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণ দেওয়ার সময় যে টেবিল (পোডিয়াম) এর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যার ওপর তিনি চশমা রেখে ভাষণ দিয়েছিলেন সেটিও এখনো সংরক্ষিত আছে তাদেরই কাছে। রাজধানীর হোসেনি দালান এলাকার হাজী চান মিয়া ডেকোরেটর সেদিন সেই টেবিলটি সরবরাহ করেছিল। এসব শুনে এখন এক প্রশ্ন জাগে মুক্তিযুদ্ধ জাদুকর কেন এখন তাদের কাছ থেকে ঐতিহাসিক স্মৃতি চিহৃ গুলো সংরক্ষনের জন্য নিয়ে আসছে না। তাদের কথায় তারা দেবার জন্য রেডি আছেন।
কল-রেডী শুধুমাত্র একটি মাইক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। বিক্রমপুরের দুই ভাই দয়াল ঘোষ ও হরিপদ ঘোষের হাত ধরে ১৯৪৮ সালে যাত্রা শুরু করা কল-রেডি, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সবখানেই ছিল অগ্রণী ভূমিকা। একসময় যে মাইক্রোফোনের তারে জড়ানো ছিল মানুষের মুক্তির আহ্বান, সেই কল-রেডি আজও আমাদের সংগ্রামী অতীতের স্মৃতি বয়ে বেড়ায়। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে উচ্চারিত এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এই অমর আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল কল-রেডীর মাইক্রোফোনের মাধ্যমেই। কল-রেডী শুধু প্রযুক্তিগত এক নাম নয় এটি বাঙালির আবেগ, সংগ্রাম ও স্বাধীনতার প্রতীক। সময়ের ধুলো ঝেড়ে এই প্রতিষ্ঠানকে সংরক্ষণ করা মানে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসকে অম্লান রাখা। ইতিহাস এতিহ্য নিয়ে আরো হাজার বছর বেঁচে থাক এই প্রতিষ্ঠান। আমাদের শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।
--- বাউল পানকৌড়ি
৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ- বঙ্গবন্ধু--Click to Read
Read on mobile
