ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি কুমিল্লা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নীরব সাক্ষী

সবুজে ঘেরা পাহাড়ের ঢাল, সুনসান নীরবতা আর সারি সারি সাদা সমাধিফলক এই দৃশ্যটি কুমিল্লার ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রির। এটি কেবল একটি ভ্রমণ স্থান নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক বিষাদময় অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী। সময়ের চাকায় ইতিহাস থমকে দাঁড়ায় কিছু বিশেষ স্থানের একটি। কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপত্য নয়, বরং নিজ দেশ ও স্বজন ছেড়ে হাজার মাইল দূরে জীবন উৎসর্গ করা শত শত তরুণ যোদ্ধার এক পরম শান্তিময় বিশ্রামস্থল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত এই সমাধিক্ষেত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় কয়েক দশক আগের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর কথা, যখন হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আসা তরুণ সেনারা এই জনপদে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। আমাদের আরও মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের ভয়াবহতা আর শান্তির মূল্য।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-১৯৪৫) বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) ফ্রন্টে জাপানি বাহিনীর সাথে মিত্রশক্তির প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। তৎকালীন সময়ে কুমিল্লা ছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটি। এখানে স্থাপিত হয়েছিল বড় সামরিক হাসপাতাল, রসদ সরবরাহ কেন্দ্র এবং বিমান ঘাঁটি। ১৯৪৪ সালে ইম্ফল যুদ্ধের আগে এটি ছিল চতুর্দশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর। যুদ্ধে বার্মা, আসাম এবং তৎকালীন পূর্ববঙ্গে যে ৪৫ হাজার কমনওয়েলথ সৈনিক প্রাণ হারান, তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে ৯টি রণ সমাধিক্ষেত্র তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে এর দুটি অবস্থিত—একটি চট্টগ্রামে এবং অন্যটি কুমিল্লার ময়নামতিতে। ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি মূলত ১৯৪৩-১৯৪৪ সালে তৈরি করা হয়।

সমাধিক্ষেত্রের স্থাপত্য ও পরিবেশ

কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৭-৮ কিলোমিটার পশ্চিমে ময়নামতি সেনানিবাসের উত্তর দিকে টিলার পাদদেশে এই সমাধিক্ষেত্রটি অবস্থিত। প্রবেশদ্বারেই একটি সুন্দর তোরণ ঘর আপনাকে স্বাগত জানাবে। তোরণের ভেতরের দেওয়ালে ইংরেজি ও বাংলায় এই সিমেট্রির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস খোদাই করা আছে। তোরণ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপ। উঁচুনীচু টিলার ওপর অত্যন্ত পরিপাটি করে সাজানো সারি সারি সমাধিফলক। প্রতিটি কবরের পাশে লাগানো হয়েছে মৌসুমি ফুলগাছ, যা পরিবেশের বিষণ্ণতাকে এক ধরনের স্নিগ্ধতায় রূপান্তর করে। সৈন্যদের ধর্ম অনুযায়ী তাদের সমাধিফলকে নাম, পদবি এবং মৃত্যুর তারিখের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন—খ্রিস্টানদের জন্য ক্রুশ এবং মুসলিমদের জন্য আরবিতে 'হুয়াল গাফুর' খোদাই করা ফলক।

এখানে যারা চিরনিদ্রায় শায়িত

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে মোট ৭৩৬টি সমাধি রয়েছে। এর মধ্যে ৭২৩ জন নিহতের পরিচয় জানা গেছে। এখানে সমাহিত যোদ্ধারা বিভিন্ন দেশের বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন:
যুক্তরাজ্য: ৩৫৭ জন
অবিভক্ত ভারত: ১৭৮ জন
পশ্চিম আফ্রিকা: ৮৬ জন
পূর্ব আফ্রিকা: ৫৬ জন
জাপান: ২৪ জন (যুদ্ধবন্দি)
এছাড়া কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, রোডেশিয়া (জিম্বাবুয়ে), বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের সৈনিকদের সমাধি এখানে রয়েছে। বাহিনীর বিন্যাস অনুযায়ী এখানে ৩ জন নাবিক, ৫৬৭ জন সৈনিক এবং ১৬৬ জন বৈমানিক শায়িত আছেন। এই সমাধিক্ষেত্রের একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো সম্মুখ ভাগের একটি গণকবর। যেখানে ২৩ জন বিমানসেনার নাম খোদাই করা একটি বড় ফলক রয়েছে। প্রশস্ত পথের পাশে রয়েছে একটি বিশেষ সমাধি। যেখানে একসঙ্গে ২৩ জন বিমানসেনাকে সমাহিত করা হয়েছে।এটি এই সমাধিক্ষেত্রের অন্যতম স্মরণীয় নিদর্শন। সেখানে লেখা আছে: “These plaques bear the names of twenty three Airmen whose remains lie here in one grave.”

কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন ও বার্ষিক প্রার্থনা

এই সমাধিক্ষেত্রটি 'কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন' (CWGC) দ্বারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালিত ও রক্ষনাবেক্ষণ করা হয়। তাদের নিপুণ ছোঁয়ায় পুরো এলাকাটি একটি পরিচ্ছন্ন বাগানের মতো মনে হয়। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে এখানে একটি বিশেষ বার্ষিক প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে কমনওয়েলথভুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনেক সময় দূর দেশ থেকে শহীদ সৈন্যদের স্বজনরা তাদের পূর্বপুরুষদের কবর দেখতে এখানে আসেন।

ভ্রমণ গাইড: কীভাবে যাবেন ও কোথায় থাকবেন

যাতায়াত: ঢাকা থেকে কুমিল্লার দূরত্ব মাত্র ৯৬ কিলোমিটার। ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে এশিয়া লাইন, তিশা বা প্রাইম বাসে করে সরাসরি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মোড়ে নামা যায়। বাস ভাড়া ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। ক্যান্টনমেন্ট মোড় থেকে সামান্য উত্তর দিকে ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। বাস থেকে নেমে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ, চাইলে রিকশা বা অটোরিকশায়ও যাওয়া যায়।থাকা ও খাওয়া: থাকার জন্য কুমিল্লা শহরে বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল আছে, যেমন—হোটেল চন্দ্রিমা, হোটেল নুরজাহান, হোটেল শালবন বা আশীক রেস্ট হাউস। এসব হোটেলে মানভেদে ২০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে রুম পাওয়া সম্ভব। খাবারের জন্য কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাইয়ের স্বাদ নিতে ভুলবেন না।


ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি কেবল ইতিহাস প্রেমীদের জন্য নয়, বরং শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য একটি দারুণ জায়গা। সবুজে ঘেরা এই নিবিড় পরিবেশে গেলে মন অজান্তেই বিষণ্ণ হয়ে ওঠে, আবার শান্তির পরশও পাওয়া যায়। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে যুদ্ধ নয়, শান্তিই হোক পৃথিবীর একমাত্র পাথেয়। যারা কুমিল্লার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে (শালবন বিহার) ভ্রমণে আসেন, তাদের জন্য ওয়ার সিমেট্রি একটি আবশ্যিক গন্তব্য। ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি বীর যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। নিজ দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে বিদেশের মাটিতে ঘুমিয়ে থাকা এই সৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর হাজারো দর্শনার্থী এখানে ভিড় করেন। আপনিও যদি ইতিহাসের সাক্ষী হতে চান এবং প্রকৃতির নিরিবিলি পরিবেশে কিছুক্ষণ কাটাতে চান, তবে ঘুরে আসতে পারেন এই ঐতিহাসিক রণ সমাধিক্ষেত্র থেকে।

--- বাউল পানকৌড়ি
আবার ফিরে আসছে নদীর ট্রেন : বাতাসে ভেসে আসবে স্টিমারের হুইসেল ইতিহাস ঐতিহ্য
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url