বাংলার স্বাধীন বারো ভূঁইয়াদের সর্দার ঈশা খাঁ- তাঁর সমাধি ইতিহাস ও অবস্থান

সম্রাট আকবরের ক্রোধে
তেরে আসে মানসিংহের বাহিনী
পাঁচ সেপ্টেম্বর মোঘল রণতরী
ঘিরে বাংলার সেনানি।
বাধে যুদ্ধ লড়ে ঈশা খাঁ
মোঘল বাহিনীর ত্রাহি দশা
বীর বিজয়ী বীর সে গাথা
জানো কি?

উপরের লাইন গুলো প্রিয় ব্যান্ড নোভার একটি গান। সেই স্কুল সময়ের গান ঈশা খাঁ। আজকে ঈশা খাঁয়ের কথা আর তাঁর সমাধি কোথায় এই নিয়েই লেখা। আমরা যে কেউ অলস সময়ে অলস ভ্রমনে একবার হলে দেখে আসতে পারি তাঁর সমাধি এক বীরের সমাধি। অনেকেই মনে করে ঈশা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁতে ছিলো তাঁর সমাধি হয়তো সোনারগাঁয়ে আছে। এই তথ্যটি ভুল কারন ঈশা খাঁ সমাধি রয়েছে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর গ্রামে। ২০২১ সালে ১ ডিসেম্বর আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমাধি (সংস্কার-পরবর্তী) নির্মাণ শেষে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে ‘ঈশা খাঁ’র সমাধিস্থলে লাল সিরামিক ইট দিয়ে প্রাচীন নির্মাণ কৌশলসমৃদ্ধ সাড়ে ১৭ ফিট উচ্চতার এবং ২৪ ফিট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের একটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমাধিস্থ নির্মাণ করা হয়েছে।


অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে ঈশা খাঁর সমাধি গাজীপুরের বক্তাপুর গ্রামে কেন। ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ। সোনারগাঁ, গাজীপুরের কালীগঞ্জের বক্তারপুর, কিশোরগঞ্জের এগারসিন্ধু ও আরও ২২টি পরগনার শাসক ছিলেন তিনি। মোগল শাসকদের সাথে তার একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। যুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রতিরোধের জন্য তিনি এগারসিন্ধু ও বক্তারপুরে দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। জীবনের শেষদিকে সোনারগাঁয় ফেরার পথে অসুস্থ হলে তিনি বক্তারপুর দুর্গে অবস্থান নেন এবং ১৫৯৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ৭০ বছর বয়সে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে বক্তারপুর দুর্গের দিঘির পশ্চিম পাড়ে সমাহিত করা হয়। কালের বিবর্তনে সমাধির চিহ্ন হারিয়ে যায়। প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কবরটি ঈশা খাঁর বলে চিহ্নিত করে। ২০০৪ সালে উপজেলা প্রশাসন সমাধিতে বেষ্টনি প্রাচীর নির্মাণ করে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এফ বি ব্রাডলি-বার্ট’র ১৯০৬ সালে প্রকাশিত “দ্য রোম্যান্স অফ অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল” গ্রন্থের ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন “বর্তমান কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুরে ঈশা খাঁ’র কবর অবস্থিত”।

ঈশা খাঁ

ঈশা খাঁর সমাধিতে যেতে হলে আপনাকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত বক্তারপুর গ্রামে যেতে হবে। সেখানে বক্তারপুর পুরোনো দিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত এই প্রাচীন সমাধিটি এখন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। প্রথমে আপনাকে ঢাকা থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ যেতে হবে। কালীগঞ্জ থেকে আপনি স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করে বক্তারপুর গ্রামে পৌঁছাতে পারবেন। বক্তারপুর গ্রামের পুরোনো দিঘির পশ্চিম পাড়ে ঈশা খাঁর সমাধিটি অবস্থিত। পথে স্থানীয় কাউকে জিজ্ঞাসা করলে আপনি সহজেই সমাধিটি খুঁজে নিতে পারবেন।

ঈশা খাঁ

ঈসা খাঁ ১৫২৯-১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দ। পূর্ব-বাংলার স্বাধীন বার ভুঁইয়াদের একজন। ১৫২৯ খ্রিষ্টব্দের ১৮ই আগষ্ট সুলতানি শাসনভুক্ত ভাটি অঞ্চলের সরাইলে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নাম সোলায়মান খাঁ ছিলেন আফগানিস্তানের সোলায়মান পার্বত্য অঞ্চলের এক আফগান দলপতির বংশধর। সোলায়মান খাঁ গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ’র (১৫৩৩–৩৮) মেয়ে সৈয়দা মোমেনা খাঁতুনকে বিয়ে করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল পরগণা ও পূর্ব মোমেনশাহী অঞ্চলের জমিদারি লাভ করেন। ঈশা খাঁর ছোট ভাইয়ের নাম ছিল ইসমাইল খাঁ এবং বোনের নাম ছিল শাহিশা বিবি। ১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে শের শাহ সুরির পুত্র ইসলাম শাহ সুর সাম্রাজ্যের সম্রাট হলে, সোলেমান খান সম্রাটের আনুগত্য অস্বীকার করে কৌশলে তাঁকে হত্যা করে। এই সময় তাঁর দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র ঈসা খান এবং ইসমাইল খানকে একদল তুরানি বণিকের নিকট বিক্রি করা হয়। ১৫৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ঈসা খানের চাচা কুতুব খাঁ রাজকার্যে নিযুক্তি লাভ করে, এদের সন্ধান করা শুরু করেন। বহু অনুসন্ধানের পর তুরানের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ২ ভ্রাতুস্পুত্রকে উদ্ধার করেন। এ সময় ঈসা খানের বয়স ছিল ২৭ বছর।

ঈশা খাঁ

বাংলার সুলতান তাজ খান কররানী ১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করলে ঈসা খানকে তাঁর পিতার জমিদারি ফেরত দেওয়া হয়। তাঁর জমিদারির স্থান ছিল সোনারগাঁও ও মহেশ্বরদী পরগানা। ১৫৭১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী তৈরি করে। পূর্ববাংলার অন্যতম শাসকে পরিণত হন। বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খান কররানীর রাজত্বকালে (১৫৭২-৭৬) ঈসা খান বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন। ১৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দাউদ খান কাররানীকে ত্রিপুরার মহারাজা উদয় মানিক্যের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম অভিযানে সহায়তা করেন। মুঘলদের বাংলা জয়ের পূর্বে ঈসা খান ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সোনারগাঁও সংলগ্ন এলাকা থেকে মুঘলের নৌবাহিনীকে বিতাড়িত করার ক্ষেত্রে কররানী রাজবংশ সুলতান দাউদ খানের সেনাপতিকে সাহায্য করেছিলেন। প্রতিদানে তিনি মসনদ-ই-আলা উপাধি লাভ করেন। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ১২ জুলাই রাজমহলের যুদ্ধে মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি ও বাংলার সুবাহ হোসেনকুলী বেগের কাছে সুলতান দাউদ খান পরাজিত হন। হোসেনকুলী বেগ পরবর্তী সময়ে সুলতান দাউদ খান হত্যা করেন। এরপর তিনি আরও অগ্রসর হয়ে দাউদ খানের অবশিষ্ট অনুসারীদের পরাজিত করেন এবং সাতগাঁও মুগল সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। এই সময় আফগান দলপতি ও ভূঁইয়াগণ ঈসা খাঁ এর নেতৃত্বে ভাটি অঞ্চলে মোগলদের বিরুদ্ধে পুনরায় লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। এই বিদ্রোহ দমনের জন্য ১৫৭৮ খ্রিষ্টাব্দে হোসেনকুলী বেগের ভাটি অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ভাওয়াল অঞ্চলে শিবির স্থাপন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি কিছুটা সাফল্য লাভ করলেও কাসতুলে নৌ-যুদ্ধে তাঁর বাহিনী ঈসা খাঁ-এর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। ১৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট আকবর মানসিংহকে বাংলার শাসক করে পাঠান। পূর্ববঙ্গকে মোগল শাসনাধীনে আনার জন্য মানসিংহ, ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে এক অভিযান পরিচালনা করেন।

ঈশা খাঁ

১৫৯৬ খ্রিষ্টাব্দে মোগল বাহিনী এবং ঈসা খাঁর বাহিনীর ভিতরে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর সম্মিলনস্থলে, বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার সম্পূর্ণ দক্ষিণ প্রান্তের টাঙ্গার গ্রামে হয়। কিন্তু ঈশা খাঁকে পরাজিত করা সম্ভব হয় নি। ১৫৯৭ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে রাজা মানসিংহ স্থল ও জলপথে ঈসা খানের বিরুদ্ধে দুটি বিরাট বাহিনী পাঠান। এই বাহিনী প্রথম দিকে কিছুটা সাফল্য লাভ করে। এই সময় এরঁ ঈসা খানের রাজধানী আক্রমণ করে। কিন্তু ৫ই সেপ্টেম্বর বিক্রমপুর থেকে ২০ কি.মি. দূরে এক নৌ-যুদ্ধে দুর্জন সিংহ নিহত হন এবং মোগল বাহিনী বিধ্বস্ত হয়। এরপর মানসিংহ ঈশা খাঁর সাথে সন্ধি করেন। এভাবে ঈসা খাঁর বিরুদ্ধে মানসিংহের অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং হতোদ্যম মানসিংহ ১৫৯৮ খ্রিষ্টাব্দে আজমীরের উদ্দেশে বাংলা ত্যাগ করেন। এই যুদ্ধের পর ঈসা খাঁ মুঘলদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন এবং আগ্রায় গিয়ে সম্রাট আকবরের সাথে সাক্ষাত করেন। সম্রাট আকবর তাঁকে দেওয়ান ও মসনদ-ই-আলা উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ঈশা খাঁ, কেদার রায়ের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করলে ক্রুদ্ধ কেদার রায় ঈসা খানের রাজধানী আক্রমণ করেন। কেদার রায়ের আক্রমণে ঈসা খান প্রাণভয়ে মেদিনীপুর পালিয়ে যান। কেদার রায় ঈসা খানের প্রায় সম্পূর্ণ জমিদারির দখল নিয়ে নেন। পরে ঈসা খান অজ্ঞাত রোগে তার স্ত্রী ফাতেমা খানের বাড়ি ফুলহরি (ফুলদি) জমিদার বাড়িতে ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মারা যান।

ঈশা খাঁ

ঈসা খাঁর জীবন আমাদের পূর্ববাংলার স্বাধীন ভূঁইয়াদের সাহসিকতা, কৌশল এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

--- বাউল পানকৌড়ি
মুঘল জলদুর্গ - সোনাকান্দা দূর্গ নারায়ণগঞ্জ --Click to Read
বিজ্ঞাপন থেকে আপনার বিশেষ অফার নিশ্চিত করতে এখনই ক্লিক করুন---View Offer

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url