বাংলার মাটির গভীরে মিশে আছে বাউল দর্শন, আর সেই দর্শনের মধ্যমণি হলেন মহাত্মা লালন সাঁইজি। লালন পরবর্তী যুগে তাঁর সেই নিগুঢ় আধ্যাত্মিক ধারাকে যারা বিশুদ্ধভাবে লালন ও পালন করে চলেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব হলেন ফকির নহির শাহ। তিনি কেবল সুরের কারিগর নন, বরং লালন থেকে ভোলাই শাহ হয়ে আসা আধ্যাত্মিক বংশপরম্পরার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
তাঁর জীবন ও দর্শন এতটাই গভীর যে তা সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি হয়েছে। সহজ মানুষ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি ফকির নহির শাহের জীবন ও তাঁর সাধনার ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত। আজকের ব্লগে থাকছে মহান সাধকের কথা ও গান। একজন শিল্পীকে নয় একজন সহজ মানুষ কিংবদন্তি সাধকের গল্প।
ফকির নহির শাহ: জীবন ও সাধনার পটভূমি
ফকির নহির শাহ বাংলাদেশের একজন প্রবীণ সাধক ও লালনভক্ত। লালন সাঁইজির সঙ্গে তাঁর উত্তরাধিকার সম্পর্ক–লতিকার পর্যায়ক্রমটা এই রকম: ফকির লালন শাহ, ভোলাই শাহ, কোকিল শাহ, লবান শাহ ওরফে আব্দুর রব শাহ, তারপরই ফকির নহির শাহ। আব্দুর রব শাহর প্রধান খলিফা ফকির নহির একাধারে আধ্যাত্মিক গুরু, ভাবসংগীতের শিক্ষক এবং সংগীত সংগ্রাহক।
১৯৭১ সালে ফকির নহির শাহ দেশের প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে গুরুবাক্য গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৪ সালে খেলাফতপ্রাপ্ত হয়ে কুষ্টিয়ার প্রাগপুরে ‘হেম আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করে আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন হন। ফকির নহির শাহ এর জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের প্রাগপুরে হেম আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে বাৎসরিক সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠিত হয়।
লালন থেকে নহির শাহ: আধ্যাত্মিক বংশপরম্পরা
বাউল সাধনা মূলত একটি গুরু-শিষ্য কেন্দ্রিক ধারা। ফকির নহির শাহ এই ধারার এক শক্তিশালী যোগসূত্র। তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি হওয়ার পথটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ:
লালন শাহ → ভোলাই শাহ → কোকিল শাহ → লবান শাহ (আব্দুর রব শাহ) → ফকির নহির শাহ। তিনি এই ঐতিহ্যের প্রধান খলিফা হিসেবে বর্তমানে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া ও বৃহত্তর বাউল সমাজে শিক্ষক ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করছেন।সাধনা ও সংগীতের মেলবন্ধন
ফকির নহির শাহ বিশ্বাস করেন, লালন গীতি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি পরমাত্মার সাথে মিলনের একটি পথ।
- সংগ্রাহক ও শিল্পী: তিনি অসংখ্য বিলুপ্তপ্রায় লালন গীতি সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলোর আদি সুর ও বাণী অবিকৃত রেখে পরিবেশন করছেন।
- মিডিয়ায় পদচারণা: চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাঁর পরিবেশিত গানগুলো বাউল দর্শনের প্রকৃত স্বরূপ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
- শিক্ষকতা: তিনি বর্তমান প্রজন্মের শত শত বাউল শিল্পীকে আধ্যাত্মিকতা ও ভাবসংগীতের দীক্ষা দিচ্ছেন।
নির্বাচিত কিছু অমৃত লালন বাণী ও ফকির নহির শাহের গান
অমৃত লালন বানী
কোথায় হে দয়াল কাণ্ডারী
সাধুগুরু নহির শাহ ফকির
কোথায় রইলে হে দয়াল কাণ্ডারি।
এ ভবতরঙ্গে আমায় দাও এসে চরনতরী।।
পাপীকে করিতে তারণ
নাম ধরেছ পতিত পাবন।
সেই ভরসায় আছি যেমন,
চাতক মেঘ নিহারি।।
যতই করি অপরাধ
তথাপি হে তুমি নাথ।
মারিলে মরি নিতান্ত
বাঁচালে বাঁচতে পারি।।
সকলরে নিলে পারে
আমারে না চাইলে ফিরে।
লালন বলে এ সংসারে
আমি কি তোর এতই ভারি।।
কোথায় হে দয়াল কাণ্ডারি | | সাধুগুরু নহির শাহ ফকির
অমৃত লালন বানী
এস হে প্রভু নিরঞ্জন | তুমি ভক্তি তুমি মুক্তি
সাধুগুরু নহির শাহ ফকির
এস হে প্রভু নিরঞ্জন।
এ ভব তরঙ্গ দেখে
আতঙ্কেতে যায় জীবন।।
তুমি ভক্তি তুমি মুক্তি
অনাদির আদ্যশক্তি।
দাও হে আমার ভক্তির শক্তি
যাতে তৃপ্ত হয় ভবজীবন।।
ধ্যান যোগে তোমারে দেখি
তুমি সখা আমি সখী।
মম হৃদয় মন্দিরে থাকি
দাও ঐ রূপ দরশন।।
ত্রিগুনে সৃজিলেন সংসার
লীলা দেখে কয় লালন তার।
ছাদরাতুল মোন্তাহার উপর
নূর তাজেল্লার হয় আসন।।
এস হে প্রভু নিরঞ্জন | তুমি ভক্তি তুমি মুক্তি | সাধুগুরু নহির শাহ ফকির
অমৃত লালন বানী
গুরু সুভাব দাও আমার মনে
সাধুগুরু নহির শাহ ফকির
রাঙ্গা চরণ যেন ভুলিনে।
গুরু সুভাব দাও আমার মনে।।
তুমি নির্দয় যাহার প্রতি
সদাই ঘটে তার কুমতি।
তুমি মনরথের হংসরথি
যথা লও যাই সেখানে।।
তুমি মনের মন তরী
তুমি তন্ত্রের তন্ত্রী।
তুমি যন্ত্রের যন্ত্রী
না বাজাও বাজবে কেনে।।
আমার জন্ম অন্ধ মন নয়ন
তুমি বৈদ্য সচেতন।
চরণ দেখবো আশায় কয় লালন
জ্ঞানঅঞ্জন দাও মোর নয়নে।।
গুরু সুভাব দাও আমার মনে - সাধু গুরু নহির শাহ ফকির
অমৃত লালন বানী
ইতরপনা স্বভাব আমার
সাধুগুরু নহির শাহ ফকির
আমারে কি রাখবেন তোমার চরণদাসী
ইতরপনা স্বভাব আমার ঘটে অহর্নিশি
গুরু আমারে কি রাখবেন তোমার চরণদাসী।
জঠরও যন্ত্রণা পেয়ে
এসেছি মন কড়ার দিয়ে
সে সকল গেছি ভুলে
ভবেতে আসি।
দয়াল ভবেতে আসি
গুরু আমারে কি রাখবেন তোমার চরণদাসী।
ইতরপনা স্বভাব আমার | গুরু আমারে কি রাখবেন তোমার চরণের দাসী

