ফিলিংস ব্যান্ডের সব অ্যালবাম: ৯০-এর দশকের রক নস্টালজিয়া

বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে ফিলিংস মানেই নব্বইয়ের দশকের এক গভীর নস্টালজিয়া। এই নস্টালজিয়ার শিকড় আরও গভীরে চট্টগ্রামে, ১৯৭৫ সালে। পাশ্চাত্য রক সংগীতের প্রতি তীব্র ভালোবাসা থেকেই কিছু সংগীতপ্রেমী তরুণ একত্রিত হয়ে যে ব্যান্ড করেছিলেন তার নাম ছিল Feelings। প্রতিষ্ঠার পরের বছরগুলোতে ফিলিংসের সঙ্গে যুক্ত হন বহু প্রতিভাবান মিউজিশিয়ান গুলু (এক আদিবাসী রাজার নাতি), মঙ্গু, কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু, র‍্যালিসহ আরও অনেকে। যারা একসময় এই ব্যান্ডের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছেন।  ১৯৮৩ সালে ব্যান্ডে যোগ দেন জেমস ও ফান্টি। সে সময় চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদের নাইটক্লাব ছিল তাদের নিয়মিত পরিবেশনা। তৎকালীন লাইনআপে ছিলেন জেমস (লিড গিটার ও ভোকাল), ফান্টি (ড্রামস), পাবলো (কিবোর্ড) এবং মোহাম্মদ আলী (বেস গিটার)। এই সময় তারা Dire Straits, Deep Purple, Doors, Queen, JJ Cale এর মতো বিখ্যাত পশ্চিমা রক ব্যান্ডের গান কভার পরিবেশনা করতেন। এখান থেকেই শুরু হয় ফিলিংসের সেই পথচলা যা পরবর্তীতে রূপ নেয় এক কিংবদন্তি অধ্যায়ে বাংলাদেশের রক সংগীতের ইতিহাসে। ফিলিংস ব্যান্ডের জেমস ২০০০ সালে ফিলিংস ভেঙ্গে করেন নগর বাউল এবং কিংবদন্তি জেমস পরিচিতি পেতে থাকেন নগর বাউল নামে। ফিলিংস ব্যান্ডটি মুছে গেলে তার প্রতি সে সময়ে ফিলিংস ব্যান্ডের গান মিউজিকের প্রতি আর ব্যান্ড লাইন আপের সেইসব মিউজিশিয়ানদের প্রতি এখন রয়ে গেছে গভীর ভালবাসা। কারন তারাই আমাদের কাছে একং আবেগের অধ্যায়ের অংশ। 

🟢 অ্যালবাম: স্টেশন রোড (১৯৮৭)

ব্যান্ড ফিলিংস তাদের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করে চট্টগ্রাম থেকে ১৯৮৭ সালে স্টেশন রোড নামে। খুব একটা আলোড়ন তুলতে না পারলেও আজও এটি বাংলাদেশের রক সংগীতের অন্যতম মাস্টারপিস হিসেবে বিবেচিত। অ্যালবামের দুটি মৌলিক ইংরেজি গান ছিল। আর ছিল একটি ফোক সংগ্রহ করা।

🎸 অ্যালবামের লাইন-আপ:
ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস (ভোকাল/গিটার) •• আহসান এলাহী ফান্টি (ড্রামস/ভোকাল) •• গুলু (গিটার) •• পাবলো (কি-বোর্ড, ক্ল্যারিওনেট, বাঁশি/ ভোকাল) •• সাইদুল হাসান স্বপন (বেস) •• ফখরুল(?) ।

🎵 ট্র্যাক লিস্ট: 
🟨0️⃣1️⃣ স্টেশন রোড (কথা: জেমস, কণ্ঠ: জেমস)
🟨0️⃣2️⃣ আর নয় যুদ্ধ (কথা: জেমস, কণ্ঠ: জেমস)
🟨0️⃣3️⃣ আগের জনমে (কথা: জেমস, কণ্ঠ: জেমস)
🟨0️⃣4️⃣ আমায় যেতে দাও (কথা: জেমস, কণ্ঠ: জেমস)
🟨0️⃣5️⃣ ঝর্না থেকে নদী (কথা: জেমস, কণ্ঠ: জেমস)
🟨0️⃣6️⃣ দু:খ কেন কর (কথা: শাকিল, কণ্ঠ: ফান্টি)
🟨0️⃣7️⃣ Glass Bit Games (কথা: পাবলো, কণ্ঠ: পাবলো)
🟨0️⃣8️⃣ একদিন ছিল (কথা: মুসা, কণ্ঠ: জেমস)
🟨0️⃣9️⃣ যদি এমন হত (কথা: সালাউদ্দিন সজল, কণ্ঠ: জেমস)
🟨1️⃣0️⃣ সত্যের সুন্দর (কথা: বাবু দেওয়ান, কণ্ঠ: জেমস)
🟨1️⃣1️⃣ Ever Since You (কথা: পাবলো, কণ্ঠ: পাবলো)
🟨1️⃣2️⃣ রূপ সাগরে (কথা: ফোক সংগ্রহ, কন্ঠ: ফান্টি)

🟢 অ্যালবাম: জেল থেকে বলছি (১৯৯৩):

ফিলিংস ব্যান্ড তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম জেল থেকে বলছি প্রকাশ করে সারগামের ব্যানার থেকে ১৯৯৩ সালে। ব্যান্ড লাইন আপেও পরিবর্তন হয়। বেস গিটারিস্ট স্বপন এলআরবিতে যোগ দেওয়ায় তার স্থানে আসে আলম আওরঙ্গেজেব বাবু। কিবোর্ড তানভির। জেল থেকে বলছি অ্যালবামটাই ব্যান্ড ফিলিংসকে নিয়ে আসে শ্রোতাদের কাছাকাছি। সব গুলির গানের কন্ঠ দিয়েছিল জেমস।

🎸 অ্যালবামের লাইন-আপ:
ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস (ভোকাল/গিটার) •• আহসান এলাহী ফান্টি (ড্রামস) •• আলম  আওরঙ্গজেব বাবু (বেস) •• তানভির (কি-বোর্ড)।

🎵 ট্র্যাক লিস্ট: 
🟨0️⃣1️⃣ জেল থেকে বলছি (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)
🟨0️⃣2️⃣ নীল আকাশ (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী/বাবু)
🟨0️⃣3️⃣ ইচ্ছের পলক (কথা: বাপ্পী খান)
🟨0️⃣4️⃣ ভাবনা (কথা: সালাউদ্দিন সজল)
🟨0️⃣5️⃣ জোসি প্রেম (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)
🟨0️⃣6️⃣ আমার ভালবাসা (কথা: সালাউদ্দিন সজল)
🟨0️⃣7️⃣ হৃদয়ের একলা প্রান্তরে (কথা: জেমস)
🟨0️⃣8️⃣ পেশাদার খুনি (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)
🟨0️⃣9️⃣ ঝড়ের রাতে (কথা: বাপ্পী খান)
🟨1️⃣0️⃣ ঢাকার প্রেম (কথা: বাপ্পী খান)
🟨1️⃣1️⃣ তোমাকে খুঁজি (কথা: বাপ্পী খান)
🟨1️⃣2️⃣ প্রাণের শহর (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)

🟢 অ্যালবাম: নগর বাউল (১৯৯৬):

বাংলাদেশের ব্যান্ড ইতিহাসে ফিলিংস ব্যান্ডের নগরবাউল অ্যালবামটা ছিল সাউন্ডটেক অডিও প্রকাশনা ব্যানারে দেশের আলোড়ন তোলা একটি অ্যালবাম।  বিশেষ করে লিরিক্সের দিক থেকে তারপর মিউজিক এবং জেমসের গায়কীতে এক কথায় ৯০ এর প্রজন্মছিল এই অ্যালবামে বুদ হয়ে। মন্নান মিয়ার তিতাস মলম, নাগ নাগীনির খেলা বা যাত্রা ছিল আমাদের স্কুল পড়ুয়াদের কাছে এক একটা উপন্যাস। তারায় তারায় রটিয়ে দিবো আহা ক্লাশিক আর তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও। নগর বাউল টাইটেল গানটা ছিল বেশি ভাললাগার। যান্ত্রিক নগরে এখন মাঝ রাত পেরিয়ে গেছে। কনর্সাটে এই গান গুলিতেই ছিল উন্মাধনার। সব গুলির গানের কন্ঠ দিয়েছিল জেমস।

🎸 অ্যালবামের লাইন-আপ:
ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস (ভোকাল/গিটার) •• আহসান এলাহী ফান্টি (ড্রামস) •• আলম আওরঙ্গজেব বাবু (বেস) •• আসাদুজ্জামান আসাদ (কি-বোর্ড)। 

🎵 ট্র্যাক লিস্ট: 
🟨0️⃣1️⃣ মন্নান মিয়ার তিতাস মলম (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)
🟨0️⃣2️⃣ হারাগাছের নূরজাহান (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨0️⃣3️⃣ তারায় তারায় (কথা: কবি শামসুর রহমানের উত্তর কবিতা অবলম্বনে)
🟨0️⃣4️⃣ নগর বাউল (কথা: রুদ্র পলাশ)
🟨0️⃣5️⃣ হোমায়রার নিশ্বাস (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨0️⃣6️⃣ একটা প্রেম দাও (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨0️⃣7️⃣ নাগ- নাগিনীর খেলা (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨0️⃣8️⃣ কতটা কাঙাল আমি (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)
🟨0️⃣9️⃣ যাত্রা (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨1️⃣0️⃣ জঙ্গলে ভালবাসা (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)
🟨1️⃣1️⃣ নবজীবনের কথা বলছি (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨1️⃣2️⃣ তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)

🟢 অ্যালবাম: লেইস ফিতা লেইস (১৯৯৯):

লেইস ফিতা লেইস ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত অ্যালবামটি হচ্ছে ব্যান্ড ফিলিংসের শেষ অ্যালবাম। তারপর এই ব্যান্ডের লাইন আপ পরিবর্তনে হয়ে নতুন ব্যান্ড রান করেন জেমস। ব্যান্ডের নাম রাখেন নগর বাউল। নগর বাউল এরপর আজকে পর্যন্ত বিশাল সময় আমাদেরিআচ্ছন্ন করে রাখলেও। ৯০ এর সেই লিরিক্স আর ফিলিংস অন্তত আমি পাই নাই। লেইস ফিতা লেইস অ্যালবামটা আমাদের ভাল ভাবেই ফিলিংস ব্যান্ডের প্রতি আকৃস্ট করে রাখতে পেরেছিল। সিনায় সিনায় লাগে টান , লেইস ফিতা লেইস, পথের বাপি বাপরে মন বা বায়োস্কপের খেলা, হাউজি ভালই পাগল  করেছিল স্কুল জীবন শেষ হবার সময়টা। সব গুলির গানের কন্ঠ দিয়েছিল জেমস।

🎸 অ্যালবামের লাইন-আপ:
ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস (ভোকাল/গিটার) •• আহসান এলাহী ফান্টি (ড্রামস) •• আলম আওরঙ্গজেব বাবু (বেস) •• আসাদুজ্জামান আসাদ (কি-বোর্ড)। 

🎵 ট্র্যাক লিস্ট: 
🟨0️⃣1️⃣ পথ (কথা: অসির উদ্দিন মন্ডল ও আনন্দ)
🟨0️⃣2️⃣ লেইস ফিতা লেইস (কথা: আনন্দ)
🟨0️⃣3️⃣ সারথি (কথা: সুমন)
🟨0️⃣4️⃣ দে দৌড় (কথা: মারজুক রাসেল)
🟨0️⃣5️⃣ সিনায় সিনায় (কথা: আনন্দ)
🟨0️⃣6️⃣ বায়োস্কোপের খেলা (কথা: আনন্দ)
🟨0️⃣7️⃣ লাগ ভেলকি লাগ (কথা: সুমন)
🟨0️⃣8️⃣ রাখে আল্লাহ মারে কে (কথা: মারজুক রাসেল/সুমন)
🟨0️⃣9️⃣ হাউজি (কথা: মারজুক রাসেল)
🟨1️⃣0️⃣ খুলে দেখ মনটা (কথা: সুমন)
🟨1️⃣1️⃣ পুবের হাওয়া (কথা: সুভাশ মুখার্জি)
🟨1️⃣2️⃣ দয়াল (কথা: মারজুক রাসেল/আনন্দ)

🟢 অ্যালবাম: স্ক্র-ড্রাইভার ও ক্যাপসুল ৫০০ এমজি (১৯৯৬)

ব্যান্ড এলআরবি আর ফিলিংস কে নিয়ে দুইটি অ্যালবাম প্রকাশ করে সাউন্ডটেক। দুটি ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। যেখানে এলআরবির পাঁচটি এবং ফিলিংসের পাঁচটি করে গান ছিল। দুই অ্যালবাম ব্যবসা সফল এবং জনপ্রিয়তা পায়। এবং এই দুই অ্যালবাম থেকে এলআরবি আর ফিলিংস কালজয়ী কিছু গান উপহার দেয়। ফিলিংসের বিখ্যাত বাংলা লাঠিয়াল গানটি ছিল স্কু-ড্রাইভার অ্যালবামে। এলআরবির হাসতে দেখ, নীল বেদনা ছিল ক্যাপসুল অ্যালবামে। ফিলিংস ব্যান্ডের সব গুলির গানের কন্ঠ দিয়েছিল জেমস।

🎵 ট্র্যাক লিস্ট: স্ক্র-ড্রাইভার (ফিলিংস)
🟨0️⃣1️⃣ বাংলার লাঠিয়াল (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨0️⃣2️⃣ যে পথে পথিক নেই (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨0️⃣3️⃣ মধ্যরাতের ডাকপিয়ন (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)
🟨0️⃣4️⃣ বেদুঈন (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨0️⃣5️⃣ ব্যাবিলন (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)

🎵 ট্র্যাক লিস্ট: ক্যাপসুল ৫০০ এমজি (ফিলিংস)
🟨0️⃣1️⃣ কতটা কষ্টে আছি (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)
🟨0️⃣2️⃣ দূরে আছি তাই (কথা: নুর-ই-আলম)
🟨0️⃣3️⃣ যতটা পথ (কথা: লতিফুল ইসলাম শিবলী)
🟨0️⃣4️⃣ হে পাগলি (কথা: আসাদুল্লাহ দেহলভী)
🟨0️⃣5️⃣ নিষিদ্ধ ইতিহাস (নিয়াজ আহমেদ আংশু)


স্টেশন রোড থেকে লেইস ফিতা লেইস এর পরিণত শিল্পসত্তা পর্যন্ত তাদের যাত্রা কেবল সুরের বিবর্তন একটি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, প্রতিবাদ ও ভালোবাসারও দলিল। জেমস, ফান্টি, আসাদ, বাবু আজও আমাদের নস্টালজিক করে। সময় হয়তো এগিয়ে গেছে নতুন ব্যান্ড ও গান এসেছে কিন্তু ফিলিংসের সৃষ্টি এখনও সাক্ষী হয়ে জ্বলজ্বল করছে ৯০-এর প্রজন্মের কাছে। ফিলিংস ব্যান্ডের সেই নস্টালজিক যাত্রা শেষ হয় যখন জেমস ব্যান্ড ভেঙ্গে নতুন নামে নগর বাউল তৈরি করেন।

--বাউল পানকৌড়ি
যান্ত্রিক নগরের এক ম্যাজিশিয়ানের গল্প: মিলেনিয়াল ও জেন-জি’র হৃদয়ে এক অবিনাশী রকস্টার
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url