আবার ফিরে আসছে নদীর ট্রেন - বাতাসে ভেসে আসবে স্টিমারের হুইসেল ইতিহাস ঐতিহ্য

আবার ফিরে আসছে  নদীর ট্রেন রকেট ইতিহাস ঐতিহ্য - বাতাসে ভেসে আসবে স্টিমারের হুইসেল মানুষ ছুটে যাবে ঘাটে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রকেট স্টিমার আবার নদীপথে ফিরছে। জানুন প্যাডেল স্টিমারের ইতিহাস, রুট, যাত্রীস্মৃতি ও ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের গল্প।

নদী ছিল আমাদের জীবনের মহাসড়ক খুব বেশী দিন আগের কথা নয় । সন্ধ্যার পর হঠাৎ কুয়াশা নেমে এলে দূর থেকে ভেসে আসত স্টিমারের কর্কশ গগনবিদারী হুইসেল মানুষ ছুটে যেত ঘাটে। কেউ অপেক্ষা করত প্রিয়জনের জন্য, কেউবা নামত ঘাটে। সড়ক বা রেলপথ ছিল সীমিত তখন মানুষ নদীপথে চলত। আর সেই যাত্রার এক অনন্য প্রতীক ছিল প্যাডেল স্টিমার। এভাবেই নদীর সাথে প্যাডেল স্টিমার হয়ে উঠেছিল জীবনের অংশ। বাংলাদেশের নৌপরিবহনের ইতিহাস নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এই নদীমাতৃক ভূখণ্ডে মানুষের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যের মূল ভরসা ছিল নৌযান। এক সময় দেশের নদীপথে রাজত্ব করত এক বিশেষ ধরণের জাহাজ যার নাম প্যাডেল স্টিমার। যা শুধু পরিবহনের মাধ্যমই ছিল না ছিল এক ঐতিহ্যের প্রতীক। কালের পরিক্রমায় প্রযুক্তির অগ্রগতি, নদীপথের পরিবর্তন ও মানুষের জীবনযাত্রার বিবর্তনে এই ঐতিহ্য অলস বসে পড়েছিলো। চলে যেতে নিয়েছিলো বাতিলের খাতায়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্যাডেল স্টিমারের নিয়মিত বাণিজ্যিক চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিলো কতৃপক্ষ। আনন্দের হল এ বছর আবার ফিরে আসছে ঐতিহ্য ফিরে আসছে কমলা রকেট।


বাংলাদেশে প্যাডেল স্টিমারের সূচনা উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আমলের সময়ে। । ১৮৮৬ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি India General Navigation and Railway Company (IGNRC) পদ্মা ও মেঘনা নদীতে প্রথম রকেট সার্ভিস নামে যাত্রীবাহী স্টিমার সার্ভিস চালু করে। পরে পাকিস্তান আমলে এই পরিষেবা জাতীয়করণ হয় এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন (BIWTC) এর অধীনে আসে। স্টিমারগুলোর নকশা ছিল ইউরোপীয়। মাঝখানে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন পাশে দুটি বড়  চাকা বা প্যাডেল থাকত বলে এর নাম প্যাডেল স্টিমার। এই প্যাডেলের কারণেই এটি দ্রুতগতি সম্পন্ন নৌযান ছিল।যা পানির ধাক্কায় জাহাজকে এগিয়ে নিয়ে যেত। কাঠের তৈরি আসবাব, প্রশস্ত ডেক, আলাদা ফার্স্ট ও ইকোনমি ক্লাস সব মিলিয়ে রাজকীয় বিলাসবহুল ভ্রমণের প্রতীক এই স্টিমারগুলো। তখনকার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা থেকে খুলনা পর্যন্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। ব্রিটিশরা দক্ষিণ বাংলার বিস্তৃত নদীজালকে ব্যবহার করেই গড়ে তোলে এক সুসংগঠিত জলপথ নেটওয়ার্ক। এই স্টিমারগুলো এত দ্রুতগতিতে চলত যে তুলনামূলক ভাবে ধীর গতির লঞ্চ বা পালতোলা নৌকার সঙ্গে তুলনা করে লোকমুখে এগুলোর নাম হয়ে যায় রকেট। সেই থেকেই রকেট স্টিমার নামটির প্রচলন।


🚢 পিএস মাহসুদ (১৯২৮)- সবচেয়ে দ্রুতগামী ও কার্যকর; ব্রিটিশদের “রকেট অব দ্য ইস্ট”।
🚢 পিএস অস্ট্রিচ (১৯২৯)- স্কটল্যান্ডে নির্মিত; সর্বাধিক টনেজ বহনক্ষম।  
🚢 পিএস লেপচা (১৯৩৮)- ঐতিহাসিক রবীন্দ্রনাথ ও রানি এলিজাবেথের ভ্রমণ যুক্ত।
🚢 পিএস টার্ন (১৯৫০)- পরবর্তী প্রজন্মের ডিজাইন, ডিজেলচালিত সংস্করণে সবচেয়ে টেকসই।

এর মধ্যে পিএস মাহসুদ ও পিএস লেপচা তৈরি হয় কলকাতার গার্ডেন রিচ ডকইয়ার্ডে। পিএস অস্ট্রিচ নির্মিত হয় স্কটল্যান্ডের রিভার ক্লাইডে। পিএস টার্ন আসে পরবর্তীতে ১৯৫০ এর দশকে। শুরুর দিকে প্যাডেল স্টিমারগুলো ছিল কয়লাচালিত। বড় বড় চুল্লিতে কয়লা পোড়ানো হতো আর সেখান থেকে তৈরি হওয়া বাষ্প ইঞ্জিন চালাতো দুটি বিশাল প্যাডেল চাকা। প্রতিটি স্টিমারে ইঞ্জিনিয়ার, ফায়ারম্যান, স্টোকার, স্টুয়ার্ড, বাবুর্চি, নাবিক ও মেকানিকসহ কাজ করতেন প্রায় ৬০ জন কর্মী। ১৯৮০ এর দশকে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে কয়লা ইঞ্জিন বদলে ডিজেল ইঞ্জিন বসানো হয়। এতে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমে গতি বাড়ে এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি যুক্ত হয়। তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দ্রুতগামী লঞ্চ ও ফেরির আগমনে যাত্রীসংখ্যা কমে আসে। ধীরে ধীরে অলাভজনক হয়ে পড়ে ঐতিহ্যবাহী রকেট সার্ভিস। এ কারনেই বন্ধ হয়ে স্টিমারের চাকা। প্যাডেল স্টিমারগুলোর প্রধান রুট ছিল ঢাকা–চাঁদপুর–বরিশাল–ঝালকাঠি–খুলনা–মোরেলগঞ্জ। এই যাত্রায় প্রায় ২৭টি জেলা ও ১৩টি নদী অতিক্রম করতে হতো এবং পুরো সফর শেষ হতে সময় খরচ হত প্রায় ২০ ঘণ্টা। দিনের বেলা জানালা দিয়ে দেখা যেত সবুজ মাঠ, নদীর ঢেউ, জেলে ও নৌকায় ভাসমান মানুষের জীবন। রাতে স্টিমারের আলোয় ঝলমল করত নদীর জল, বাজত হুইসেলের তীক্ষ্ণ শব্দ যা দূরের গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যেত। এই রোমাঞ্চ, এই সঙ্গীত ছিল বাংলাদেশের নদীজীবনের এক অনন্য সৌন্দর্য।


বিশ শতকের প্রথমার্ধে প্যাডেল স্টিমার ছিল দক্ষিণবঙ্গের মানুষের প্রাণ। ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, চাঁদপুর, মাদারীপুর ও পটুয়াখালী রুটে প্রতিদিনই চলত এসব স্টিমার। অনেকে এগুলো নদীর ট্রেন বলতো সময়নিষ্ঠতা ও আরামের কারণে। তাছাড়া দৈর্ঘ্য ছোট ছিলো না প্রতিটি প্রায় ১৯০ ফুট থেকে ২৩৫ ফুট ছিলো লস্বা। গতি ছিলো ৯ থেকে ১০ ন্যাটিক্যাল মাইল। তৎকালীন স্টিমার শুধু যাত্রাপথের বাহনই নয়, বরং সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। বরিশালগামী এই স্টিমারেই একসময় দেশের বিখ্যাত সাহিত্যিক, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা ভ্রমণ করতেন। স্টিমারের ডেকে বসে নদীর বাতাসে কেটে যেত দীর্ঘ সময়। চা-কফির দোকান, গান, গল্পগুজব যেন এক চলমান সমাজ। প্যাডেল স্টিমার শুধু পরিবহনের মাধ্যম ছিল না বরং এটি ছিল নদীর রাজা এক রাজকীয় জাহাজ। কাঠামো, সজ্জা, আরামের ব্যবস্থা, এমনকি রান্নাঘর পর্যন্ত এতটাই মানসম্মত ছিল যে আজকের বিলাসবহুল  শিপের সঙ্গে তুলনা করা যায়। নিচ তলায় ইঞ্জিনরুম মাঝের তলায় সাধারণ যাত্রী আসন আর উপরের তলায় ফার্স্ট ক্লাস কেবিন , পরিপাটি টেবিল, পিতলের বাতি, এবং প্রশস্ত বারান্দা। একসময় ব্রিটিশ অফিসার জমিদার ব্যবসায়ী এমনকি ইউরোপীয় পর্যটকেরাও এই স্টিমারে ভ্রমণ করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দক্ষিণবঙ্গ সফরে রকেট স্টিমারে যাত্রা করেছিলেন। জানা যায় কবি গুরু পিএস লেপচা স্টিমারে বসেই পদ্মা ও মেঘনার মিলনস্থলের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এছাড়া রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মহাত্মা গান্ধী ও প্রাক্তন যুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোও এই স্টিমারে ভ্রমণ করেছেন। যা এই জাহাজগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।


স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে সড়ক ও রেলপথের উন্নয়ন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, এবং ইঞ্জিনচালিত লঞ্চ ও স্পিডবোটের প্রসারের ফলে স্টিমারের যাত্রী ধীরে ধীরে কমে আসে। এক সময় এই স্টিমারগুলোকে চালিয়ে রাখা হয়ে ওঠে অলাভজন। এর সাথে পদ্মা সেতুর কারনে সড়ক পথে গতি বৃদ্ধির কারনে আরো যাত্রী কমে আসে। BIWTC ধীরে ধীরে তাদের সার্ভিস কমাতে শুরু করে। সর্বশেষ কয়েকটি প্যাডেল স্টিমার PS Ostrich, PS Tern, PS Lepcha ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে চাক বন্ধ করতে বধ্য হয়। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী জাহাজগুলো পড়ে আছে ঢাকার বাদামতলী ঘাট, নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড ও কাঞ্চন ব্রিজ এলাকায়, পরিত্যক্ত অবস্থায়। সে সময় ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি নিয়ে অনেক সংগঠন সক্রিয় ছিল। ইতিহাসবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন প্যাডেল স্টিমার শুধু পরিবহন নয়। এটি বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের অংশ। ইতিমধ্যে কিছু নাগরিক সংগঠন ও নৌপ্রেমী দাবির প্রেক্ষিতে অন্তত একটি স্টিমারকে সংস্কার করে ঢাকার নদীপথে ঐতিহ্যবাহী ভ্রমণ বা রিভার ক্রুজ হিসেবে চালু রাখা হচ্ছে। এতে পর্যটন ও ইতিহাস উভয় দিক থেকেই নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। 

নদী, নৌযান ও জাতির স্মৃতি। বাংলাদেশের ইতিহাসে নদী মানে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয় এটি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। প্যাডেল স্টিমার সেই নদী সংস্কৃতির উজ্জ্বল প্রতীক ছিল। নদীপথে কচুরিপানা, কুয়াশা, নৌবাতির আলোয় ভেসে চলা স্টিমারের শব্দ সবই এখন স্মৃতি। যারা এক সময় স্টিমারে ভ্রমণ করেছেন, তাদের কাছে এটি এক আবেগময় স্মৃতির নাম। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজগৎ নদী ছাড়া অসম্পূর্ণ। পদ্মা, মেঘনা, গঙ্গা এই তিন নদী তাঁর চিন্তা ও কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। তিনি জমিদারি তদারকির জন্য যেতেন পদ্মাপারের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে। সেখানে যাওয়ার সবচেয়ে প্রিয় বাহন ছিল স্টিমার। পিএস লেপচা স্টিমারে বহুবার যাত্রা করে নদীর ঢেউ, নৌযানের ছন্দ আর আকাশের আলো-ছায়ার মেলবন্ধনে জন্ম নেয় নতুন কবিতার ভাবনা। ১৯২০ এর দশকে ভারত ভ্রমণের সময় মহাত্মা গান্ধী কলকাতা থেকে খুলনা পর্যন্ত নদীপথে যাত্রা করেন প্যাডেল স্টিমারে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কায়দে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গীয় প্রদেশের গ্রামাঞ্চলে স্বাধীনতা আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। গান্ধীজি নদীর ঘাটে ঘাটে থেমে গ্রামীণ জনতার সঙ্গে দেখা করতেন। স্টিমারের উপরের ডেকে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, এই নদী যেমন আপন গতিতে চলে, তেমনি ভারতও একদিন আপন শক্তিতে চলবে, কোনো শাসকের অনুমতি ছাড়াই। গান্ধীর সেই সফর ইতিহাসে “River Mission Journey” নামে পরিচিত। তাঁর এই যাত্রাই প্রথমবারের মতো দেখায় কীভাবে নদীপথ হতে পারে এক সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রকৃত অর্থে নদীর মানুষ। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার সন্তান হিসেবে নদী তাঁর জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। রাজনীতির শুরু থেকেই তিনি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল সফরে ব্যবহার করতেন প্যাডেল স্টিমার। ঢাকা থেকে বরিশাল বা খুলনা সফরে তিনি প্রায়ই পিএস মাহসুদ বা পিএস লেপচা স্টিমারে যেতেন। ক্যাপ্টেনদের সঙ্গে গল্প করতেন, যাত্রীদের খোঁজ নিতেন, আর রাতে ডেকে দাঁড়িয়ে নদীর হাওয়া খেতেন এমন দৃশ্য অনেক পুরনো নাবিক আজও মনে রেখেছেন। ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতার পরও তিনি একবার পিএস মাহসুদে চড়ে খুলনা সফরে গিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নদীপথে দেশের পুনর্গঠনের অবস্থা দেখা। বঙ্গবন্ধু সেদিন বলে বলেছিলেন, “এই নদী আমার দেশের শিরা উপশিরা, নদাীকে বাঁচাতে পারলেই দেশ বাঁচবে।” বরিশালের সন্তান জীবনানন্দ দাশ ছিলেন নদীর কবি। শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন কীর্তনখোলার বুক চিরে চলা স্টিমার দূরের হুইসেল আর নৌঘাটের ভিড়। কলকাতায় পড়তে যাওয়ার সময় তিনিও চড়েছেন সেই রকেট স্টিমারে। এই নদীযাত্রার অভিজ্ঞতাই তাঁর কবিতায় রূপ নিয়েছে অদ্ভুত এক সময়চেতনা ও নিঃসঙ্গতার প্রতীকে। যদিও তিনি সরাসরি “স্টিমার” শব্দটি খুব বেশি ব্যবহার করেননি, তবুও তাঁর কবিতার প্রতিটি নদী কুয়াশা কিংবা সাঁঝবেলার আলো আমাদের শুনিয়ে দেয় সেই দূরের হুইসেলধ্বনি। নদীর পারে বসে আছি সময় বয়ে যায়, দূরে এক স্টিমার হুইসেল বাজিয়ে চলে যায়। কবি জীবনানন্দ দাশ যখন ১৯৫৪ সালে মারা যান (কলকাতায় ট্রামে দুর্ঘটনায়), তখন তাঁর মরদেহ বরিশালে আনা হয় নদীপথে সেই পথেই, যেদিন তিনি বহুবার স্টিমারে পাড়ি দিয়েছিলেন। 


রকেট স্টিমারের চাকার শব্দে নদী যেন গান গাইত। এক সময় দক্ষিণবঙ্গের মানুষ বলত স্টিমার ছাড়া বরিশাল যাওয়া মানেই অসম্পূর্ণ যাত্রা। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমার শুধু পরিবহনের একটি অধ্যায় নয়G এটি নদীমাতৃক বাংলা প্রতীক এবং সময়ের সাক্ষী। এখন প্রয়োজন সরকারের উদ্যোগে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে, কীভাবে একসময় নদীপথই ছিল জীবনের প্রাণ। সবচেয়ে থেকে বড় বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের চারটি জীবিত প্যাডেল স্টিমার পৃথিবীর ইতিহাসে এতিহ্যের অংশ। ভারতের PS Bhopal ও Bengal Paddle এবং স্কটল্যান্ডের The Waverley এর মতো এটিও “Heritage Cruise” বা “River Museum” হিসেবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে যেমন দেশের ইতিহাস রক্ষা পাবে, তেমনি রিভার ট্যুরিজম সেক্টরেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে। চাই শুধু কতৃপক্ষের সদিচ্ছা। এবং হয়তো  এই সদিচ্ছায় আবার চাল হচ্ছে রকেট সার্ভিস। এই লক্ষ্যে পিএস মাহসুদ সংস্কার করা হয়েছে। ঢাকা-বরিশাল রুটে সপ্তাহে দুই দিন চলবে জানা গেল পত্রিকায়। 


আজকের প্রজন্ম হয়তো কেবল গল্পেই শুনে যে স্টিমারের আওয়াজে কাঁপত নদীর বাতাস। যে রাতে ঘাটে ঘাটে জ্বলে উঠত লণ্ঠনের আলো। আর দূরে নদীর বুক জুড়ে ভেসে আসত সোনালি রেখা। তবুও, স্টিমার আজও বেঁচে আছে আমাদের ভাষায়, গল্পে, আর জীবনানন্দের কাব্যে।

এ যেন এক চলমান সময়ের প্রতীক
যে সময় নদীর মতোই চলে যায়
তবু ফিরে আসে স্মৃতির ঢেউ হয়ে

নিচে কিছু নির্বাচন করা ফটো গ্যালারি দেওয়া হলো । প্রতিটি ছবিতে প্যাডেল স্টিমার “রকেট স্টিমার” বৈশিষ্ট্যগুলো ধরা পড়েছে। ছবিগুলোতে স্টিমারের প্যাডেল চাকা, স্ট্রাকচার এবং নৌরূপ ফুটে উঠেছে কিছু ছবিতে স্টিমারের সাইড ভিউ ও সামনে থেকে দৃশ্য পাওয়া যাচ্ছে  রঙ ও গঠন। 

(১)
(২)
(৩)
(৪)
(৫)
(৬)
(৭)
(৮)
(৯)
(১০)
(১১)
(১২)
(১৩)
(১৪)
(১৫)
(১৬)
(১৭)
(১৮)
(১৯)
(২০)
(২১)
(২২)
(২৩)
(২৪)
(২৫)
(২৬)
(২৭)
(২৮)
(২৯)
(৩০)
(৩১)
(৩২)
(৩৩)
(৩৪)
(৩৫)
(৩৬)


--- বাউল পানকৌড়ি
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজরিত বাংলাদেশ-- পতিসর কুঠিবাড়ী --Click to Read

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url