বাউল আবদুল করিম শাহ ফকির: লালন গানের আদি সুরের কিংবদন্তি ও তাঁর মরমী পরিবেশনা
বাংলা লোকসংগীতের বিশাল আকাশে যে ক’জন নক্ষত্র লালন সাঁইয়ের নিগূঢ় দর্শনকে তাঁদের কণ্ঠের মাধুর্যে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম বাউল আবদুল করিম শাহ ফকির। তিনি ছিলেন লালন দর্শনের একনিষ্ঠ সাধক এবং লালন-গীতির আদি ও অকৃত্রিম সুরের বাহক। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর এই কালজয়ী বাউল আধ্যাত্মিক সাধনার উত্তরসূরি হিসেবে নিজের পিতার কাছ থেকেই লাভ করেছিলেন সংগীতের প্রাথমিক দীক্ষা। বাণিজ্যিক চাকচিক্যের বিপরীতে গিয়ে তিনি লালনের গানের আদি ভাব ও বিশুদ্ধ সুরধারাকে যে মরমী দরদে তুলে ধরেছেন তা বাংলা লোকসংগীতকে করেছে ঋদ্ধ ও মহিমান্বিত। ২০১১ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই কিংবদন্তি শিল্পীর স্মরণে আজকের লেখা।
আবদুল করিম শাহ ফকির একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রথম বাউল শিল্পী। ২০১১ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত হন। জন্ম: ১০ জুলাই ১৯২৯ - মৃত্যু: ১০ জুন ২০১৪। খুব ছেলেবেলাতেই লালন সাঁইয়ের গানে শিক্ষা লাভ করতে থাকেন নিজ পিতা ঝুমুর আলী জোয়ার্দার এর কাছে। বাউল আবদুল করিম শাহ ফকির তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে লালনের গানের আদি ও মূল সুরকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন । লালনের গানের মূল সুর ও ভাবকে ধারণ করে তিনি নিজেই একজন বরেণ্য বাউল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এই আদি সুরে লালনের গান গাওয়ার প্রচেষ্টা বাংলা লোকসংগীতকে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর এই বিশেষ পরিবেশনা ও গানের ধারাই তাকে কিংবদন্তি শিল্পীর আসনে বসিয়েছে।আবদুল করিম শাহ ফকিরের সংগীত জীবনের শেকড় ছিল তাঁর পরিবারেই। ১৯২৯ সালের ১০ জুলাই কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে জন্ম নেওয়া এই মহান শিল্পী অতি অল্প বয়সেই লালন সাঁইয়ের গানের জগতে প্রবেশ করেন। তাঁর পিতা ঝুমুর আলী জোয়ার্দার ছিলেন একজন উচ্চপর্যায়ের সাধক। পিতার কাছেই তিনি কেবল সুর নয়, লালন দর্শনের গূঢ় তত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক দীক্ষা লাভ করেন। পরিবারের এই সংগীতময় পরিবেশই তাঁকে পরবর্তী জীবনে একজন মরমী সাধক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
বর্তমানে লালনের গান যখন বিভিন্ন আধুনিক বাদ্যযন্ত্র আর ফিউশনের আড়ালে তাঁর মৌলিকত্ব হারাতে বসেছে, ঠিক তখন আবদুল করিম শাহ ফকির ছিলেন এক ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর। তিনি লালনের গানের আদি ও মূল সুরকে কোনো রকম বিকৃতি ছাড়াই মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার শপথ নিয়েছিলেন। তাঁর গায়কিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না । ছিল মাটির সোঁদা গন্ধ আর আত্মার এক গভীর হাহাকার। তিনি বিশ্বাস করতেন, লালন সাঁইয়ের গান কেবল শোনার বিষয় নয়, এটি অনুভবের বিষয়। তাঁর এই অনড় অবস্থানের কারণে গবেষক ও সংগীতানুরাগীদের কাছে তিনি লালন-গীতির এক নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হয়ে উঠেছেন। আবদুল করিম শাহ ফকিরের দীর্ঘ সংগীত সাধনা কেবল ছেঁউড়িয়া বা কুমারখালীর সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি তাঁর সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ করেছেন সারা বাংলার মানুষকে। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের একজন নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তিনি লোকসংগীতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শিল্পকলায় তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে তিনি প্রথম বাউল শিল্পী হিসেবে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'একুশে পদক'-এ ভূষিত হন। এই পদক কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না, বরং তা ছিল বাংলার বাউল ঐতিহ্যের এক পরম স্বীকৃতি।
১.পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
অমৃত লালন বানী
কন্ঠ- আবদুল করিম শাহ ফকির
দেখ দেখ মনরায় হয়েছে উদয়
কী আনন্দময় এই সাধবাজারে
পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
যথা রে সাধুর বাজার
তথা সাঁইর বারাম নিরন্তর
হেন পদে যার, নিষ্ঠা না হয় আর
না জানি কপালে কী আছে রে
পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
এই পাপীর ভাগ্যে এমন।।
পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে | আব্দুল করিম শাহ ফকির (একুশে পদকপ্রাপ্ত)
২. জিন্দা দেহে মরার বসন
অমৃত লালন বানী
কন্ঠ- আবদুল করিম শাহ ফকির
কে তোমারে এ বেশ ভূষণ
পরাইলো বলো শুনি।
জিন্দা দেহে মরার বসন
খিলকা তাজ আর ডোর কোপিনী।।
জিন্দা মরার পোশাক পরা
আপন ছুরত আপনি সারা।
কে তোমারে এ বেশ ভূষণ পরাইলো বলো শুনি | ফকির আব্দুল করিম শাহ
৩. মধুর দেল দরিয়ায় ডুবে করো ফিকিরি
অমৃত লালন বানী
কন্ঠ- আবদুল করিম শাহ ফকির
মধুর দেল দরিয়ায় ডুবে করো ফকিরি
ছাড় ফিকিরি করো ফকিরি হলো দিন আখেরি।।
খোদার তখত বান্দার দেল যথায়
কোরানে বলেছে আপে খোদ খোদায়
আজাজিলের পর হলো খাতা
না বুঝে দেল গভীরি।।
মধুর দেল দরিয়ায় ডুবে করো ফকিরি | আবদুল করিম শাহ ফকির
৪. রঙ মহলে রঙের মানুষ আ মরি মরি
অমৃত লালন বানী
কন্ঠ- আবদুল করিম শাহ ফকির
রঙ মহলে রঙের মানুষ আ মরি মরি
রঙ সুলতান রঙের ঘরে
আঘলা সাজ মহলের পরেে
আছে নিজ বাড়ি তোর আলীপুরে
সেথা প্রাণ থাকতে কি যেতে পারবি।
রঙ মহলে রঙের মানুষ আ মরি মরি
রঙ মহলে রঙের মানুষ।
রঙ মহলে রঙের মানুষ | আবদুল করিম শাহ ফকির
আবদুল করিম শাহ ফকির লালনের গানকে কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ করেননি, বরং তিনি লালন সাঁইয়ের সেই আদি সুর ও ভাবকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই করেছেন আজীবন। তাঁর গায়কিতে যে মাটির ঘ্রাণ আর আত্মার টান অনুভূত হয়, তা আজও বিরল। বর্তমান সময়ের আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ভিড়ে তাঁর গাওয়া 'পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে'র মতো গানগুলো আমাদের ভেতরের আধ্যাত্মিক সত্তাকে জাগ্রত করে। এই মহান সাধকের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর দেখানো পথে লালনের বিশুদ্ধ সুর টিকে থাকুক প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
-- বাউল পানকৌড়ি
