লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, মানবতা ও ভক্তির প্রকাশ–সংগৃহীত গান ও গানের কথা : পর্ব-২
লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, মানবতা ও ভক্তির প্রকাশ– সংগৃহীত গান ও গানের কথা : পর্ব-২
মানুষের মধ্যে লুকানো আছে অসীম সত্য সেই সত্যকে উপলব্ধি করাই বাউল সাধকদের সাধনা। সত্যের পথ বাহিরে নয় অন্তরে। সহজ মানুষ ভজে দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে অথবা সদা মন থাকো বা হুঁশ ধর মানুষরূপ নিহারে। মানুষরূপে যে স্রষ্টা প্রকাশমান তাকে চিনলেই মুক্তি। বাউল দর্শন বাহ্যিক আচার নয় অন্তরের সরলতা ও প্রেমই সত্য ধর্ম। সে রূপ দেখবি যদি নিরবধি সরল হয়ে থাক এখানে আছে চাতকের সহজ উপদেশ। এইভাবেই বাউল গান মানুষের ভিতরের আলো জ্বালায়। শেখায় নিজেকে চেনার শেষে যখন প্রশ্ন আসে।
লালন গান শুধু সঙ্গীত নয়, এটি জীবনের দর্শন, মানবতা, ভক্তি এবং মুক্তচিন্তার এক অমোঘ পাঠ। এই ধারাবাহিক পর্ব যেখানে থাকছে লালন সাধকদের কণ্ঠে শুদ্ধভাবে পরিবেশিত ১০টি অমৃত লালন বানী এবং তার সাথে গানের কথা।
👉 পর্ব-২ (১১ থেকে ২০)
1️⃣2️⃣ সদা মন থাকো বা হুঁশ ধর মানুষরূপ নিহারে
1️⃣3️⃣ সোনার মান গেলো রে ভাই ব্যাঙ্গা এক পিতলের কাছে
1️⃣4️⃣ সমুদ্রের কিনারায় থেকে জল বিনে চাতকী ম’লো
1️⃣5️⃣ সে প্রেমের বাড়ি কোথায় বলো বিহারী
1️⃣6️⃣ সদাই বলরে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
1️⃣7️⃣ সবে বলে লালন হিন্দু কি যবন
1️⃣8️⃣ সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
1️⃣9️⃣ সে কি আমার কবার কথা | আপন বেগে আপনি মরি
2️⃣0️⃣ সে রূপ দেখবি যদি নিরবধি সরল হয়ে থাক
(১১)
অমৃত লালন বানী
সহজ মানুষ ভজে দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে
শাহজাহান মুন্সি
পাবিরে অমূল্য নিধি বর্তমানে
সহজ মানুষ ভজে দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে।
ভজ মানুষেরেই চরন দু’টি
নিত্য বস্তু হবে খাঁটি
মরলে সব হব মাটি
ত্বরায় এই ভেদ লও জেনে।
শুনি মরলে পাবো বেহেস্তখানা
আসলে তো মন মানে না
বাকির লোভে নগদ পাওনা
কে ছাড়ে ভুবনে।
আসসালাতুল মেরাজুল মোমেনিনা
জানতে হয় নামাজের বেনা
বিশ্বাসীদের দেখা শোনা
লালন কয় এই ভুবনে।।
(১২)
অমৃত লালন বানী
সদা মন থাকো বা হুঁশ ধর মানুষরূপ নিহারে
মনসুর ফকির সাঁই
সদা মন থাকো বা হুঁশ
ধর মানুষ রূপ নিহারে
আয়না আঁটা রূপের ছটা
চিলেকোঠায় ঝলক মারে।
স্বরূপ রূপে রূপকে জানা
সেই বটে উপাসনা
গাঁজায় দম চড়ায়ে মনা
বোম কালী আর বলিও নারে।
বর্তমানে দেখো ধরি
নর দেহে অটলবিহারী
মরো কেন হড়ি বুড়ি
কাঠের মালা টিপে হারে।
দেল ঢুঁড়ি দরবেশ যারা
রূপ নিহারে সিদ্ধ তারা
লালন কয় আমার খেলা
ডান্ডাগুলি সার হলো রে।।
(১৩)
অমৃত লালন বানী
সোনার মান গেলো রে ভাই ব্যাঙ্গা এক পিতলের কাছে
অরূপ রাহী সাঁই
শাল ফটকের কপালের ফের
কুষ্টার বানাত দেশ জুড়েছে
সোনার মান গেল রে ভাই
বেঙ্গা এক পিতলের কাছে।
বাজিল কলির আরতি
প্যাঁচ প’লো ভাই মানীর প্রতি
ময়ূরেরও নৃত্য দেখি
পেঁচায় পেখম ধরতে বসে ৷
শাল গ্রামকে করে নোড়া
ভূতের ঘরে ঘন্টা নাড়া
কলির তো এমনি দাঁড়া
স্থুল কাজে সব ভুল পড়েছে ৷
সবাই কিনে পিতলদানা
জহরের মূল্য হল না
লালন কয় গেল জানা
চটকে জগৎ মেতেছে ৷
(১৪)
অমৃত লালন বানী
সমুদ্রের কিনারায় থেকে জল বিনে চাতকী ম’লো
মামুন নদীয়া
সমুদ্রের কিনারায় থেকে জল বিনে চাতকী ম’লো
হায়রে বিধি ওরে বিধি তোর মনে কি ইহাই ছিলো।
নবঘন বিনে বারি খায় না চাতক অন্য বারি
চাতকের প্রতিজ্ঞা ভারি যায় যাবে প্রাণ সেও ভালো।
চাতক থাকে মেঘের আশে মেঘ বরিষণ অন্য দেশে
বলো চাতক বাঁচে কিসে ওষ্ঠাগত প্রাণ আকুল।
লালন ফকির বলে রে মন হলো না মোর ভজন সাধন
ভুলে সিরাজ সাঁইজীর চরণ মানব জনম বৃথা গেল ।
(১৫)
অমৃত লালন বানী
সে প্রেমের বাড়ি কোথায় বলো বিহারী
বজলু শাহ ফকির
সে প্রেমের বাড়ি কোথায় বলো বিহারী
প্রেম প্রেম বলে করি কোর্ট কাচারি
প্রেমের উৎপত্তি কি সে
শুণ্য কি ভাণ্ড মাঝে
কোন প্রেমে ফেরে সে অহর্নিশি।
কোন প্রেমে মাতা পিতা
খণ্ড করে জীবন আত্মা
না জেনে সেই প্রেমের কথা
গোলমাল করি।
কোন প্রেমে মা কালি
পদ তলে মহেশ্বর বলি
লালন বলে ধন্য দেবি
জয় জয় হরি।
(১৬)
অমৃত লালন বানী
সদাই বলরে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
বাউল পাগলা বাবুল সাঁই
সদাই বলরে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
আইন ভেজিলেন রাসুলুল্লাহ।
লা ইলাহা নফি যে হয়
ইল্লালাহ সেই দ্বীন দয়াময়
নফি এজবাত ইহারে কয়
এই তো এবাদতুল্লাহ।
নামের সহিত রূপ
ধিয়ানে রাখিয়া জপো
বে-নিশানায় যদি ডাকো
চিনবি কি রূপ কে সে আল্লাহ।
লা শরিক জানিয়া যারে
জপ কালাম দেলে মুখে
মুক্তি পাবি থাকবি সুখে
দেখবি রে নূর তাজেল্লা।
বলেছেন সাঁই আল্লাহ নূরি
এই জেকেরের দরজা ভারি
দরবেশ সিরাজ সাঁই তাই কয় ফুকারি
শোন রে লালন বে-লিল্লাহ।।
(১৭)
অমৃত লালন বানী
সবে বলে লালন হিন্দু কি যবন
মনুসর ফকির
সবে বলে লালন হিন্দু কি যবন
ফকির লালন বলে
আমি আমার
না জানি সন্ধানী।
একই ঘাটে আসা যাওয়া
একই পাটনী দিচ্ছে খেওয়া
ভবে কেউ খায় না কাউরি ছোঁয়া
ভিন্ন জল কোথায় পাই।
বিবিদের নাই মুসলমানী
পৈতা নাই যার সেও তো বামনী
দেখো রে ভাই দিব্যজ্ঞানে
লালন তেমনি জাত একখান।
(১৮)
অমৃত লালন বানী
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
লালন বলে জাতের কি রূপ
দেখলাম না দুই নজরে
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
সুন্নত দিলে হয় মুসলমান
নারীর তবে কি হয় বিধান
বামন চিনি পৈতায় প্রমাণ
বামনী চিনি কিসে রে।
কেউ মালায় কেউ তসবি গলে
তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে
আসা কিংবা যাওয়া কালে
জাতের চিহ্ন রয় কারে।
জগৎ জুড়ে জেতের কথা,
গৌরব করে যথা তথা
লালন সে জেতের ফাতা
ঘুচিয়াছে সাধ বাজারে।।
(১৯)
অমৃত লালন বানী
সে কি আমার কবার কথা আপন বেগে আপনি মরি
আপন বেগে আপনি মরি
আর গৌর এসে হৃদে বসে
করলো আমার মনচুরি।
কিবা গৌর রূপ লম্পটে
আমার ধৈর্যের ডুরি দেয় গো কেটে
লজ্জা ভয় সব যায় গো ছুটে
যখন ঐ রূপ স্মরন করি।
ঘুমের ঘোরে দেখলাম যারে
আমি চেতন হয়ে পাইনে তারে
লুকাইলে কোন শহরে
নব রসের রাসবিহারী।
আর মেঘে যেমন চাতকেরে
দেখা দিয়ে ফাঁকি মারে
লালন কয় তাই আজ আমারে
করলে গৌর বরাবরিই।
(২০)
অমৃত লালন বানী
সে রূপ দেখবি যদি নিরবধি সরল হয়ে থাক
কন্ঠ- শহিদুল বাউল
আয় না চলে ঘোমটা ফেলে নয়ন ভরে দেখ।
সরল ভাবে যে তাকাবে অমনি সে রূপ দেখতে পাবে
রূপেতে রূপ মিশে যাবে ঢাকনি দিয়ে ঢাক।
চাতক পাখির এমনি ধারা অন্য বারি খায় না তারা
প্রান থাকিতে জ্যান্তে মরা ঐ রূপ ডালে বসে ডাক।
ডাকতে ডাকতে রাগ ধরিবে হৃৎকমল বিকশিত হবে
লালন বলে সেই কমলে হবে মধুর চাক।
Read on mobile