অরূপ রাহী: আধুনিক নাগরিকতায় লালন শাহের ভাব ও সহজিয়া দর্শনের এক অনন্য সাধক

 লালনের ভাব ও আধুনিক লালন চর্চার ধারক: অরূপ রাহীর লালন গান: 

অরূপ রাহী একজন সহজিয়া-বস্তবাদী কবি প্রাবন্ধিক ও সঙ্গীতশিল্পী। পেশাগতভাবে তিনি দশ বছর সাংবাদিকতা করেছেন। পরে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছেন লেখালিখি, গবেষণা ও সঙ্গীতে। তিনি বাংলা লোকসংগীতের ধারার উপর গভীর গবেষণা করেছেন এবং তাদের গান পরিবেশনা করেছেন। তিনি রক সাঁইজি নামেও পরিচিত। তাঁর গানের দল লীলা। লীলার প্রথম একক অ্যালবাম নায়ক প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তিনি স্থাপন করেছেন একটি স্বেচ্ছাসেবী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র। যেখানে বাংলা লোকসাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চার গবেষণা করা হয়। অরূপ রাহীর সঙ্গীতে ফকির লালন সাঁই-এর ভাব ও অনুশীলনকে আধুনিক পরিমণ্ডলে ধরা হয়। তার লালন চর্চা শ্রোতাদের কাছে নান্দনিক ও আত্মিক প্রকাশ অনুপ্রেরণার উৎস । অরূপ রাহী নামের এই অপরূপ কবি লেখক ও সংগীতশিল্পীর  জন্ম ১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই।

আধুনিক লালন সাধক ও সংগীতশিল্পী অরূপ রাহীর গান

অরূপ রাহীর লালন গানে ফকির লালন সাঁই-এর ভাব ও দর্শন আধুনিক পরিমণ্ডলে ফুটে ওঠে। আজকের থাকছে অরূপ রাহীর কিছু নির্বাচিত লালন গান।

(১) অমৃত লালন বানী
বিনা কা‌র্যে ধন উপার্জন কে ক‌রি‌তে পা‌রে
অরূপ রাহী

বিনা কার্যে ধন উপার্জন কে করিতে পারে
প্রেমের প্রেমিক না হলে
গুরু গত না হলে
সে ধন পায় না রে। 
একই ইস্কুলে দশজনা পড়ে
গুরুমনের এই বাসনা
 সব সমান করে
কেউ পিছে এসে আগে গেল
পরীক্ষায় চিনা যায় তারে।
বাংলা কিতাব কতই জনে পড়ে
আরবি ফারসি নাগরি বুলি 
কে বুঝতে পারে
আবার শিখবি যদি নাগরি বুলি
বাংলা নেওগে পাশ করে।
বিষম্বরে বিষ পান করে
তাড়কায় করে বিছা হজম
কাকে কি পারে
ফকির লালন বলে রসিক হলে
বিষ খেয়ে হজম করে।। 


(২) অমৃত লালন বানী
মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে
অরূপ রাহী

সেকি অন্য তত্ত্ব মানে
মানুষতত্ত্ব সত্য হয় যার মনে।
মাটির ঢিবি কাঠের ছবি
ভূত ভবিষ্যৎ দেবাদেবী
ভোলে না সে এসব রূপী
মানুষ ভজে দিব্যজ্ঞানে।
জোরোই সরোই লুলা ঝোলা
পেঁচাপেঁচী িএলোভোলা
তাতে নয় সে ভোলনেওয়ালা
মানুষ রতন যে জন  চেনে।
ফেয়োফেপি ফ্যাকসা যারা
ভাকা ভোকায় ভোলে তারা
লালন তেমনি চটামারা
ঠিক দাঁড়ায় না একখানে।।


(৩) অমৃত লালন বানী
মন জানে আর জানে মরম
অরূপ রাহী

মনের কথা বলবো কারে
মন জানে আর জানে মরম
মজেছি মন দিয়ে যারে
মনের কথা বলবো কারে।
মনেরও তিনটি বাসনা
নদীয়ায় করবো সাধনা
নইলে মনের বিয়োগ যায় না
তাইতে ছিদাম এই হাল মনে। 
কটিতে কোপিন পরিবো
করেতে করঙ্গ নিবো
মনের মানুষ মনে রাখবো
কর যোগে মনের সিদ্ধি।
যে দায়ের দায় আমার এ মন
রসিক বিনে বুঝবে কোন জন
গৌড় হয়ে নন্দের নন্দন
লালন কয় বিনয় করে।।


(৪) অমৃত লালন বানী
সোনার মান গেলো রে ভাই ব্যাঙ্গা এক পিতলের কাছে
অরূপ রাহী

শাল ফটকের কপালের ফের
কুষ্টার বানাত দেশ জুড়েছে
সোনার মান গেল রে ভাই
বেঙ্গা এক পিতলের কাছে।
বাজিল কলির আরতি
প্যাঁচ প’লো ভাই মানীর প্রতি
ময়ূরেরও নৃত্য দেখি
পেঁচায় পেখম ধরতে বসে ৷
শাল গ্রামকে করে নোড়া
ভূতের ঘরে ঘন্টা নাড়া
কলির তো এমনি দাঁড়া
স্থুল কাজে সব ভুল পড়েছে ৷
সবাই কিনে পিতলদানা
জহরের মূল্য হল না
লালন কয় গেল জানা
চটকে জগৎ মেতেছে ৷


(৫) অমৃত লালন বানী
দিল দরিয়ার মা‌ঝে দেখলাম আজব কারখানা
অরূপ রাহী

দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা
ডুবলে পরে রতন পাবে
সেথায় ডুবলে পরে রতম পাবে
ভাসলে পরে পাবে না
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা।
দেহের মধ্যে বাড়ি আছে
সেই বাড়ীতে চোর লেগেছে
ছয় জনাতে সিঁদ কাটিছে
চুরি করে একজনা
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা।
এই দেহের মধ্যে নদী আছে
সেই নদীতে নৌকা চলছে
ছয় জনাতে গুণ টানিছে
হাল ধরেছে একজনা
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা।
এই দেহের মধ্যে বাগান আছে
সেই বাগানে কত রকমের ফুল ফুটেছে
ফুলের সৌরভে জগৎ মেতেছে
লালনের মন মাতলো না
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা।


(৬) অমৃত লালন বানী
‌প্রেম জা‌নো না প্রেমের হা‌টের বোল বোলা
অরূপ রাহী

কথায় করো ব্রহ্ম-আলাপ
মনে মনে খাও মন কলা
প্রেম জানো না
প্রেমের হাটে বোল-বোলা।
বেশ করে হয় বোস্টমগিরি
রস নাহি তার যষ্টি ভারি
হরি নামের ঢুঢু তারি
তিন গাছি জপের মালা।
খাঁদা-বাঁধা ভূত চালানি
সেই যে বটে গণ্য জানি
সাধুর হাটে ঘুসঘুসানি
কি বলিতে কি বলা।
মন মাতওয়াল মদন-রসে
সদাই থাকে সেই আবেশে
লালন বলে সকল মিছে
লব-লবানে প্রেম উত্তালা। 



অরূপ রাহী প্রকাশিত কিছু বইয়ের তালিকা দিয়ে শেষ করি-
১. খনার বিজ্ঞান
২. রূপপুর 
৩. প্রেমের হাট 
৪. অকৈতবের গান
৫. লুঙ্গি কাহিনি। 

গানের অ্যালবাম-লালন ফকিরের গান রবে না এ ধন জীবন যৌবন, নায়ক ও লোকায়ত।

লীলা ব্যান্ডের অ্যালবাম ‘নায়ক’ ও লালন গীতি

অরূপ রাহী আমাদের দেখিয়েছেন যে লালন কেবল কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াতেই সীমাবদ্ধ নন, বরং লালন বাস করেন ঢাকার ব্যস্ত রাজপথে কিংবা নাগরিক পড়ার ঘরেও। তাঁর ‘দিল দরিয়ার মাঝে আজব কারখানা’ কিংবা ‘সোনার মান গেলো রে ভাই’—প্রতিটি গানেই তিনি প্রাচীন আধ্যাত্মিকতাকে আধুনিক সমাজ-বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছেন। একজন সাংবাদিক থেকে পূর্ণকালীন গবেষক ও শিল্পী হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রায় অরূপ রাহী আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের এক অতন্দ্র প্রহরী। তাঁর কণ্ঠের মাধ্যমে লালন শাহের গান আজও তরুণদের মনে বিদ্রোহ ও প্রেমের আগুন জ্বালায়। ‘বাউল পানকৌড়ি’র এই শ্রদ্ধাঞ্জলি সেই ‘অপরূপ’ শিল্পীর প্রতি, যিনি সুরের একতারাকে আধুনিক গিটারের সাথে মিলিয়ে মানবধর্মের জয়গান গাইছেন।

হাফিজুর রহমান বাবুল থেকে লালন সাধক বাউল পাগলা বাবুল সাঁই: এক যোদ্ধার জীবনগাথা
আব্দুল লতিফ শাহ ফকির : লালন দর্শনের এক নিভৃতচারী পথিকৃৎ



Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url