বাউল সাধক খোদা বক্স সাঁই - দেবতা হারিয়ে পূজারী কাঁদবি কতদিন
বাউল সাধক খোদা বক্স সাঁই - দেবতা হারিয়ে পূজারী কাঁদবি কতদিন
এক হাতে একতারা অন্য হাতে ডুগডুগি মুখে অমৃত বাণী আজও প্রতিধ্বনিত হয় খোদা বক্স সাঁইয়ের সুর। লালনের জীবনদর্শন, প্রেম, মানবতা ও অন্তর্দৃষ্টি যেন তাঁর কণ্ঠে নতুনভাবে জন্ম হয়েছিল। তিনি শুধু একজন বাউল নন তিনি ছিলেন এক অনন্ত অনুসন্ধানী সাধক। খোদা বক্স সাঁইয়ের সংগীত জীবনের সূচনা হয় অল্প বয়সেই। ছোটবেলা থেকেই লালনের গান, দেহতত্ত্ব আর মানবধর্মের কথা অন্তরে লালন করা শুরু করেছিলেন। গ্রামের আখড়াবাড়ির সাধু সান্নিধ্যে নিয়মিত যাতায়াত ছিল । সেই সময় থেকেই তিনি শিখে নিয়েছিলেন বাউলগানের মৌলিক তত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, আর মানবধর্মের বার্তা। পরে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও সাধনা মিলিয়ে তিনি গড়ে তোলেন এক অনন্য সংগীতধারা। যেখানে লালনের তত্ত্ব ও আধুনিক ভাবপ্রকাশ একসঙ্গে মিলেছে। তাঁর কণ্ঠ ছিল গভীর ও আবেগপূর্ণ। সাধারণ শ্রোতাও তাঁর গান শুনে উপলব্ধি করতে পারত এই গান শুধু সুর নয়, এটি এক জীবনদর্শন। খোদা বক্স সাঁই বিশ্বাস করতেন, ধর্মের মূল নিহিত মানুষের মধ্যেই। তাঁর গানগুলোতে বারবার উঠে এসেছে সেই দর্শন মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। ধর্ম, জাতপাত, বর্ণভেদের ঊর্ধ্বে মানবপ্রেমের বার্তা দিয়েছেন। সমাজে যখন মানুষ বিভাজনের রাজনীতিতে ক্লান্ত, তখন খোদা বক্স সাঁই গেয়েছেন ভালোবাসার গান। আর সাধনা মানে নিজের মধ্যে ঈশ্বরকে চিনে ফেলা।
খোদা বক্স সাঁইয়ের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ খোদা বক্স বিশ্বাস। তাঁর জন্ম ১৩৩৪ সালের ৩০ চৈত্র (চৈত্র সংক্রান্তি)/ ১২ এপ্রিল ১৯২৮ইং, চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার জাঁহাপুর গ্রামে। পিতা ছিলেন কফিল উদ্দিন বিশ্বাস এবং মাতা ব্যাশোরণ নিছা। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁর সাধনসঙ্গিনী ছিলেন রাহেলা খাতুন। দুই সন্তানের জনক ছিলেন তিনি ছেলে আবদুল লতিফ বিশ্বাস ও মেয়ে মালঞ্চ। ১৯৭৬ সালে গুরু শুকচাঁদ শাহের কাছ থেকে খেরকা খেলাফত (ফকিরি পোশাক) গ্রহণের পর তিনি নামের শেষে বংশীয় পদবি বিশ্বাস বাদ দিয়ে সাঁই বা শাহ যুক্ত করেন। এই কারণেই তিনি কখনও নিজেকে শুধু শিল্পী ভাবেননি। বরং ছিলেন এক সাধক ও দার্শনিক যিনি গানের ভাষায় মানবতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। খোদা বক্স সাঁই লালনের অনুসারী হলেও তাঁর গানের ধরনে ছিল নিজস্বতা। তিনি ঐতিহ্যবাহী বাউলসুরের পাশাপাশি নতুন ধাঁচের সুর ও যন্ত্রসংযোজন ব্যবহার করতেন। যা ছিলো দোতারা, খমক, ঢোল, বাঁশির সঙ্গে হারমোনিয়াম ও তবলার মেলবন্ধন। তাঁর গানে লালনের ভাষা যেমন ছিল, তেমনি ছিল আঞ্চলিক সরলতা ও হৃদয়ের টান। তাঁর একটি জনপ্রিয় গানের পঙক্তি, আমি মানুষ খুঁজি মানুষের ভেতর, বাহিরে দেখি শুধু দেহ।
খোদা বক্স সাঁইয়ের শিকড় গভীরভাবে লালনের গানের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলো। এই দেশের আধ্যাত্মিক সংগীতচর্চাকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। ফকির লালন সাঁইয়ের চতুর্থ প্রজন্মের প্রতিনিধি বলা হয় সাধক খোদা বক্স সাঁইকে। লালনের প্রথম প্রজন্মের উত্তরসূরি ছিলেন মনিরুদ্দিন শাহ। যিনি নিজে গান রচনা না করলেও লালনের গান সংগ্রহ ও প্রচারে নিজেকে নিবেদন করেছিলেন। লালনের মৃত্যুর পর তিনি ছেউড়িয়ার আখড়া ছেড়ে নিজ বাড়িতে থেকেই লালনের গানের প্রচার চালিয়ে যান। তাঁর শিষ্য ছিলেন ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার খোদা বক্স শাহ লালনের দ্বিতীয় প্রজন্মের উত্তরাধিকার। খোদা বক্স শাহ ছিলেন গায়ক ও গীতিকার। পাশাপাশি বিভিন্ন সাধুসমাবেশে অন্য শিল্পীদের লালনগীতি প্রতি উৎসাহিত করতেন। তাঁরই প্রেরণায় বহু সাধক বিশেষত অমূল্য শাহ লালনের গানকে সাধারণের কাছে পৌঁছে দেন। অমূল্য শাহ এবং শুকচাঁদ শাহ ছিলেন লালনের তৃতীয় প্রজন্মের উত্তরাধিকার। অমূল্য শাহ উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের শিল্পী ছিলেন কিন্তু লালনের ভাবমূর্তি তাঁকে একতারা-বায়া হাতে নিয়ে লালনের গান পরিবেশনায় অনুপ্রাণিত করে। জাঁহাপুরের খোদা বক্স সাঁই ছিলেন শুকচাঁদ শাহের শিষ্য এবং অমূল্য শাহের ভাবসঙ্গীতের শিক্ষার্থী। শুকচাঁদ শাহ তাঁর দীক্ষাগুরু, আর অমূল্য শাহ তাঁর সঙ্গীতগুরু। বুঝাতে পারলাম না মনে হয়।
মনিরুদ্দিন শাহ → খোদা বক্স শাহ → শুকচাঁদ শাহ ও অমূল্য শাহ → খোদা বক্স সাঁই (যাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে) এই ধারাবাহিকতায় লালনের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার অক্ষুণ্ণ থেকেছে।
খোদা বক্স সাঁই মাঠে-মেলায় বাউলগান গেয়ে বেড়াতেন। কিন্তু তাঁর গানের আবেদন সীমিত ছিল না শুধু গ্রামের আখড়ায়। শহরের তরুণ প্রজন্মও তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়েছে। অনেক শিল্পী নাম বলায় যায় যারা তাঁর গানে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ফকির আলমগীর, কালিকাপ্রসাদ, ও পরবর্তী প্রজন্মের ফোক ব্যান্ডগুলোর সংগীতশিল্পীরা তাঁর গানে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, বাউলগান আধুনিক সময়েও প্রাসঙ্গিক, কারণ এর মূল দর্শন মানবতা ও ভালোবাসা। খোদা বক্স সাঁই শুধু দেশের বাউলমেলায়ই নয়, আন্তর্জাতিক ফোক উৎসবেও অংশ নিয়েছেন। ইউরোপ ও ভারতে অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি লোকসংগীত উৎসবে তাঁর গাওয়া গান বিদেশি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। তাঁর কণ্ঠে বাংলার মাটির গন্ধ, সহজ সত্যের প্রকাশ যা ভাষা না বুঝলেও অনুভব করা যায়। এইভাবেই তিনি লালনচর্চাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলেন। খোদা বক্স সাঁইয়ের জীবন মানেই সাধনা। গান যদি সাধনা না হয়, তবে তা কেবল শব্দ। তাঁর প্রতিটি গান, প্রতিটি কথায় মিশে ছিল সেই আত্মশুদ্ধির অনুসন্ধান। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকার জয় করলেই আলোর দেখা পায়। সমাজে হিংসা লোভ হিংস্রতা বেড়ে চলার সময় তিনি গেয়েছেন, ভালোবাসা ছাড়া মুক্তি নাই, ঘৃণা যত পোষো তত দহন বাড়ে। তাঁর জীবন ছিল সরল, কিন্তু গভীর দর্শনে পরিপূর্ণ।
১৯৭৬ সালে তাঁরই হাতে লালন সংগীত স্বরলিপি তৈরি শুরু হয়। সংগৃহীত ২৫টির স্বরলিপি নিয়ে ১৯৮৬ সালে লালন সংগীত স্বরলিপি নামে গ্রন্থ প্রকাশ করে লালন কেন্দ্রীয় সংসদ, ঢাকা। ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে লালন সঙ্গীতের শিক্ষক এবং বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো।। বাউল সঙ্গীতের তার অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৯০ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে। ১৯৯০ সালের ১৫ জানুয়ারি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন লালন গানের শুদ্ধ ধারক ও বাহক সাধক খোদা বক্স সাঁই। খোদা বক্স সাঁইয়ের মৃত্যুর পরও তাঁর গান আজও নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে বেঁচে আছে। ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, যশোর, চুয়াডাঙ্গা এই চার জেলার মাঠে এখনো তাঁর স্মরণে আখড়ামেলা হয়। তাঁর শিষ্য ও অনুসারীরা তাঁর গান গেয়ে বেড়ান, ছড়িয়ে দেন লালনের দর্শন। অনেক গবেষক এখন খোদা বক্স সাঁইকে “লালন-উত্তর যুগের সেতুবন্ধ” বলে আখ্যা দেন। কারণ, তিনি যেমন ঐতিহ্য রক্ষা করেছেন, তেমনি সময়ের সাথে মানিয়ে নিয়েছেন নতুন সুর ও উপস্থাপনাও। আজকের বিশ্বে যেখানে বিভাজন, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বেড়েছে, সেখানে খোদা বক্স সাঁইয়ের গান এক প্রকার শান্তির বার্তা দেয়। তাঁর গানে পাওয়া যায় মাটির গন্ধ, অথচ বার্তা থাকে সার্বজনীন মানুষে মানুষে ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর আত্মচিন্তার আহ্বান। তাঁর গান তিনি বলছেন, যে মানুষ মানুষকে ভালোবাসে না সে কেমন করে ঈশ্বরকে পাবে? খোদা বক্স সাঁই ছিলেন লালনের দর্শনের এক জীবন্ত প্রতিরূপ। সরল জীবন, গভীর চিন্তা, আর অন্তর্দর্শনের সাধনা। তিনি শুধু গান গেয়ে যাননি; তিনি মানুষকে শেখাতে চেয়েছেন মানুষ হওয়া কীভাবে সম্ভব। আজও তাঁর কণ্ঠের সুর, তাঁর দার্শনিক বাণী বাংলার মাটিতে এক আলোকবর্তিকার মতো জ্বলজ্বল করছে। খোদা বক্স সাঁই তাই শুধু একজন বাউল নন বরং তিনি ছিলেন এক মানবদর্শনের কবি, যাঁর গান আজও আমাদের শেখায়, নিজেকে জানো, মানুষকে ভালোবাসো, তাহলেই জীবনের মানে খুঁজে পাবে। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
১. খোদা বক্স সাঁই এর গান
সামনে হেঁটে চলো পিছের কথা ভুলো
কন্ঠ - আবদুল লতিফ শাহ্
২. খোদা বক্স সাঁই এর গান
এই মানুষে মানুষ আছে
কন্ঠ - আবদুল লতিফ শাহ্
৩. খোদা বক্স সাঁই এর গান
রহমান রহিম রাব্বুল আলামিন
কন্ঠ - আবদুল লতিফ শাহ্
৪. খোদা বক্স সাঁই এর গান
দেবতা হারিয়ে পূজারী কাঁদবো কত দিন
কন্ঠ - বজলু শাহ ফকির
--- বাউল পানকৌড়ি
লালন পরম্পরায় সাধক ও মরমি কবি সূফি দার্শনিক বাউল পাঞ্জু শাহ-এর গান--Click to Readখোদা বক্স সাঁইয়ের সুযোগ্য পুত্র লালন সাধক আব্দুল লতিফ শাহ ফকির --Click to Read
Read on mobile
.jpg)
