নিলয় দাস: বাংলাদেশের গিটার সাধক ও এক নিভৃতচারী সুরের কারিগর
নিলয় দাস ক্ষনজন্মা এক মিউজিশিয়ান। নিলয় দা নামে যিনি পরিচিত ছিলেন, পুরো নাম নিলয় কুমার দাস। জন্ম ঢাকাতেই ১৯৬১ সালে ৩০ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের গিটার ইতিহাসের রাজপুত্র বলা হয় তাঁকে। যাঁর আঙুলের ছোঁয়ায় একুস্টিক গিটারের তারে কথা বলত ক্ল্যাসিক্যাল আর ব্লুজের সুর। তিনি নিলয় দাস যিনি কেবল ওস্তাদ সুধীন দাসের সুযোগ্য সন্তানই ছিলেন না, ছিলেন বাংলাদেশের গিটার মাইলস্টোন এবং কয়েক প্রজন্মের গিটারিস্টদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। গিটার নিয়ে বাংলাদেশে যখনই কোনো আলোচনা হয়, তাঁর নিপুণ বাদনশৈলী আর নিভৃতচারী সাধনা সবার আগে স্মরণে আসে। প্রিয় বন্ধু হ্যাপি আখন্দের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই সুরের যাত্রা আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আইয়ুব বাচ্চু থেকে শুরু করে আজকের বাপ্পা মজুমদার কিংবা ওয়ারফেজের কমল সবার কাছেই তিনি ছিলেন এক বিস্ময়কর অনুপ্রেরণা। গত শতকের আশির দশকে ব্যান্ড মিউজিকে পাশ্চাত্য ক্লাসিক্যালের যে বিপ্লব তিনি ঘটিয়েছিলেন, তা আজও অতুলনীয়। গুণী এই শিল্পীর প্রয়াণ দিবসে আজকের বিশেষ আয়োজন তাঁর জীবন, গান এবং গিটারের সেই কালজয়ী গল্পগুলো নিয়ে।

বাবা ছিলেন উপমহাদেশের বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ, নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপিকার ও গবেষক ওস্তাদ সুধীন দাস এবং মা সঙ্গীত শিল্পী নীলিমা দাস। সঙ্গীত পরিবারের সন্তান ছিলেন বাবা মা’র কাছে ছোট বেলাতেই নজরুল সঙ্গীত তামিল নেওয়া শুরু করেন।

নিলয় দাস তার প্রিয় বন্ধু হ্যাপি আখন্দ এর উৎসাহেই গিটার হাতে তুলে নিয়েছিলেন। নিজের অদম্য চেষ্টা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের গিটার মাইলস্টোন হিসেবে পরিচিত হোন। বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকে গিটারিস্টদের নিয়ে যেখানেই আলোচনা হোক না কেন বিশেষ করে গিটারের ক্লাসিক্যাল শিল্পী, বাংলাদেশে একুষ্টিক গিটারের এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ কারিগর প্রথম নামটাই উঠে আসে নিলয় দাস। তিনি একজন গিটারিস্টই ছিলেন না তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং সঙ্গীত শিক্ষক।
১৯৮৮ সালে শুরু করেন নিজের একক অ্যালবামের কাজ। ঐ বছরই সারগামের ব্যানারে প্রকাশিত হয় নিলয় দাসের প্রথম একক অ্যালবাম ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’। এ্যালবামের সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ফুয়াদ নাসের বাবু। কাওসার আহমেদ চৌধুরী (২টি), আহমেদ ইউসুফ সাবের (৪টি), আসিফ ইকবাল (৪টি), সেলিম-বিন-সালেহ(১টি) গানের গীতিকার ছিলেন।
কত যে খুজেছি তোমায়, পথ চলছি, সাগর ডেকে বলে, সময়ের সূচনা, সেই অচেনা, একা থাকা, হ্যাপী, দুচোখে তোমার, আমি মুক্তি পেয়েছি, যখন দেখি, বিবর্তণ, যখন নিবিড়।
১৯৯২ সালে সংগীত শিল্পী আশিকুজ্জামান টুলুর সঙ্গীত পরিচালনায় ‘বিবাগী রাত‘ নামে তাঁর দ্বিতীয় এ্যালবাম প্রকাশ পায় সারগামের ব্যানার থেকেই। মারুফ আহমেদ, বাপ্পী খান, আহসান, আহমেদ ইউসুফ সাবের, সামিনা চৌধুরী, লতিফুল ইসলাম শিবলী এবং নিলয় দাস নিজেও এই এ্যালবামের জন্য গান লিখেন। আমার স্বপ্নের দরজা, বিবাগী রাত, ছেড়ে গেল চাঁদ, ভালোবাসি জোৎস্না, আকাশ কত বিশাল, সেই ভালো, স্বপ্নের সাওতালী, সাকি, সন্ধ্যাতারা, আরশী ও আমি, রাস্তার ছেলে, অপবাদ।
নিলয় দাস ‘দ্য জেনমস’ এবং ‘ট্রিলজি’ নামের দুটি ব্যান্ডের সাথে গিটার বাজাতেন। এর মধ্যে ‘ট্রিলজি’ ব্যান্ডটি বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং এই ব্যান্ডের হাত ধরে অসাধারণ গিটারের মূর্ছনায় একের পর এক মঞ্চ কাঁপাতে থাকেন। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে প্রথম instrumental কনসার্ট ব্যাপক সুনাম অর্জন করে যা নিয়মিত শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে অনুষ্ঠিত হতো। এরপরে জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে। শিল্পকলা একাডেমিতে গিটার শিক্ষক পদে যোগ দেয়ার প্রস্তাব পান তিনি। আর এই সুযোগ পেয়ে নিলয় দাস ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব গোলাম আলী, মেহেদী হাসান সহ আরো অনেক গুণীজনের সাথে গিটার বাজানো এবং তাদের সান্নিধ্য পাওয়ার এক অকল্পনীয় সুযোগ লাভ করেন। হ্যাপি আখন্দ প্রিয় বন্ধুকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন “হ্যাপি স্কুল অফ মিউজিক”। বাংলাদেশের অনেক গিটারিস্ট, সঙ্গীত শিল্পী এবং সঙ্গীত পরিচালক তাঁর প্রতিষ্ঠিত “হ্যাপি স্কুল অফ মিউজিক” থেকে বর্তমান সময়ে অনেক জনপ্রিয় মিউজিশিয়ান ও সঙ্গীত শিল্পীর সৃষ্টি শুরুটা হয়েছিলো।
গত শতকের আশির দশকে যাঁরা গিটার শিখেছেন এবং পরবর্তীকালে অনেক বিখ্যাত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নিলয় দাশের সরাসরি ছাত্র কিংবা তাঁর সঙ্গে বাজিয়ে শিখেছেন এমন। এর মধ্যে ‘অর্থহীন’-এর সুমন, ‘ওয়ারফেজ’-এর কমল, ‘দলছুট’-এর বাপ্পা মজুমদার, ‘সোলস’-এর পার্থ বড়ুয়া অন্যতম। তাই বলা যায়, এখনকার সময়ের প্রথম সারির ব্যান্ড হিসেবে যাঁদের ধরা হয়, সেসব ব্যান্ডের অনেক গিটারিস্টই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিলয় দাশের হাত ধরে উঠে এসেছেন। সে সময়ের ঢাকার মিউজিশিয়ানরা প্রতিনিয়ত আসতেন নতুন কিছু শেখার জন্য এবং নিলয় দাশের বাসায় আড্ডা দেওয়া, গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া। কোনটা রক, কোনটা কান্ট্রি, কোনটা জ্যাজ কিংবা ব্লুজ,মূলত বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের শ্রোতাদের তিনিই প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল, নিও ক্ল্যাসিক্যাল, স্প্যানিশ ফ্ল্যামেনকো মিউজিকের সঙ্গে। বিশ্বসংগীতের সব খবরাখবর সাথে বিশাল কালেকশন ছিল ওয়েস্টান মিউজিক ও ব্যান্ডের অ্যালবামের। নিলয় দাশ ছিলেন প্রধানত নিও ক্ল্যাসিক্যাল গিটারমাস্টার। অনুসরণ করতেন বিখ্যাত গিটারিস্ট রিচি ব্ল্যাকমোর, র্যান্ডি রোডসকে। তাঁর শেখানোর বিশেষত্ব ছিল ক্ল্যাসিক ইনফ্লুয়েন্স লিড। তিনি অনায়াসে পিঙ্ক ফ্লয়েড, ডিপ পার্পল, ইগলস, অল স্টুয়ার্ট, ব্রেড, নিল ইয়াং, ক্রসবি স্টিলস অ্যান্ড ন্যাশ, লোবো, ড্যান ফকলারবার্গ, এয়ার সাপ্লাই, জিম করবি, সান্টানা, ডায়ার স্ট্রেইটসের বিখ্যাত সব গান হুবহু নিখুঁতভাবে গিটারে বাজাতে পারতেন। যাঁরা তাঁকে সামনাসামনি গিটার বাজাতে দেখেছেন, তাঁদের কাছে নিলয় দাশ ছিলেন এক বিস্ময়ের নাম।
দীর্ঘ দিনের নিজের ভিতর লুকিয়ে রাখা অভিমান থেকে বের হয়ে ২০০৫ সালে পরিকল্পনা করেন নিজের একক এ্যালবাম প্রকাশ করা সাথে পরিকল্পনা করেছিলেন ‘৭০ থেকে ‘৮০-এর দশকের সকল ব্যান্ড ও প্রিয় শিল্পীদের দিয়ে নিজের মতো করে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করার । নিজের কিছু মৌলিক গানের কাজ শুরু করেছিলেন সময় নিয়ে। লম্বা চুলে, সাদামাটা চেহারায় ভাবগাম্ভীর্যে ভরা শান্ত আবেগী মানুষটা ২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সেন্টার পয়েন্ট হাসপাতালে রাত ৯টার সময় পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। তাঁর হঠাৎ চলে যাওয়া বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিকে সে সময় প্রচন্ড প্রভাব ফেলে।
লাশ কাটা ঘর
এ্যালবাম- টুগেদার (ব্যান্ড মিক্সড)
ফিরে দেখো আমাকে
এ্যালবাম- টুগেদার (ব্যান্ড মিক্সড)
যখন নিবিড় করে
এ্যালবাম- কত যে খুঁজেছি তোমায়
কথা- আহমেদ ইউসুফ সাবের
সুর ও সঙ্গিত- ফুয়াদ নাছের বাবু
বৃষ্টি রিনঝিন বৃষ্টির ছন্দে ছন্দে
এ্যালবাম- কেই সুখি নয় (ব্যান্ড মিক্সড)
কথা- টিপু
সুর ও সঙ্গিত- নিলয় দাস
এ শহর ডুবে যায়
এ্যালবাম- তুমিহীনা সারাবেলা (ব্যান্ড মিক্সড)
কথা- আইয়ুব বাচ্চু
সুর ও সঙ্গিত- আইয়ুব বাচ্চু
এইটুকু খোলা রেখ পথ
এ্যালবাম- দেখা হবে বন্ধু (ব্যান্ড মিক্সড)
কথা-
সুর ও সঙ্গিত-
হায় ভালোবাসি
এ্যালবাম- বিবাগী রাত
কভার- মহীনের ঘোড়াগুলি
এ্যালবাম- কত যে খুঁজেছি তোমায়
কথা- কাউসার আহমেদ চৌধুরী
সুর ও সঙ্গিত- ফুয়াদ নাছের বাবু
কভার- পার্থ/বাপ্পা মজুমদার
নিলয় দাস হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের গিটারিস্টদের প্রতিটি আঙুলের কম্পনে তিনি অমর হয়ে আছেন। তিনি এমন এক শিল্পী ছিলেন যিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে গিটারের সুরকে ইবাদতে পরিণত করেছিলেন। ওস্তাদ সুধীন দাসের ক্ল্যাসিক্যাল ঐতিহ্য আর হ্যাপি আখন্দের ব্যান্ড মিউজিকের স্বপ্ন এই দুইয়ের এক অপূর্ব মিলন ঘটেছিল তাঁর মাধ্যমে। ২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি অকালেই পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া 'কত যে খুঁজেছি তোমায়' বা 'বিবাগী রাত'-এর মতো গানগুলো আজও আমাদের কানে মায়ার সুর ছড়িয়ে যায়। 'বাউল পানকৌড়ি' ব্লগের এই আয়োজন কেবল এক শিল্পীর জীবনগাথা নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের সেই স্বর্ণালী সময়ের কারিগরের প্রতি আমাদের বিনম্র ভালোবাসা। তাঁর সুরের এই উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের মিউজিশিয়ানদের জন্য চিরদিন দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে।
---- বাউল পানকৌড়ি



