এস. এম. সুলতান: কৃষকের পেশিতে সভ্যতার শক্তি এবং এক মহান শিল্পদর্শন
চিত্রশিল্পী সুলতানের কৃষকের ক্যানভাস- “ওরা এত রুগ্ন কেন, যারা আমাদের অন্ন জোগায়?”
বাংলার মাটি, মানুষ আর প্রকৃতি এই ত্রয়ীর মধ্যে চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতান যেন খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের শিকড়। তাঁর ক্যানভাসে মানুষ মানে কৃষক, আর কৃষক মানে শক্তি, শ্রম আর সৃষ্টির প্রতীক। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই মাটির মানুষই সভ্যতার প্রকৃত ভিত্তি। সুলতানের ছবিতে কৃষক কখনো রুগ্ন নয়, বরং মহাকায়, বলিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত। তাঁর তুলির আঁচড়ে কৃষকের শরীর যেন এক মহাকাব্যের প্রতীক হয়ে ওঠে যেখানে শ্রমই সৌন্দর্য, মাটি-ঘামই সৃষ্টির শক্তি।
তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি আমার বিশ্বাসের কথা বলছি। আমার সকল চিন্তা, সবটুকু মেধা, সবটুকু শ্রম দিয়ে যা কিছু নির্মাণ করি, তা কেবল মানুষের জন্য, জীবনের জন্য, সুন্দর থেকে সুন্দরতম অবস্থায় এগিয়ে যাবার জন্য। সুলতানের কাছে কৃষক ছিল কেবল শ্রমজীবী মানুষ নয়, ছিল এক জীবন্ত শক্তির প্রতিমূর্তি। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন “ওরা এত রুগ্ন কেন, যারা আমাদের অন্ন জোগায়?” এই প্রশ্নে লুকিয়ে আছে তাঁর মানবিক বোধের গভীরতা। শিল্পীর চোখে কৃষকের শুকনো শরীর আসলে সমাজের অসাম্যের প্রতীক। সুলতান তাঁর ক্যাসভাস নিয়ে বলতেন, আমার ছবির মানুষেরা এরা তো মাটির মানুষ। মাটির সঙ্গে স্ট্রাগল করেই এরা বেঁচে থাকে। এদের শরীর যদি শুকনো থাকে, মনটা রোগা হয়, তাহলে এই যে কোটি কোটি টন মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় বস্তুসকল আসে কোথা থেকে ? ওদের হাতেই তো এসবের জন্ম!
জগৎ বিখ্যাত চিত্র শিল্পী সুলতান কৃষকের দেহে খুঁজে পেয়েছিলেন এক অদৃশ্য শক্তি, এক প্রাণশক্তি। শুকনো, শক্তিহীন শরীর হলে মাটির নিচে লাঙলটাই দাব্বে না এক ইঞ্চি। আসলে, মূল ব্যাপারটা হচ্ছে এনার্জি, সেটাই তো দরকার। ঐ যে কৃষক, ওদের শরীরের অ্যানাটমি আর আমাদের ফিগারের অ্যানাটমি দু’টো দুই রকম। ওদের মাসল যদি অতো শক্তিশালী না হয়, তাহলে দেশটা দাঁড়িয়ে আছে কার ওপর? ওই পেশীর ওপরেই তো আজকের টোটাল সভ্যতা। এই কথাগুলোর মধ্যে সুলতানের শিল্পদর্শনের সারমর্ম লুকিয়ে আছে। তাঁর ক্যানভাসে কৃষক শুধু চাষ করে না সে যেন পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখে।
আজও তাই সুলতানের কৃষক আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায়, “ওরা এত রুগ্ন কেন, যারা আমাদের অন্ন জোগায়?”এই প্রশ্ন শুধু শিল্পের নয়, মানবতারও। শিল্পী সুলতানের সালতানাতে কৃষকের ক্যানভাসে স্বাগতম:-
(১)
(২)
(৩)
(৪)
(৫)
(৬)
(৭)
(৮)
(৯)
(১০)
(১১)
(১২)
(১৩)
(১৪)
(১৫)
(১৬)
(১৭)
(১৮)
(১৯)
(২০)
(২১)
(২২)
(২৩)
(২৪)
(২৫)
(২৬)
(২৭)
(২৮)
(২৯)
(৩০)
(৩১)
এস. এম. সুলতান কেবল ছবি আঁকেননি, তিনি ক্যানভাসে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। সাধারণ মানুষের রুগ্ন বাস্তবতাকে তিনি অস্বীকার করেননি, বরং তাদের ভেতরের অসীম প্রাণশক্তিকে পৃথিবীর সামনে বড় করে দেখিয়েছেন। তাঁর ছবির সেই বিশাল দেহের কৃষক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শ্রমজীবী মানুষের পেশিই আসলে আধুনিক বিশ্বের ইঞ্জিন। নড়াইলের লাল মিঞা থেকে বিশ্বখ্যাত এস. এম. সুলতান হয়ে ওঠার এই যাত্রায় তিনি বাংলার মাটি ও মানুষকে যে সম্মান দিয়েছেন, তা ইতিহাসে বিরল। আজও যখন আমরা তাঁর কৃষকদের দেখি, তখন মনে হয় শ্রমিকই সুন্দর, কৃষকই শ্রেষ্ঠ। এই মহান শিল্পীর প্রতি 'বাউল পানকৌড়ি'র সশ্রদ্ধ সালাম।
--বাউল পানকৌড়ি
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন: দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা (Famine Sketches) শুধু শিল্প নয়.jpg)
































