মুক্তিযুদ্ধ ও ডাকটিকিট: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিটে লুকানো নকশার গল্প
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে এক অনন্য উদ্যোগ ছিল বাংলাদেশ নামে প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশ। ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই মুজিবনগর, কলকাতা এবং লন্ডন থেকে একযোগে প্রকাশিত হয় এই ডাকটিকিটের প্রথম সেট। প্রথমবার প্রকাশিত ডাকটিকিটের সংখ্যা ছিল ৮টি। নকশা করেছিলেন প্রবাসী ভারতীয় বাঙালি শিল্পী বিমান মল্লিক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই ডাকটিকিটগুলো শুধুমাত্র ডাক ব্যবস্থার প্রতীক ছিল না। এগুলো ছিল স্বাধীনতার চিহ্ন আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রমাণ। যখন বিশ্ব স্বীকৃতি দেয়নি তখনও এই ডাকটিকিটগুলো লেবেল বা স্টিকার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকটিকিট হিসেবে স্বীকৃত হয়।
প্রথম ৮টি ডাকটিকিটের প্রতিটি নিজস্ব ইতিহাস ও বার্তা বহন করে। এর মধ্যে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫-২৬ মার্চের গণহত্যা, ৭৫ মিলিয়ন মানুষের ঐক্য, স্বাধীনতার পতাকা, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, মুজিবনগরের মুক্তি ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং ‘বাংলাদেশকে সমর্থন করুন’ বার্তা। প্রতিটি ডাকটিকিটের মূল্যও ছিল ১০ পয়সা থেকে শুরু করে ১০ টাকা পর্যন্ত। আজকের লেখায় ঐতিহাসিক আটটি ডাকটিকিটের নকশার প্রতিটি রঙ, প্রতিটি প্রতীক এবং প্রতিটি মূল্যমানের পেছনে লুকিয়ে থাকা বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম, ঐক্য ও আত্মত্যাগের আখ্যান আবার নতুন করে জানবো।
ডাকটিকিটের থিম: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
রঙ ও নকশা: বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি
মূল্য: ৫ টাকা
বার্তা/ব্যাখ্যা: স্বাধীনতার সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিশ্ব দরবারে তাঁকে উপস্থাপন।
ডাকটিকিটের থিম: স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র
রঙ ও নকশা: গাঢ় লাল, নীল ও বেগুনী; মাঝ বরাবর কর্কটক্রান্তি রেখা
মূল্য: ১০ পয়সা
বার্তা/ব্যাখ্যা: কর্কটক্রান্তি রেখা কেন মাঝ বরাবর রাখা হলো? (দেশের ভূখণ্ড ও বৈশ্বিক পরিচিতি তুলে ধরা)।
ডাকটিকিটের থিম: ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণহত্যা
রঙ ও নকশা: রক্তলাল ছাপের ওপর হলুদ বর্ণে DACCA UNIVERSITY; গণহত্যা ও ২৫-২৬ মার্চের চিত্র
মূল্য: ২০ পয়সা
বার্তা/ব্যাখ্যা: গণহত্যার চিত্র বিশ্বকে জানানোর উদ্দেশ্য। গণহত্যার স্মরণ ও জাতীয় শোকের চিহ্ন।
ডাকটিকিটের থিম: ৭৫ মিলিয়ন মানুষের ঐক্য
রঙ ও নকশা: ধূসর রঙ
মূল্য: ৫০ পয়সা
বার্তা/ব্যাখ্যা: ধূসর রঙ কীভাবে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ঐক্যবদ্ধতা ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক হয়ে উঠল।
ডাকটিকিটের থিম: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা
রঙ ও নকশা: মানচিত্র খচিত পতাকা
মূল্য: ১ টাকা
বার্তা/ব্যাখ্যা: পতাকা শুধু একটি প্রতীক নয়, এটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়।
ডাকটিকিটের থিম: ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল
রঙ ও নকশা: ব্যালট বাক্সে ৯৮% বোঝানো
মূল্য: ২ টাকা
বার্তা/ব্যাখ্যা: গণতান্ত্রিকভাবে আওয়ামী লীগের বিজয়। যুদ্ধ যে কেবল আবেগ নয়, এটি গণতান্ত্রিকভাবে আওয়ামী লীগের বিজয় ও জনগণের ম্যান্ডেট ছিল, সেই সত্য তুলে ধরা।
ডাকটিকিটের থিম: মুজিবনগর দিবস (১০ এপ্রিল)
রঙ ও নকশা: গাঢ় সবুজ, পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ডে সবুজ, বাকি বর্ণ নীল
মূল্য: ৩ টাকা
বার্তা/ব্যাখ্যা: দীর্ঘদিনের পরাধীনতা ও নিপীড়নের শিকল ভাঙার প্রতীকী উপস্থাপনা।
ডাকটিকিটের থিম: SUPPORT BANGLADESH
রঙ ও নকশা: উজ্জ্বল গোলাপি রঙ, মাঝখানে বাদামী পতাকা, বাম পাশে বেগুনী “SUPPORT BANGLADESH” লেখা
মূল্য: ১০ টাকা
বার্তা/ব্যাখ্যা: বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থন দেওয়ার জন্য জোর আহ্বান এবং সাহায্যপ্রত্যাশী জাতির প্রতীক।
বিমান মল্লিক (জন্ম ১৯৩৩, হাওড়া, কলকাতা) ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটগুলোর নকশাকার। লন্ডনের সেন্ট মার্টিন স্কুল অব আর্টে ডিজাইন শিক্ষা শেষে তিনি ১৯৬৫ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে কাজ শুরু করেন এবং মহাত্মা গান্ধীর স্মারক ডাকটিকিটের নকশা করে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পান। যা তাকে ব্রিটিশ ডাকটিকিট ডিজাইন করা প্রথম ও একমাত্র বিদেশি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭১ সালে ব্রিটিশ মন্ত্রী জন স্টোনহাউসের উদ্যোগে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের ডাকটিকিটের নকশা তৈরি করেন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও ডোনাল্ড চেসওয়ার্থের সহযোগিতায় নকশা অনুমোদিত হয় এবং লন্ডনের ফরম্যাট ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রেসে মুদ্রিত হয়। ২৬ জুলাই হাউস অব কমন্সে এগুলো প্রথম প্রদর্শিত হয় এবং ২৯ জুলাই ১৯৭১ বিশ্বব্যাপী একযোগে প্রকাশিত আটটি টিকিট এক পাউন্ড নয় পেনি মূল্যে বাজারে আসে। বাংলাদেশ ফিলাটেলিক এজেন্সি সারা বিশ্বে টিকিট বিতরণ করে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ডাকটিকিট আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিমান মল্লিক এই নকশা বিনা পারিশ্রমিকে করেছেন। তিনি তার সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, ১৯৬৯ সালে মহাত্মা গান্ধীর ডাকটিকিট নকশা করার অভিজ্ঞতার পর লন্ডন থেকে বাংলাদেশের জন্য ডাকটিকিট ডিজাইন করার অনুরোধ পান। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সরকার ও ব্রিটিশ ডাক বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং অবশেষে ৮টি নকশা অনুমোদিত হয়। তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ৮টি ডাকটিকিট শুধু ইতিহাস নয়, আমাদের অস্তিত্ব, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার স্বাক্ষর। ১৯৭১ সালের রক্তঝরা দিনগুলোতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। তখন এই ডাকটিকিটগুলোই বিশ্বের দরবারে এক প্রতীকী রাষ্ট্রদূত হিসেবে পরিচিতি ছড়িয়েছে। প্রতিটি নকশার ভেতর লুকিয়ে আছে স্বাধীনতার গল্প, গণহত্যার স্মৃতি, বাঙালির ঐক্য, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ। আজও এই ডাকটিকিটগুলো শুধু সংগ্রহশালার সম্পদ নয় বাংলাদেশের জন্মকথার নীরব দলিল। নতুন প্রজন্মের কাছে এগুলো স্বাধীনতার ইতিহাস বোঝার এক শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল মাধ্যম। এই মূল্যবান ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাতে তারা জানতে পারে কিভাবে একটি জাতি নিজের পরিচয়ের জন্য সংগ্রাম করেছে এবং কিভাবে একটি ছোট্ট কাগজের টুকরো বিশ্বকে জানিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীণতা সংগ্রামের কথা।
--- বাউল পানকৌড়ি
স্বাধীনতার অগ্নিশিখা আমার অহংকার-: সংগ্রাম থেকে লাল সবুজের পতাকার ইতিহাস--Click to Read১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার যত : সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী--Click to Read
স্বাধীনতার শব্দসঙ্গী কল-রেডী--Click to Read







