বিশ্বকাপ মঞ্চ মাতানো আইকনিক আফ্রো ও ঝাঁকড়া চুলের সেই সব কিংবদন্তি
ফুটবল মাঠে কেবল গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা নিখুঁত ড্রিবলিং দিয়ে দর্শকদের মন জয় করা যায় না; অনেক সময় খেলোয়াড়দের অনন্য ব্যক্তিত্ব এবং নিজস্ব স্টাইলও তাদের ইতিহাসের পাতায় অমর করে রাখে। বিশেষ করে ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বিশ্বমঞ্চে কিছু খেলোয়াড় এসেছেন যারা মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি নিজেদের হেয়ারস্টাইল দিয়ে গ্যালারিতে আলাদা উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন।
এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে 'ঝাঁকড়া চুল' বা আফ্রো ও ড্রেডলকস লুকের ফুটবলাররা। সবুজ ঘাসে যখন তারা বল নিয়ে ছুটতেন, তখন তাদের মাথার সেই ঝাঁকড়া চুলের দোলা কোটি ভক্তের হৃদয়ে দোলা দিত। আজ আমরা জানবো বিশ্বকাপ মাতানো এমনই কয়েকজন আইকনিক ঝাঁকড়া চুলের জাদুকরদের গল্প, যারা ফুটবল ও ফ্যাশনের মেলবন্ধনে ফুটবলবিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছিলেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন অনেক তারকা ছিলেন যাদের চুল ছিল যতাদের দ্বিতীয় পরিচয়। দর্শকরা দূর থেকে জার্সির নম্বর না দেখেও চিনতে পারতো তাদের। আসুন ফিরে দেখা যাক বিশ্বকাপ ইতিহাসের কয়েকজন বিখ্যাত ‘ঝাঁকড়া চুলের’ জাদুকরকে।
কার্লোস ভালদেরামা (কলম্বিয়া): সোনালী আফ্রো চুলের ফুটবল সম্রাট
ফুটবল ইতিহাসে 'ঝাঁকড়া চুল' শব্দ জোড়া উচ্চারণ করলেই সবার আগে যে মানুষটির অবয়ব চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তিনি আর কেউ নন কলম্বিয়ার ফুটবল কিংবদন্তি কার্লোস ভালদেরামা। তাকে ফুটবল বিশ্বের 'আসল' ঝাঁকড়া চুলের আইকন বলা চলে।
তার মাথার সেই বিশাল আকৃতির, সোনালী রঙের আফ্রো (Afro) চুল মাঠের যেকোনো প্রান্ত থেকে, এমনকি স্টেডিয়ামের সবচেয়ে দূরবর্তী গ্যালারি থেকেও এক পলকেই চেনা যেত। ভালদেরামা কেবল চুলের স্টাইল দিয়ে নয়, তার জাদুকরী পাসিং সেন্স এবং মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ১৯৯০, ১৯৯৪ এবং ১৯৯৮ পরপর তিনটি বিশ্বকাপে তিনি কলম্বিয়া দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
মাঠে তার খেলার ধরণ ছিল ধীরস্থির কিন্তু অত্যন্ত মারণাত্মক। যখনই তিনি বল পায়ে নিতেন, মনে হতো পুরো মাঠের সময় থমকে গেছে। আর তার সেই নিখুঁত থ্রু-পাস দেওয়ার মুহূর্তে মাথার সোনালী চুলের ঝাঁকুনি ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর এক দৃশ্য। আজও কলম্বিয়ার ফুটবল বা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা স্টাইলিশ খেলোয়াড়দের তালিকা করতে গেলে ভালদেরামার নাম থাকবে সবার ওপরে।
রুড গুলিট (নেদারল্যান্ডস): ডাচ ফুটবলের ড্রেডলকস ডাইনামো
১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে বিশ্ব ফুটবল কাঁপানো নেদারল্যান্ডস দলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন রুড গুলিট। তাকে বলা হতো ফুটবল মাঠের এক 'কমপ্লিট ফুটবলার'। রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে আক্রমণভাগ মাঠের যেকোনো পজিশনে খেলার অতিমানবীয় ক্ষমতা ছিল তার।
তবে মাঠের সেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে তার তুমুল জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ ছিল তার লম্বা, ঝাঁকড়া 'ড্রেডলকস' (Dreadlocks) হেয়ারস্টাইল। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে রুড গুলিট যখন ডাচ শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন তার মাথার সেই লম্বা ড্রেডলকস চুল বাতাসে উড়ে বেড়াত।
প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে যখন তিনি ক্ষিপ্র গতিতে বক্সে ঢুকতেন, তখন তার চুলের সেই ডাইনামিক মুভমেন্ট দর্শকদের চোখ জুড়িয়ে দিত। স্টাইলের দিক থেকে তিনি এতটাই প্রভাব ফেলেছিলেন যে, সেই সময়ে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ তরুণ গুলিটের মতো ড্রেডলকস চুল রাখার ফ্যাশন শুরু করেছিল। কেবল ফ্যাশন আইকনই নন, ব্যালন ডি'অর জয়ী এই তারকা ডাচ ফুটবলকে এক সোনালী সময় উপহার দিয়েছিলেন।
মার্সেলো, উইলিয়ান ও ডেভিড লুইজ (ব্রাজিল): সাম্বার ছন্দে চুলের দোলা
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সাথে জাদুকরী ছন্দ আর শিল্পের একটা গভীর যোগাযোগ সবসময়ই ছিল। আর এই সাম্বার শিল্প শুধু পায়ে নয়, মাথাতেও ফুটিয়ে তুলেছেন আধুনিক ফুটবলের তিন ব্রাজিলিয়ান তারকামার্সেলো, উইলিয়ান এবং ডেভিড লুইজ। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে ঝাঁকড়া চুলের ঐতিহ্য অবশ্য বেশ পুরোনো, তবে এই ত্রয়ী সেটিকে একবিংশ শতাব্দীতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে এই তিন ঝাঁকড়া চুলের তারকার উপস্থিতি ব্রাজিলের আক্রমণ ও রক্ষণভাগে আলাদা এক সৌন্দর্য যোগ করেছিল।
রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক কিংবদন্তি লেফট-ব্যাক মার্সেলোর চেনা আফ্রো লুক ফুটবলপ্রেমীদের বড্ড প্রিয় ছিল। উইং ধরে যখন তিনি বিদ্যুৎ গতিতে ওভারল্যাপ করে ওপরে উঠতেন, তখন তার ঝাঁকড়া চুলের আন্দোলন গ্যালারিতে অন্যরকম এক ভিজ্যুয়াল থ্রিল তৈরি করতো। অন্যদিকে, উইঙ্গার উইলিয়ানের মাথার নিখুঁত ও পরিপাটি আফ্রো ঝাঁকড়া চুল ছিল তার ট্রেডমার্ক, যা প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙার সময় বাতাসে চমৎকারভাবে দুলতো।
রক্ষণভাগে তাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন ডেভিড লুইজ। ডিফেন্ডার হলেও তার মাথায় ছিল সিংহ-সদৃশ বিশাল আকৃতির ঘন ঝাঁকড়া চুলের স্তূপ। মাঠে লুইজ যখন ডিফেন্স থেকে লম্বা পাস বাড়াতেন, দূরপাল্লার ফ্রি-কিক নিতেন কিংবা কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে হেড করার জন্য লাফিয়ে উঠতেন, তখন তার চুল বাতাসে এক অন্যরকম অবয়ব তৈরি করতো। মাঠে এই তিন তারকার একসাথে দৌড়ানোর দৃশ্যটি ছিল ক্যামেরার ফ্রেমে এক দৃষ্টিনন্দন ফ্রেম। তারা প্রমাণ করেছিলেন যে, একই দলের একাধিক খেলোয়াড় তাদের খেলার ধরণ এবং একই রকম আইকনিক চুলের স্টাইল দিয়ে পুরো বিশ্বকাপের একটা বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারেন।
কার্লেস পুয়োল: স্পেনের সিংহ
ফুটবল মাঠে কিছু খেলোয়াড় আসেন যারা কেবল তাদের পায়ের জাদু দিয়ে নয়, বরং তাদের ইস্পাতকঠিন মানসিকতা, নেতৃত্ব আর মাঠের লড়াকু মনোভাব দিয়ে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ও বার্সেলোনা লেজেন্ড কার্লেস পুয়োল ঠিক তেমনই একজন ফুটবলার। মাঠে তার অকুতোভয় ডিফেন্স এবং শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার অভ্যাসের কারণে তাকে ভালোবেসে ডাকা হতো 'এল তারজান' বা 'স্পেনের সিংহ'। আর এই সিংহের কেশরের মতোই মাঠজুড়ে রাজত্ব করতো তার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা, ঘন ঝাঁকড়া চুলের বাঘাড়।
২০০৮ এর ইউরো এবং ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে স্পেনের ‘টিকি-টাকা’ ফুটবলের আড়ালে রক্ষণভাগের মূল দেয়াল ছিলেন পুয়োল। প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকাররা যখন স্প্যানিশ ডিফেন্সে আক্রমণ চালাতো, তখন সিংহের মতোই ঝাঁপিয়ে পড়তেন তিনি। ২০১০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে তার করা সেই বুলেট গতির জয়সূচক হেডটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা হাইলাইট। কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে যখন তিনি বাতাসে ভেসে হেডটি করলেন, তখন তার মাথার সেই ঝাঁকড়া চুলের আন্দোলন এবং গোল উদযাপনের সময় চুলের বুনো ঝাঁকুনি গ্যালারিতে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল।
অনেকেই ক্যারিয়ারের শুরুতে তাকে চুল ছোট করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু পুয়োল তার এই আইকনিক লুক কখনো বদলাননি। তার মতে, এই চুলই ছিল মাঠে তার শক্তির প্রতীক। কোনো রকম হেয়ার ব্যান্ড বা ক্লিপ ছাড়াই সেই বিশাল ঝাঁকড়া চুল নিয়ে মাঠের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়াতেন তিনি। প্রতিপক্ষের মারাত্মক সব ট্যাকল বা বলের আঘাতের পর যখন তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে চুলগুলো সোজা করতেন, তা প্রতিপক্ষের মনে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ভয় ধরিয়ে দিত। পুয়োল প্রমাণ করেছেন যে, বিশ্বকাপের মঞ্চে রক্ষণভাগের কঠোরতা আর মাথার ঝাঁকড়া চুল মিলেও একজন খেলোয়াড়কে ফুটবলের চিরন্তন রোমান্টিক চরিত্রে রূপ দেওয়া সম্ভব।
রেনে হিগুইতা: গোলপোস্টের বিদ্রোহী শিল্পী
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে অদ্ভুতুড়ে, রোমাঞ্চপ্রিয় এবং একই সাথে বিনোদনদায়ী গোলরক্ষক হলেন কলম্বিয়ার রেনে হিগুইতা। তাকে ভালোবেসে সবাই ডাকতো 'এল লোকো' বা 'পাগলা'। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে শান্ত থাকা তার স্বভাব ছিল না; বরং বল পায়ে নিয়ে মাঝমাঠ পর্যন্ত ড্রিবলিং করে চলে আসাটাই ছিল তার সহজাত প্রবৃত্তি। আর তার এই দুর্দান্ত পাগলামির সঙ্গী ছিল তার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা, ঘন ঝাঁকড়া কালো চুল।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে হিগুইতা তার অবিশ্বাস্য সব কাণ্ডকারখানা দিয়ে পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছিলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার সেই বিখ্যাত শূন্যে ভেসে করা 'স্করপিওন কিক' (Scorpion Kick) আজ অব্দি ফুটবলের অন্যতম সেরা আইকনিক মুহূর্ত। গোলপোস্ট ছেড়ে যখন তিনি বল নিয়ে প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের ডজ দিতেন, তখন তার লম্বা ঝাঁকড়া চুল বাতাসে দুলতো, যা দর্শকদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিত। হিগুইতা প্রমাণ করেছিলেন যে, একজন গোলরক্ষকও তার খেলার ধরণ এবং চুলের স্টাইল দিয়ে বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারেন।
মারোয়ান ফেলাইনি: বেলজিয়ামের আফ্রো চুলের যোদ্ধা
২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের অন্যতম সদস্য ছিলেন ফেলাইনি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে গুরুত্বপূর্ণ হেড গোল করে দলের প্রত্যাবর্তনে বড় ভূমিকা রাখেন। সেই গোল বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ যাত্রার অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।
২০১৮ বিশ্বকাপেও তিনি বেলজিয়ামের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে শক্তিশালী ব্রাজিলকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার পথে ফেলাইনির শারীরিক উপস্থিতি ও অভিজ্ঞতা দলের জন্য ছিল বড় সম্পদ। শেষ পর্যন্ত বেলজিয়াম তৃতীয় স্থান অর্জন করে, যা দেশটির বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা সাফল্য।
ফেলাইনির আফ্রো চুল তাকে শুধু দর্শকদের কাছে আলাদা পরিচিতিই দেয়নি, বরং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আইকনিক চেহারায় পরিণত করেছিল। স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে টেলিভিশনের পর্দাযেখানেই দেখা যাক, সেই বিশাল চুলের জন্য তাকে চিনতে ভুল হতো না কারও।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মারোয়ান ফেলাইনি তাই শুধু একজন মিডফিল্ডার নন; তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ‘ঝাঁকড়া চুলের’ যোদ্ধা।
ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল চার বছর পর পর ট্রফি জয়ের একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি আসলে বিশ্ব সংস্কৃতি, ফ্যাশন এবং আত্মপ্রকাশের এক অনন্য মহামিলন মেলা। কার্লোস ভালদেরামার সোনালী আফ্রো থেকে শুরু করে রুড গুলিটের ড্রেডলকস কিংবা রেনে হিগুইতার লম্বা ঝাঁকড়া চুল এই নায়কেরা প্রমাণ করেছেন যে, ফুটবল মাঠে কেবল বুটের জাদুতেই নয়।
নিজেদের অনন্য ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতা আর নিজস্ব স্টাইল দিয়েও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে নেওয়া সম্ভব। বিশ্বকাপ আসবে, বিশ্বকাপ যাবে, নতুন নতুন তারকার জন্ম হবে; কিন্তু মাঠ কাঁপানো এই 'ঝাঁকড়া চুলের' জাদুকরদের রঙিন স্মৃতি ফুটবলপ্রেমীদের মনে চিরকাল অম্লান থাকবে।
