কাক নিয়ে লেখা বিখ্যাত কবিদের ছড়া কবিতা যত- কালো কাক কবিতার খাতা

কাক নিয়ে লেখা বিখ্যাত কবিদের ছড়া কবিতা যত- কালো কাক কবিতার খাতা: 

সকালের কাকের ডাকে আলো আসে, চেয়ে দেখি কালো দাঁড়কাক

কাক আমাদের খুব চেনা এক পাখি। কালো রঙের তীক্ষ্ণ চোখের এই পাখিকে আমরা প্রতিদিনই দেখি ছাদে গাছে কিংবা রান্নাঘরের ধারে। কিন্তু শুধু পাখি হিসেবেই নয় কাক অনেক আগে থেকেই জায়গা করে নিয়েছে বাংলা সাহিত্যে। কখনও শিশুর ছড়ায় কখনও কবির গভীর ভাবনায় সে এসেছে নানা রূপে চতুর মজার বুদ্ধিমান কিংবা সতর্কবার্তাবাহী এক চরিত্র হয়ে। বাংলা ছড়া-কবিতায় কাক যেন এক অনন্য রূপক। যেখানে ছন্দের পাশাপাশি আছে প্রকৃতি ও জীবনের গল্প। এই লেখায় আমরা কাক নিয়ে যত কবিতা ও ছড়া সংগ্রহের চেষ্টা করবো। যেখানে কাক শুধু ডাকেই নয় কবিতার শব্দেও করে বাজে কা কা।


মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে শুরু করে আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, সুকুমার রায় বিখ্যাত প্রায় সব কবিই কোনো না কোনোভাবে কাককে তাদের কবিতায় এনেছেন নিজস্ব ভাবনায়। কেউ দেখেছেন কাককে অন্ধকার ও একাকিত্বের প্রতীক। কেউ বা বুদ্ধি সতর্কতা ও টিকে থাকার প্রতিচ্ছবি হিসেবে। শিশু সাহিত্য থেকে আধুনিক নগর কবিতা পর্যন্ত কাক বাংলা কবিতায় হয়ে উঠেছে জীবনের এক অনিবার্য চরিত্র।

১. কাক ও শৃগালী
মাইকেল মধুসূদন দত্ত

একটি সন্দেশ চুরি করি,
উড়িয়া বসিলা বৃক্ষোপরি
কাক,হৃষ্ট-মনে;
সুখাদ্যের বাস পেয়ে,
আইল শৃগালী ধেয়ে,
দেখি কাকে কহে দুষ্টা মধুর বচনে;-
“অপরূপ রূপ তব,মরি!
তুমি কি গো ব্রজের শ্রীহরি,-
গোপিনীর মনোবাঞ্ছা?-কহ গুণমণি!

হে নব নীরদ-কান্তি,
ঘুচাও দাসীর ভ্রান্তি,
যুড়াও এ কান করি বেনু-ধ্বনি!
পূণ্যবতী গোপ-বধূ অতি।
পূণ্যবতী গোপ-বধূ অতি।
তেঁই তারে দিলা বিধি,
তব সম রূপ-নিধি,-
মোহ হে মদনে তুমি; কি ছার যুবতী?
গাও গীত, গাও, সখে করি এ মিনতি!
কুড়াইয়া কুসুম-রতনে,
গাঁথি মালা সুচারু গাঁথনে,
-------------------------------------------------
২. কাক
আল মাহমুদ

হে আমার প্রিয়, পরম চতুর পাখি,
তোর কণ্ঠেই শুনি সত্যের সুর,
এই উদ্দাম নগরের হাঁকাহাঁকি
আত্মায় তোর উত্তাল ভরপুর;
বুঝি জীবাকার প্রতীক চিহৃ ওড়ে,
কৃষ্ণে ধবলে সবল দু’খানি পাখা
শব্দ তোমার নটীদের ঘুংগুরে
যেন নৃত্যের মুদ্রায় তাল রাখা !

তুমি দুপুরের, তুমি ধূসরের জয়,
গভীর শ্রমের আহার্যে বেঁচে থাকো,
মিষ্টি-মধুর কান্নাকে করে ক্ষয়
আরো নির্দয় নির্মম হয়ে ডাকো;
কাকজোছনায় সকালের ভুল করা
তাঁদেরই তো সাজে যাঁরা নির্দোষ কবি,
আর সব প্রাণ হতাশায় ম্লান মরা
শূন্য হৃদয় বধির প্রতিচ্ছবি।

ওরে বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ নীল,
আহা প্রেয়সীর ভুরুর মতন তুই!
চিবুকের পাশে যেন তার কালো তিল
তেমনি আকাশে উড়ন্ত দেখি, ওই।
কখনো ভেবেছি খোঁপা বাধা কুন্তল
ডানার প্রান্তে যখন চষ্ণু গুজে
ঘুমাও তখন মনে পড়ে সেই ছল,
যে-জন আমারে চিরকাল ভুল বোঝে।

তুমি নগরের উত্তম নাগরিক,
ধূর্ত চতুর খেলো বুদ্ধির খেলা
অগোছালো যেন বিমর্ষ বিটনিক
কাটায় তিক্ত অসহ্য কালবেলা;
চোখ দু’টি তোর যেন বিয়ারের ফোটা
বন্ধু কৃষ্ণ করুণ কালের কাক,
কখনো হাওয়া, কখনো শূন্যে ওঠা
রাস্তার শিুশু চেয়ে থাকে নির্বাক।

ক্লান্তিতে প্রাণ ক্ষয় হয়ে গেলে, আমি
যখন ভাবছি বাচবো আবার কিসে?
জীবন তো চাই দুর্দম দ্রুতগামী,
তখন তুমিই উড়ে এসে কার্নিশে,
শোনাও তোমার সাহসী কন্ঠস্বর
অথবা দড়িতে বসে থেকে আড়াআড়িি
উচ্চকন্ঠে ফোটাও যে অক্ষর,
এতেই জীবন মনে হয় তরবারি।
-------------------------------------------------
৩. কাক
শামসুর রাহমান

গ্রাম্য পথে পদচিহ্ন নেই। গোঠে গরু
নেই কোনো, রাখাল উধাও,রুক্ষ সরু
আল খাঁ-খাঁ, পথপার্শ্বে বৃক্ষেরা নির্বাক
নগ্ন রৌদ্র চতুর্দিকে, স্পন্দমান কাক, শুধু কাক।
-------------------------------------------------
৪. কাকের ছায়া
শামসুর রাহমান
এলাটিং বেলাটিং (১৯৭৪), ছড়াসমগ্র

কাঠফাটা সেই দুপুরে
কাকটা গেল পুকুরে।
পানি খাওয়ার আমেজে
পুকুরপাড়ে নামে যে।
সরিয়ে ঝরা পাতাটা,
দেখে কাকের মাথাটা।

কে এল ফের দুপুরে
ভাগ বসাতে পুকুরে?
ঠুকরে মজা পানিকে
নিজের ছায়া খানিকে
তাড়িয়ে দিয়ে ঘুসিতে
নেচে ওঠে খুশিতে!
-------------------------------------------------
৫. কাক
নির্মলেন্দু গুণ

কাকের মুখে তুলে দিয়েছি নষ্ট ডিম,
এ নষ্ট জীবন আমি কার কাছে দেবো?
বাসন্তী কোকিল হতে গিয়ে
আমি ভুল করে হয়ে গেছি কাক।

অথবা ছিলাম কাক, অপরাধে এই জন্মে
নষ্ট ডিমের মত হয়েছি মানুষ।

এরকম নষ্ট মানুষ আমি কোথায় লুকাবো?
কার মুখে তুলে দেবো, জন্মান্তরে
ভুল হয়ে যাওয় এরকম মানুষিক কাক?
-------------------------------------------------
৬. কাক ও কোকিল
আল মাহমুদ

একবার এক শহুরে কাকের দলে
মিশে গিয়েছিলো গানের কোকিল পাখি
মনে ছিলো তার কোন মতে কোনো ছলে
শেখা যায় যদি জীবিকার নানা ফাঁকি।

শুধু গান ছাড়া বুদ্ধির নানা খেলা
শিখবে সে এই চালাক কাকের ভিড়ে,
পার হয়ে মহানগরীর অবহেলা
কন্ঠ সাধবে প্র‍ভাতের বুক চিরে।

কিন্তু বাতাসে ফিরে এলো ওর গান
জন জীবনের কোলাহলে ভয় পেয়ে
ধুলোয় হাওয়ায় কেবলি যে অপমান
কাকের কলহ আকাশের মন্দিরে।
কাকেরা যে বোঝেনা গানের ভাষা
রুক্ষ পালকে তীব্র‍ কন্ঠে হাসে
গানের পাখির নিভে যায় কত আশা
সবুজ পাহাড়ে একদিন ফিরে আসে।

মহুয়ার গাছে দুঃখের নানা শ্লোক
তারপর থেকে শোনা যায় রোজ রোজ
কার সঙ্গীতে কাঁপে অরণ্যলোক
কোন্ পক্ষীর হৃদয়ের নির্যাসে??
-------------------------------------------------
৭. দাঁড়ের কবিতা
সুকুমার রায়

চুপ কর্, শোন, শোন, বেয়াকুল হোস্‌নে-
ঠেকে গেছি বাপ্‌রে কি ভয়ানক প্রশ্নে!
ভেবে ভেবে লিখে লিখে বসে বসে দাঁড়েতে
ঝিম্‌ঝিম্ টন্‌টন্ ব্যথা করে হাড়েতে।
এক ছিল দাঁড়িমাঝি- দাড়ি তার মস্ত,
দাড়ি দিয়ে দাঁড়ি তার দাঁড়ে খালি ঘষ্‌ত‌‌।
সেই দাঁড়ে একদিন দাঁড়কাক দাঁড়াল,
কাঁকড়ার দাঁড়া দিয়ে দাঁড়ি তারে তাড়াল।
কাক বলে রেগেমেগে, “বাড়াবাড়ি ঐ ত!
না দাঁড়াই দাঁড়ে তবু দাঁড়কাক হই ত?
ভারি তোর দাঁড়িগিরি শোন বলি তবে রে-
দাঁড় বিনা তুই ব্যাটা দাঁড়ি হোস কবে রে?
পাখা হলে পাখি হয় ব্যাকরণ বিশেষে-
কাঁকড়ার দাঁড় আছে, দাঁড়ি নয় কিসে সে?
দ্বারে বসে দারোয়ান, তারে যদি দ্বারী কয়,
দাঁড়ে-বসা যত পাখি সব তবে দাঁড়ি হয়!
দূর দূর! ছাই দাঁড়ি! দাড়ি নিয়ে পাড়ি দে!”
দাঁড়ি বলে, “ব্যাস্ ব্যাস্! ঐখেনে দাঁড়ি দে!”
-------------------------------------------------
৮. কাক ডাকে
প্রেমেন্দ্র মিত্র

খাঁখাঁ রোদ, নিস্তদ্ধ দুপুর;
আকাশ উপুর করে ঢেলে-দেওয়া
অসীম শূন্যতা,
পৃথিবীর মাঠে আর মনে-
তারই মাঝে শুনি ডাকে
শুষ্ককন্ঠ কাক! 
গান নয়, সুর নয়,
প্রেম, হিংসা, ক্ষুধা-কিছু নয়,
সীমাহীন শূন্যতার শব্দমূর্তি শুধু।

মানুষের কথা বুঝি শুনেছি সকলই;
মনের অনেণ্যে যত হাওয়া তোলে
কথার মর্মর,
বেদনা ও ভালোবাসা
উদ্দীপনা, আশা ও আক্রোশ,
জেনেছি সমস্ত দোলা।
সব ঝড় পার হয়ে, আছে এক
শব্দের নীলিমা,
অন্তহীন, নিষ্কষ্প্র, নিমর্ল।

কোথায় কাদের ছাদে সমস্ত দুপুর
কাক ডাকে, শুনি।
বোঝা আর বোঝাবার
প্রাণান্ত ক্লান্তির শেষে
অবস্মাৎ খুলে যায় আশ্চর্য কবাট।
কাক ডাকে, আর,
সে শব্দের ধুধু-করা অপার বিস্তার
হৃদয়ে ছড়ায় সব শব্দের অতীত
ধ্যান-গাঢ় প্রশান্তির মতো।

আবার বিকেল হবে,
রোদ যাবে পড়ে
মানুষ মুখর হবে
মাঠে আর ঘরে।
বোঝাপড়া লেনদেন
প্রত্যহের প্রসঙ্গ প্রচুর
মন জুড়ে রবে।
ক্ষণে-ক্ষণে তবু সব সুর
কেটে দিতে পারে এক কাক-ডাকা গহন দুপুর।
সমস্ত অর্থের গ্রন্থি ধীরে ধীরে খুলে,
প্রত্যহের ভাষা তার সব ভার ভুলে,
উত্তরিতে পারে এক নিষ্কষ্প্র নিথর
নভোনীল অপার বিস্ময়ে।।
-------------------------------------------------
(১)
কাকেরা জানে শহরের খবর
ডাস্টবিনে বসে করে রাজনীতি।
তাদের চোখে রঙিন নয় কেউ
সবাই কালো, সবাই একরকম।

(২)
কাক বলে খবর আছে,
মেঘ জমেছে আকাশে।
বৃষ্টি আসবে ঝুম করে,
চল সবাই ঘরে ঘরে।

(৩)
কাক মামা কা কা কা 
ভাত খাবে না না না না
ভাত দিলে সে ডাকে চেঁচিয়ে
বলল একটু ঝাল দিও মিশিয়ে।
-------------------------------------------------

আপনার কাছে কাক নিয়ে লেখা কোনো ছড়া বা কবিতা থাকলে শেয়ার করুন। আমরা তা এই লেখায় অন্তর্ভুক্ত করব, যাতে সবাই উপভোগ করতে পারে।

শিল্পাচার্যের কাক


--- বাউল পানকৌড়ি
হাতি শব্দের হাতাহাতি: বাংলা প্রবাদ-প্রবচনের রঙিন ভাণ্ডার--Click to Read
















Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url