ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু গোল্ডেন বুট বা ট্রফি জয় নয়। এটি এমন কিছু গল্পের সমষ্টি, যেখানে কখনও কখনও একজন সাধারণ খেলোয়াড়ও হয়ে ওঠেন ইতিহাসের নীরব নায়ক। তাদের নাম হয়তো পোস্টার বা বিজ্ঞাপনে থাকে না কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয় তারাই।
বিশ্বকাপ জয়ের নায়করা যেমন মিডিয়ার আলোয় থাকেন তেমনি কিছু থাকেন দলের ছায়ার মতো। তাঁদের কাজ নিয়ে শিরোনাম হয় না কিন্তু সেই কাজ না থাকলে দলের চাকা অনেক সময় থেমে যেত। আজকে এমনই কিছু ‘আনসাং হিরো’ নিয়ে লেখা।
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই আমরা সাধারণত বড় নামগুলোকে মনে করি মেসি, রোনালদো, পেলে, জিদান। কিন্তু প্রতিটি বিশ্বকাপে এমন কিছু খেলোয়াড় থাকেন, যারা নীরবে ইতিহাস লিখে দেন। তারা হয়তো গোল্ডেন বল পান না, তাদের নিয়ে ট্রেন্ড হয় না।
কিন্তু তাদের একটি পাস, একটি সেভ বা একটি গোল পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দেয়। এই খেলোয়াড়রাই হলেন “আনসাং হিরো” ফুটবলের অদৃশ্য কিংবদন্তি।
ডিডি (ব্রাজিল, ১৯৫৮)
১৯৫৮ বিশ্বকাপে ১৭ বছরের এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, তার নাম পেলে। কিন্তু সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মাঝমাঠের আসল সুতোটা যার পায়ে ছিল, তিনি হলেন ওলদি আলভেস পেরেইরা, ফুটবল বিশ্ব যাকে ডিডি (Didi) নামে চেনে।
- কেন তিনি অনন্য: পেলে এবং গারিঞ্চাকে বল সাপ্লাই দেওয়ার মূল দায়িত্ব ছিল তার। মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত পাসিং এক্যুরেসির মাধ্যমে তিনি খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। শুধু পাসিংই নয়, ডেড-বল স্পেশালিস্ট হিসেবে তার ফ্রি-কিক নেওয়ার ‘ফোলহা সেকা’ (শুকনো পাতার মতো ড্রপ খাওয়া) টেকনিক প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকদের বোকা বানিয়ে দিত। ১৯৫৮ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল সেরা খেলোয়াড়ও (গোল্ডেন বল) হয়েছিলেন তিনি। অথচ আজ পেলে-গারিঞ্চার গ্ল্যামারের ছায়ায় ঢাকা পড়ে এই মহানায়কের নাম অনেকেই মনে রাখেনি।
হোর্হে বুরুচাগা (আর্জেন্টিনা, ১৯৮৬)
১৯৮৬ বিশ্বকাপ মানেই ডিয়েগো ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্য 'হ্যান্ড অব গড' কিংবা 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি'। কিন্তু ফাইনালের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের কথা ভাবুন। জার্মানি যখন ২-২ গোলে সমতা ফিরিয়ে এনে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার অপেক্ষায়, তখন ম্যারাডোনার পাস থেকে জয়সূচক গোলটি কে করেছিলেন? তিনি মিডফিল্ডার হোর্হে বুরুচাগা (Jorge Burruchaga)।
- কেন তিনি অনন্য: পুরো টুর্নামেন্টে ম্যারাডোনাকে বোতলবন্দী করার জন্য যখন প্রতিপক্ষের ৩-৪ জন ডিফেন্ডার কড়া পাহাড়ায় ঘিরে রাখত, তখন ফাঁকা জায়গা তৈরি করা এবং আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ সচল রাখার নিরলস কাজটি বুরুচাগাই করেছিলেন। ম্যারাডোনার ওপর থেকে ট্যাকটিকাল চাপ কমিয়ে দলকে ফাইনালে তোলা এবং শেষ মুহূর্তে স্নায়ু ধরে রেখে লক্ষ্যভেদ করে আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার আসল কারিগর ছিলেন তিনিই।
সালভাতোরে শিলাচি (ইতালি, ১৯৯০)
১৯৯০ বিশ্বকাপের আগে সালভাতোরে ‘টোটো’ শিলাচিকে ইতালির বাইরের মানুষ তো বটেই, খোদ ইতালির অনেক ফুটবলপ্রেমীও ভালো করে চিনতেন না। ইতালির স্কোয়াডে তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন স্রেফ একজন ব্যাক-আপ স্ট্রাইকার হিসেবে। কিন্তু টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, শিলাচি হয়ে উঠেছেন ১৯৯০ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিস্ময় বা ‘ওয়ান-হিট ওয়ান্ডার’।
- কেন তিনি অনন্য: অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই গোল করে ইতালির ত্রাণকর্তা বনে যান তিনি। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পুরো টুর্নামেন্টে জাদুকরী পারফরম্যান্স দিয়ে ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট (সর্বোচ্চ গোলদাতা) এবং গোল্ডেন বল (সেরা খেলোয়াড়) দুটিই জিতে নেন তিনি। রোবের্তো ব্যাজিও বা জিয়ানলুকা ভিয়ালির মতো বড় বড় তারকাদের ভিড়ে ইতালির 'ম্যাজিকাল নাইটস' (Notti Magiche)-এর আসল রূপকথার নায়ক ছিলেন এই শিলাচি।
গোলপোস্টের নিচের তিন নীরব দেয়াল
স্ট্রাইকাররা গোল করে হাততালি পান, কিন্তু গোলপোস্টের নিচে যারা নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দলকে বাঁচান, তাদের অবদান প্রায়ই আড়ালে চলে যায়।ফুটবলে গোল যারা করেন, তারা হয়তো খবরের শিরোনাম হন।
কিন্তু যারা গোল করা বা বাঁচানোর জন্য নিজেদের রক্ত-ঘাম ঢেলে দেন, তারা পান ফুটবলপ্রেমীদের চিরন্তন শ্রদ্ধা। এই আনসাং হিরোরা যদি নিজেদের উজাড় করে না দিতেন, তবে ফুটবল বিশ্বকাপের অনেক ইতিহাস আজ হয়তো সম্পূর্ণ অন্যভাবে লেখা হতো।
সের্জিও গোয়কোচিয়া (আর্জেন্টিনা, ১৯৯০)
১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার গল্প মানেই ম্যারাডোনার ভাঙা গোড়ালি আর লড়াকু ফুটবল। কিন্তু আর্জেন্টিনার আসল ত্রাণকর্তা ছিলেন তাদের ব্যাক-আপ গোলরক্ষক সের্জিও গোয়কোচিয়া (Sergio Goycochea), যিনি টুর্নামেন্টের শুরুতে সাইডবেঞ্চে বসে ছিলেন!
- কেন তিনি অনন্য: প্রথম চয়েস গোলরক্ষক নেরী পাম্পিডো গ্রুপ পর্বের ম্যাচে গুরুতর ইনজুরিতে পড়ায় হুট করেই মাঠে নামতে হয় গোয়কোচিয়াকে। এরপর তিনি পেনাল্টি শুটআউটে যা করেছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। কোয়ার্টার ফাইনালে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে এবং সেমিফাইনালে স্বাগতিক শক্তিশালী ইতালির বিপক্ষে টাইব্রেকারে একের পর এক পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি একাই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলেন। ম্যারাডোনার ছায়ায় ঢাকা থাকা সেই দলের তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই পর্দার আড়ালের মহানায়ক।
ক্লাউদিও তাফারেল (ব্রাজিল, ১৯৯৪)
ব্রাজিল ফুটবল মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সুন্দর আক্রমণাত্মক ফুটবল, পায়ের কাজ আর স্ট্রাইকারদের গোল উৎসব। কিন্তু ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দীর্ঘ ২৪ বছরের ট্রফি খরা কাটানোর পেছনে গোলপোস্টের নিচে আসল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ক্লাউদিও তাফারেল।
- কেন তিনি অনন্য: রোমারিও বা বেবেতোদের উজ্জ্বলতার আড়ালে ঢাকা থাকলেও তাফারেল ছিলেন দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভরসা। বিশেষ করে ফাইনালের টাইব্রেকারে ইতালির ড্যানিয়েল মাসারোর পেনাল্টি শটটি যেভাবে তিনি আটকে দিয়েছিলেন, তা ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। তার এই অতিমানবীয় সেভ ইতালির কিংবদন্তি রবার্তো ব্যাজিওর ওপর এতটাই মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছিল যে ব্যাজিও তার শেষ শটটি বারের ওপর দিয়ে মেরে বসেন। পুরো টুর্নামেন্টে রক্ষণভাগকে নেতৃত্ব দেওয়া তাফারেল ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আনসাং হিরো।
ফাবিয়েন বার্থেজ (ফ্রান্স, ১৯৯৮)
১৯৯৮ বিশ্বকাপে জিনেদিন জিদানের সেই ফাইনালে করা দুটি জাদুকরী গোল বা থিয়েরি অঁরিদের দুর্দান্ত উত্থানের গল্পে প্রায়ই ঢাকা পড়ে যায় ফ্রান্সের গোলপোস্টের নিচের মূল স্তম্ভটির নাম ফাবিয়েন বার্থেজ। পুরো টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্য সব সেভ করে ফ্রান্সকে তাদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন এই ক্যাচমাস্টার গোলরক্ষক।
- কেন তিনি অনন্য: ১৯৯৮ সালের পুরো বিশ্বকাপে ৭ ম্যাচ খেলে বার্থেজ গোল খেয়েছিলেন মাত্র ২টি, যা আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপে যৌথভাবে সবচেয়ে কম গোল খাওয়ার বিশ্বরেকর্ড। ফাইনালে ব্রাজিলের রোনালদো, রিভালদোর মতো ভয়ংকর আক্রমণভাগকে একাই হতাশ করেছিলেন তিনি। প্রতি ম্যাচের আগে ডিফেন্ডার লরেন্ট ব্লাঙ্ক কর্তৃক বার্থেসের ন্যাড়া মাথায় চুমু খাওয়ার দৃশ্যটি যেমন ফরাসিদের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক ছিল, তেমনি মাঠের পারফরম্যান্সে বার্থেজ ছিলেন ফ্রান্সের বিশ্বজয়ের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি।
ফুটবল ইতিহাসের অমলিন ছায়াপথ
ফুটবল ম্যাচ জেতায় ক্ষণিকের ঝলক বা ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, কিন্তু একটি পুরো টুর্নামেন্ট বা বিশ্বকাপ জেতায় দলীয় সংহতি আর পর্দার আড়ালের এই নীরব আত্মত্যাগ। ডিডি-বুরুচাগাদের নিখুঁত পাসিং কিংবা গোয়কোচিয়া, তাফারেল ও বার্থেজদের গোলপোস্টের নিচের অতিমানবীয় প্রাচীর না থাকলে হয়তো পেলে, ম্যারাডোনা বা জিদানদের অমরত্বের গল্পগুলো আজ অধরাই থেকে যেত।
ইতিহাসের পাতায় হয়তো সবার নাম সমান গুরুত্বে লেখা হয় না, ট্রফির সোনালী আলোয় ট্রিব্রিউনের পেছনের সারির নায়কেরা অনেক সময়ই আড়ালে হারিয়ে যান। তবে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে এবং ফুটবলীয় বিশ্লেষণে এই ‘আনসাং হিরো’রাই হলেন আসল কারিগর যারা খবরের শিরোনাম না হয়েও ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছেন, প্রচারের আলোয় না এসেও কোটি ফুটবল ভক্তের মুখে ফুটিয়েছেন বিজয়ের হাসি।
গ্ল্যামার আর রেকর্ডের ভিড়ে এই নীরব যোদ্ধাদের অবদান ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চিরকাল এক অমলিন ছায়াপথ হয়ে বেঁচে থাকবে। আপনার মতামত জানান: বিশ্বকাপ ইতিহাসের এই ৬ জন নায়কের মধ্যে কার গল্পটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে? কিংবা আপনার চোখে এমন কোনো গোলরক্ষক বা মাঠের খেলোয়াড় আছেন যাকে এই তালিকায় রাখা উচিত ছিল? কমেন্ট বক্সে আপনার প্রিয় ‘আনসাং হিরো’র নাম আমাদের সাথে শেয়ার করুন!
