চরণ কবি বিজয় সরকারের নির্বাচিত গান
বাংলা লোকসংগীতের মরমী ধারায় এক অনন্য নাম চরণ কবি বিজয় সরকার। প্রথম পর্বে তাঁর জীবনের সংগ্রাম, সাধনা ও শিল্পীসত্তার নানা দিক সম্পর্কে লেখা ছিল। অভিজ্ঞতা, প্রেম-বিরহ, আধ্যাত্মিকতা আর মানবিক বোধই তাঁর গানগুলোকে করেছে অনন্য ও চিরকালীন। এই পর্বে থাকছে আরও কিছু হৃদয়ছোঁয়া গান। যেখানে ভালোবাসার আকুতি যেমন আছে, তেমনি আছে না-পাওয়ার বেদনা, বিচ্ছেদের জ্বালা এবং ঈশ্বরের প্রতি আর্ত প্রার্থনা। বিজয় সরকারের গান শুধু শোনার জন্য নয় অনুভব করার জন্য। তাঁর প্রতিটি পংক্তিতে লুকিয়ে আছে জীবনের গভীর সত্য। আজও মানুষের হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। জয় হোক মরমী সাধকের জয় হোক বিজয় সরকারের গানের।
আধ্যাত্মিক অনুভব ও ভক্তিমূলক গান
১২.তুমি জানো নারে প্রিয়
১৩.আমার দুই নয়নে বহে ধারা গো
১৪.একটা চিঠি লিখি তোমার কাছে ব্যাথার কাজলে
১৫.আমি যারে বাসি ভালো সে কি রে তা জানে
১৬.আমার মনে মেনেছে, আমার জানে জেনেছে
১৭.কি সাপে কামড়াইলো আমারে
১৮.ওরে আমার সোনার ময়না পাখিরে
১৯.ওগো দেবতা ব্যথাহারি মোর
২০.আমার মনটারে বলি এ জীবনে দাগা ছাড়া আর কী
২১.আমি কৃষ্ণ বলিয়া ত্যাজিব পরাণ সইরে যমুনারই নীরে
২২. তারে আর কি ফিরে পাবো রে আমি যারে হারায়েছি
-(১২)-
তুমি জানো নারে প্রিয়
তুমি মোর জীবনের সাধনা
তোমায় প্রথম যেদিন দেখেছি
মনে আপন মেনেছি
তুমি বন্ধু আমার বেদন বুঝো না।
ফাল্গুন দোল পূর্ণিমায়
মৃদু মৃদু বায়ু বয়
ফুলবনে পুলকের আল্পনা
মাধুয়া মাধুবী রাতে বঁধুয়া তোমারি সাথে
করেছিনু যামিনী যাপনা।
(তুমি) আমায় ফেলে চলে গেলে
কি আগুন মোর বুকে জ্বেলে
একদিনও দেখতে তুমি এলে না
যদি পেতাম দুঃখিনীর কুটিরে
দেখাইতাম অন্তর চিঁড়ে
বুকের ব্যথা মুখে বলা চলে না।
কাষ্ঠ-নলে দাবানল
পুড়ে যায় বন জঙ্গল
মন পোড়া পিরিত বন্ধু তাহা নয়
কত বিরহীনির তুমি অন্তর তলে
বিনা কাষ্ঠে আগুন জ্বলে
জলে গেলে জ্বলে দ্বিগুণ
নিভে না– না নিভে না।
খুঁজিলাম জনম জনম
ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোম
কোনখানে পাইনে তোমার ঠিকানা
পাগল বিজয় বলে চিত্ত চোর
ফিরবে কি জীবনে মোর
মনে রইলে ব্যথা ভরা বাসনা।।
-(১৩)-
আমার দুই নয়নে বহে ধারা গো
আমি মুছব কত অঞ্চলে
প্রাণজ্বলে সে আর আসিবে গো
কলংকিনি না মরিলে।
নিশিতে সাজাইলাম রে বন্ধু
ফুলের বাসর ঘর
দেখতে অতি মহোহর বন্ধু
আমার ফুলের মালা হইলো বাসী
মালা দিব কার গলে
প্রাণ জ্বলে।
আসবে বলে প্রাণের বন্ধু (আমার)
রইলাম চেয়ে
আমার বন্ধু বিনোদিয়া বন্ধুরে
আমার বন্ধু বিনে সোনার যৌবন
মরিব সই অকালে
প্রাণ জ্বলে।
আমি বন্ধুর তালাশে যাব
প্রতি ঘরে ঘরে
বন্ধু রইল কার বাসরে
বন্ধুরে
পাগল ফকির ভানু কেন্দে বলে
আর কি পাব তাহারে।।
-(১৪)-
একটা চিঠি লিখি তোমার কাছে ব্যাথার কাজলে
আশা করি পরান বন্ধু আছো কুশলে
আগে নিও ভালোবাসা অবলার না বলা ভাষা
আমার যত গোপন আশা ভিজাইয়া দেই নয়ন জলে।
প্রথম যেদিন এসে তুমি মিলাইলে হাত
ফুটিল মনের বনে প্রেম পারিজাত
সেই বাসরে শুণ্যহিয়া আমি থাকি তবু পথ চাহিয়া
কান্দে আমার মন পাপিয়া গুঞ্জরিয়া বুকের তলে।
যে বকুলের তলায় বসে শুনেছিলাম বাঁশী
সেই বকুলের মুকুলেতে গন্ধে অলি হাসে
ছিঁড়ে গেছে গাঁথা মালা বুকে জ্বলে দারুন জ্বালা
কুলবধু হইলা একলা কান্দি বসে নিরালে।
ভুলে যাওয়া পথটি ধরে ভুল করে এসে
পার যদি দেখে যেও দিনের শেষে
(আমি) কেমন আছি পরের ঘরে দেখে যেও নয়ন ভরে
বনবিহঙ্গী থাকে যেমন বাঁধা শিকলে।
কি যে লিখি কি বা বাকি পাইনা খুঁজিয়া
অভাগিনীর মনের বেদন (তুমি) লও বুঝিয়া
চিঠি লিখি করি ইতি নিও আমার প্রেম পিরীতি
(অধম) রসিক বলে শেষ মিনতি চরণ কমলে।।
-(১৫)-
আমি যারে বাসি ভালো সে কি রে তা জানে
জানলে ব্যাথা অমন করে দিত না আর প্রাণে
আমি যার লাগিয়া সদাই কান্দি গো
কান্না পৌঁছায় না তার কানে।
এই জগতে ভালোবাসা আমার হলো না
ভালোবাসার বিনিময়ে মন কিছুই পেল না
আমি পরকে দিয়ে ভালোবাসা রে
ভুল করিলাম জীবনে।
পরকে ভালোবেসে আমার কান্না হলো সার
আমার চোখে জল দেখে [কেঁদ না ব্যথায়]
আমি যার কাছে যাই দেয় বেদনা
ব্যথা ভরা জীবনে।
বিজয় বলে ভালবাসা হলো না আমার
সারা জনম ঘুরে মনের মানুষ পেলাম না
আমি পরকে ভালোবেসে রে
ভুল করিলাম জীবনে।।
-(১৬)-
আমার মনে মেনেছে আমার জানে জেনেছে
আমার মনে মেনেছে আমার প্রাণে জেনেছে
তুমি আসবেনা
নয়নে ছাড়েনা তবু পথ চাওয়া।
মনে বলে আসবেনা সে,
নয়ন বলে আসে আসে গো
আমি দাঁড়ায়ে রই পথের পাশে
হলোনা ঘরে যাওয়া ।
বাদল ভরা বিলের মাঝে ছাড়া ভিটের পর
হিজল গাছ ভিজিছে বনে বৃষ্টি থরথর
ওরে পানশি নৌকায় খাটায়ে পাল
মাঝিমাল্লায় গায় ভাটিয়াল গো
হিজল ফুলের গন্ধে মাতাল
উদাসী উতল হাওয়া ।
নয়নে ছাড়েনা তবু পথ চাওয়
বাদল বায়ু মেতেছে তার প্রাণের গান গেয়ে
ধানের ক্ষেতে নেচেছে কোন দুলালি মেয়ে
আছে সবুজ ভরা যৌবন অঙ্গে
কবে মিলিবে সোনালি রঙ্গে
আমার জীবন-মিলন ভঙ্গে
বিরহ ব্যথায় ছাওয়া
নয়নে ছাড়েনা তবু পথ চাওয়া…
সরোবরে সরোজিনী মেঘলা প্রভাতে
দিবাকরের কর পরশ মাখে হিয়াতে
ওরে মেঘে যত করে বিলাস
তবু ছাড়েনা মিলন পিয়াস
আমারো তেমনি অভিলাষ
না পাওয়ার পরশ পাওয়া
নয়নে ছাড়েনা তবু পথ চাওয়া।
পাগল বিজয় বলে বিগত কাল বিস্মৃতির পরে
কোন অজানা কারনে আজি ফিরে চাই তারে
তারে রেখে কোন সুদূরে
আমি মত্ত আছি মর্ত্যপুরে
না পাওয়ার এক ব্যথার সুরে
আসার আশে গান গাওয়া
নয়নে ছাড়েনা তবু পথ চাওয়া।।
-(১৭)-
কি সাপে কামড়াইলো আমারে
ওরে ও সাপুড়িয়া রে
জ্বলিয়া পুড়িয়া মলেম বিষে
ওগো বিষ উঠাইছে।
বিষোনালে রক্তের সনে মিশে
ও সাপুড়িয়া রে
হাসনাহেনা হাসতেছিল
সন্ধ্যার আঁধারে
আমি তখন দাড়িয়া ছিলাম
ফুল গাছের ধারে
ওগো সাপ ছিলো
সেই ঝোপের আড়ালে
আগে পাই নাই দিসে
চিকন কালো সাপটিরে তাঁর
মাথায় মনি জ্বলে
হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে সাপ
ছিলো গাছের ডালে।
ওগো সাপ ছিলো সেই
ঝোপের আড়ালে
সখী সাপ ছিল সেই গাছের ডালে
আমি আগে পাই নাই দিসে
আগে যদি জানতাম আমি
বিষের এতোই তাপ
ঘর বাঁধিতাম হাওয়ায় দ্বীপে
যে দেশে নাই সাপ।
আমি ঘর বাঁধিলাম এই সাপের দেশে
ওঝার পরানি সে।
বিজয় বলে বিধির লেখন
খন্ডানো না যায়।
বনের বাঘে খাই না যারে
মনের বাঘে খাই।
এই ভবে যারে দংশিসে
কালো সাপে
সে বাঁচিবে কিসে
ও সাপুড়িয়া রে
জ্বলিয়া পুড়িয়া মলেম বিষে।।
-(১৮)-
ওরে আমার সোনার ময়না পাখিরে
তুই কোন ফাঁকে পালিয়ে গেলি
আমায় দিয়া ফাঁকি রে।।
বনের পাখি পুষেছিলাম মনেরই আশায়,
শুনিতাম তার সুখ দুঃখের গান সুমধুর ভাষায়;
তোরে সোহাগে সোনালি খাঁচায়
দিয়েছিলাম রাখিরে।।
বাটি ভরে খাবার দিতাম শোভন পিঞ্জরে
এখন তোর বিরহে আঁখিজল মোর রাত্র-দিন ঝরে;
আমি তোরে ছেড়ে কেমন করে
এমনভাবে থাকিরে।।
খালি খাঁচার দিকে যখন সজল চোখে চাই
আমার স্মৃতির তমাল শাখায় তোরে বসা দেখতে পাই
আমি তোর মুখ চেয়ে সব ভুলে যাই
পরান খুলে ডাকিরে।।
নদীর বুক শুকায়ে গেলে ভাটির টান লেগে,
দুকূল ভরে ওঠে আবার জোয়ারের বেগে।
ও তুই তেমনি মতো মনের বাগে
ফিরে আনবি না ফিরে।।
মানুষের হারায় না কিছু শুনলাম এতদিন,
সব হারানো সব ফিরে পায় আছে এমন দিন;
তুই বলতে পারিস সেই দিনের দিন
আর কয়দিন আছে বাকিরে।।
না পাওয়ার বেদনা আছে হৃদয় মোর ছেয়ে
তবু আশায় বুক বেঁধেছি যাতনা পেয়ে;
পাগল বিজয় আছে পথ চেয়ে
জল ভরা দুই আঁখিরে।।
-(১৯)-
ওগো দেবতা ব্যথাহারি মোর
থাকিও না আর ভুলিয়া
আশার বাণী কও আপন হাতে
দাও দেউল দুয়ার খুলিয়া।
কাঁদিছে বিশ্ব তোমারই কারণ
তোমা বিনা অশ্রু কে করে বারণ
তরুণ অরুনসম করুণা কিরণ
শ্রী করে দাও বুলিয়া।
সন্ধ্যার আঁধার ওই আসিল ঘিরে
পারের কান্ডারী তুমি অকূল নীরে
পাগল বিজয় কাঁদিছে দাঁড়ায়ে তীরে,
তরীতে লহ তুলিয়া।।
-(২০)-
আমার মনটারে বলি
এ জীবনে দাগা ছাড়া আর কী পেলি
আমার মনটারে বলি।
পেলি না তুই ভালবাসা,পেলি না তুই সুখ
সারাজনম পেলি শুধু ব্যথাভরা দুঃখ
ও তুই পরের জন্য কেঁদে কেঁদে বুকটা ভাসালি
আমার মনটারে বলি।
সুখ পেলি না সংসারে,তুই সুখ পেলি না বনে
সারাজনম কি করিলি ভেবে দেখনা মনে
ও তুই সুখের আশায় ঘর বাঁধিয়া বনে পালালি
আমার মনটারে বলি।
যাকে তুই ভালোবেসে বেঁধেছিলি ঘর
তারই তরে কেঁদে কেঁদে ছাড়িলি সংসার
ও তুই সুখের আশায় ঘর বাঁধিয়া বনে পালালি
আমার মনটারে বলি।
পাগল বিজয় বলে এমনি করে আমায় কাঁদালি
সর্বহারা করে আমায় পথে বসালি।
এখন আমার যাবার সময় হ’ল
বিধি কোথায় লুকাইলি।
-(২১)-
আমি কৃষ্ণ বলিয়া ত্যাজিব পরাণ
সইরে যমুনারই নীরে
কালা কাল বলে গিয়াছে চলে
সেই কালের শেষ নাহিরে।
যমুনারই নীরে
বাদল ঝরা পাগল আঁখি মানে না মানা
দিগাঞ্চলে মিশেছে সই দৃষ্টির সীমানা
করি যার লাগিয়া আনাগোনা।
সে এলো না ফিরে যমুনারই নীরে
মনের বনে ঘরের কোণে জ্বলে এক আগুন
কাল বৈশাখীর ঝরা পাতায় কাঁদিছে ফাল্গুন
সইরে মলয় পবন জ্বালায় দ্বিগুণ।
কালা বিরহীরে যমুনারই নীরে
শেষের দাবি রইলো সইরে ভুলিস না পাছে
শ্যাম বিরহে শ্যাম দুলালী প্রাণ ত্যাজিয়াছে
তোরা এই খবর দিস বন্ধুর কাছে।
আমার মাথার কিরে যমুনারই নীরে
কোন্ বিধাতা গড়ায়েছে এই ভালোবাসা
পাগল বিজয় বলে,এ যে শুধু আগুনের বাসা
সইরে যার ঘটে নাই এ দুর্দশা।।
-(২২)-
তারে আর কি ফিরে পাবো রে
আমি যারে হারায়েছি মনে ।
সে যদি আমায় দেখতে আশে গো
চিনবে কি দুই নয়নে রে ।
বাদল হাওয়া নিষ্ঠুর শ্রাবণ মেঘে ডাকা তারা
এমনি দিনে হারায়েছি আমার ঘরের চাঁদ ।
অসে আলোর ঝর্ণা আঁধারের বাকে গো
ঐ চাঁদ খুঁজি সারা ভুবনে ।
মণিমুক্তা হিরাকাঞ্চন না থাকিলে ঘরে
অর্থ হলে সবি মিলেরে দিন কয়েক পরে ।
অতার মন বিক্রয় হয় মনের দরে গো
সেই মন মিলেনা মনি-কাঞ্চনে ।
নদীর কূল ভাঙ্গিয়া গেলে পরে বালুর চর
ঘরের কূল ভাঙ্গিয়া গেলেরে আরকি পরে চর ।
অজার ভেঙ্গে গেছে স্বপ্নের ঘর গো
সে কেমনে ঘর বান্ধে চরে ।
আমি জীবনে যারে হারায়েছি পাব ফিরে আর
কিঞ্চিৎ মাত্র রইল সুধু প্রানের হাহাকার ।
পাগল বিজয়ের ছিঁড়ল বিনার তার
বিনা বাজেনা সুজন বিহনে ।
চরণ কবি বিজয় সরকারের গান মানেই জীবনের গভীর অনুভূতির এক অনন্ত ভাণ্ডার। এই সংকলনের প্রতিটি গানে যেমন প্রেম ও বিরহের বেদনাময় সুর ধ্বনিত হয়েছে, তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের অন্তর্গত আর্তি, আধ্যাত্মিক খোঁজ এবং না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। তাঁর ভাষা সহজ, কিন্তু ভাব গভীর। শ্রোতার হৃদয়ে নিঃশব্দে দাগ কেটে যায়। সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছু বদলে গেলেও তাঁর গান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ মানুষের হৃদয়ের ভাষা কখনো পুরোনো হয় না। এই সংকলন সেই চিরন্তন অনুভূতিরই এক ছোট্ট প্রতিফলন যেখানে ডুবে গেলে পাওয়া যায় নিজেরই গল্প। জয় হোক মরমী সুরের, জয় হোক চরণ কবি বিজয় সরকারের অমর সৃষ্টির।
