বৃক্ষ কথা’ ও একটি কালজয়ী গানের জনপ্রিয়তা
“মায়াবিনী কালসাপিনী মায়াবিনী কালনাগিনী মায়াবিনী রাক্ষসীনী” এই গানটা প্রথম শুনি হুমায়ূন আহমেদ এর “বৃক্ষ কথা” নাটকে। অনেকেই জানে না এই গানটা কার লেখা বা এই গানের অর্থ বা কি। জনপ্রিয় এই গানের অর্থ মর্ম আমিও জানি না। কিছু গান থাকে যা প্রথমবার শুনলেই মনের ভেতর এক গভীর হাহাকার বা কৌতূহল তৈরি করে।
হুমায়ূন আহমেদের ‘বৃক্ষ কথা’ নাটকে যখন প্রথম শোনা গেল “মায়াবিনী কালসাপিনী মায়াবিনী কালনাগিনী”, তখন থেকেই গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রহস্যময় ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে দেয়। অনেকেই হয়তো ভাবেন এটি কেবল একটি বিরহের গান, কিন্তু বাউল ও মরমি দর্শনের গূঢ় তত্ত্ব মিশে আছে এর প্রতিটি ছত্রে। এই গানের কথাগুলো আমাদের ভাবায় কে এই মায়াবিনী?
কেনই বা তাঁকে কালসাপিনীর সাথে তুলনা করা হয়েছে? এই গানটির স্রষ্টা কিংবদন্তি মরমি সাধক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ আবদুল হামিদ জালালি। সিলেটের এই গুনী শিল্পীর জীবন ও তাঁর সৃষ্টি করা এই কালজয়ী গানটির অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়েই আমাদের আজকের এই আয়োজন। বাউল দর্শনের এই অনন্য উপাখ্যান এবং গানের মূল লিরিক্স জানতে পড়ুন আজকের পুরো পোস্টটি।
কিংবদন্তি শাহ আবদুল হামিদ জালালি
শাহ আবদুল হামিদ জালালি (১৯৪৯-২০২৩) জন্ম তাঁর সিলেট জেলায়। ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মরমি ও বাউল গানের কিংবদন্তি। ২০ এপ্রিল ২০২৩ সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন ৭৪ বছর বয়সে। অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা ছিলেন তিনি।
“ঝাঁকে উড়ে আকাশ জুড়ে
দেখতে কী সুন্দর
জালালি কইতর
জালালের জালালি কইতর”
“দ্বীনের নবী মোস্তফায়
রাস্তা দিয়া হাঁইটা যায়
হরিণ একটা বান্ধা ছিল
গাছেরই তলায় গো”
গানের লিরিক্স: মায়াবিনী কালসাপিনী
মায়াবিনী কালসাপিনী
মায়াবিনী কালনাগিনী
মায়াবিনী রাক্ষসীনী...
জগৎ খেয়ে চেয়ে রই
জগৎ খেয়ে চেয়ে রই...
ভবে পুরুষ মরে ব্যভিচারে
নারী কিন্তু দোষী নয়...
ওরে এক নারী আমায় জন্ম দিলো
ও রেখে আপন উধরে,
আরেক নারী প্রেম যুগাইলো
যাইয়া রে বাসর ঘরে....
ও দেখো ঘরে ঘরে একি নারী
সারাজাহান ব্যাপী একই নারী
নারী চিনা ভীষণ দায়
খারাপের করলে সিজদা আল্লাহ্ নবী পাওয়া যায়...
কত মনিষী আওলিয়ারা
দেখো নারীর প্রেম এ মজিয়া
তারা রাস্তা পথে ঘুরিতেছে
তবিল হারা হইয়া..
দিশা হারা হইয়া..
ভবে সাপের বিষ জাড়িলে নামে
নারীর বিষ বিষম দায়..
খাইয়া নাগিনীর কামড়
কতজনা পাগল হয়...
দেখো শেখ সৈয়দ হিন্দু মুসলমান
একই মায়ের উধরে
তারা জন্মনিয়া সবাই
এই না ভবো সংসারে...
ভবে না জানিয়া নারীর সাধন
যে জনা নারী খেলায়
খাইয়া নাগিনীর কামড়
কতজনা পাগল হয়...
মায়াবিনী কালসাপিনী
মায়াবিনী কালনাগিনী
মায়াবিনী রাক্ষসীনী...
জগৎ খেয়ে চেয়ে রই
জগৎ খেয়ে চেয়ে রই...
ভবে পুরুষ মরে ব্যভিচারে
নারী কিন্তু দোষী নয়...
শাহ আবদুল হামিদ জালালির ‘মায়াবিনী কালসাপিনী’ গানটি কেবল কান জুড়ানো কোনো সুর নয়, বরং এটি মানুষের মনোজাগতিক ও আধ্যাত্মিক দ্বৈরথের এক গভীর দর্শন। বাউল দর্শনে নারীকে যেভাবে মা, প্রেমিকা এবং শক্তির রূপক হিসেবে দেখা হয়েছে, জালালি সাহেব তাঁর গানে সেই গূঢ় সত্যকেই তুলে ধরেছেন। হুমায়ূন আহমেদের জাদুকরী উপস্থাপনায় গানটি জনপ্রিয়তা পেলেও এর মূল শেকড় প্রোথিত আছে আমাদের মাটির মরমি ঐতিহ্যে।
এই গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জগতের মায়া আর মোহের আড়ালে আসল সত্যকে চেনাটাই মানুষের জীবনের বড় সাধনা। শাহ আবদুল হামিদ জালালির মতো মরমি কবিরা চলে গেলেও তাঁদের রেখে যাওয়া এই আধ্যাত্মিক সুরগুলো যুগ যুগ ধরে আমাদের অন্তরের অন্ধকার দূর করার পথ দেখাবে। মরমী এই সাধক ও বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির প্রতি রইলো আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
আধ্যাত্মিক দ্বৈরথ: মায়া ও মুক্তির সাধনা
মরমি–দর্শন, লোকবিশ্বাস, আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা আর মানবজীবনের তিক্ত মধুর অভিজ্ঞতা মিলেমিশে “মায়াবিনী কালসাপিনী” গানটিকে রূপ দিয়েছে এক অনন্য গীত সাহচর্যে। শাহ আবদুল হামিদ জালালির গানে নারী শুধুই চরিত্র নয় সে রূপকের ভাষা, জীবনের প্রবাহ, প্রলোভন ও মুক্তির দ্বৈত-সত্তা। তাঁর বাউল মন ভেবে দেখিয়েছে, মানুষের পতন বা উত্থানের দায় কোনো একক সত্তার নয়।
বরং সামগ্রিক সমাজ, অভ্যাস, কামনা আর আত্মার অপূর্ণতার যোগফল। ঠিক সেই কারণেই গানটির সুর ও কথায় কেবল অভিযোগ নেই, আছে প্রতীক, সতর্কবার্তা, জীবনের গভীর সত্য আর মানবিকতার আহ্বান। জালালির এই গান তাই কেবল একটি সংগীত নয় এ এক মরমি আয়না, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের ছায়াটুকু খুঁজে নিতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: 'মায়াবিনী কালসাপিনী' গানটির স্রষ্টা কে?
উত্তর: এই কালজয়ী গানটির স্রষ্টা হলেন কিংবদন্তি মরমি সাধক, বাউল শিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ আবদুল হামিদ জালালি। তিনি সিলেটের মাটি ও মানুষের কণ্ঠে এই গানটি রচনা ও সুরারোপ করেন।
প্রশ্ন ২: 'মায়াবিনী কালসাপিনী' গানটি কোথায় প্রথম শোনা যায়?
উত্তর: গানটি প্রথম ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে হুমায়ূন আহমেদের 'বৃক্ষ কথা' নাটকের মাধ্যমে। এই নাটকে গানটি ব্যবহারের পর এটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রহস্যময় ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে দেয়। তবে এর মূল শেকড় প্রোথিত আছে বাংলার মরমি বাউল ঐতিহ্যে।
প্রশ্ন ৩: গানটির মূল অর্থ বা বার্তা কী?
উত্তর: গানটি শুধু বিরহ বা অভিযোগের গান নয়; এটি আধ্যাত্মিক দ্বৈরথ, মায়া ও মুক্তির সাধনার এক গভীর দর্শন। এখানে 'নারী' শুধু চরিত্র নয়, বরং জীবনের প্রলোভন, কামনা, মোহ ও আত্মার অপূর্ণতার রূপক। গানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—
- জগতের মায়া-মোহের আড়ালে আসল সত্য চেনা কঠিন
- পতন বা উত্থানের দায় কোনো একক সত্তার নয়
- নারীকে মা, প্রেমিকা ও শক্তির রূপক হিসেবে দেখা হয়েছে
- 'পুরুষ মরে ব্যভিচারে, নারী কিন্তু দোষী নয়'—এটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন
প্রশ্ন ৪: গানটিতে 'কালসাপিনী', 'কালনাগিনী', 'রাক্ষসীনী'—এসব শব্দ দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: বাউল দর্শনে এই শব্দগুলো প্রলোভন ও মোহের প্রতীক। যেমন—
- কালসাপিনী/কালনাগিনী: জীবনের বিষাক্ত মায়া, যে মোহ মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়
- রাক্ষসীনী: সেই শক্তি যা মানুষকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়
- জগৎ খেয়ে চেয়ে রই: এই মায়া সমগ্র জগৎকে গ্রাস করে রেখেছে
তবে গানের শেষে বলা হয়েছে—'পুরুষ মরে ব্যভিচারে, নারী কিন্তু দোষী নয়'—যার অর্থ, পতনের দায় নারীর ওপর চাপানো ঠিক নয়; বরং এটি পুরুষের নিজের কামনা-বাসনা ও দুর্বলতার ফল।
প্রশ্ন ৫: শাহ আবদুল হামিদ জালালি কে ছিলেন?
উত্তর: শাহ আবদুল হামিদ জালালি (১৯৪৯-২০২৩) ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, মরমি গানের কিংবদন্তি ও বাউল শিল্পী। তিনি সিলেট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে বাউল ও মরমি গানের মাধ্যমে বাংলার লোকসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেন। ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রশ্ন ৬: শাহ আবদুল হামিদ জালালির অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গান কী কী?
উত্তর: তাঁর অসংখ্য কালজয়ী গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- "ঝাঁকে উড়ে আকাশ জুড়ে, দেখতে কী সুন্দর, জালালি কইতর"
- "দ্বীনের নবী মোস্তফায়, রাস্তা দিয়া হাঁইটা যায়"
- "মায়াবিনী কালসাপিনী"
এছাড়াও তিনি অসংখ্য বাউল ও মরমি গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন।
প্রশ্ন ৭: গানটিতে 'ভবে পুরুষ মরে ব্যভিচারে, নারী কিন্তু দোষী নয়'—লাইনটির অর্থ কী?
উত্তর: এই লাইনটি সামাজিক দ্বৈতমানের প্রতি এক গভীর পর্যবেক্ষণ। সমাজে প্রচলিত ধারণা যে নারীই পুরুষের পতনের কারণ—এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে জালালি বলেছেন, পুরুষ নিজের কামনা-বাসনা ও দুর্বলতার কারণে পথভ্রষ্ট হয়; নারীকে দোষী করা মানবিক নয়। এটি বাউল দর্শনের মানবতাবাদী চেতনার প্রতিফলন।
প্রশ্ন ৮: গানটির সাথে হুমায়ূন আহমেদের 'বৃক্ষ কথা' নাটকের সম্পর্ক কী?
উত্তর: হুমায়ূন আহমেদ তাঁর 'বৃক্ষ কথা' নাটকে এই গানটি ব্যবহার করেন, যা গানটিকে এক অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা দেয়। হুমায়ূন আহমেদের জাদুকরী উপস্থাপনায় গানটি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। তবে গানটির মূল শেকড় ও দার্শনিকতা সম্পূর্ণভাবে শাহ আবদুল হামিদ জালালির নিজস্ব সৃষ্টি।
প্রশ্ন ৯: গানটি কি শুধু বিরহের গান?
উত্তর: না, গানটি শুধু বিরহের গান নয়। এটি আধ্যাত্মিক দ্বৈরথ, মায়া ও মুক্তির সাধনার এক গভীর দর্শন। জালালি তাঁর বাউল মন দিয়ে দেখিয়েছেন—
- মানুষের পতন বা উত্থানের দায় কোনো একক সত্তার নয়
- বরং সামগ্রিক সমাজ, অভ্যাস, কামনা ও আত্মার অপূর্ণতার যোগফল
- এই গানে অভিযোগের পাশাপাশি আছে প্রতীক, সতর্কবার্তা, জীবনের গভীর সত্য ও মানবিকতার আহ্বান
প্রশ্ন ১০: শাহ আবদুল হামিদ জালালি কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
উত্তর: শাহ আবদুল হামিদ জালালি আজও প্রাসঙ্গিক কারণ—
- তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা—স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন অংশীদার
- তিনি বাংলার মরমি ও বাউল গানের ঐতিহ্যকে ধারণ ও বিকাশ করেছেন
- তাঁর গানে ফুটে উঠেছে মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আধ্যাত্মিক সত্য
- 'মায়াবিনী কালসাপিনী'-র মতো গান আজও নতুন প্রজন্মকে ভাবায়, প্রশ্ন জাগায়
- তিনি প্রমাণ করেছেন, সাধারণ মানুষের কণ্ঠেও লুকিয়ে থাকে অসাধারণ দার্শনিক চেতনা


