চারণ কবি কবিয়াল বিজয় সরকার ও তাঁর গান: ফিরে আসার আশা নাইরে জলে ভাসা ঘর- পর্ব-১
কবিয়াল বিজয় সরকার নড়াইলে জন্ম নেওয়া দক্ষিণবঙ্গের এক প্রবাদতুল্য কবিয়াল। তাঁর গান আজও মতুয়া সম্প্রদায় যারা মূলত নমশুদ্রদের একটি সহজিয়া মত ভক্তিভরে গেয়ে থাকে এবং পথচলায় অনুপ্রেরণা হিসেবে মানে। বিজয় সরকার বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবিয়াল ও বিচ্ছেদী গানের রচয়িতা। জন্মেছিলেন ১৩০৯ বঙ্গাব্দের ৭ই ফাল্গুন (২০ ফেব্রুয়ারি ১৯০৩) নড়াইল জেলার ডুমুদী গ্রামে। একটি নমঃশুদ্র পরিবারে। জন্মের সময় তাঁর পৈত্রিক নাম ছিল বিজয়কৃষ্ণ বৈরাগী। পরবর্তীতে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বিজয়কৃষ্ণ পদবী পরিবর্তন করে বিজয় অধিকারী নাম গ্রহণ করেন। কবিয়াল হিসেবে খ্যাতি অর্জনের পর সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হন বিজয় সরকার নামে। বিজয় ছিলেন পিতামাতার শেষ সন্তান। মা হিমালয় দেবী তাঁর যত্ন নিতে পারতেন না। বড় বোন স্নেহে বড় হন। শিক্ষার সূচনা স্থানীয় পাঠশালা ও হোগলাভাঙ্গা ইউ.পি স্কুলে ভর্তি হয়ে নেপাল পণ্ডিতের তত্ত্বাবধানে যাত্রা ও সঙ্গীত শিখতে থাকেন।
কিশোর বয়সেই অনন্ত মাহাত্ম্য যাত্রায় অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন। হোগলাভাঙ্গা ও বাঁশগ্রাম স্কুলে পড়াশোনা করার সময় তিনি স্থানীয় যাত্রাদলে অভিনয় ও গান চর্চা করেন। এই সময়ে পুলিনবিহারী ও পঞ্চানন মজুমদারের সঙ্গে পাঁচালি গানে পাল্লা দিয়ে তিনি সঙ্গীত জগতে নাম লেখান। ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর পিতার মৃত্যু হয়। সংসার চালানোর জন্য শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির সঙ্গে যুক্ত হন। একবার ফরিদপুরে মনোহর সরকারের সঙ্গে কবিগানের পাল্লা দিতে গিয়ে বিজয়ের কণ্ঠের সৌন্দর্য মনোহরকে মুগ্ধ করে। এরপর মনোহর সরকারের কাছে কবি গান শেখা শুরু করেন। ১৯২৯ সালে নিজস্ব কবিগান দল গঠন করেন। প্রথমে ভেন্নাবড়ি গ্রামের মহিম সরকারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। সুমধুর কণ্ঠ ও দক্ষতার কারণে অনেক পুরনো দল তাঁর অনুসারী হয়ে যান। এরপর বরিশালের নকুল সরকারের সঙ্গে মিলে আড়াই বছর কবিগান চর্চা করেন। বিজয় সরকারের জীবদ্দশায় প্রায় ৪০০ উপরে গান রচনা করেন। তাঁর গানগুলোতে শাস্ত্রীয় এবং লোকধর্মের সংমিশ্রণ পাওয়া যায়।
১৩৪২ বঙ্গাব্দে (১৯৩৫-৩৬) বরিশালের শশিভূষণ পাণ্ডের কন্যা বীণাপাণিকে বিবাহ করেন। তাঁদের কন্যা কানন বালা (বুলবুলি) ও মঞ্জুরাণী জন্মগ্রহণ করেন, তবে মঞ্জুরাণীর শৈশবেই মৃত্যু ঘটে। ১৩৫৩ বঙ্গাব্দে (১৯৪৬) রমেশচন্দ্র বিশ্বাসের কন্যা প্রমদা বিশ্বাসকে বিবাহ করেন। তাঁদের দুটি পুত্র সন্তান কাজল অধিকারী ও বাদল অধিকারী। বিজয় কবিগানের মাধ্যমে ভালো অর্থ উপার্জন করতেন। প্রথমে বাংলাদেশে এবং পরে পশ্চিমবঙ্গে জমি ক্রয় করেন। বিজয় সরকারের আধ্যাত্মিক জীবন ছিল অত্যন্ত বহুমুখী। তিনি মতুয়া, খেজুরতলা মত এবং বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। ইসলামিক জিকিরেও অংশগ্রহণ করতেন তবে কখনো মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না। কৃষ্ণকে মনে স্থান দিয়ে বৈষ্ণব ধর্মে তাঁর আস্থা ছিল। সর্বধর্মে বিশ্বাসী হওয়ায় তিনি অসম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী হিসেবে মানুষের কাছে একজন আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে সম্মানিত ছিলেন। কবিয়াল বিজয় সরকারের সাখে জগৎ বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ছলি গভীর বন্ধু। শিল্পী সুলতান তাঁর সাথে তাঁর গানে বাঁশি বাজিয়েছিলেন জানা যায়।
বিজয় সরকার প্রায় ৫৫ বছর সঙ্গীতসাধনা করেছেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলা একাডেমী ও শিল্পকলা একাডেমীতে সঙ্গীত পরিবেশন করে বহু পুরষ্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। শেষ জীবনে অন্ধ হয়ে যান। কলকাতা ও ভারতের বিভিন্ন চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা করান কিন্তু সুফল পাননি। পরে কন্যা কানন বালার বাসায় এসে ১৩৯২ বঙ্গাব্দের ১৮ই অগ্রহায়ণ (৪ ডিসেম্বর ১৯৮৫) রাত ১০:৫৫ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন বাংলা কবি গানের কিংবদন্তি বাংলার চারণ কবি কবিয়াল বিজয় সরকার। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
১.আষাঢ়ের কোন ভেজা পথে এল ও এলরে
২.এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনি ঠিক রবে
৩.আমি জানিতে চাই দয়াল তোমার
৪.পোষা পাখী উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে
৪.পোষা পাখী উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে
৫.কোন দেশেতে যাব গুরু যাব আমি তোমার সন্ধানে
৬.ক্ষ্যাপারে পাগলরে ভাব না জেনে পীরিত করো না
৭.ক্ষ্যাপারে পাগলরে তোর আপন ঘরে বেঁধেছে গোলমাল
৮.জাতি বলতে কি বুঝলে পণ্ডিত মশাই
৯.নকশী কাঁথার মাঠে রে সাজুর ব্যথায় আজো কাঁদে
১১.যার অন্তরে লেগেছে সই কৃষ্ণপ্রেম পিরিতির রেখা
১১. কবে আমার তীরে ভিড়াবে নাও ধীরে ধীরে বাইয়া রে
-(১)-
আষাঢ়ের কোন ভেজা পথে এল ও এলরে
এলো আবার ঘর ভাঙ্গা শ্রাবণ।
এমনি দিনে লেগেছে মনের কোলে ভাঙ্গন
এলো আবার দুরন্ত শ্রাবণ।
চুর্নি নদী ঘূর্ণি পাকে যেথায় পড়ল চর
সেই চরেতে বেধে ছিলাম বসতি এক ঘর
সেই ঘর ভেসে গেল দিন কয়েক পর
এসে এক প্লাবন ।
ছাওয়া ছারা ভিটে হিজল গাছে জল পরি কন্যা
উদাস চোখে চেয়ে দেখ শ্রাবনের বন্যা
আমি কান্দি তাহার কান্দন
তার কি নাই কান্দন ।।
মেঠো আগুন নেবে রে জলের ছিটে লেগে
রাবনের চিতে নিভেনা শ্রাবনের মেঘে
সেই আগুন জলে
দ্বিগুন বেগে দুঃসহ দাহন।
শ্রাবণ ঐ আসিল ফিরে একটি বছর পর
ফিরে আসার আশা নাইরে জলে ভাসা ঘর
পাগল বিজয় বলে
এমনও তার বিধাতার বাঁধন।।
-(২)-
এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনি ঠিক রবে
সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে
যখন নগদ তলব তাকিত পত্র নেবে আসবে যবে
মোহ ঘুমে যে দিন আমার মুদিরে দুই চোখ
পাড়াপড়শী প্রতিবেশী পাবে কিছু শোক
তখন আমি যে এই পৃথিবীর লোক ভুলে যাবে সবে
যতো বড় হউকনা কেন রাজা জমিদার
পাকা বাড়ি জুড়ি গাড়ি ট্রানজিস্টার
তখন থাকবে না কোন অধিকার বিষয় ও বৈভবে
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা আকাশ বাতাস জল
যেমন আছে তেমনি ঠিক রইবে অবিকল
মাত্র আমি আর থাকবোনা কেবল জনপূর্ণ ভবে
শব্দ স্পর্শ রূপ রস গন্ধ বন্ধ হলো যেন
এই পৃথিবীর অস্বস্তি বোধ থাকবেনা আর হেন
পাগল বিজয় বলে সেই দিন যেন এসে পড়ে কবে।।
-(৩)-
আমি জানিতে চাই দয়াল তোমার
আসল নামটি কি
আমরা বহুনামে ধরাধামে
কত রকমে ডাকি
কেউ তোমায় বলে ভগবান
আর গড কেউ করে আহ্বান
কেউ খোদা কেউ জিহুদা
কেউ কয় পাপীয়ান
গাইলাম জনম ভরে মুখস্থ গান
মুখ বুলা টিয়াপাখী
সর্বশাস্ত্রে শুনিতে যে পাই
দয়াল তোমার নাকি মাতাপিতা নাই
তবে তোমার নামকরন কে করলে সাঁই
বসে ভাবি তাই
তুমি নামি কি অনামি সে সাঁই
আমরা তার বুঝি বা কি
কেহ পিতা কেহ পুত্র কয়
আবার বন্ধু বলে কেউ দেয় পরিচয়
তুমি সকলেরই সকল আবার
কারো কেহ নয়
তোমার দেওয়া আসল পরিচয়
কে জানে তা কি না কি
বিজয় বলে মনের কথা কই
আমি খাঁটি ভাবের পাগল নই
আমার গোল বেঁধেছে মনের মাঝে
তাতেই পাগল হই
আমার বুকে যা আই মুখে তা কই
কাঁটা কান চুলে ঢাকি।।
-(৪)-
পোষা পাখী উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে
সে আমারে ভুলবে কেমনে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে
খেলতো পাখী সোনালী খাঁচায়
কতো কি বলিতো আমায়
বসে রূপালী আড়ায়
স্ফটিকের বাতি ভরে খাবার দিতাম থরে থরে
নিঠুর পাখী আমার খেলতো আনমনে
জংলি পাখী করলো সর্বনাশ
শুধু করি হাই হুতাস
কোথায় করবো তারে তালাশ
বনের পাখী বনে গেল
দিল আমার বুকে শেল
নিঠুর পাখী আমার গেল কোন বনে
আমি পাখীর মায়া ভুলবো কেমনে
পাখীর মায়ায় পড়ে কতো লোক
তারা পেল আমার মত শোক
তাদের জল ভরা দুই চোখ
অসীম গহীন বনের পাখী
(তারে) আপন বলে কেন ডাকি
পাগল বিজয় কান্দে পাখীর সন্ধানে
পাগল বিজয় কান্দে বসে বিজনে।।
-(৫)-
কোন দেশেতে যাব গুরু
যাব আমি তোমার সন্ধানে
জনম আমার গেল বিফলে
আমায় মানবকুঞ্জে কনে বা পাঠালে
বহুজনম করিয়ে এমন তবুও হলনা স্মরণ
শুধু মায়ারই কারণ
আমার এ জনম বিফলে গেল
কৃষ্ণ সেবায় না লাগিল
আমার এ দুঃখ কি যাবে মরিলে
ভাই-বন্ধু-পুত্র পরিজন
তারা ভাবে না কখন
আমি ভাবি সর্বক্ষণ
যাবে ভাবিলে হয় চির শান্তি
জীবনে কেটে যায়রে মোহশান্তি
তারে পুজলেম না
দুই নয়নের জলে
সাধু গুরুর চরণ ধৌত জল
শুনি সর্ব তীর্থের ফল
কবে করিব সম্বল
শুধু এ করিও দান বন্ধু
নয়নে আসে যেন জল একবিন্দু
সে জলে দেব আমি
সাধু গুরুর চরণ যুগলে
আমার বৃথা এই জনমে
পাগল বিজয় বলে মন ইন্দ্রিয়রে
তুই রইলি মোহ অন্ধকারে
সাধু গুরুর কৃপা হলে
কত প্রেম ফল ফলে।।
-(৬)-
ক্ষ্যাপারে পাগলরে ভাব না জেনে পীরিত করো না,
এবার সুহৃদ চিনে করো পীরিত কোন অভাব রবে না
মানুষ চিনবি রয়ে সয়ে শাহ স্নিগ্ধ স্বভাব লয়ে
দুগ্ধ হোসেন মুগ্ধ হয়ে দুগ্ধে দিয়ে গোচনা
মধু হয় না বল্লার চাকে, ইলিশ মাছ কি বিলে থাকে
কিলাইলে কি কাঁঠাল পাকে, সব লোকের জানা
সুজন সাথে না করলে পীরিত, হিতে ফল ফলবে বিপরীত
নষ্ট হবে মানব চরিত চোখ থাকতে হবে কানা
প্রেম গাছে চড়িস না শখে ঝাঁকমারি করিস না ঝোকে
কামড়াবে শুধু মৌপোকে, মধু মিলবে না,
ডাল ভাঙিয়া তলায় পলে জনম তোর যাবে বিফলে
যেমন চিনিত ভরা ডুবলে জলে কোন কাজে লাগে না
পীরিত করে লাইলী মজনু, বিষাম প্রেমে ভরা তনু
তবুতে নাই অতনু প্রেমের দেওয়ানা
চণ্ডিদাস পীরিত করে এক মরণে দুইজন মরে
এমন পীরিত যেজন করে মরলেও প্রেম ছোটে না
গুণে কর্মে সমান দু\’জন মিলবে সু-জনে সুজন
প্রেম নদীতে ধরবি উজান তীরে ফিরবি না
বেঁধে রাখবি কাল কৌশলে মাওঙ্গ মাকড়সার জালে
পাগল বিজয় বলে এই কপালে ঘটলো কই সে সাধনা।।
-(৭)-
ক্ষ্যাপারে পাগলরে তোর আপন ঘরে বেঁধেছে গোলমাল,
এবার পরের ঘরে গেছেরে তোর নিজের ঘরের মালামাল
তোর বসত করা ঘরের মধ্যে ছয়জন ফেরে তোর বিরুদ্ধে
একাকী তাহাদের যুদ্ধে পারবি নারে বেসামাল
দশজন তোর বাহির দরজায়, ছয়জন তোর ভিতর কামরায়
বিষয়ের বিষ-দাঁতে কামড়ায় মোহের মহাকাল,
ওঝা আছে পরতন্ত্রে, বিষ চলে তার চালান মন্ত্রে
ষড় রিপুর ষড়যন্ত্রে সব করে দিলো পয়মাল
বাহিরে বীরত্ব ভারি, ভিতরে প্রবাল অরি
তোর দিয়ে নাকে দড়ি ঘুরায় চিরকাল,
বিষয় বিষে হয়ে মত্ত, জাগলোনা আর আত্মতত্ত্ব
ভুলে গেলি পরস্বার্থ কেবল স্বার্থের ঝামাল
টাকা পয়সা সিন্ধুক ভরা পার হইতে তোর নাই এক কড়া
ঘাটের মাঝি ভীষণ কড়া দূরন্ত ভয়াল,
ধূলায় দিয়ে গড়াগড়ি কুড়ায়ে লও পায়ের কড়ি
শ্রীগুরুর চরণে পড়ি নিজেরে করো সামাল
অজানা এই সংসারপুরে, পথ না চিনে মরলি ঘুরে
পড়ে গেছিস অনেক দূরে, এলো সন্ধ্যা কাল,
মোহে মুগ্ধমহীতলে দগ্ধচিত্তে বিজয় বলে
বাস করলি বাঁশ গাছের তলে ত্যাগ করে কৃষ্ণ তমালা।।
-(৮)-
জাতি বলতে কি বুঝলে পণ্ডিত মশাই
দেখি জগতে এক মানব জাতি
দুই ভাগে বিভক্ত তাই।।
ব্ৰাহ্মণ ক্ষৈত্র বৈশ্য শুদ্ৰ কেহ বৃহৎ কেহ ক্ষুদ্র
আবরণে ইতর ভদ্র গুন কর্ম অনুযায়ী
কেহ ওঠে বহু উচে কেহ পড়ে অনেক নীচে
গুনের মাত্ৰ জাতি আছে গুনীর কোন জাতি নাই।।
আৰ্য সন্তানের জাতিভেদ সমাজে আনিলো বিভেদ
উপনিষদ দর্শন কি বেদ জাতিভেদের কথা নাই
জাতিভেদ মেনে হিন্দুদল দিনের দিন গেলো রসাতল
জাতাজাতির এই যাঁতাকলে কেমনে এড়ায়ে ভাই।।
জন্মে যতো ঘটে দুর্নাম কর্মে বাড়ে মানুষের দাম
জাবালার পুত্র সত্যকাম পিতার ঠিক ঠিকানা নাই
বলিষ্ঠ গনিতাত্মজ পরাশর চণ্ডাল রক্তজ
মেছনির পুত্র জারজ বেদের কর্তা ব্যাস গোঁসাই।।
হিন্দুর এই হিংসা বিদ্বেষে বিষম বিষে
জাতির জীবন বাঁচবে কী সে বসে বসে ভাবি তাই
ঠুনকো জাতি চরাচরে আজ হয় না কাল ভাঙ্গবে পরে
পাগল বিজয় বলে বিষাদ ভাবে
জাতিভেদের মুখে ছাই।।
-(৯)-
নকশী কাঁথার মাঠে রে সাজুর ব্যথায় আজো কাঁদে
রূপাই মিয়ার বাঁশের বাঁশি
তাঁদের আশার বাসা ভেঙে গেছে রে
তবু যায় নি ভালোবাসাবাসি
কতো আশা বুকে নিয়ে বেঁধেছিলো ঘর
কতো সুখে মিশেছিলো মিলনমঞ্চপর
হঠাৎ আসিয়া এক বৈশাখী ঝড় রে
সে ঘর কোথা গেলো ভাসি
সাজুর কবরের এক পাশে নকশী কাঁথা গায়
রূপাই মিয়া শুয়ে আছে মরণের শয্যায়;
তারা আছে চির নীরবতায় রে
তাদের দুইটি হিয়া পাশাপাশি
অকরুণ দারুণ বিধি বিচার তোর কেমন
তোর বুঝি ভালোবাসার কেউ নাহি রে এমন;
তাই তে বুঝিস না তুই বিরহীর মন রে
হারে কেমন তাদের কান্নাহাসি
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বেদনার ছায়ায়
নকশী কাঁথা লিখেছে তার মনেরি মায়ায়;
ভাবুক কবিগণ আনে কল্পনায় রে
যতো সত্য লোকের তত্ত্বরাশি
নকশী কাথাঁর মাঠে লোকে আজো শুনতে পায়
সাজুর ব্যথার রূপাইমিয়া বাঁশরি বাজায়;
পাগল বিজয় বলে, পরানে চায় রে।।
-(১০)-
যার অন্তরে লেগেছে সই
কৃষ্ণপ্রেম পিরিতির রেখা
ও তার লোভ মেটেনা ক্ষো়ভ ছুটেনা
যেমন ওঠেনা পাষাণের লেখা।।
জ্বলিছে মরম ব্যথায়,
বলিতে পারে না কথায়,
কী ব্যথা সে জানে একা;
তার বুক ফেটে যায় মুখ ফোটে না
যেমন বোবা লোকের স্বপ্ন দেখা।।
বাহিরে যত জল ঢালো
অন্তর পুড়ে হয় তার কালো
এমনি সে অগ্নির দাহিকা;
যেমন কলের জাহাজ জলে চলে
তার বুকে জ্বলে অগ্নিশিখা।।
মুখ দেখে দুঃখ বুঝে লবে,
এমন দুঃখ দরদি কেউ নাই ভবে
বিনা সেই মরম সখা;
আমি বুক চিরে দুঃখ দেখাইতাম
যদি পেতাম সেই নিঠুরের দেখা।।
বুকে মেরে মিছরির ছুরি,
মম পরান করে চুরি
প্রেম পিরিতির এমনি ঠেকা;
পাগল বিজয় বলে ভালোবেসে শেষে
সাজিলাম দুনিয়ার ন্যাকা।।
-(১১)-
কবে আমার তীরে ভিড়াবে নাও
ধীরে ধীরে বাইয়া রে
ওরে আমার জীবন নদীর নাইয়া রে
বের হইয়াছি সেই যে ভোরে আমি ধরণীর ধূলে
খেলা করে বেলা গেল দয়াল তোমারে ভুলে
এখন দিনের শেষে নদীর কূলে
আমি রয়েছি দাঁড়াইয়ারে
ওরে আমার জীবন নদীর নাইয়া রে
ষোল আনা তবিল নিয়ে করেছি কারবার
জমা শূন্য খরচ বেশি হয়েছে বারবার
আমার হিসাবের আর নেই সারবার,
দেখেছি মিলাইয়া রে
ওরে আমার জীবন নদীর নাইয়া রে
নিজের হাতে নিজের বিপদ নিয়েছি গড়ি
নদীর কূলে কাঁদি এখন বিপদে পড়ি
আমি দীন ভিখারী পারের কড়ি
ফেলেছি হারাইয়া রে
ওরে আমার জীবন নদীর নাইয়া রে
সাথি যারা গেছে তারা ফেলিয়া আমায়
এখন শুধু বসে আছি দয়াল তোমারি আশায়
তুমি কাঙাল বলে এই অভাগায়
দিওনা ফিরাইয়া রে
ওরে আমার জীবন ও জীবন নদীর নাইয়া রে।
পাগল বিজয় বলে আছি আমি এ ভবেরই কূলে
কবে এসে নাবিক বন্ধু আমায় নেবে যে তুলে
আমার পারের তরী নেবে খুলে
গনের লগন পাইয়া রে।।
বিজয় সরকার শুধু একজন কবিয়াল ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ। তাঁর গান ও দর্শন এখনও বাংলাদেশের সঙ্গীত ও সাহিত্য জগতে প্রভাব ফেলছে। নড়াইলে প্রতিষ্ঠিত বিজয় সরকার ফাউন্ডেশান তাঁর জীবন ও গানের উপর গবেষণা ও সংরক্ষণ করে চলেছে।
গগন হরকরা যার গানের সুরে আমার সোনার বাংলা---Click to Read
Read on mobile
