কিংবদন্তি লাকী আখন্দের পূর্ণ ডিস্কোগ্রাফি ও সংগীত জীবন
বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে কিছু নাম আছে যাদের অবদান সময়ের সীমা পেরিয়ে আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। তেমনই একজন কিংবদন্তি শিল্পী লাকী আখন্দ। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সুরকার, সংগীত পরিচালক ও গায়ক। সত্তর ও আশির দশকের সংগীতজগতে আধুনিক সুর, ব্যতিক্রমী সংগীতায়োজন এবং গভীর আবেগঘন গায়কীর মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজের স্বতন্ত্র এক পরিচয়। ১৯৫৬ সালের ১৮ জুন পুরান ঢাকার পাতলা খান লেনে জন্ম নেওয়া এই বরপুত্র খুব অল্প বয়সেই সংগীতের পথে হাঁটা শুরু করেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে সংগীতের হাতেখড়ি নেওয়া লাকী আখন্দ পরবর্তীতে শিশু শিল্পী হিসেবে রেডিও ও টেলিভিশনে নিয়মিত অংশ নেন। কৈশোরেই তিনি এইচএমভি পাকিস্তান ও এইচএমভি ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে লাকী আহমেদ ছদ্মনামে গান প্রচার করে দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণাও জুগিয়েছেন।
লাকী আখন্দের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তাঁর ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দ। দুই ভাই মিলে বাংলা গানে সৃষ্টি করেছিলেন এক অনন্য যুগল অধ্যায়। ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ কিংবা ‘কে বাঁশি বাজায় রে’ এমন বহু জনপ্রিয় গানের নেপথ্যে ছিল এই দুই ভাইয়ের অসাধারণ সুর-যাত্রা। বিশেষ করে ‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত গানগুলো সেই সময়ের শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়। ১৯৮৪ সালে সারগাম ব্যানারে প্রকাশিত লাকী আখন্দের প্রথম একক অ্যালবাম ‘লাকী আখন্দ’ বাংলা সংগীতের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে ওঠে। তবে এই উজ্জ্বল পথচলা থমকে যায় ১৯৮৭ সালে যখন মাত্র ২৭ বছর বয়সে হ্যাপী আখন্দের আকস্মিক মৃত্যু লাকী আখন্দকে ভেঙে দেয় ভেতর থেকে। প্রিয় ভাইকে হারিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে গানের জগত থেকে সরিয়ে নেন নীরবতার আড়ালে জমে ওঠে অভিমান, শূন্যতা আর গভীর বেদনা। তবে সময়ের নিয়মে একসময় তিনি আবার ফিরে আসেন শ্রোতাদের কাছে। লাকী আখন্দের সরের তুলনায় নিজের কন্ঠের গান খুবই কম। আজকে থাকছে কিংবদন্তি লাকী আখন্দের গানের ডিস্কোগ্রাফি।
লাকী আখান্দ অ্যালবাম: লাকী আখান্দ (১৯৮৪)
অ্যালবাম: লাকী আখন্দ ( Self-titled) )
প্রকাশকালঃ ১৯৮৪
লেবেলঃ সারগাম
সুর ও সংগীতঃ লাকী আখন্দ
প্রযোজনা ও পরিবেশনায়ঃ সারগাম
১৯৮৪ সালে সারগাম ব্যানারে প্রকাশ পায় লাকী আখন্দের প্রথম একক অ্যালবাম ‘লাকী আখন্দ’ (Self-titled)। অ্যালবামটির লেবেল নম্বর ছিল সারগাম-১২০। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এটি একটি ক্ল্যাসিক ও স্মরণীয় অ্যালবাম হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। এই অ্যালবামে থাকা উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে-‘এই নীল মণিহার’, ‘আমায় ডেকো না’, ‘রীতিনীতি কি জানি না’, ‘মামনিয়া’, ‘আগে যদি জানতাম’, ‘হৃদয় আমার’, ‘সুমনা’, এবং ‘তোমার স্বাক্ষর আঁকা’। পরবর্তীতে এই অ্যালবামের জনপ্রিয় গান ‘আমায় ডেকো না’ লাকী আখন্দ শিল্পী সামিনা চৌধুরীকে উপহার দেন। সামিনা চৌধুরী পরে গানটি তাঁর একক অ্যালবামে অন্তর্ভুক্ত করেন, যা গানটির জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করে।
এই নীল মনিহার | লাকী আখান্দ
কভার : এই নীল মনিহার- বাপ্পা মজুমদার |
🎧 ট্রাক লিস্ট
- এই নীল মণিহার — কথা: এস. এম. হেদায়েত
- আমায় ডেকোনা -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- রীতিনীতি জানিনা -- কথা: শেখ খুরশীদ আনোয়ার
- তোমার স্বাক্ষর আঁকা -- কথা: মুনশী ওয়াদুদ
- নীলা -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- সুমনা-- কথা: মোস্তাক হোসেন
- হৃদয় আমার -- কথা: মাহফুজুর রহমান
- ঘুমিয়ে পড়ো-- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- আগে যদি জানিতাম -- কথা: মোঃ নূরুল হুদা
- রেল গাড়ী-- কথা: মোস্তাক হোসেন
- মামনিয়া -- কথা: মোস্তাক হোসেন
- পলাতক আমি -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
লাকী আখন্দ অ্যালবাম: শেষ উপহার (১৯৯৩)
অ্যালবাম: হ্যাপী আখন্দ ( শেষ উপহার )
প্রকাশকালঃ ১৯৯৩
লেবেলঃ মূর্ছনা
সুর ও সংগীতঃ লাকী আখন্দ
প্রযোজনা ও পরিবেশনায়ঃ সার্প প্রোডাক্ট
লাকী আখন্দ তাঁর আদরের ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের গানগুলোকে কেন্দ্র করে প্রকাশ করেন একটি স্মরণীয় অ্যালবাম ‘শেষ উপহার’। এটি ছিল মূলত হ্যাপী আখন্দের প্রতি লাকীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক অনন্য সংগীত-উপহার। হ্যাপী আখন্দের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে লাকী আখন্দ গড়ে তোলেন ‘হ্যাপীটাচ’ নামের একটি ব্যান্ড। ভাই হারানোর শোক যেন ধীরে ধীরে লাকী আখন্দকে আরও নীরব করে তোলে। হ্যাপীর অনুপস্থিতি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা যার প্রভাব পড়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সংগীতচর্চাতেও। অ্যালবামটি হ্যাপি আখন্দের গানের একমাত্র গানের অ্যালবাম। লাকী আখন্দের চারটি গানছিল।
🎧 ট্রাক লিস্ট
- হ্যাপি হারাইনি-- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে গান তো লিখেছি-- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী-- কন্ঠ: হ্যাপি আখান্দ ও লাকী আখান্দ
- নিস্পাপ ফুল -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- গীটার-- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী --কন্ঠ: নওশাদ বাবু ও লাকী আখান্দ
আবার এলো যে সন্ধ্যা| হ্যাপী আখন্দ ও লাকী আখান্দ
কভার : আইয়ুব বাচ্চু | শাফিন আহমেদ | পার্থ বড়ুয়া
১৯৯৮: লাকী আখন্দের ফিরে আসার বছর
হ্যাপী আখন্দের আকস্মিক মৃত্যু লাকী আখন্দকে যে গভীর নীরবতার ভেতর ঠেলে দিয়েছিল সেই নীরবতা দীর্ঘদিন স্থায়ী ছিল। গানের জগত থেকে স্বেচ্ছায় দূরে সরে গিয়ে তিনি যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন এক বিষণ্ন অন্তর্লোকে। তবে সময়ের প্রবাহে সেই নীরবতা একসময় ভাঙে আর সেই ভাঙনের বছর ছিল ১৯৯৮। এই বছরেই লাকী আখন্দ আবার নতুন করে আলোড়ন তুলেছিলেন বাংলা সংগীতাঙ্গনে। দীর্ঘ বিরতির পর তিনি ফিরে আসেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যালবামের সংগীতায়োজনের মাধ্যমে ‘পরিচয় কবে হবে’ এবং ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’। এই দুই অ্যালবাম ছিল তাঁর ফিরে আসার বার্তা, এবং একইসাথে শ্রোতাদের জন্য এক আবেগঘন সংগীত-উপহার। ‘পরিচয় কবে হবে’ ছিল লাকী আখন্দের দ্বিতীয় একক অ্যালবাম। বিশেষ বিষয় হলো এটি মূলত তাঁর ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের একক অ্যালবাম ‘শেষ উপহার’-এর একটি রিমেক সংস্করণ। বলা যায় এই অ্যালবামের মাধ্যমে লাকী আখন্দ যেন সংগীতের ভেতর দিয়েই আবার ভাইয়ের স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনেন। অন্যদিকে ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ অ্যালবামটি ছিল আরও বড় পরিসরের এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। এই অ্যালবামে লাকী আখন্দের সুরে কণ্ঠ দেন সেই সময়ের ছয়জন জনপ্রিয় শিল্পী মাহফুজ আনাম জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, এবং সামিনা চৌধুরী। এক অ্যালবামে এতগুলো জনপ্রিয় কণ্ঠকে একত্র করা এবং তাদের কণ্ঠে নিজের সুরের ভিন্নতা তুলে ধরা ছিল লাকী আখন্দের সৃষ্টিশীলতার বড় প্রমাণ। এই অ্যালবামটি ছিল ব্যান্ড সংগীত এবং আধুনিক গানের এক অসাধারণ মেলবন্ধন যেখানে রোমান্টিকতা, বেদনা, এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া আধুনিক সুর একসাথে মিশে গিয়ে তৈরি করেছিল এক কালজয়ী আবহ। শুধু তাই নয়, ১৯৯৮ সালেই তিনি ব্যান্ডদল আর্ক-এর শিল্পী হাসানের জনপ্রিয় গান ‘হৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা’ এর সুর করেন। গানটি প্রকাশ পায় ‘দেখা হবে বন্ধু’ অ্যালবামে এবং শ্রোতাদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পায়। কিংবদন্তি সামিনা চৌধুরীর সাথে একটি ডুয়েট অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৯৮ সালেই। সব মিলিয়ে বলা যায় ১৯৯৮ সাল ছিল লাকী আখন্দের সংগীতে পুনর্জন্মের বছর। এ বছরেই তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নীরবতা তাঁকে থামাতে পারেনি। সময়ের সাথে তাঁর সুর আরও গভীর, আরও পরিণত এবং আরও স্মরণীয় হয়ে ফিরে এসেছে।
লাকী আখন্দ অ্যালবাম: পরিচয় কবে হবে (১৯৯৮)
অ্যালবাম: পরিচয় কবে হবে
প্রকাশকালঃ ১৯৯৭
লেবেলঃ সারগাম
সুর ও সংগীতঃ লাকী আখন্দ
প্রযোজনা ও পরিবেশনায়ঃ সারগাম
🎧 ট্রাক লিস্ট
- তুমি ডাকলেই কাছে আসতাম -- কথা: হাবিব আহসান
- নিঠুর মাইয়ারে -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- বলেছিলে কাল তুমি -- কথা: শেখ খুরশীদ আনোয়ার
- তুমি আমার -- কথা: জোবেদা খানম
- জিপসিরা ঘর বাধে না -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- আজ আছি কাল নেই -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- পরিচয় কবে হবে -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- নীল নীল শাড়ি -- কথা: কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- প্রতিদান দিতে পারে না -- কথা: মুহিদ্দিন চৌধুরী
- কে ঐ যায় রে -- কাওসার আহমেদ চৌধুরী
- আমার পরান যা চায়-- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
লাকী আখন্দ অ্যালবাম: আনন্দ চোখ (১৯৯৮)
অ্যালবাম: আনন্দ চোখ
প্রকাশকালঃ ১৯৯৮
লেবেলঃ সাউন্ডটেক
সুর ও সংগীতঃ লাকী আখন্দ
ধরন: ডুয়েট (লাকী আখন্দ ও সামিনা চৌধুরী)
প্রযোজনা ও পরিবেশনায়ঃ সাউন্ডটেক
🎧 ট্রাক লিস্ট
- কাল কি যে দিন ছিল— কথা: গোলাম মুর্শেদ -- কন্ঠ: লাকী আখান্দ ও সামিনা চৌধুরী
- আনন্দ চোখ -- কথা: গোলাম মুর্শেদ --কন্ঠ: লাকী আখান্দ
- আর নয় অভিমান -- কথা: গোলাম মুর্শেদ -- কন্ঠ: লাকী আখান্দ ও সামিনা চৌধুরী
- তুমি মিছেমিছি হলেও-- কথা: গোলাম মুর্শেদ -- কন্ঠ: লাকী আখান্দ
- চিঠি লিখে পৌছে দেবো-- কথা: গোলাম মুর্শেদ -- কন্ঠ: লাকী আখান্দ
- মনে করতে পারো -- কথা: গোলাম মুর্শেদ -- কন্ঠ: লাকী আখান্দ ও সামিনা চৌধুরী
- যেখানেই থাকে দূরে -- গোলাম মুর্শেদ -- কন্ঠ: লাকী আখান্দ ও সামিনা চৌধুরী
লাকী আখন্দ ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি শুধু গান করেননি তিনি বাংলা সংগীতকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিলেন। সুর, সংগীতায়োজন আর কণ্ঠে এক অনন্য স্বাক্ষর রেখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক সৃষ্টিশীল জাদুকর। জীবনের নানা ওঠানামা, প্রিয় ভাই হ্যাপী আখন্দকে হারানোর গভীর শোক, নীরবতা আর অভিমান সবকিছুর মাঝেও তাঁর সুর কখনো থেমে থাকেনি। বরং প্রতিটি গান হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। ২০১৫ সালে এই কিংবদন্তি শিল্পীর ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে। দীর্ঘদিন কঠিন লড়াইয়ের পর অবশেষে ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল ঢাকার আরমানিটোলায় নিজ বাসায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ভক্তদের প্রার্থনা, ভালোবাসা কিংবা আকুতি কিছুই তাঁকে ফেরাতে পারেনি। তবে লাকী আখন্দ চলে গেলেও তাঁর গানগুলো থেকে গেছে আজও বেঁচে আছে শ্রোতাদের হৃদয়ে। তিনি হয়তো এই পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো জগতে সুরের মায়াজাল ছড়িয়ে দিতে পাড়ি জমিয়েছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর কণ্ঠ এবং তাঁর সুরের জাদু বাংলা সংগীতের ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। মহান বীরমুক্তিযোদ্ধা ও সুর সম্রাটের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আগে যদি জানতাম তবে মন ফিরে চাইতাম | লাকী আখন্দ
কভার : বাপ্পা মজুমদার
