স্মৃতির আড়ালে যদি হারায় সবইতবে এসো মোর কাছে আমি দেখাবোশৈশব শৈশব শৈশব শৈশব
বাংলার গ্রামীণ মেলা মানেই রঙিন খেলনার সমারোহ। মাটির ঘ্রাণ, ঢোলের শব্দ আর শিশুদের উচ্ছ্বাস। সেই চিরচেনা লোকজ খেলনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল “টমটম গাড়ি” বা “টরটরি”। একসময় গ্রামের প্রতিটি মেলা, ওরশ কিংবা বৈশাখী উৎসবে শিশুদের হাতে হাতে দেখা মিলত এই খেলনার।
সুতা ধরে টেনে নিয়ে গেলে ‘টং টং’ কিংবা ‘টমটম’ শব্দ তুলত ছোট্ট গাড়িটি। আর সেই শব্দেই যেন লুকিয়ে থাকত বাংলার শৈশব, লোকজ সংস্কৃতি আর মেলার আনন্দ। আজ আধুনিক প্লাস্টিকের খেলনা, মোবাইল গেম আর প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই খেলনা।
মেলা কিংবা দেশের যেকোনো লোকজ উৎসবে আজও এই খেলনাটি আমাদের সংস্কৃতির জানান দিয়ে যায়। শিশুদের কৌতূহলী চোখ আর মেলার কোলাহলের ভেতর আজও টমটমের সেই পরিচিত শব্দ শোনা যায়। দূর থেকে ভেসে আসা একটা চেনা মিষ্টি ঝংকার আজও আমাদের থমকে দাঁড় করাতে বাধ্য করে।
টমটম গাড়ির উৎপত্তি ও ইতিহাস
ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে রংপুর অঞ্চলে বসবাসকারী বিহারিদের হাত ধরে এই খেলনার প্রচলন শুরু হয়। পরে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার খোলাস গ্রামের কয়েকজন যুবক এই খেলনা তৈরি শেখেন এবং নিজেদের গ্রামে উৎপাদন শুরু করেন।
বর্তমানে খোলাস গ্রাম পরিচিত “খেলনার গ্রাম” হিসেবে। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে টমটম তৈরির সঙ্গে জড়িত। তিন প্রজন্ম ধরে এখন প্রায় ৩০০টি পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। করছেন জীবিকা নির্বাহ করছেন এবং ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন।
লোকশিল্পী ফয়জল হক, নজরুল ইসলাম কিংবা আব্দুল বারীর মতো কারিগরদের হাত ধরে আজও বেঁচে আছে এই ঐতিহ্য। একসময় মাত্র কয়েক আনায় বিক্রি হতো টমটম গাড়ি। এখন খুচরা বাজারে একটি টমটম বিক্রি হয় ২০ থেকে ২৫ টাকায়।
কীভাবে তৈরি হয় টমটম গাড়ি?
টমটম গাড়ি তৈরি আসলে একটি নিখুঁত হস্তশিল্প। একটি গাড়ি সম্পূর্ণ করতে প্রায় ৩৯ বার হাতের ছোঁয়া লাগে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় হাতে, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার খুবই কম। টমটম তৈরির প্রধান উপকরণগুলো হলো—
- মাটির বাটি ও চাকা তৈরি: প্রথমে কুমার পাড়া থেকে এঁটেল মাটির ছাঁচে ছোট বাটি এবং চাকা তৈরি করে আনা হয়। এরপর সেগুলো কড়া রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়।
- বাঁশের ফ্রেম: বাঁশ নির্দিষ্ট মাপে কেটে, টুকরো করে রোদে শুকানো হয়। ড্রিল মেশিন দিয়ে ছিদ্র করে বা আগুনের শিকের আঁচ দিয়ে ফ্রেম ও কাঠি তৈরি করা হয়।
- কাগজ ও তুলির কারুকাজ: শুকনো মাটির বাটির ওপর আঠা দিয়ে শক্ত কাগজ লাগানো হয়। এরপর কাঠিতে কাপড় পেঁচিয়ে তৈরি করা দেশি তুলি দিয়ে নারীরা তাতে ফুটিয়ে তোলেন ফুল, পাখি, হাতি, ঘোড়া, মাছ কিংবা গ্রামীণ আলপনা।
- শব্দযন্ত্রের জাদু: এই মাটির বাটির দুই পাশে বাঁশের ফ্রেমের সাথে মাটির চাকা যুক্ত থাকে। চাকার সাথে বাঁধা থাকে শক্ত সুতো। শিশু যখন সুতো ধরে গাড়িটি টেনে নিয়ে যায়, তখন চাকার ঘূর্ণনের সাথে সাথে ভেতরের কাঠি দুটি মাটির বাটির চামড়ায় বা কাগজে আঘাত করে। আর তাতেই তৈরি হয় সেই জাদুকরী ‘টমটম’ বা ‘টংটং’ শব্দ।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে টমটম?
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে শিশুদের বিনোদনের ধরন। এখন শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম কিংবা ব্যাটারিচালিত খেলনা। ফলে মাটির তৈরি ঐতিহ্যবাহী খেলনার চাহিদা কমে গেছে অনেকটাই।
একসময় যে টমটম গাড়ি তৈরি করতে খরচ হতো মাত্র ২ টাকা, আজ সেই খেলনা তৈরিতে ব্যয় হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ টাকা। পাইকারি বাজারে প্রতিটি টমটম ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হলেও মেলা কিংবা ফেরিওয়ালাদের মাধ্যমে তা ১৫ থেকে ২৫ টাকায় পৌঁছে যায়।
তবে করোনার ধাক্কা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন এবং আধুনিক খেলনার দাপটে ঐতিহ্যবাহী এই লোকশিল্প আজ বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। টমটম ব্যবসায়ীরাদের সাথে কথা বলে জানা যায় আগে মেলায় প্রচুর বিক্রি হতো এই খেলনা।
বিশেষ করে দুর্গা পূজা, বৈশাখী মেলা, ঈদ কিংবা শীতকালীন ওরাস মেলাকে কেন্দ্র করে এই কারিগর ও বিক্রেতারা কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ান। এখন প্লাস্টিকের খেলনার ভিড়ে টমটমের দোকানে আগের মতো ভিড় দেখা যায় না। তবুও ঐতিহ্যের টানে অনেকেই এখনো এই ব্যবসা ছাড়তে পারেননি।
টমটম শুধু খেলনা নয়
টমটম গাড়ি শুধু একটি শিশুতোষ খেলনা নয়; এটি বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অংশ। মাটির গন্ধ, হাতে আঁকা নকশা আর টংটং শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে বাংলার শিকড়ের গল্প। গ্রামের টমটম শিল্পে নারীদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ।
গৃহস্থালির কাজ শেষ করে গ্রামের নারীরা টমটমের বিভিন্ন অংশ তৈরি করেন। কেউ বাঁশ কাটেন, কেউ রঙ করেন, কেউ কাগজ লাগান আবার কেউ চাকা শুকান। এ যেন পুরো পরিবারকেন্দ্রিক এক লোকশিল্প।
ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়োজন
আজকের শিশুরা হয়তো টমটমের আনন্দ খুব কমই চেনে। কিন্তু নব্বই দশক কিংবা তার আগের প্রজন্মের কাছে এটি শৈশবের সবচেয়ে মধুর স্মৃতিগুলোর একটি।
লোকজ খেলনা টমটমকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। গ্রামীণ মেলা, বৈশাখী উৎসব, স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা লোকজ মেলায় এই খেলনার প্রদর্শনী বাড়ানো যেতে পারে।
দেশীয় খেলনার প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ তৈরি করতে পারলে হয়তো আবারও মেলার মাঠে শোনা যাবে সেই চিরচেনা “টমটম” শব্দ। কারণ টমটম গাড়ি শুধু একটি খেলনা নয়— এটি বাংলার আবেগ, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মারক।
শেষ কথা
টমটম গাড়ি কেবল মাটি আর বাঁশের তৈরি কোনো খেলনা নয়। এটি বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি এবং শিকড়ের সাথে মিশে থাকা এক অমূল্য সম্পদ। আমাদের নতুন প্রজন্মের সন্তানদের মোবাইল বা ট্যাবের যান্ত্রিক নেশা থেকে বের করে এনে যদি আমরা এই মাটির সুবাস মাখা, সম্পূর্ণ হাতে তৈরি লোকজ খেলনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি, তবেই বাঁচবে এই শিল্প, বাঁচবে খোলাস গ্রামের শত শত শ্রমজীবী পরিবার।
আগামী মেলার মৌসুমে আপনার সন্তানের হাতে একটি প্লাস্টিকের খেলনার বদলে ঐতিহ্যবাহী টমটম গাড়ি তুলে দিন। সেই মৃদু 'টংটং' শব্দে পুনর্জন্ম হোক আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের। আপনার কাছে প্রশ্ন? আপনার শৈশবের মেলায় প্রথম পছন্দের খেলনা কি এই টমটম গাড়ি ছিল? আপনার কোনো স্মৃতি থাকলে আমাদের সার্থকতা।
