স্মৃতির আড়ালে যদি হারায় সবইতবে এসো মোর কাছে আমি দেখাবোশৈশব শৈশব শৈশব শৈশব
বাংলার গ্রামীণ মেলা মানেই রঙিন খেলনার সমারোহ। মাটির ঘ্রাণ, ঢোলের শব্দ আর শিশুদের উচ্ছ্বাস। সেই চিরচেনা লোকজ খেলনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল “টমটম গাড়ি” বা “টরটরি”। একসময় গ্রামের প্রতিটি মেলা, ওরশ কিংবা বৈশাখী উৎসবে শিশুদের হাতে হাতে দেখা মিলত এই খেলনার।
সুতা ধরে টেনে নিয়ে গেলে ‘টং টং’ কিংবা ‘টমটম’ শব্দ তুলত ছোট্ট গাড়িটি। আর সেই শব্দেই যেন লুকিয়ে থাকত বাংলার শৈশব, লোকজ সংস্কৃতি আর মেলার আনন্দ। আজ আধুনিক প্লাস্টিকের খেলনা, মোবাইল গেম আর প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই খেলনা।
মেলা কিংবা দেশের যেকোনো লোকজ উৎসবে আজও এই খেলনাটি আমাদের সংস্কৃতির জানান দিয়ে যায়। শিশুদের কৌতূহলী চোখ আর মেলার কোলাহলের ভেতর আজও টমটমের সেই পরিচিত শব্দ শোনা যায়। দূর থেকে ভেসে আসা একটা চেনা মিষ্টি ঝংকার আজও আমাদের থমকে দাঁড় করাতে বাধ্য করে।
টমটম গাড়ির উৎপত্তি ও ইতিহাস
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেই জানা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে রংপুর অঞ্চলে বসবাসকারী বিহারিদের হাত ধরে এই খেলনার প্রচলন শুরু হয়। মাটির তৈরি ছোট্ট এই গাড়িটি তখন থেকেই গ্রামীণ শিশুদের মন জয় করে নেয়। পরে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার খোলাস গ্রামের কয়েকজন যুবক এই খেলনা তৈরির কৌশল শেখেন এবং নিজেদের গ্রামে উৎপাদন শুরু করেন। ধীরে ধীরে এটি একটি পরিবারকেন্দ্রিক শিল্পে রূপ নেয়।
বর্তমানে খোলাস গ্রাম পরিচিত "খেলনার গ্রাম" হিসেবে। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে টমটম তৈরির সঙ্গে জড়িত। তিন প্রজন্ম ধরে প্রায় ৩০০টি পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা শুধু জীবিকা নির্বাহই করছেন না, বরং বাংলার এক অনন্য লোকজ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন।
লোকশিল্পী ফয়জল হক, নজরুল ইসলাম কিংবা আব্দুল বারী এঁদের মতো কারিগরদের হাত ধরেই আজও বেঁচে আছে এই ঐতিহ্য। তাঁদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় মাটি আর বাঁশ হয়ে ওঠে প্রাণের খেলনা। একসময় মাত্র কয়েক আনায় বিক্রি হতো টমটম গাড়ি, যা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির এক সহজলভ্য বিনোদন। আর এখন খুচরা বাজারে একটি টমটম বিক্রি হয় ২০ থেকে ২৫ টাকায়। দাম বেড়েছে, কিন্তু সেই মাটির গন্ধ, সেই 'টংটং' শব্দ আজও অমলিন।
কীভাবে তৈরি হয় টমটম গাড়ি?
টমটম গাড়ি তৈরি আসলে একটি নিখুঁত হস্তশিল্প। একটি গাড়ি সম্পূর্ণ করতে প্রায় ৩৯ বার হাতের ছোঁয়া লাগে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় হাতে, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার খুবই কম। টমটম তৈরির প্রধান উপকরণগুলো হলো—
- মাটির বাটি ও চাকা তৈরি: প্রথমে কুমার পাড়া থেকে এঁটেল মাটির ছাঁচে ছোট বাটি এবং চাকা তৈরি করে আনা হয়। এরপর সেগুলো কড়া রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়।
- বাঁশের ফ্রেম: বাঁশ নির্দিষ্ট মাপে কেটে, টুকরো করে রোদে শুকানো হয়। ড্রিল মেশিন দিয়ে ছিদ্র করে বা আগুনের শিকের আঁচ দিয়ে ফ্রেম ও কাঠি তৈরি করা হয়।
- কাগজ ও তুলির কারুকাজ: শুকনো মাটির বাটির ওপর আঠা দিয়ে শক্ত কাগজ লাগানো হয়। এরপর কাঠিতে কাপড় পেঁচিয়ে তৈরি করা দেশি তুলি দিয়ে নারীরা তাতে ফুটিয়ে তোলেন ফুল, পাখি, হাতি, ঘোড়া, মাছ কিংবা গ্রামীণ আলপনা।
- শব্দযন্ত্রের জাদু: এই মাটির বাটির দুই পাশে বাঁশের ফ্রেমের সাথে মাটির চাকা যুক্ত থাকে। চাকার সাথে বাঁধা থাকে শক্ত সুতো। শিশু যখন সুতো ধরে গাড়িটি টেনে নিয়ে যায়, তখন চাকার ঘূর্ণনের সাথে সাথে ভেতরের কাঠি দুটি মাটির বাটির চামড়ায় বা কাগজে আঘাত করে। আর তাতেই তৈরি হয় সেই জাদুকরী ‘টমটম’ বা ‘টংটং’ শব্দ।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে টমটম?
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে শিশুদের বিনোদনের ধরন। এখন শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম কিংবা ব্যাটারিচালিত খেলনা। ফলে মাটির তৈরি ঐতিহ্যবাহী খেলনার চাহিদা কমে গেছে অনেকটাই।
একসময় যে টমটম গাড়ি তৈরি করতে খরচ হতো মাত্র ২ টাকা, আজ সেই খেলনা তৈরিতে ব্যয় হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ টাকা। পাইকারি বাজারে প্রতিটি টমটম ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হলেও মেলা কিংবা ফেরিওয়ালাদের মাধ্যমে তা ১৫ থেকে ২৫ টাকায় পৌঁছে যায়।
তবে করোনার ধাক্কা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন এবং আধুনিক খেলনার দাপটে ঐতিহ্যবাহী এই লোকশিল্প আজ বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। টমটম ব্যবসায়ীরাদের সাথে কথা বলে জানা যায় আগে মেলায় প্রচুর বিক্রি হতো এই খেলনা।
বিশেষ করে দুর্গা পূজা, বৈশাখী মেলা, ঈদ কিংবা শীতকালীন ওরাস মেলাকে কেন্দ্র করে এই কারিগর ও বিক্রেতারা কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ান। এখন প্লাস্টিকের খেলনার ভিড়ে টমটমের দোকানে আগের মতো ভিড় দেখা যায় না। তবুও ঐতিহ্যের টানে অনেকেই এখনো এই ব্যবসা ছাড়তে পারেননি।
টমটম শুধু খেলনা নয়
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে শিশুদের বিনোদনের ধরন। একসময় যে মাটির খেলনা ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণ, আজ তার স্থান দখল করেছে প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন। নিচে টমটম গাড়ি বিলুপ্তির পথে যাওয়ার কয়েকটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হলো-
- প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের দাপট
এখন শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন, ট্যাব, ভিডিও গেম কিংবা ব্যাটারিচালিত খেলনা। ফলে মাটির তৈরি ঐতিহ্যবাহী খেলনার চাহিদা কমে গেছে অনেকটাই। শিশুরা এখন 'টংটং' শব্দের চেয়ে 'কার্টুন' আর 'গেম' এর গল্প বেশি জানে।
- উৎপাদন খরচ বনাম লাভের অনুপাত
একসময় যে টমটম গাড়ি তৈরি করতে খরচ হতো মাত্র ২ টাকা, আজ সেই খেলনা তৈরিতে ব্যয় হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ টাকা। পাইকারি বাজারে প্রতিটি টমটম ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হলেও মেলা কিংবা ফেরিওয়ালাদের মাধ্যমে তা ১৫ থেকে ২৫ টাকায় পৌঁছায়। অথচ মাটির সঙ্গে জড়িত এই পরিশ্রমের তুলনায় লাভ খুবই কম।
- করোনা মহামারির ধাক্কা:
করোনার সময় মেলা-উৎসব বন্ধ থাকায় টমটমের বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। অনেক কারিগরই বিকল্প পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন।
- মেলায় ভিড় কমে যাওয়া
টমটম ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগে দুর্গা পূজা, বৈশাখী মেলা, ঈদ কিংবা শীতকালীন ওরাস মেলাকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচুর বিক্রি হতো এই খেলনা। এখন প্লাস্টিকের খেলনার ভিড়ে টমটমের দোকানে আগের মতো ভিড় দেখা যায় না।
- নতুন প্রজন্মের অনীহা
আজকের শিশুরা টমটমের সাথে নিজেদের আবেগের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। ফলে এই শিল্পের প্রতি তাদের আকর্ষণ দিন দিন কমছে। তবুও আশার কথা হচ্ছে, ঐতিহ্যের টানে এখনো অনেক কারিগর ও ব্যবসায়ী এই পেশায় আঁকড়ে আছেন। তাঁরা চান না এই বাংলার লোকজ সম্পদটি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাক।
ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়োজন
আজকের ডিজিটাল প্রজন্মের শিশুরা হয়তো টমটমের মিষ্টি 'টংটং' শব্দ খুব কমই চেনে। কিন্তু নব্বই দশক কিংবা তারও আগের প্রজন্মের কাছে এটি শৈশবের সবচেয়ে নির্মল ও মধুর স্মৃতিগুলোর একটি। মেলায় বাবা-মায়ের হাত ধরে কেনা সেই মাটির গাড়ি, সুতো টেনে ছুটে বেড়ানোর আনন্দ। আজও চোখ বন্ধ করলে যেন দেখা যায় সেই দৃশ্য।
তবে এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। গ্রামীণ মেলা, বৈশাখী উৎসব, স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা লোকজ মেলায় টমটমের বিশেষ প্রদর্শনী ও কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। শিশুরা যদি নিজের হাতে একটি টমটম তৈরি করার সুযোগ পায়, তবে তারা এর মূল্য বুঝবে, শুধু দেখে নয় অনুভবে।
দেশীয় খেলনার প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে পারলেই আবারও মেলার মাঠে ভেসে আসবে সেই চিরচেনা 'টমটম' শব্দ। কারণ টমটম গাড়ি শুধু একটি খেলনা নয় এটি বাংলার আবেগ, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মারক, যা আমাদের শিকড়ের সঙ্গে বেঁধে রাখে।
শেষ কথা
টমটম গাড়ি কেবল মাটি আর বাঁশের তৈরি কোনো খেলনা নয় এটি বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি এবং শেকড়ের সঙ্গে মিশে থাকা এক অমূল্য সম্পদ। মাটির গন্ধ, হাতের স্পর্শ আর সেই মায়াবী 'টংটং' শব্দ সব মিলিয়ে এটি যেন আমাদের শৈশবের এক জীবন্ত ঠিকানা।
আমাদের নতুন প্রজন্মের সন্তানরা যদি মোবাইল বা ট্যাবের যান্ত্রিক জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে এই মাটির সুবাসমাখা, সম্পূর্ণ হাতে তৈরি লোকজ খেলনার সঙ্গে পরিচিত হয়, তবেই বাঁচবে এই শিল্প, বাঁচবে খোলাস গ্রামের শত শত শ্রমজীবী পরিবার। আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি আগামী মেলায়, উৎসবে কিংবা কোনো বিশেষ দিনে সন্তানের হাতে প্লাস্টিকের চকচকে খেলনার বদলে একটি মাটির টমটম তুলে দেব।
সেই মৃদু 'টংটং' শব্দে পুনর্জন্ম হোক আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের। শেষে একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি আপনার শৈশবের মেলায় প্রথম পছন্দের খেলনা কি এই টমটম গাড়ি ছিল? আপনার কোনো স্মৃতি থাকলে আমাদের জানান। আপনার সেই স্মৃতিই এই লেখার সার্থকতা।
❓ FAQ (প্রশ্নোত্তর)
১ প্রশ্ন: টমটম গাড়ি কী?
উত্তর: টমটম গাড়ি হলো মাটি, বাঁশ, কাগজ ও সুতা দিয়ে তৈরি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলনা। সুতা ধরে টানলে এটি 'টংটং' বা 'টমটম' শব্দ করে, যা শিশুদের কাছে একসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
২ প্রশ্ন: টমটম গাড়ির উৎপত্তি কোথায়?
উত্তর: স্বাধীনতার আগে রংপুর অঞ্চলে বসবাসকারী বিহারিদের মাধ্যমে টমটম গাড়ির প্রচলন শুরু হয় বলে জানা যায়। পরে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার খোলাস গ্রামে এর উৎপাদন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
৩ প্রশ্ন: খোলাস গ্রামকে কেন 'খেলনার গ্রাম' বলা হয়?
উত্তর: বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার খোলাস গ্রামের প্রায় ৩০০টি পরিবার তিন প্রজন্ম ধরে টমটম গাড়ি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এ কারণে গ্রামটি 'খেলনার গ্রাম' নামে পরিচিত।
৪ প্রশ্ন: টমটম গাড়ি কীভাবে শব্দ করে?
উত্তর: টমটম গাড়ি টেনে নিয়ে গেলে চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে ভেতরের কাঠি মাটির বাটি বা কাগজে আঘাত করে। ফলে 'টংটং' বা 'টমটম' শব্দ সৃষ্টি হয়।
৫ প্রশ্ন: টমটম গাড়ি তৈরিতে কী কী উপকরণ ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: টমটম গাড়ি তৈরিতে প্রধানত এঁটেল মাটি, বাঁশ, শক্ত কাগজ, সুতা, আঠা, রং এবং হাতে তৈরি তুলি ব্যবহার করা হয়।
৬ প্রশ্ন: একটি টমটম গাড়ি তৈরি করতে কতবার হাতের কাজ লাগে?
উত্তর: একটি টমটম গাড়ি সম্পূর্ণ তৈরি করতে প্রায় ৩৯ ধাপে বা ৩৯ বার হাতের কাজ করতে হয়। এটি সম্পূর্ণ একটি হস্তশিল্পনির্ভর প্রক্রিয়া।
৭ প্রশ্ন: টমটম গাড়ি কেন বিলুপ্তির পথে?
উত্তর: আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খেলনা, মোবাইল গেম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কম লাভ, করোনা মহামারির প্রভাব এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে টমটম গাড়ির জনপ্রিয়তা কমে গেছে।
৮ প্রশ্ন: বর্তমানে একটি টমটম গাড়ির দাম কত?
উত্তর: বর্তমানে একটি টমটম গাড়ি খুচরা বাজারে সাধারণত ২০ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। পাইকারি বাজারে এর দাম তুলনামূলক কম।
৯ প্রশ্ন: টমটম গাড়ি কোথায় বেশি বিক্রি হয়?
উত্তর: দুর্গাপূজা, বৈশাখী মেলা, ঈদ, ওরশ, শীতকালীন মেলা এবং বিভিন্ন লোকজ উৎসবে টমটম গাড়ি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।
১০ প্রশ্ন: টমটম গাড়ি শুধু একটি খেলনা নাকি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও?
উত্তর: টমটম গাড়ি শুধু একটি খেলনা নয়; এটি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামীণ মেলা এবং বাঙালির শৈশব স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন।
১১ প্রশ্ন: টমটম গাড়ির ঐতিহ্য সংরক্ষণে কী করা যেতে পারে?
উত্তর: গ্রামীণ মেলা, বৈশাখী উৎসব, স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ প্রদর্শনী এবং শিশুদের জন্য টমটম তৈরির কর্মশালার আয়োজনের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।
১২ প্রশ্ন: নতুন প্রজন্মের কাছে টমটম গাড়ির গুরুত্ব কী?
উত্তর: টমটম গাড়ি নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য, দেশীয় হস্তশিল্প এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এটি শিশুদের প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের বাইরে দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে।
টমটম গাড়ি: সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১. টমটম গাড়ি কী?
উত্তর: টমটম গাড়ি হলো এঁটেল মাটি, বাঁশ, কাগজ ও সুতা দিয়ে তৈরি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলনা। সুতা ধরে টানলে এটি অদ্ভুত এক 'টংটং' শব্দ করে, যা অতীতে গ্রামীণ শিশুদের প্রধান বিনোদন ছিল।
প্রশ্ন ২. টমটম গাড়ির উৎপত্তি কোথায়?
উত্তর: স্বাধীনতার আগে রংপুর অঞ্চলে বসবাসকারী বিহারিদের মাধ্যমে এই খেলনার প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীকালে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার 'খোলাস' গ্রামে এটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়।
প্রশ্ন ৩. খোলাস গ্রামকে কেন 'খেলনার গ্রাম' বলা হয়?
উত্তর: বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার এই গ্রামের প্রায় ৩০০টি পরিবার তিন প্রজন্ম ধরে বংশপরম্পরায় টমটম তৈরি করছে। এ কারণে গ্রামটি 'খেলনার গ্রাম' হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্ন ৪. টমটম গাড়ি কীভাবে শব্দ করে?
উত্তর: খেলনাটি টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় চাকার ঘূর্ণনের সাথে সাথে ভেতরের কাঠিগুলো মাটির বাটির আবরণে আঘাত করে, যার ফলে ছন্দময় 'টংটং' শব্দের সৃষ্টি হয়।
প্রশ্ন ৫. টমটম তৈরিতে কী কী উপকরণ লাগে?
উত্তর: এতে প্রধানত এঁটেল মাটি (চাকা ও বাটির জন্য), বাঁশ (ফ্রেম ও কাঠির জন্য), শক্ত কাগজ, সুতা, আঠা এবং দেশি তুলি দিয়ে আঁকা নকশা ও রং ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্ন ৬. একটি টমটম তৈরিতে কতবার হাতের কাজ লাগে?
উত্তর: এটি একটি নিখুঁত হস্তশিল্প। একটি গাড়ি সম্পূর্ণ করতে প্রায় ৩৯ বার নিপুণ হাতের ছোঁয়া বা ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
প্রশ্ন ৭. টমটম গাড়ি কেন হারিয়ে যাচ্ছে?
উত্তর: আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খেলনা, মোবাইলের প্রতি শিশুদের আসক্তি, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, করোনার প্রভাব এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
প্রশ্ন ৮. বর্তমানে একটি টমটম গাড়ির দাম কত?
উত্তর: বর্তমানে খুচরা বাজারে একটি টমটম গাড়ি সাধারণত ২০ থেকে ২৫ টাকায় পাওয়া যায়।
৯. টমটম গাড়ি কোথায় বেশি বিক্রি হয়?
উত্তর: বিভিন্ন মেলা যেমন—বৈশাখের মেলা, ঈদ উৎসব, দুর্গাপূজার মেলা, ওরশ এবং গ্রামীণ লোকজ উৎসবে এগুলো মূলত বিক্রি হয়।
প্রশ্ন ১০. এটি কি কেবল একটি খেলনা?
উত্তর: না, টমটম শুধু খেলনা নয়; এটি বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক এবং শৈশব স্মৃতির এক অমূল্য স্মারক।
প্রশ্ন ১১. এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে করণীয় কী?
উত্তর: স্কুল পর্যায়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রদর্শন, মেলার আয়োজন বৃদ্ধি এবং শিশুদের জন্য 'নিজে হাতে খেলনা তৈরির' কর্মশালার মাধ্যমে এই শিল্প বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।
প্রশ্ন ১২. নতুন প্রজন্মের জন্য এর গুরুত্ব কী?
উত্তর: যান্ত্রিক বিনোদনের ভিড়ে টমটম শিশুদের শেকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং সৃজনশীল হস্তশিল্পের প্রতি তাদের আগ্রহী করে তোলে।
