তাঁকে বলে দাও আমি সেদিনের কথা ভুলিনিতাঁকে বলে দাও সেই মনিহার আজও খুলিনিতাঁকে বলে দাও তাঁরই কারণে এত যন্ত্রণাতাঁকে বলে দাও তাঁরই বিরহে এত বেদনা
বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সংগীত ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কিছু মানুষ নীরবে কাজ করেও রেখে গেছেন অমলিন ছাপ। তেমনই এক বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন আহমেদ ইউসুফ সাবের।
তিনি ছিলেন লেখক, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, নির্মাতা এবং সংস্কৃতিচর্চার এক নিবেদিত প্রাণ মানুষ। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন অসংখ্য কালজয়ী গান, নাটক, চিত্রনাট্য এবং শিল্প-সাহিত্যের প্রতি গভীর ভালোবাসার এক অনন্য উত্তরাধিকার।
২০২৩ সালের ১৫ জুন সন্ধ্যায় এই কিংবদন্তি বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব চিরবিদায় নেন। আজ আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এই গুণী মানুষকে।
জন্ম ও শৈশব
আহমেদ ইউসুফ সাবের জন্মগ্রহণ করেন ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৫২ সালে, নাটোরে। যে নাটোরকে কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর “বনলতা সেন” কবিতায় অমর করে রেখেছেন।
তাঁর পিতা আব্দুস সাত্তার আহমেদ ছিলেন সরকারের একজন যুগ্মসচিব এবং মাতা হাবিবা বেগম ছিলেন গৃহিণী। তবে শুধু গৃহিণী নন, তাঁর মা ছিলেন সংগীতপ্রিয় ও শিল্পমনস্ক একজন মানুষ।
ছোটবেলা থেকেই মায়ের সাংস্কৃতিক চর্চা সাবেরের মনে শিল্পবোধ জাগিয়ে তোলে। পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা সাবের খুব অল্প বয়সেই সংগীত, কবিতা ও গল্প বলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
উচ্চশিক্ষা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি
নাটোরের নওয়াব সিরাজউদ্দৌলা সরকারি কলেজে পড়াশোনা শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য রাশিয়া যান। সেখানে ব্যবসা প্রশাসনে শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে ব্যবসা প্রশাসনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর টান কমেনি এতটুকুও। বরং বিদেশের মাটি তাঁর চিন্তার জগতকে আরও প্রসারিত করে।
বিদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শ তাঁর চিন্তার জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করে। বিশ্বসংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার নানা দিক তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে নতুন মাত্রা দেয়। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতির প্রতি তাঁর টান কখনোই কমেনি।
শিল্প-সংস্কৃতির পথে যাত্রা
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গান, কবিতা, গল্প ও চিত্রনাট্য রচনায় তিনি ধীরে ধীরে নিজস্ব স্বাক্ষর তৈরি করেন। বাংলাদেশের সংগীতজগতে আহমেদ ইউসুফ সাবেরের লেখা বহু গান শ্রোতাদের হৃদয়ে আজও জীবন্ত।
তাঁর গানের ভাষা ছিল আবেগময়, কাব্যিক এবং হৃদয়স্পর্শী। শুধু গানই নয়, বিজ্ঞাপনের চটজলদি ‘জিঙ্গেল’ তৈরিতেও তাঁর জুড়ি ছিল মেলা।
নাটক, চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনে অবদান
গানের পাশাপাশি তিনি নাটক ও চলচ্চিত্রের সংলাপ, কাহিনী এবং চিত্রনাট্য রচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লিখেছেন অসংখ্য বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেল।
কয়েকটি নাটক পরিচালনাও করেছেন তিনি। বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ব্যক্তিজীবন
আহমেদ ইউসুফ সাবেরের স্ত্রীর নাম হাসিনা ইউসুফ। ১৯৭৭ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও সহযাত্রী। তাঁদের দুই মেয়ে চৈতি ও মিতু। চৈতি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এবং মিতু কানাডায় বসবাস করেন।
এক অনন্ত মায়াবীর প্রস্থান
২০২৩ সালের ১৫ জুন সন্ধ্যায় ধানমন্ডির নিজ বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন আহমেদ ইউসুফ সাবের।তিনি ছিলেন সেইসব শিল্পীদের একজন যারা প্রচারের আলোয় কম থেকেও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন।
তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি রয়ে গেছে। বাংলা গান, নাটক ও সংস্কৃতির ভুবনে এক চিরন্তন মায়া হয়ে। শ্রদ্ধাঞ্জলি, আহমেদ ইউসুফ সাবের।
গানের ভুবনে কালজয়ী সৃষ্টি
ছাত্রজীবন থেকেই গান, কবিতা আর গল্প বলার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল তাঁর। তিনি গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশের আজীবন সদস্য ছিলেন। তাঁর লেখা গানগুলো এখনো শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেয়। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক তাঁর জনপ্রিয় কিছু গানের তালিকা:
- স্বদেশ- মেলা/ফিডব্যাক
- মন বুঝিয়া-মেলা/ফিডব্যাক
- পালকী- মেলা/ফিডব্যাক
- বিদ্রোহি- বঙ্গাব্দ/ফিডব্যাক
- মনে করো আমায় খুঁজে- চাইম
- পথ চলছি- কত যে খুজেছি তোমায়/নিলয় দাস
- সেই অচেনা- কত যে খুজেছি তোমায়/নিলয় দাস
- যখন দেখি- কত যে খুজেছি তোমায়/নিলয় দাস
- যখন নিবিড় করে- কত যে খুজেছি তোমায়/নিলয়
- সেই ভাল- বিবাগী রাত/নিলয় দাস
- আজ-ও আমি সেই পথে- স্যাডোজ
- নিজে নিজের কাছে - নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী
- মায়াবী এ রাতে দুজনে- সুমনা হক
- তারে ভালবাসি-শিশির বিন্দু/মার বিশ্বজিৎ
- জীবনের ও পারে -শিশির বিন্দু/মার বিশ্বজিৎ
- বাপ হারাইছে- প্রজাপতি/ জাফর ইকবাল
- কেন তুমি কাঁদালে- প্রজাপতি/ জাফর ইকবাল
- বাতাস পাইয়া-প্রজাপতি/ জাফর ইকবাল
- মেঘের কোলে- প্রজাপতি/ জাফর ইকবাল
- নি:সঙ্গতা-অজান্তে হঠাৎ/রেশাদ মাহমুদ
- ধুপ ছায়া- ধুপ ছায়া/ ফেরদৌস ওয়াহিদ
- দুটি চোখ- ধুপ ছায়া/ ফেরদৌস ওয়াহিদ
- নদী ডুবে - ধুপ ছায়া/ ফেরদৌস ওয়াহিদ
- পথে যেতে যেতে - ধুপ ছায়া/ ফেরদৌস ওয়াহিদ
- আঁধারে আমি - ধুপ ছায়া/ ফেরদৌস ওয়াহিদ
- কান্দেনা - ধুপ ছায়া/ ফেরদৌস ওয়াহিদ
- ফুল মতি - ধুপ ছায়া/ ফেরদৌস ওয়াহিদ
- পাড়ায় পাড়ায় - ধুপ ছায়া/ ফেরদৌস ওয়াহিদ
- গোলাপী লাল- ধুপ ছায়া/ ফেরদৌস ওয়াহিদ
স্বদেশ-আহমেদ ইউসুফ সাবের-ফিডব্যাক
- অ্যালবাম- মেলা
- ব্যান্ড ফিডব্যাক
- কন্ঠ- মাকসুদ
- সাল-
আমায় ক্ষমা করো মাগো
আমি চির অপরাধী
চাই যে ক্ষমা আমার অনুনয়
আমায় ক্ষমা করো মাগো
আমি জানি এ জীবনে
আর তো তোমার ক্ষমা পাবার নয়
ক্ষমা পাবো কি জানিনা।
নয়টি মাসের জঠর বেদনা
সয়েছো আমার কারণে
জন্মে আমি ভুলেছি তোমায়
আমি তোমার অবুঝ ছেলে
বুঝিনি অপার স্নেহে
নষ্ট আমি করেছি আমায়।
অন্ধ অতীত আঁধার পেরিয়ে
দাঁড়িয়ে এখন আমি
হারিয়ে ফেলে ঠিকানা তোমার
চাই যে একাকী পথে
তবুও তোমার করুণা
তুমি ছাড়া কে আছে আমার
এ দেশ আমার মাগো
আমি চির অপরাধী।
পালকি-আহমেদ ইউসুফ সাবের-ফিডব্যাক
- অ্যালবাম- মেলা
- ব্যান্ড ফিডব্যাক
- কন্ঠ- মাকসুদ
- সাল-
- হ্যাপি আখন্দ স্মরনে
তাঁকে বলে দাও আমি সেদিনের কথা ভুলিনি
তাঁকে বলে দাও সেই মনিহার আজও খুলিনি
তাঁকে বলে দাও তাঁরই কারণে এত যন্ত্রণা
তাঁকে বলে দাও তাঁরই বিরহে এত বেদনা
সেই দেখা যে শেষ দেখা ছিল বুঝতে পারিনি
সেই প্রভাতে ঐ দিগন্তে সূর্য ওঠেনি
এঁকেবেঁকে পাহাড় জুড়ে ঝরনা ছোটেনি
নদী হয়ে অশ্রু আমার সাগরে মেশেনি
সে যে যায় পালকিটায় শুনি হু হুমনা
সে যে যায় পালকিটায় শুনি হু হুমনা
সে যে যায় পালকিটায় শুনি হু হুমনা
সে যে যায় হ্যাপি যায় বহুদূরে।।
তাঁর কথা যে ছড়িয়ে আছে বোবা বাতাসে
তাঁর স্মৃতি যে সোনালি পাখি সুরের আকাশে
সব যাওয়া কি শেষ যাওয়া হয়, ফিরে সে আসে
প্রাণ ছুঁয়ে সে প্রাণ ছুঁয়ে যে রয়েছে মিশে
বিদ্রোহী-আহমেদ ইউসুফ সাবের-ফিডব্যাক
- অ্যালবাম- বঙ্গাব্দ
- ব্যান্ড ফিডব্যাক
- কন্ঠ- লাবু রহমান
- সাল-
একা একা চলেছি এ পথ,
মনে মনে জ্বেলেছি শপথ
এখন আমি বিদ্রোহী,
এখন আমি আর নহি অভিমানী
বুকেরই মেঘ থেকে
ঝড় ওঠে এই অন্তরে
ক্লেদ যতো ভেদ ততো
শেষ হলো যে সেই ঝড়ে
সবকিছু আমি শেষ করেছি আজ
এখন আমি বিদ্রোহী
এখন আমি আর নহি অভিমানী
সাজাবো ফের আমি
ঝড় ভাঙা এ পথটাকে
সাজাতে এ জীবন
ঘর ফেরা ওই পথ ডাকে
প্রত্যাশা নিয়ে পথ চলেছি আজ
এখন আমি বিদ্রোহী
এখন আমি আর নহি অভিমানী
যখনি নিবিড় করে-আহমেদ ইউসুফ সাবের-নিলয় দাস
- অ্যালবাম- কত যে খুঁজেছি তোমায়
- শিল্পী- নিলয় দাস
- কন্ঠ- নিলয় দাস
- সাল-
যখনি নিবিড় করে
পেতে চাই তোমাকে
তখনি দু'চোখ বুজি আমি
নয়নে-স্বপনে দেখি শুধু তোমায়
বিরহ বর্ষায় মেঘের ছায়ায়
তুমি যে রয়েছ অভিমানে
খেয়ালী জড়ানো অনুরাগে
জীবনে এখনো গানে গানে
তোমারি কারণে জোড়া লাগে
উদাসী বিকেলের দখিনা হাওয়ায়
তুমি কি তেমনও আছো আজো
আমাকে নীরবে ভালোবেসে
তুমি কি এখনো সুরে বাজো
আমারি ছবিটির কাছে এসে
এখনো ফোটে ফুল মাধবী লতায়
মনে করো আমায় খুঁজে-আহমেদ ইউসুফ সাবের-চাইম
- অ্যালবাম- চাইম
- ব্যান্ড- চাইম
- কন্ঠ- আশিকুজ্জামান টুলু
- সাল-
মনে করো আমায় খুঁজে
পেলে না কোথাও
অথচ আছি আমি
তোমার কাছাকাছি
সাগরের সৈকতে যখন তুমি একা
মনের কথা কবে
আমি তখন উড়ে চলা মৌমাছি
সারাক্ষণ তোমার কাছাকাছি
তোমারি অন্তরে নিবির করে
রব প্রেম ভরে
দেখবে তখন অনুভবে আছি
সারাক্ষণ তোমার কাছাকাছি
বাংলা গানের এক সোনালী অধ্যায়
আহমেদ ইউসুফ সাবেরের মতো বহুমাত্রিক ও প্রচারবিমুখ গুণী মানুষেরা প্রতিদিন জন্ম নেন না। তিনি শুধু গান লেখেননি বরং প্রতিটি শব্দে বুনে দিয়েছেন বাঙালির আবেগ, প্রেম ও নস্টালজিয়া। একদিকে ফিডব্যাকের কণ্ঠে "তাকে বলে দাও আমি সেদিনের" গানের তুমুল উম্মাদনা আর অন্যদিকে সুমনা হকের কণ্ঠে "মায়াবী এ রাতে" গানের গভীর নিস্তব্ধতা।
এই দুই বিপরীত ধারার সুরের মেলবন্ধন কেবল তাঁর পক্ষেই ঘটানো সম্ভব ছিল। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন সত্য, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কালজয়ী সৃষ্টিগুলো যুগের পর যুগ ধরে আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে।
যতদিন এ দেশে সুরের চর্চা থাকবে, নিঝুম রাতে রেডিও কিংবা হেডফোনে বেজে উঠবে তাঁর লেখা গান, ততদিন আহমেদ ইউসুফ সাবের বেঁচে থাকবেন প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয়ে। ওপারে ভালো থাকবেন হে কালজয়ী কথামালা ও সুরের জাদুকর। আপনার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

