ব্যান্ড নোভা : আহ্বান থেকে ভাইসো- প্রথম চার অ্যালবামের গল্প
নোভা আশির দশকের বাংলাদেশি রকের এক দুঃসাহসী অধ্যায়।সাইকেডেলিক হার্ড ও প্রোগ্রেসিভ রকের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই ব্যান্ডটি ১৯৮৫ সালে যাত্রা শুরু করে। প্রথমদিকে ওয়েস্টার্ন কাভার গান দিয়ে পরিচিতি পেলেও খুব দ্রুতই নোভার সদস্যরা ঝুঁকে পড়েন মৌলিক সৃষ্টির দিকে। যেখানে সুরের ব্যতিক্রম, গানের গঠন আর বিষয়বস্তুর গভীরতায় তারা আলাদা হয়ে ওঠে সমসাময়িকদের থেকে। এই সৃজনশীল অভিযাত্রার ফল হিসেবে ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয় তাদের প্রথম অ্যালবাম আহ্বান। যা নোভাকে এনে দেয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে আহবান নেশার আগুন জ্বেলে গানটি মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবেও জায়গা করে নেয়। সংগীত যে কেবল বিনোদন নয় সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ারও হতে পারে নোভা সেই বার্তাই শক্তভাবে উচ্চারণ করেছিল তাদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় অ্যালবাম ছিল রাজাকারের তালিকা চাই। নোভা ব্যান্ডের নাম উচ্চারন হলে প্রথমেই যার নাম এসে েপড়ে নোভা ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা লীড গিটারিস্ট,ভোকাল ও নোভার বেশির ভাগ গানের সুর কথা ও কম্পোজিশন করা আহমেদ ফজল করিম। নোভাব ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠা কালীন মেম্বার ও কিবোর্ডিস্ট ও ভোকাল শামীম হায়দার খান টলো ২০২২ সালে কানাডাতে ইন্তেকাল করেন। নোভা এ পর্যন্ত তাদের অ্যালবাম প্রকাশ করেছে সাতটি আহবান (১৯৮৯), রাজাকারের তালিকা চাই (১৯৯০), স্কুল পলাতক মেয়ে (১৯৯৩), ভাইসো (১৯৯৬), নোভা ৯৯ (১৯৯৯), ঠিকানা (২০০২), Return of the Nova (২০১০)। আজ থাকছে ব্যান্ড নোভার প্রথম চারটি অ্যালবামের কথা।
অ্যালবাম প্রোফাইল: আহবান (১৯৮৯)
১৮৮৯ সালে নোভা ব্যান্ড তাদের প্রথম অ্যালবাম আহবান প্রকাশ করে অডিও প্রতিষ্ঠান সারগামের ব্যানারে। প্রথম অ্যালবামেই জয় করে নেয় শ্রোতাদের মন এমনকি রাস্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত হয় তাদের আহবান শিরোনামের গানটি। তৎকালীন মাদকবিরোধী প্রচারণায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তরুণ সমাজকে মাদকের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার জন্য এই গানটি ইতিহাসে স্থান করে নেয়। অন্যান্য গানের মাঝে রাখাল ছেলে, সজনী, ডাঃ আতিকুল্লাহ গান গুলো জনপ্রিয়তা পায়। এই অ্যালবামের প্রতিটি গানের কথা সুর মিউজিক কম্পোজিশন ছিল ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট ও ভোকাল আহমেদ ফজল করিম। অ্যালবামটায় ছিল দুজন মেইন ভোকাল ফজল ও শাকিল। আহবান গানটি ছিল শাকিল খানের কন্ঠে একটি মাস্টারপিস।
নেশার আগুন জ্বেলে
তুমি কে শোনো মোর গান
এসো প্রানের প্রদীপ জ্বালি
তোমার তরে
এ আমার আহবান
আঁধারে চেয়ে থেকে কোন
বাবার আহবান
কেঁদে কেঁদে অন্ধ কত শত
মায়ের আহবান
সবার তরে আকুল করা
এ আমার আহবান....
🎸 লাইন-আপ
শাকিল খান: ভোকাল
ময়ো: ড্রামস
টলো (প্রয়াত): কি-বোর্ড
ভালো: বেস গিটার
💿 ট্র্যাক লিস্ট: আহবান (১৯৮৯)ময়ো: ড্রামস
টলো (প্রয়াত): কি-বোর্ড
ভালো: বেস গিটার
🎵 ০১. আহবান — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল ও শাকিল)
🎵 ০২. রাখাল ছেলে — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: শাকিল)
🎵 ০৩. সজনী— (কথা: ফজল / কণ্ঠ: শাকিল)
🎵 ০৪. দুঃখু কান্দে — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৫. বন্যা — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৬. নোভা — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৭. ডাঃ আতিকুল্লাহ — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৮. মানুষ যদি — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৯. খোকান কোথাও — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: শাকিল)
🎵 ১০.নীলঞ্জনা নদীর — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ১১. রোখে আলাদিন — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ১২. দ্যুতি — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: শাকিল)
অ্যালবাম প্রোফাইল: রাজাকারের তালিকা চাই (১৯৯০)
১৯৯০ সালে নোভা প্রকাশ করে তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম রাজাকার-এর তালিকা চাই সারগামের ব্যানার থেকে। তাদের দ্বিতীয় অ্যালবামে স্থান পায় বক্তব্যধর্মী গান। যার মধ্যে অন্যতম ছিল শিরোনাম গান রাজাকার-এর তালিকা চাই। পিংক ফ্লয়েডের বিখ্যাত গান Another Brick in the Wall এর আদলে গাওয়া এই গানটি সে সময় রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করে। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এটিই প্রথম গান যেখানে প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানানো হয় এবং দৃপ্ত কণ্ঠে বলা হয় ওই রাজাকার ছেড়ে যা এই দেশটা আমার। কল্পনার বাহিরে তাদের রাজাকারেদের প্রতি ঘৃনা প্রতিবাদের ভাষা। রাজাকারের তালিকা চাই অ্যালবামের টাইটেল আর দেশের রাজাকারের বংশ তো আর চুপ থাকতে পারে না। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে নোভাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। ৯০ এর গণতন্ত্র উদ্ধারের উত্তাল আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ব্যান্ডটির ওপর থেকে। ব্যান্ড লাইন আপে কিছু পরিবর্তন হয়। ভোকাল শাকিল খান ব্যান্ড ছেড়ে চলে যায়। পদ্মার চরে গানটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল।
আর নয়, আর কতকাল তারা পাবে প্রশ্রয়!
পরাজিত সব দালাল আজ দাও পরিচয়
আজ যারা এই মাটিতে হাতিয়ার শানে
আজ যাদের রক্ত চোখ মোদেরই পানে
ওই রাজাকার ছেড়ে যা এই দেশটা আমার
আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ করবে তোদের চির অবসান,
আসছে এই প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদেরই সন্তান
আমরা এই প্রজন্ম রাজাকারের তালিকা চাই
লাখো শহীদের সাথে
মুক্তিযোদ্ধা আমরা সবাই।।
🎸 লাইন-আপ
ময়ো: ড্রামস
টলো (প্রয়াত): কি-বোর্ড
ভালো: বেস গিটার
💿 ট্র্যাক লিস্ট: রাজাকারের তালিকা চাই (১৯৯০)টলো (প্রয়াত): কি-বোর্ড
ভালো: বেস গিটার
🎵 ০১. পদ্মার চরে — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল )
🎵 ০২. রাজাকারের তালিকা চাই — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৩. খাই জেলে ভাত— (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৪. লাশ জলে ভাসে — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৫. বাবুরাম সাপুড়ে — (কথা: ছড়া সংগ্রহ / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৬. নূর হোসেন — (কথা: টলো / কণ্ঠ: টলো)
🎵 ০৭. হাতছানি — (কথা: ভালো / কণ্ঠ: ভালো)
🎵 ০৮. ফিরে আর আসবে না — (কথা: টলো / কণ্ঠ: টলো)
🎵 ০৯. গল্পে ভরা রাত — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল ও টুলো)
🎵 ১০.হে বিশ্ববাসী — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ১১. চিতায় সাজাইলাম বাসর — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ১২. নীনা হাসনাঈন — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
অ্যালবাম প্রোফাইল: স্কুল পলাতক মেয়ে (১৯৯৩)
ব্যান্ড নোভার কালজয়ী অ্যালবাম হচ্ছে স্কুল পলাতক মেয়ে অ্যালবামটি। ১৯৯৩ অডিও প্রতিষ্ঠান সাউন্ডটেকের ব্যানার থেকে প্রকাশিত হয়। অ্যালবামের ক্যাসটির ছিল সোপ কেস মত দেখতে না সোপ কেস ছিল। এরজন্য প্রথমে ক্যাসেটের দামটি ছিল ৩৫ টাকার জায়গায় ৪৫ টাকা। অ্যালবাম প্রকাশের আগের বছর বিটিভির এক অনুষ্ঠানে নোভা স্কুল পলাতক মেয়ে গানটা প্রথম প্রচারিত হয় আর আলোড়ন ফেলে দেয়।
স্বপ্ন রানী ঘুম ঘুম মালা নিয়ে | রাতজাগা পাখি হয়ে এসো
নোভা | স্কুল পলাতক মেয়ে
ব্যান্ড নোভার স্কুল পলাতক মেয়ে অ্যালবামের ব্যান্ড লাইন আপে বড় পরির্বতন আসে। বর্তমান কিংবদন্তি সাউন্ ইঞ্জিনিয়ার চারু বেস গিটার আর কি-বোর্ডে পাপ্পু যোগ দেয়। ড্রামারও পরিবর্তন আসে। এই অ্যালবামের আরেকটি জনপ্রিয় গানছিল স্বপ্ন রাণী ঘুম ঘুম মালা নিয়ে এসো।
🎸 লাইন-আপ
রানা: ড্রামস
পাপ্পু/রিপন: কি-বোর্ড
চারু: বেস গিটার
পাপ্পু/রিপন: কি-বোর্ড
চারু: বেস গিটার
জাফর: ম্যানেজার
💿 ট্র্যাক লিস্ট: স্কুল পলাতক মেয়ে (১৯৯৩)🎵 ০১. স্কুল পলাতক মেয়ে — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল )
🎵 ০২. রেলগাড়ি — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৩. স্বপ্ন রাণী— (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৪. মঙ্গল গ্রহে — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৫. মা — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৬. মেঁউ— (কথা: সংগ্রহ / কণ্ঠ: টলো)
🎵 ০৭. আয় আসু— (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৮. মেঘ আয় — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৯. বসুনিয়া — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল ও টুলো)
🎵 ১০.ইসা খাঁ — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ১১. কত সাঁধে — (কথা: অনীল দে / কণ্ঠ: ফজল)
অ্যালবাম প্রোফাইল: ভাইসো (১৯৯৬)
ব্যান্ড নোভার চতুর্থ অ্যালবাম ভাইসো। ১৯৯৬ সালে সঙ্গিতার ব্যানার থেকে প্রকাশিত হয়। তবে অ্যালবামটি আগের তিনটি অ্যালবামের মত আলোড়ন তুলতে পাড়েনি। তারপরও ঘৃনা, রাত জাগা পাখি, ঘুম পাড়নি মা, দিদি যায় জনপ্রিয়তা হয়েছিল। কথা রাখবো গানটি ব্যান্ড নোভার আরেকটি প্রতিবাদি সরে আহ্ববান।
এসো রাত জাগা পাখি | নোভা
নোভা-ভাইসো
🎸 লাইন-আপ
শ্রী: ড্রামস
পাপ্পু: কি-বোর্ড
চারু: বেস গিটার
পাপ্পু: কি-বোর্ড
চারু: বেস গিটার
🎵 ০১. ভাইসো — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল )
🎵 ০২. ঘৃনা — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৩. রাত জাগা পাখি— (কথা: ফজল / কণ্ঠ: চারু)
🎵 ০৪. ঘুম পাড়ানী মা — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৫. প্রিয়ঞ্জনা — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৬. ভাগ— (কথা: ফজল / কণ্ঠ: চারু ও ফজল)
🎵 ০৭. দিদি যায় — (কথা: আনন্দ / কণ্ঠ: পাপ্পু/ শ্রী/ শায়লা শারমীন)
🎵 ০৮. কথা রাখবো — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ০৯. দুর বহুদুর — (কথা: চারু / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ১০. নিনা-২ — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
🎵 ১১. এ ছবি — (কথা: ফজল / কণ্ঠ: ফজল)
ব্যান্ড নোভা আশির দশকের বাংলাদেশি রকের এক দুঃসাহসী অধ্যায়। সাইকেডেলিক, হার্ড ও প্রোগ্রেসিভ রকের মেলবন্ধনে ১৯৮৫ সালে যাত্রা শুরু করা এই ব্যান্ডটি এমন এক সময়ে আত্মপ্রকাশ করে, যখন দেশীয় ব্যান্ড সংগীত নিজস্ব ভাষা খুঁজছিল। ব্যান্ড সংগীত যে কেবল বিনোদন নয় সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ারও হতে পারে নোভা সেই বার্তাই দিয়ে গেছে তাদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। অন্যকোন দিন থাকবে ব্যান্ড নোভা দ্বিতীয় পর্ব।

