তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রভুবনবাংলাদেশের বিকল্প ধারার সিনেমার এক অনন্য নির্মাতা
বাংলা চলচ্চিত্রে ‘বিকল্প ধারা’ বা ‘স্বাধীন চলচ্চিত্র’ শব্দবন্ধগুলো উচ্চারিত হলেই যে নামটি সবার আগে মনের কোণে ভেসে ওঠে তিনি তারেক মাসুদ। চলচ্চিত্র ছিল তার কাছে শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং সমাজ পরিবর্তনের, ইতিহাসকে নতুন করে চেনার এবং শেকড়ের সন্ধানের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। মাটি ও মানুষের গল্পকে যেভাবে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছেন তা আজও এদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করে।
স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ এই নির্মাতা তার কাজের মাধ্যমে বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন পরিচয় এনে দেন। তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো যেমন নন্দিত, তেমনি চিন্তাশীল ও মানবিক। আজকের আমরা ফিরে তাকাবো এই গুণী নির্মাতার জীবন, সৃষ্টি এবং সেলুলয়েডের ক্যানভাসে তার রেখে যাওয়া অবিস্মরণীয় কিছু কাজের দিকে।
মাদ্রাসা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: জীবনের শুরুর ক্যানভাস
১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া তারেক মাসুদের জীবনের শুরুটা ছিল একটু ভিন্নধর্মী। বাবার ইচ্ছায় প্রথম পড়াশোনা শুরু করেন মাদ্রাসায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।
পরবর্তীতে ফরিদপুর ও ঢাকা থেকে সাধারণ শিক্ষায় ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীনই তিনি লেখক শিবির, বাম আন্দোলন এবং চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ইতিহাসের ছাত্র হওয়ার কারণেই হয়তো পরবর্তীতে তার প্রতিটি চলচ্চিত্রে ইতিহাস এক জীবন্ত চরিত্র হয়ে ধরা দিয়েছিল।
এক নজরে তারেক মাসুদের কালজয়ী চলচ্চিত্রসমূহ
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স শেষ করার পর তিনি নির্মাণ শুরু করেন তার প্রথম বড় কাজ আদম সুরত। শিল্পী এস এম সুলতান-এর জীবন ও শিল্পচর্চাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র সম্পন্ন করতে তার সাত বছর সময় লেগেছিল। ১৯৮৯ সালে মুক্তির পর এটি বাংলাদেশের প্রামাণ্যচিত্র ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
- প্রামাণ্যচিত্র-সোনার বেড়ি-১৯৮৭
- প্রামাণ্যচিত্র-আদম সুরত-১৯৮৯
- প্রামাণ্যচিত্র-ইউনিসন-১৯৯২
- প্রামাণ্যচিত্র-সে-১৯৯৩
- পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র-মুক্তির গান-১৯৯৫
- প্রামাণ্যচিত্র-শিশু কথা-১৯৯৫
- ডকুমেন্টারি-নিরাপত্তার নামে-১৯৯৮
- পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র-মুক্তির কথা-১৯৯৯
- ডকুমেন্টারি-নারীর কথা-২০০০
- পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র- মাটির ময়না-২০০২
- ডকুমেন্টারি-আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড-২০০২
- পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র- অন্তর্যাত্রা-২০০৬
- প্রামাণ্যচিত্র-কানসার্টের পথে-২০০৮
- স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র-নরসুন্দর'-২০০৯
- পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র- রানওয়ে-২০১০
চলচ্চিত্র ভাষা ও নির্মাণশৈলী
তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তবধর্মী গল্প বলার ভঙ্গি। তিনি লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন, রাজনৈতিক ইতিহাস ও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে খুব সূক্ষ্মভাবে চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলতেন। তার নির্মাণশৈলী বাংলাদেশের মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তার সিনেমায় দেখা যায়—
- মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় ইতিহাসের পুনর্বিবেচনা
- ধর্ম ও মানবতার দ্বন্দ্ব
- প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম
- লোকসঙ্গীত ও গ্রামীণ সংস্কৃতির ব্যবহার
- ডকুমেন্টারি ও ফিকশনের মিশ্রণধর্মী ভাষা
আদম সুরত’: তারেক মাসুদের ক্যামেরায় শিল্পী এস এম সুলতানের জীবনগাথা
বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও আধুনিক চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে নির্মিত কালজয়ী প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’ (১৯৮৯)। এটি প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের পরিচালিত প্রথম প্রামাণ্যচিত্র। ১৬ মিলিমিটার প্রযুক্তিতে নির্মিত এই তথ্যচিত্রে সুলতানের দৈনন্দিন কর্ম ও শিল্পজীবনের পাশাপাশি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি ও কৃষকদের চিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
১৯৮২ সালে লেখক আহমদ ছফার একটি লেখা পড়ে তারেক মাসুদ এই প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণে অনুপ্রাণিত হন। বিদেশে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে, জমানো সব টাকা দিয়ে তিনি এই প্রজেক্টের কাজ শুরু করেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯ দীর্ঘ ৭ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমের পর এটি আলোর মুখ দেখে।
- ক্যামেরার পেছনে অনীহা: শুরুতে শিল্পী এস এম সুলতান ক্যামেরার সামনে আসতে চাননি। তিনি বলেছিলেন, "আমাকে উপলক্ষ করে আপনারা বাংলার কৃষকের ওপর ছবি বানান।"
- টিম ‘আদম সুরত’: প্রামাণ্যচিত্রটির চিত্রগ্রহণ করেছেন মিশুক মুনীর, নির্বাহী প্রযোজনা করেছেন ক্যাথরিন মাসুদ এবং সম্পাদনায় ছিলেন নজরুল ইসলাম। বাংলা ও ইংরেজি ধারাবর্ণনা করেছেন যথাক্রমে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ও আলমগীর কবির।
- প্রেম ও পরিণয়: এই প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের সময়ই তারেক মাসুদের সাথে ক্যাথরিন শেপিয়ারের (পরবর্তীতে ক্যাথরিন মাসুদ) পরিচয় হয়, যা ১৯৮৯ সালে বিয়েতে রূপ নেয়।
এতে লুডভিগ ফান বেটোফেনের ‘নাইনথ সিম্ফনি’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘সৃজন ছন্দে নাচে আনন্দে’ (কণ্ঠ: তানভীর আলম সজীব), শাহ আলম দেওয়ান ও নাসিমা বয়াতির গানসহ বেশ কিছু বৈচিত্র্যময় ও কালজয়ী গান ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত কারণে তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে এটি দেখানো সম্ভব হয়নি। ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রথম প্রদর্শনী হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে ঢাকার গ্যোটে ইনস্টিটিউটে এর উদ্বোধনী প্রদর্শনী করা হয়। ২০০৯ সালে এই ১৬ মি.মি. প্রামাণ্যচিত্রটিকে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা হয়
২০১৪ সালে ‘তারেক মাসুদ উৎসব’-এ এই প্রামাণ্যচিত্রের একটি সমৃদ্ধ ডিভিডি সংস্করণ প্রকাশ করা হয়, যাতে সুলতানের সাক্ষাৎকার, চিত্রসমগ্র এবং শুটিংয়ের দুর্লভ আলোকচিত্র যুক্ত রয়েছে।
মুক্তির গান’: যুদ্ধদিনের সুর ও তারেক-ক্যাথরিন মাসুদের কালজয়ী সৃষ্টি
১৯৯৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মুক্তির গান’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি অনন্য এবং ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত এই প্রামাণ্যচিত্রটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিপুল প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়।
হারিয়ে যাওয়া ২০ ঘণ্টার ফুটেজ (নির্মাণ-নেপথ্য)
লিয়ার লেভিনের সংগ্রহ: ১৯৭১ সালে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ নামক একটি সাংস্কৃতিক দলের সাথে যুক্ত হন। এই দলটি বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও মুক্তাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করত। লেভিন তাদের সাথে থেকে প্রায় ২০ ঘণ্টার চমৎকার ফুটেজ ধারণ করেন। কিন্তু যুদ্ধের পর আর্থিক সংকটের কারণে তিনি তা দিয়ে কোনো তথ্যচিত্র বানাতে পারেননি।
তারেক-ক্যাথরিনের উদ্ধারযজ্ঞ
দীর্ঘ দুই দশক পর, ১৯৯০ সালে নিউইয়র্কে তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ লিয়ার লেভিনের কাছ থেকে এই ঐতিহাসিক ফুটেজগুলো উদ্ধার করেন। এরপর আরও বিভিন্ন উৎস থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংরক্ষিত উপাদান এবং ২০ বছর আগের সেই শিল্পীদের সাথে যোগাযোগ করে তৈরি করেন পূর্ণাঙ্গ এই প্রামাণ্যচিত্র।
এই প্রামাণ্যচিত্রে গান গেয়েছেন এবং অংশ নিয়েছেন সেই সময়ের সাহসী সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: মাহমুদুর রহমান বেণু, শাহীন সামাদ, লুবনা মরিয়ম, বিপুল ভট্টাচার্য, দেবব্রত চৌধুরী, দুলাল চন্দ্র শীল, নায়লা খান, লতা চৌধুরী, শারমিন মুরশিদ, স্বপন চৌধুরী এবং তারিক আলী।
এছাড়াও এতে অংশ নেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী, আমিনুল হক চৌধুরীসহ নাম না জানা অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্বীকৃতি
চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর দর্শকদের আবেগকে নাড়া দেওয়ার পাশাপাশি বড় বড় দুটি পুরস্কার লুফে নেয়:
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৫): শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কৃত হন তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ।
- দক্ষিণ এশিয়া চলচ্চিত্র পুরস্কার: বিশেষ উল্লেখ (Special Mention) পুরস্কার লাভ করে।
- এক নজরে: ‘মুক্তির গান’ কেবল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নয়, এটি ছিল গান ও সুরের মাধ্যমে অস্ত্র না ধরেও কীভাবে যুদ্ধ জেতা যায়—তার এক জীবন্ত দলিল।
মাটির ময়না’: কান জয়ী তারেক মাসুদের এক কালজয়ী মাস্টারপিস
২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মাটির ময়না’ (The Clay Bird) বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মাইলফলক সৃষ্টি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য এই চলচ্চিত্রটি তাঁর নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার আলোকে নির্মিত। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী অশান্ত সময়ের প্রেক্ষাপটে, যুদ্ধ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে বিচ্ছিন্ন এক পরিবারের গল্প এতে ফুটে উঠেছে।
মূল কাহিনিসংক্ষেপ
চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র ‘আনু’ (নুরুল ইসলাম বাবলু) নামের এক কিশোর। আনুর বাবা কাজি (জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়) একজন ধর্মান্ধ মুসলিম ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। অন্যদিকে আনুর মা আয়েশা (রোকেয়া প্রাচী) এক সময়ের প্রফুল্ল মেয়ে হলেও বিয়ের পর স্বামীর গোঁড়ামির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন।
আনুর চাচা মিলন প্রগতিশীল ও বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। কাজি নিজের ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে আনুকে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন, যেখানে রোকন নামের এক নিঃসঙ্গ ছেলের সাথে আনুর বন্ধুত্ব হয়। দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সমান্তরালে আনুর পরিবার ও মাদ্রাসার ভেতরেও মধ্যপন্থী ও চরমপন্থী মতবাদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চমৎকারভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।
নির্মাণের নেপথ্য ও বৈশিষ্ট্য
আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্র: পরিচালক তারেক মাসুদ নিজেই ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত মাদ্রাসায় পড়েছেন। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এর চিত্রনাট্য তৈরি।
- অ-পেশাদার অভিনয়শিল্পী: চলচ্চিত্রটির প্রায় পুরো শুটিং হয়েছে ফরিদপুর ও ধামরাইয়ের গ্রামীণ লোকেশনে এবং এতে অংশ নিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ, পথশিশু ও প্রকৃত মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।
- লাইভ সাউন্ড: বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে বাস্তব আবহ ধরে রাখতে এর বিভিন্ন দৃশ্যে সরাসরি শব্দগ্রহণ (Direct Sound) করা হয়েছিল।
- সহ-প্রযোজনা: ফরাসি সরকারের ফন্ডস স্যুদ (South Fund) অনুদান এবং প্যারিস ভিত্তিক প্রযোজনা সংস্থা 'এমকেটু' (MK2)-এর যৌথ প্রযোজনায় এটি নির্মিত হয়।
সেন্সরশিপ ও বিতর্ক
কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হওয়ার পর, তৎকালীন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও মাদ্রাসা ব্যবস্থার বিকৃত উপস্থাপনার অজুহাতে চলচ্চিত্রটি দেশে নিষিদ্ধ করে। এর বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়। পরবর্তীতে তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ আপিল বিভাগে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হলে ২০০২ সালের শেষের দিকে চলচ্চিত্রটি দেশে প্রদর্শনের অনুমতি পায়।
আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্য ও পুরস্কার
‘মাটির ময়না’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করে এবং অস্কারের ‘শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র’ বিভাগে বাংলাদেশের পাঠানো প্রথম চলচ্চিত্র হওয়ার গৌরব অর্জন করে। প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কারসমূহ:
- কান চলচ্চিত্র উৎসব (২০০২): ডিরেক্টর্স ফোর্টনাইট আয়োজনে প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে ফিপরেস্কি (FIPRESCI) আন্তর্জাতিক সমালোচকদের পুরস্কার লাভ।
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (বাংলাদেশ): শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার (তারেক মাসুদ), শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী (রাসেল ফরাজী) এবং বিশেষ শিশু শিল্পী (নুরুল ইসলাম বাবলু) বিভাগে পুরস্কৃত।
- মারাকেশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (মরক্কো): শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য পুরস্কার।
- কারা চলচ্চিত্র উৎসব (পাকিস্তান): শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এবং শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত (মৌসুমী ভৌমিক) পুরস্কার।
- বাচসাস পুরস্কার: শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও পরিচালকসহ মোট ৫টি বিভাগে পুরস্কার।
বিখ্যাত মার্কিন সমালোচক এলভিস মিচেল (The New York Times) ছবিটির প্রশংসা করে বলেন। সহজেই এই বছরের বা অন্য যেকোনো বছরের সেরা ছবি। এটি সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীর মতোই চিত্তাকর্ষক এবং স্বাভাবিক।
আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড’: পথশিশুদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব
চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ কেবল বড় ক্যানভাসেই গল্প বলেননি। সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর এবং ক্যাথরিন মাসুদের যৌথ পরিচালনার অন্যতম একটি অনবদ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড’ (A Kind of Childhood)। এটি মূলত বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত ও শ্রমজীবী পথশিশুদের রূঢ় বাস্তবতা এবং তাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের এক মর্মস্পর্শী দলিল।
পটভূমি ও মূল বিষয়বস্তু
প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছে রাজধানী ঢাকার ফুটপাতে, বস্তিতে কিংবা কলকারখানায় কাজ করা পথশিশুদের জীবনকে কেন্দ্র করে। যেখানে একটি শিশুর হাতে বই-খাতা কিংবা খেলনা থাকার কথা, সেখানে বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের নামতে হয় কঠিন উপার্জনের লড়াইয়ে।
কুলি, হকার, টোকাই বা কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করা এই শিশুদের যাপিত জীবন, তাদের স্বপ্ন, আনন্দ-বেদনা এবং বেঁচে থাকার নির্মম সংগ্রামকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন তারেক মাসুদ।
দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণ (Longitudinal Documentary)
‘আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড’-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কোনো সাময়িক বা তড়িঘড়ি করে বানানো প্রামাণ্যচিত্র নয়। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ প্রায় ৫ বছর ধরে একই একদল পথশিশুর জীবনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
পাঁচ বছরে একটি শিশু কীভাবে শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পণ করছে এবং সময়ের সাথে সাথে তাদের স্বপ্নগুলো কীভাবে বাস্তবতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে—ক্যামেরার ফ্রেমে সেই রূপান্তরটি নিখুঁতভাবে ধরা পড়েছে।
চলচ্চিত্রের নামকরণের সার্থকতা
নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক চরম উপহাস ও বেদনা। ‘আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড’ বা ‘এক ধরণের শৈশব’—বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে যে, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুরা যেভাবে স্বাভাবিক নিয়মে শৈশব কাটায়, এই পথশিশুদের শৈশব তেমন নয়। তাদের শৈশব মানেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সস্তা শ্রম, ক্ষুধা আর বেঁচে থাকার লড়াই। এটি এক অন্যরকম, অনাকাঙ্ক্ষিত শৈশব, যা সমাজ তাদের উপহার দিয়েছে।
নির্মাণশৈলী ও দৃষ্টিভঙ্গি
তারেক মাসুদ এই প্রামাণ্যচিত্রে শিশুদের কেবল ‘দয়া বা করুণার পাত্র’ হিসেবে দেখাননি। বরং চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তাদের ভেতরের প্রাণচাঞ্চল্য, বন্ধুত্ব, রসবোধ এবং আত্মসম্মানবোধকে তুলে ধরেছেন। কোনো কৃত্রিম মেলোড্রামা ছাড়াই, ডিরেক্ট সিনেমার (Direct Cinema) স্টাইলে বাস্তবতাকে সরাসরি দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দর্শককে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
অন্তহীন যাত্রার প্রথম ধাপ
সেলুলয়েডের ক্যানভাসে তারেক মাসুদ যে বাস্তবতার বীজ বুনেছিলেন, তা শুধু রূপালী পর্দার গল্প ছিল না; তা ছিল এদেশের মাটি ও মানুষের অবিকল প্রতিচ্ছবি। 'আদম সুরত' থেকে শুরু করে 'আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড' প্রতিটি সৃষ্টিতেই তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে চলচ্চিত্রের ভাষা দিয়ে সমাজ ও ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণ করা যায়।
তবে এই গুণী নির্মাতার সৃষ্টির ক্যানভাস এখানেই শেষ নয়।তার নির্মিত অন্যান্য কালজয়ী কাজ, চলচ্চিত্রে লোকসঙ্গীতের অনবদ্য ব্যবহার এবং তাঁর আকস্মিক প্রয়াণের পর এদেশের চলচ্চিত্রে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকছে এই আয়োজনের আগামী পর্বে।
