ঘাস বনে সাপ হিস হিস হিসকানে কানে কথা ফিস ফিস ফিসকড়কড়ে চটি চটাস চটাসরেগেমেগে চড় ঠাস ঠাস ঠাস
আমাদের শৈশবের মেঘলা আকাশ, টাপুর টুপুর বৃষ্টি কিংবা অলস দুপুরের ছুটির ঘণ্টা সবকিছুতেই যেন এক অদ্ভুত জাদুকরী সুর বুনে দিয়েছেন আমাদের প্রিয় কবি আহসান হাবীব।
১৯১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুরের শংকরপাশা গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছিলেন আধুনিক বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি এবং প্রথিতযশা সাংবাদিক। তাঁর পরিশীলিত ও সংবেদনশীল লেখনী যেমন বড়দের মনের মণিকোঠায় নাড়া দিয়েছে।
তেমনি তাঁর ছড়ার মিষ্টি ছন্দ দোলা দিয়েছে প্রতিটি শিশুর মনে। চল্লিশের দশকের অন্যতম প্রধান এই কবির কাব্যশৈলী ছিল আড়ম্বরহীন কিন্তু গভীর অর্থবহ। সাহিত্যকৃতির অসামান্য অবদানের জন্য তিনি লাভ করেছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং একুশে পদক।
১৯৪৮ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'রাত্রিশেষ' আধুনিক বাংলা কবিতায় তাঁর শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। পরবর্তীতে 'ছায়াহরিণ', 'সারা দুপুর', 'আশায় বসতি' কিংবা 'মেঘ বলে চৈত্রে যাবো'-র মতো কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
পেশাগত জীবনে দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা ও দৈনিক বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করলেও, নিজের ভেতরের শিশুমনটিকে তিনি কখনোই হারিয়ে যেতে দেননি। বড়দের সিরিয়াস কবিতার সমান্তরালে তাঁর শিশুতোষ হৃদয়ের এক অনন্য প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ছড়া ও কবিতায়।
আজকের এই বিশেষ আয়োজনে কবি আহসান হাবীবের শৈশবের তেমনই জাদুকরী, চিরসবুজ ও জনপ্রিয় ১০টি ছড়া নিয়ে সাজিয়েছি আমাদের পর্ব।
এই ছড়াগুলোর হাত ধরে আরও একবার হারিয়ে যাওয়া সোনালী শৈশবে ডুব দেওয়া যাক:
ভেংচি-কবি আহসান হাবীব
ভেংচি খাবে ভেংচি?
যাচ্ছে হেঁকে ফেরিওয়ালা
নাম নাকি তার লেংচি।
ভেংচি খাবে ভেংচি?
ইচ্ছা-কবি আহসান হাবীব
মনারে মনা কোথায় যাস?
বিলের ধারে কাটব ঘাস।
ঘাস কি হবে?
বেচব কাল,
চিকন সুতোর কিনব জাল।
জাল কি হবে?
নদীর বাঁকে
মাছ ধরব ঝাঁকে ঝাঁকে।
মাছ কি হবে?
বেচব হাটে,
কিনব শাড়ি পাটে পাটে।
বোনকে দেব পাটের শাড়ি,
মাকে দেব রঙ্গিন হাঁড়ি।
ছড়া ( শন শন শন)-কবি আহসান হাবীব
ঝাউয়ের শাখায় শন শন শন
মাটিতে লাটিম বন বন বন
বাদলার নদী থৈ থৈ থৈ
মাছের বাজার হৈ হৈ হৈ।
ঢাকিদের ঢাক ডুমডুমাডুম
মেঘে আর মেঘে গুড়ুমগুড়ুম
দুধকলাভাত সড়াত সড়াত
আকাশে বাজে চড়াৎ চড়াৎ।
ঘাস বনে সাপ হিস হিস হিস
কানে কানে কথা ফিস ফিস ফিস
কড়কড়ে চটি চটাস চটাস
রেগেমেগে চড় ঠাস ঠাস ঠাস।
খোপের পায়রা বকম বকম
বিয়েমজলিশ গম গম গম
ঘাটের কলসি বুট বুট বুট
আঁধাঁরে ইঁদুর কুট কুট কুট।
বেড়ালের ছানা ম্যাও ম্যাও ম্যাও
দু দিনের খুকু ওঁয়াও ওঁয়াও।
গরুর গাড়ি-কবি আহসান হাবীব
ঐ চলে যায় গরুর গাড়ি
ডাইনে পুকুর বাঁয়ে বাড়ি।
গলায় ঘুঙুর ঝুন ঝুনা ঝুন
ধোপার গাধা রেগে আগুন।
গানের চোটে খাড়ায় কান
গলাটা তার টান- টান।
শরতে-কবি আহসান হাবীব
ফূল ফুল তুল তুল গা ভেজা শিশিরে,
বুল বুল মশগুল, কার গান গাহিরে?
তর বর উঠে পর রাত ভোর দেখ না?
হাত তুলে প্রাণ খুলে স্রষ্টারে ডাক না..
ঝিক মিক দশ দিক নাই পিক পাপিয়া..
সাদা বক চক চক উড়ে যায় ডাকিয়া..
বিল ঝিল খিল খিল লাল নীল বরণে,
গাছে গাছে ফিঙ্গে নাচে চঞ্জল চরনে।
ভেজা ভেজা তাজা তাজা শেফালির সুবাসে,
শিশুদল কোলাহল করে নানা হরষে।
টিদার জরিপার শ্যাম শাড়ী অঙ্গে
এ্যলো কেশে এলো হেসে শরত এ বঙ্গে..
মেঘনা পারের ছেলে-কবি আহসান হাবীব
আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে
আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।
মেঘনা নদীর ঢেউয়ের বুকে
তালের নৌকা বেয়ে
আমি বেড়াই হেসে খেলে।
আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে।
মেঘনা নদীর নেয়ে আমি মেঘনা পাড়ে বাড়ি।
ইচ্ছে হলেই এপার থেকে ওপারে দেই পাড়ি।
তালে তালে তালের নৌকা দু’হাতে যাই বেয়ে
আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।
পাহাড় সমান ঢেউয়ের বুকে নৌকো আমার ভাসে,
মেঘমুলুকের পাহাড় থেকে ঝড়ের ঝাপটা আসে।
মাথার ওপর মুচকি হাসে বিজলি নামের মেয়ে
আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।
ঝড়-কবি আহসান হাবীব
বৈশাখে ঝাউশাখে ঐ এল ঝড়
শুকনো কেয়ার পাতা কাঁপে থরথর।
আকাশে মেঘের দল
হাঁকে ঐ অবিরল,
বনে বনে বুনো হাওয়া বহে শন শন
চারিদিকে ওড়ে ধূলি ধোঁয়ার মতন।
উড়ছে পাখির দল ঝড় এল ভাই,
খুঁজে ফেরে এতটুকু দাঁড়াবার ঠাঁই।
চারিদিকে থৈ থৈ
আবছা আঁধার ঐ,
ওপাশের বাগানের বকুল শাখায়,
একপায়ে কালো কাক বসে আছে ঠায়।
ঝরঝর বারিধারা ঝরবে এখন,
এমন সময়ে কার ঘরে থাকে মন?
রূপকথা-কবি আহসান হাবীব
খেলাঘর পাতা আছে এই এখানে,
স্বপ্নের ঝিকিমিকি আঁকা যেখানে।
এখানে রাতের ছায়া ঘুমের নগর,
চোখের পাতায় ঘুম ঝরে ঝরঝর।
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের,
আকাশের নীল রং ছাউনিতে এর।
পরীদের ডানা দিয়ে তৈরি দেয়াল,
প্রজাপতি রং মাখা জানালার জাল।
তারা ঝিকিমিকি পথ ঘুমের দেশের,
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের।
ছোট বোন পারুলের হাতে রেখে হাত,
সাতভাই চম্পার কেটে যায় রাত।
কখনও ঘোড়ায় চড়ে হাতে নিয়ে তীর,
ঘুরে আসি সেই দেশ চম্পাবতীর।
এই খানে আমাদের মানা কিছু নাই,
নিজেদের খুশি মত কাহিনী বানাই।
এই খানে নিরঞ্জনা-কবি আহসান হাবীব
এইখানে নিরঞ্জনা নদী ছিলো
এই ঘাটে হাজার গৌতম
স্নান করে শুদ্ধ হয়েছেন।
নদী আছে ঘাট আছে
সেই শুদ্ধ জলের অভাব
অশুদ্ধ মানুষ খুব বেড়ে গেছে
সারিবদ্ধ স্নানার্থী মানুষ
মরানদী মরাস্রোত ছাড়িয়ে এখন _
বলে দাও
যেতে হবে অন্য কোনো নিরঞ্জনা নদীর সন্ধানে।
স্বদেশ-কবি আহসান হাবীব
এই যে নদী
নদীর জোয়ার
নৌকা সারে সারে,
একলা বসে আপন মনে
বসে নদীর ধারে
এই ছবিটি চেনা৷
মনের মধ্যে যখন খুশি
এই ছবিটি আঁকি
এক পাশে তার জারুল গাছে
দুটি হলুদ পাখি,
এমনি পাওয়া এই ছবিটি
কড়িতে নয় কেনা৷
কাঠের পরে মাঠ চলেছে
নেই যেন এর শেষ
নানা কাজের মানুষগুলো
আছে নানান বেশ,
মাঠের মানুষ যায় মাঠে আর
হাটের মানুষ হাটে,
দেখে দেখে একটি ছেলের
সারাটা দিন কাটে৷
এই ছেলেটির মুখ
সারা দেশের সব ছেলেদের
মুখেতে টুকটুক
কে তুমি ভাই,
প্রশ্ন করি যখন,
ভালোবাসার শিল্পী আমি,
বলবে হেসে তখন৷
এই যে ছবি এমনি আকা
ছবির মতো দেশ,
দেশের মাটি দেশের মানুষ
নানান রকম বেশ,
বাড়ি বাগান পাখ-পাখালি
সব মিলে এক ছবি,
নেই তুলি নেই রং, তবুও
আঁকতে পারি সবই৷
কবি আহসান হাবীবের ছড়াগুলো কেবল অক্ষরের বুনন নয়, বরং এগুলো আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের একেকটি জীবন্ত দলিল। প্রতিটি পঙ্ক্তি আজও আমাদের এক লহমায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই মেঠো পথ, নদী আর রূপকথার রাজ্যে।
আধুনিকতার ব্যস্ততায় আমরা যখন ক্লান্ত, তখন তাঁর এই চিরসবুজ ছড়াগুলো আমাদের মনে স্নিগ্ধ প্রশান্তি জোগায় এবং নতুন প্রজন্মকে চেনায় রূপসী বাংলার আসল রূপ। স্মৃতির আঙিনায় বেঁচে থাকুক আমাদের শৈশব, আর যুগ যুগ ধরে অমলিন থাকুক কবি আহসান হাবীবের এই অসামান্য সৃষ্টি। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
