অ্যানাটমিক্যাল আর্টের অন্ধকার ইতিহাস
শিল্প আর বিজ্ঞানের মিলনস্থল হিসেবে বহু শতাব্দী ধরে অ্যানাটমিক্যাল চিত্রকলা ও মেডিকেল ইলাস্ট্রেশনকে দেখা হয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে। তবে বর্তমান সময়ের এক নতুন প্রদর্শনী আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। আমরা যে সূক্ষ্ম রেখাচিত্র দেখে মানবদেহ চিনি, তার পেছনে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মৃত মানুষের প্রতি চরম অবমাননার ইতিহাস। যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের Thackray Museum of Medicine-এ শুরু হওয়া প্রদর্শনী “Beneath the Sheets: Anatomy, Art and Power” বিগত পাঁচ শতকের এমন কিছু কাজ সামনে এনেছে, যা আমাদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শীতের কোট চুরি আর মৃত্যুর পর শরীর কাটা রেমব্রান্টের ছবির সেই মানুষ:
রেমব্রান্টের বিখ্যাত চিত্রকর্ম The Anatomy Lesson of Dr Nicolaes Tulp (1632) আমরা অনেকেই দেখেছি। কিন্তু আমরা কি জানি ওই ছবির মৃতদেহটি কার? ইতিহাস বলছে, তিনি কোনো মহাপুরুষ ছিলেন না, বরং ছিলেন এক অতি সাধারণ মানুষ যার অপরাধ ছিল মাত্র একটি 'শীতের কোট' চুরি করা। এই তুচ্ছ অপরাধের জন্য তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় এবং মৃত্যুর পর তার শরীরকে জনসমক্ষে ব্যবচ্ছেদ করা হয়—যা ছিল এক ধরনের সামাজিক সার্কাস। এমনই এক করুণ গল্প মেরি বিলিয়ন নামক এক নারীর। ১৭৭৫ সালে মৃত্যুর পর তার ডেন্টিস্ট স্বামী তাকে মমি করে বিয়ের পোশাকে নিজের চেম্বারের জানলায় সাজিয়ে রেখেছিলেন স্রেফ বিজ্ঞাপনের জন্য! ভাবা যায়, একজন মানুষের মৃতদেহকে স্রেফ ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল?
কবর থেকে লাশ চুরি করত ‘Resurrection Men’
১৮২৩ সালে ইংল্যান্ডে মৃত্যুদণ্ড কমে যাওয়ায় মেডিকেল স্কুলগুলোতে লাশের সংকট দেখা দেয়। আর এই সংকট জন্ম দেয় এক ভয়ংকর কালোবাজারের। ‘দেহচোর’ বা ‘Resurrection Men’ নামে পরিচিত একদল লোক রাতের আঁধারে নতুন কবর খুঁড়ে লাশ চুরি করত। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, স্বজনদের লাশ বাঁচাতে পরিবারগুলো কবরের ওপর ভারী পাথর বসাত বা লোহার খাঁচা ‘mortsafe’ ব্যবহার করতে বাধ্য হতো।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের নামে হত্যাকাণ্ড: বার্ক ও হেয়ারের ভয়ংকর অধ্যায়
বিজ্ঞানের নেশা কতটা নৃশংস হতে পারে তার প্রমাণ স্কটল্যান্ডের উইলিয়াম বার্ক ও উইলিয়াম হেয়ার। তারা কবর চুরির ঝামেলা এড়াতে সরাসরি মানুষ হত্যা শুরু করে এবং সেই লাশ মেডিকেল স্কুলে বিক্রি করত। তাদের শিকার মেরি প্যাটারসনকে মদ খাইয়ে শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছিল। ভাগ্যের পরিহাস দেখুন, খুনি বার্ক যখন ধরা পড়ল, আদালত তার শাস্তিস্বরূপ তার মৃতদেহকেও জনসমক্ষে ব্যবচ্ছেদের নির্দেশ দেয়। আজ তার কঙ্কালটি এডিনবরা ইউনিভার্সিটির মিউজিয়ামে ঝুলে আছে বিজ্ঞানের এক অভিশপ্ত স্মৃতি হিসেবে।
বিজ্ঞান, কামনা আর ক্ষমতার মিশ্রণ
অ্যানাটমিক্যাল ছবিগুলো কি কেবল নিরপেক্ষ বিজ্ঞান? গবেষকরা বলছেন না। অনেক ক্ষেত্রে নারীর দেহকে এমনভাবে আঁকা হয়েছে যা বৈজ্ঞানিক হওয়ার চেয়েও বেশি 'ইমোটিক' বা কামোদ্দীপক। এমনকি বিখ্যাত চিত্রকর জোসেফ ম্যাকলিসের পুরুষদেহের ভঙ্গিমায় হোমোইরোটিক ইশারা খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। অর্থাৎ, বিজ্ঞানের পাতায় শিল্পীরা নিজেদের ব্যক্তিগত রুচি আর যৌনতাকে অজান্তেই ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
⚫ বর্ণবাদ ও ইতিহাসের চাপা দেওয়া সত্য
অ্যানাটমির ইতিহাসেও বর্ণবাদের বিষ রয়ে গেছে। আমেরিকার দাসপ্রথার সময় প্রকাশিত অনেক বই থেকে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের শারীরবৃত্তীয় ছবি বাদ দেওয়া হয়েছিল। যেন বিজ্ঞানের জগতেও সাদা-কালোর বিভাজন ছিল স্পষ্ট। প্রদর্শনীতে একটি বিরল কালো দেহের চিত্রকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে যেটিকে ওই সময়ের অ্যানাটমিক্যাল বইগুলোর মধ্যে সম্ভবত একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ শরীর বলে মনে করা হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় আমেরিকায় দাসপ্রথার সময় প্রকাশিত সংস্করণ থেকে সেই চিত্রটি বাদ দেওয়া হয়েছিল।
নাৎসি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ভয়াবহ উত্তরাধিকার
বিংশ শতাব্দীতে নাৎসি জার্মানিতে এডুয়ার্ড পার্নকফের তৈরি অ্যানাটমি অ্যাটলাস আজও বিতর্কিত। কারণ সেই বইয়ের ছবিগুলো আঁকা হয়েছিল নাৎসিদের হাতে নিহত যুদ্ধবন্দীদের ব্যবচ্ছেদ করে। আজও অনেক সার্জন এই বইটি ব্যবহার করেন, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় রক্তে ভেজা এই জ্ঞান কি আমরা গ্রহণ করব? ১৯৯০-এর দশকের ডিজিটাল ‘Visible Human Project’ এও একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দেহ ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কি জানতেন তার শরীর এভাবে চিরকালের জন্য পৃথিবীর সামনে ‘ডিজিটাল স্লাইস’ হয়ে থাকবে?
ডিজিটাল যুগেও মৃতদেহের প্রদর্শনী থামেনি
১৯৯০-এর দশকে তৈরি Visible Human Project–এ একটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দেহকে শত শত টুকরো করে স্ক্যান করে বানানো হয় থ্রিডি ডিজিটাল মানবদেহের ডেটাসেট। যদিও তিনি নিজের দেহ দান করেছিলেন, তবু গবেষকরা বলছেন তিনি কখনো কল্পনাও করতে পারেননি যে তার শরীর এভাবে পৃথিবীর সামনে উন্মুক্ত হয়ে থাকবে।
❓ শেষ প্রশ্ন: আমরা কি সত্যিই বদলেছি?
প্রদর্শনীর কিউরেটর ড. জ্যাক গান একটি অত্যন্ত রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনেছেন। তার মতে, অ্যানাটমিক্যাল শিল্প ও মেডিকেল ইলাস্ট্রেশন কেবল নির্ভেজাল বিজ্ঞান নয়; এটি আসলে এক চরম ক্ষমতার ইতিহাস। সমাজের যে মানুষগুলো বেঁচে থাকতে প্রান্তিক আর অবহেলিত ছিল, মৃত্যুর পর তাদের শরীরকেই ব্যবচ্ছেদ করে বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রদর্শনী আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে দেয় এবং বড় প্রশ্ন রেখে যায় “মানুষের শরীর নিয়ে আমরা কতটা নৈতিকভাবে এগিয়েছি? আমরা কি সত্যিই বদলেছি?” যদিও আজকের দিনে ‘সম্মতি’ বা ‘Consent’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রধান শর্ত, তবুও ডিজিটাল যুগে আমাদের তথ্য এবং শরীরের অবয়ব যখন ডেটাসেটে পরিণত হয়, তখন সেই পুরোনো প্রশ্নটিই ভিন্ন রূপে ফিরে আসে। অতীতের সেই ‘জোরপূর্বক ব্যবচ্ছেদ’ আর বর্তমানের ‘ডিজিটাল উন্মোচন’—তফাত কি খুব বেশি? সম্ভবত বিজ্ঞানের উন্নতির মোড়কে আমরা আজও সেই ক্ষমতার লড়াইটাই চালিয়ে যাচ্ছি। ইতিহাসের এই রক্তভেজা পাতাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মর্যাদা তার মৃত্যুর পরও শেষ হয়ে যায় না।
📌 প্রদর্শনী তথ্য
স্থান: Thackray Museum of Medicine, Leeds, UK
প্রদর্শনী: Beneath the Sheets: Anatomy, Art and Power
সময়কাল: পাঁচ শতকের অ্যানাটমিক্যাল আর্ট ও মেডিকেল বইয়ের সংগ্রহ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের আজকের এই অভাবনীয় সাফল্যের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না; বরং এটি ছিল রক্ত, অপমান আর শোষণের ইতিহাস। লিডসের এই প্রদর্শনী আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মহৎ উদ্দেশ্যের দোহাই দিয়ে অতীতে অসংখ্যবার মানবাধিকারকে পদদলিত করা হয়েছে। আমরা কি আজ সেই জায়গা থেকে সরে আসতে পেরেছি? নাকি আজও ক্ষমতার জোরে আমরা অন্যের শরীরকে স্রেফ 'বস্তু' হিসেবেই দেখছি? এই প্রশ্নটিই আজ সবচেয়ে বড়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধের যাবতীয় তথ্য ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের Thackray Museum of Medicine-এর প্রদর্শনী সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত ও সম্পাদিত।