ঐ দুর পাহাড়ের ধারে দিগন্তেরই কাছেনিঃসঙ্গ বসে একটি মেয়ে গাইছেআপন সুরে আপন সুরে আপন সুরে
বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের স্বর্ণযুগ বলা হয় আশির ও নব্বইয়ের দশককে। সেই সময়ে যে কটি ব্যান্ড তাদের ব্যতিক্রমী মেলোডি, চমৎকার লিরিক আর পপ-রকের ফিউশন দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিল তাদের মধ্যে ‘উইনিং’ অন্যতম।
১৯৮৩ সালের ১লা জানুয়ারি গঠিত হওয়া এই ব্যান্ডটির পেছনে রয়েছে এক দারুণ ইতিহাস। সত্তরের দশকে পপ সম্রাট আজম খানের ব্যান্ডের কয়েকজন সদস্য নিজেদের মৌলিক কিছু করার তাগিদ থেকে এই ব্যান্ডটি গড়ে তোলেন।
প্রাথমিক লাইন-আপে বারবার পরিবর্তন, সদস্যদের বিদেশ গমন কিংবা চোট পাওয়ার মতো নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও উইনিং কখনো তার গানের মান নিয়ে আপস করেনি। চন্দনের অসাধারণ কণ্ঠ ও গিটার, রঞ্জনের ড্রামস ও চমৎকার সব সৃষ্টি।
সব মিলিয়ে নব্বইয়ের দশকে উইনিং হয়ে ওঠে তরুণ প্রজন্মের ক্রেজ। আজ তিন দশকেরও বেশি সময় পার করে এসেও উইনিং-এর গানগুলো সমানভাবে জনপ্রিয় ও কালজয়ী।
উইনিং ব্যান্ডের এ যাবৎকালের প্রকাশিত অ্যালবামগুলো বাংলা ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাসে একেকটি মাইলফলক। তাদের প্রকাশিত অ্যালবামগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ডিস্কোগ্রাফি থাকছে আজ।
উইনিং (১৯৯১)
- অ্যালবাম: উইনিং
- ব্যান্ড: উইনিং
- রিলিজ: ১৯৯১
- ধরণ: Studio Album
- লেবেল: সারগাম-১৬৫
- প্রযোজনা: সারগাম
- মোট গান: ১২ টি
ব্যান্ডের সেলফ-টাইটেলড বা প্রথম ডেবিউ অ্যালবাম। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৯৯১ সালে অ্যালবামটি বাজারে আসে এবং প্রকাশের পরপরই এটি শ্রোতামহলে তুমুল সাড়া ফেলে দেয়।
- বিশেষত্ব: এই অ্যালবামের গানগুলোর সুর ও লিরিক এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তা উইনিং-কে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশের অডিও বাজারে এটি অন্যতম সফল অ্যালবাম হিসেবে পরিগণিত হয়।
- জনপ্রিয় গান: 'ইচ্ছেরে', 'সোনার মেয়ে', 'হৃদয় জুড়ে', 'এমন একটা সময় ছিল'।
⭕️অ্যালবামের লাইন-আপ: উইনিং
- জামান আলী চন্দন (ভোকাল/গিটার) •• মুহাম্মদ শামসুন নূর রঞ্জন (ভোকাল/ গিটার) •• বিপ্লব আশরাফ (কি-বোর্ড •• এস.এম মশিউর রহমান শেলী (বেস) •• শেখ মনিরুল আলম টিপু (ড্রামস)।
🎧 Tracklist (উইনিং)
- সোনার মেয়ে – (কথা: ডা. হাসান আলী সোহাগ / কণ্ঠ: চন্দন)
- জীবন নামে – (কথা: দীপন হায়দার / কণ্ঠ: রঞ্জন )
- হৃদয় জুড়ে – (কথা: চন্দন / কণ্ঠ: চন্দন)
- নীল চোখ – (কথা: হায়দার হোসেন / কণ্ঠ: রঞ্জন)
- বৃষ্টি ঝরে যায়– (কথা: চন্দন / কণ্ঠ: রঞ্জন)
- সময়ের তালে – (কথা: চন্দন / কণ্ঠ: চন্দন )
- সুন্দর ধরনী –(কথা: দীপন হায়দার / কণ্ঠ: রঞ্জন )
- দূর পাহাড় – (কথা: সালেক রায়হান / কণ্ঠ: চন্দন )
- মন কি যে চায়– (কথা: হায়দার হোসেন / কণ্ঠ: রঞ্জন )
- স্মৃতিগুলো– (কথা: চন্দন / কণ্ঠ: চন্দন )
- আঁধারে তুমি – (কথা: এস.এম তারেক / কণ্ঠ: চন্দন )
- আমি তো বুঝিনি – (কথা: রঞ্জন / কণ্ঠ: রঞ্জন )
নীল চোখে চোখ আমি রেখেছি
সাত রঙে মনে ছবি আমি এঁকেছি
তার চোখ ভরে জাদু আমি দেখেছি
যেন স্বর্গের কাছাকাছি এসেছি
কি মায়া সেই চোখে
আমি তো বুঝিনা
হয় সিক্ত নীলাম্বরী
তাহার মধুমাখা মুখচন্দন
এলোমেলো কেশ যেনো
আকাশের সাথী হয় চন্দ্র
সে যে রুপে অপরুপা
কোনো কবির কল্পনা
নীল চোখে চোখ আমি রেখেছি
সাত রঙে মনে ছবি আমি এঁকেছি
তার চোখ ভরে জাদু আমি দেখেছি
যেন স্বর্গের কাছাকাছি এসেছি
সে যে ছন্দের তালে তালে
পাহড়ী নৃত্যে নেচে চলে
গুনগুন সুরে সুরে হৃদয়ের কথা বলে
তার সুরের লহরে এই মন দিশেহারা
নীল চোখে চোখ আমি রেখেছি
সাত রঙে মনে ছবি আমি এঁকেছি
তার চোখ ভরে জাদু আমি দেখেছি
যেন স্বর্গের কাছাকাছি এসেছি
অচেনা শহর (১৯৯৪)
- অ্যালবাম: অচেনা শহর
- ব্যান্ড: উইনিং
- রিলিজ: ১৯৯৪
- ধরণ: Studio Album
- লেবেল: সাউন্ডটেক
- প্রযোজনা: সাউন্ডটেক
- মোট গান: ১২ টি
১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল উইনিং-এর ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও ব্যস্ত সময়। এই সফলতার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় ব্যান্ডের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘অচেনা শহর’।
- বিশেষত্ব: লাইভ কনসার্টের ব্যস্ততা এবং ব্যান্ড মেম্বারদের অভ্যন্তরীণ কিছু পরিবর্তনের মাঝেও এই অ্যালবামটি উইনিং-এর সিগনেচার মেলোডি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। আধুনিক নাগরিক জীবনের একাকীত্ব, প্রেম ও বাস্তবতার এক দারুণ প্রতিফলন ছিল এই অ্যালবামের গানগুলোতে।
- জনপ্রিয় গান: 'অচেনা শহর', 'দূরে বহু দূরে'।
⭕️অ্যালবামের লাইন-আপ:অচেনা শহর/উইনিং
- জামান আলী চন্দন (ভোকাল/গিটার) •• শেখ মনিরুল আলম টিপু (ড্রামস) •• বিপ্লব আশরাফ (কি-বোর্ড •• ইমরান আহমেদ চৌধুরী মবিন (বেস)।
🎧 Tracklist (অচেনা শহর)
- ইচ্ছে করে – (কথা: জাহান আলী সানাই / কণ্ঠ: চন্দন)
- প্রিয় ঠিকানা – (কথা: দীপন (জাহাঙ্গীর হায়দার) / কণ্ঠ: চন্দন)
- মনে পড়ে – (কথা: দীপন (জাহাঙ্গীর হায়দার) / কণ্ঠ: চন্দন)
- তারা ভরা এই রাতে – (কথা: চন্দন / কণ্ঠ: চন্দন )
- একা থাকা– (কথা: অন্তু / কণ্ঠ: চন্দন)
- অচেনা শহর – (কথা: দীপন (জাহাঙ্গীর হায়দার) / কণ্ঠ: চন্দন)
- ধূমকেতু –(কথা: দীপন (জাহাঙ্গীর হায়দার) / কণ্ঠ: চন্দন)
- প্রদর্শনী – (কথা: দীপন (জাহাঙ্গীর হায়দার) / কণ্ঠ: চন্দন)
- শীতের সকাল– (কথা: দীপন (জাহাঙ্গীর হায়দার) / কণ্ঠ: চন্দন)
- আনন্দ– (কথা: দীপন (জাহাঙ্গীর হায়দার) / কণ্ঠ: চন্দন)
ইচ্ছে করে
যাই চলে যাই অচিনপুর
যেখানে দুঃখ নেই কষ্ট নেই
ঝলমল করে আলো
রোদ্দুর...
ইচ্ছে করে
হাটি এলোমেলো মেঠো পথ ধরে
গানের সুরে ছন্দে মাতি
ইচ্ছে করে
শহর থেকে একটু দুরে
ছায়া ঘেরা মোঠো পথ
পেড়োলেই
ছায়াঘেরা নদী
শ্যামল সবুজ বন
ইচ্ছে করে দেখি ভরে এই
দু' নয়ন
ইচ্ছে করে
যাই চলে যাই অচিনপুর
যেখানে দুঃখ নেই কষ্ট নেই
ঝলমল করে আলো
রোদ্দুর...
ক্লান্ত লাগে নগর জীবন
কৃত্রিম প্রেমে বিষন্ন এ মন
ইচ্ছে করে সাগর পারে
সন্ধ্যা বেলা
দেখি সূর্যডোবা
দেখি বালুকাবেলা
জোৎস্না রাতে তারার মেলায়
নিমগ্ন একা
হেটে যাই
চলে যাই অনেক দুর
যেখানে দুঃখ নেই কষ্ট নেই
ঝলমল করে আলো
রোদ্দুর...
ইচ্ছে করে
হাটি এলোমেলো মেঠো পথ ধরে
গানের সুরে ছন্দে মাতি
ইচ্ছে করে
উইনিং প্রবাসে (২০০৩)
২০০০ সালের পর ব্যান্ডের মূল ভোকাল ও গিটারিস্ট চন্দন কানাডাতে প্রবাসী হলে সেখানে ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রঞ্জনের সাথে তাঁর আবার দেখা হয়। দেশের বাইরে থেকেও উইনিং-এর গানকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ থেকে ২০০৩ সালে কানাডায় বসে তারা প্রকাশ করেন ‘উইনিং প্রবাসে’ অ্যালবামটি।
দেশের বাইরে প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রোতাদের কথা মাথায় রেখে এবং নিজেদের সাউন্ডকে আন্তর্জাতিক আঙিনায় তুলে ধরতে এই অ্যালবামটি ভূমিকা রাখে। একই বছর বাংলাদেশেও চন্দনকে ছাড়াই উইনিং এর অন্য সদস্যরা একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন। কানাডার মন্ট্রিল, অটোয়াসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই অ্যালবামের গানগুলো প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাঝে দারুণ আবেগ তৈরি করে।
বহু দূরে (২০১৬)
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৬ সালে উইনিং প্রকাশ করে তাদের তৃতীয় স্টুডিও অ্যালবাম ‘বহুদূরে’। সফট রক ও মেলো রকের মিশেলে নির্মিত ১২টি গানের এই অ্যালবামে স্থান পায় ‘বহুদূরে’, ‘কখনো আমাকে’, ‘দূর পাহাড় ২’ এবং ‘চলো’-র মতো জনপ্রিয় গান।
অ্যালবামটির নামকরণ প্রসঙ্গে ব্যান্ডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রঞ্জন জানান, দীর্ঘ ৩৩ বছরের পথচলায় তারা বন্ধু, দেশ ও গানের জগৎ থেকে অনেক দূরে সরে গেলেও পুরোনো স্মৃতিগুলো আজও তাদের তাড়া করে ফেরে। সেই অনুভূতি থেকেই অ্যালবামের নাম রাখা হয় ‘বহুদূরে’।
- চলো
- ইচ্ছে গুলো চেপে রাখা
- বাংলাদেশ
- দূর পাহাড়ের ধারে-২
- মন কিযে চায় বলো-২
- মায়া
- ডানপিটে এই মন
- তোমাকে
- নতুন রঙে
- সারা
- বহু দূরে
সময়ের আবর্তে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ধরণ বদলেছে, ক্যাসেটের ফিতা পেরিয়ে গান এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। তবে তিন দশক পার করেও উইনিং ব্যান্ডের মেলোডি আর পপ-রকের আবেদন একটুও কমেনি।
'ইচ্ছেরে', 'অচেনা শহর' কিংবা 'বহুদূরে'র মতো গানগুলো আজও আমাদের স্মৃতিকাতর করে, মনে করিয়ে দেয় বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের এক সোনালী অধ্যায়কে। যুগের পর যুগ ধরে উইনিং-এর এই কালজয়ী সৃষ্টিগুলো প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয়ে বেঁচে থাকবে এক পরম নস্টালজিয়া হয়ে।
