সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেইবন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এবং দ্রোহী কবি মোহাম্মদ রফিক (২৩ অক্টোবর ১৯৪৩ – ৬ আগস্ট ২০২৩)। আশির দশকের উত্তাল ও দমবন্ধ করা স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের পটভূমিতে তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল শোষিত মানুষের অবদমিত কণ্ঠস্বর।
আর সেই কণ্ঠস্বরের সবচেয়ে বিস্ফোরক ও অবিনাশী প্রকাশ ছিল তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘খোলা কবিতা’। ১৯৮৩ সালে সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যখন এই কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন তা পুরো শাসনযন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
এই কবিতার অপরাধে তৎকালীন সামরিক সরকার কবির বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে, তাঁকে গা-ঢাকা দিতে হয়। কিন্তু সত্যকে কি আর বুলেটের জোরে চেপে রাখা যায়? ‘খোলা কবিতা’ হয়ে ওঠে সেই সময়ের প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের প্রতিবাদের মন্ত্র।
আজকের সেই তপ্ত ও বাস্তববাদী সময়ের অন্যতম সেরা দলিল, মোহাম্মদ রফিকের কালজয়ী কবিতাটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো। আসুন, আরও একবার মুখোমুখি হই সেই তীব্র আত্মোপলব্ধি আর দ্রোহের...
খোলা কবিতা – মোহাম্মদ রফিক
লোহার গরাদ ফেটে টগবগ আষাঢ়ী পূর্ণিমা
কলমির ঘ্রানে মুগ্ধ বিলের ওপরে দৃপ্ত পায়ে
ফাঁসির দড়িতে ঝোলে হাসির জোয়ারে ভাঙা বাধ;
কপিলা, কাদায় জলে ঘামে শ্রমে অন্নদা স্বদেশ
সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেই;
বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই;
হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে তৃতীয় বিশ্বের গঞ্জে গাঁয়ে
হুট করে নেমে আসে জলপাই লেবাস্যা দেবতা;
পায়ে, কালোবুট; হাতে, রাইফেলের উদ্ধত সঙ্গিন:
লোলুপ দুর্নীতিবাজ অপদার্থের দারুন কামড়ে
অনুর্বর মাঠ-ঘাট, ছিন্ন ভিন্ন সমাজ-কাঠামো,
রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুঁজিবাদী কালো থাবা লাল রক্ত ঢালে;
এইবার ইনশাআল্লাহ সমস্যার যথাযথ
সমাধান হবে; দীন গরিবের মিলেবে বেহেস্ত;
জলপাই লেবাস্যা দেবতা অবিশ্বাস্য বানী ঝাড়ে;
একটি বছর। বড়জোর দুটি; ঠিক তারপর!
রক্তলোভী পিশাচের বিদঘুটে আকৃতি,নখে-দাঁতে
ভিখারির মাংস-পিন্ড, পড়ে থাকে নগর ভাগাড়ে।
আবার আকাশ জুড়ে তৃতীয় বিশ্বের ভাঙা ঘর
ঠেলে ঢোকে জলপাই লেবাস্যা দেবতা, একই চালে;
পায়ে, কালো বুট; হাতে, রাইফেলের উদ্ধত সঙ্গিণ
২৭শে মার্চ রাত; পোড়াদহ রেলওয়ে জংশন;
একখন্ড চাপাতি রুটির লোভাতুর বিনিময়ে
ধর্ষিতা কিশোরী-মৃত্যু। শিবগঞ্জ, তিরিশ-চল্লিশ
টাকা মূল্যে উলঙ্গ বাজারে কলা আনাজ-মরিচ
তার সঙ্গে সালেহা-মল্লিকা-মীনা; আঠারো উনিশ
বয়সী বালিকা, আরও শস্তা; খরিদ্দার বা বিক্রেতা
কারোরি অভাব নেই, প্রতি হাটে বেড়ে চলে ভিড়;
আদম বাণিজ্যে লাভ চিনে গেছে শাসন-যন্ত্রের
চুনোপুটি থেকে অজ গাঁয়ের মোড়ল, ঠগবাজ;
সাক্ষীবট জুবুথুবু কয়েকশ শতাব্দীর ভীতি
স্থবির তক্ষক চোখ, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, আদিম সংকোচে;
দরিয়ার ঢলে ডুবে গেলে লক্ষ ময়ূরপঙ্খী নাও
শুধু একা সওদাগর ভেসে থাকে স্রোতের ওরপ;
দেখে প্রতারক পূর্ণিমার চাঁদ, এক খন্ড মেঘ,
ক্রমে ক্রমে এই মেঘ ভারী হয়ে তুমুল বৃষ্টির
ভীষণ ধারায় ভেঙ্গে, ভেসে যায় চম্পক নগর;
থাকে ছায়া; বেহুলার বাসরের ফোঁকর গলিয়ে
লিকলিকে কালসাপ,সুচতুর, কুটিল, সন্ধানী ,
ঢুকে পড়ে প্রতিটি অন্দরে, বিবাহিত বিছানায়,
উৎপাদিত সন্তান-সন্ততি িবিষেনীল রক্তবীজ;
ক্লেদাক্ত সর্পিল সরু এই ছায়া দুরন্ত ছোবলে
শৈশব-কৈশর চিরে যৌবন-বার্ধক্য খেয়ে-খুয়ে
আত্মঘাতী শতাব্দীর পোড়ামাটি টেনে হিঁচড়ে, পাড়
ভেঙেচুরে হিংস্র-খল বিজাতীয় জলের আক্রোশ,
নদ্যাঠাকুরের লৌ মহুয়ার বুকেবিদ্ধ ছোরা
এই ধনী নামহীন গোত্রহীন লোকজ সংসার
এমন মাটির দেশে মাটির স্বর্গীয় আর্শীবাদ;
খানখান ত্রি-ভুবন দেয়ার দুরুন চিৎকারে
মধ্যরাতে উঠোনের পূব কোনে ভূতুড়ে তেঁতুল
দূর কোন অপদেবতার উপনিবেশিক ছায়া
হস্তারক হাওয়ার-মেঘের টানে বিভিন্ন মুখোশে
নানা অন্তরাল খোঁজে, আগলে রাখে আনাচ-কানাচ;
২৫শে জুনের ভোর; গতকাল সূর্য্য না উঠতেই
গাঁয়ের চাষীরা বিল থেকে দশজন যুবকের
পচালাশ হোগলার ঝোপ কেটে উদ্ধার করেছে;
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ঐ চাষীদের কেউ-কেউ
সম্পূর্ণ নিখোঁজ; তারা আজ তক ঘরেতে ফেরিন।
এই যাদুকরী ছায়া, খুন, গুলি, বন্দুক, ধর্ষণ
কালো বুট, বুটের দাপট; অনাহার, মহামারি
কোদালের এক কোপ কেটে বসে বুকের পাঁজরে।
মুখের ওপরে কালিমার ছাপ। ক্ষুধার্ত বুটের
কালো দাগ। চাঁদ ওঠে। বুকভর্তি জেগে ওঠে ক্ষত।
জোয়ানীর ভাঁজ খুলে জোয়ারের ঢল নামে। ভাসে
মৃত মানুষের লাশ; হাজার-হাজার, অগনিত,
বাঁক ঘুরে ছুটে আসে। বহু-শতাব্দীর পাড় ভেঙ্গে
নি:সাড় আন্ধার ছিঁড়ে কালো মুখোশের চাপাস্বর।
ষড়যন্ত্র। টর্চের প্রক্ষিপ্ত আলো। করুণ গোঙানী।
উঠোনের কোণ থেকে ধর্ষিতা বৌ এর চিৎকার।
বাতাবি কাঁটায়, ছেড়া শাড়ির আঁচল। সারারাত
চাঁদের খাটিয়া জুড়ে ধড়হীন নির্ঘুম মস্তক।
কঙ্কালের হাড়ে-হাড়ে মাটি খোঁড়ে লাঙলের ফলা।
শস্যের আবাদ ভেঙ্গে লাঠির আঘাতে ছিন্নমূল
ঘরবাড়ি। মানব বসতি। লেলিহান গঞ্জ-গ্রামে
শরনার্থী ইঁদুরের কুকুরের পাখ-পাখারির
শবযাত্রা। শশ্মানের চর্তুদিকে ভেসে থাকে ভীড়।
ভাঙা কবরের গায়ে অচেনা নামের দীর্ঘসারি।
উচ্ছল হাসির সাথে জাগে ভয়। ভীতি। ভাঙনের
শব্দ ওঠে। ধ্বস নামে। গিলে ফেলে চালের গুদাম।
মুখের ওপরে গাঢ় কালসিটে। নির্মম বুটের
দাগ। চাঁদ ওঠে। বুকভর্তি ক্ষত। বিষাক্ত সন্ত্রাস।
প্রেমের কবিতা লেখো। ভালবাসো কিংবা নাই বাসো!
প্রেমের কবিতা লেখো। দায়হীন রাইফেলের গুলি
তাক করে মাথার ওপর। গালগল্প মলমূত্র ত্যাগ,
এই টুকিটাকি ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ এখন।
রক্তের ধারায় বিষ। জন্মের ভেতরে প্রতারণা,
পদ্মার সিনার মাংস এখন শুকিয়ে বালিয়াড়ি।
হাড্ডিসার চাঁদের কঙ্কাল ঘোরে পথে,খুঁটে খায়
সারারাত। চোখের আগুনে ধোঁকে আদিগস্ত চড়া।
এখন নিষিদ্ধ সব। খাওয়া-দাওয়া, মন বিনিময়।
বুভুক্ষু দেহের ভাঁজে বৃষ্টির খরায়, কড়িকাঠে
টিকটিকি কানখাড়া করে বসে আছে। আইনের
প্রাণহীন ষড়যন্ত্র গুটিয়ে আনতে সিদ্ধ হাতে।
মাথার খুলিতে ঘুণ। অভিশপ্ত,হাসির বাঞ্ছনা।
ভোর-ভোর সূর্যদেব চেয়ে দেখে পল্লী জননীর
মরদেহ (গাছ থেকে খুলে এনে ) শুইয়ে দিয়েছে
ভাঙ্গা খাটে। আত্মহত্যা মহাপাপ। চিৎকার করে
কেঁদে ওঠা। সমবেদনার প্রসারিত করা।
মিছিলে-মিছিলে ভেঙ্গে ঢল নামা। নিষিদ্ধ এখন
প্রেমের কবিতা লেখো। দায়হীন, দায়িত্ব ব্যতিত।
এই মার তেনাকে খেতিই হবে। প্রচন্ড চড়ের
শব্দ শুনে জেগে উঠে মানব জমিন। দূর থেকে
বাতাসের বেত্রাঘাত খড়ের চালের পিঠবেয়ে
মুচড়ে ওঠে মাংসের ভেতর কালা দেয়ার বেবান
বাঁশের বেড়ার সাথে ভেঙে পড়ে সারাবছরের
গচ্ছিত চালের জালা। পেয়াঁজের বীজ। লোনা-ডাল।
রাস্তার ওপর থেকে ছুটে আসে বুটের ধারালো
তীক্ষ্ন শব্দ। উঠোনের কোণ থেকে, মেঝে ভেদ করে,
মস্তিকে মগজে ক্ষুর। কচি আনাজের ক্ষেত কেটে
নেমে আসে চাঁদের শানানো ছুরি। গোরুর গোয়ালে
ভীতিকর অস্থিরতা । নিজের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস।
মিথ্যে জন্ম টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলে সব অস্ত্রনালী
রক্তাপ্লুত কিমাকার পড়ে থাকে বেবাক অঞ্চলে
ধূলোয় কাদায় খালে নৌকার গলুই থেকে জলে।
উদ্বাত্ত আশ্বাস বাণী। স্বাধীনতা। রবীন্দ্র সঙ্গীত।
নদীর কিনার দিয়ে দীর্ঘকাল মানুষের সারি।
এই মার তোমাকে খেতেই হতো। দূরন্ত লাথির
আঘাতে, গোলার ত্রাসে, জেগে ওঠে পালিত পশুর
এক পাল, ভাবে, তবু ভালো, কী-অবাক বেঁচে আছি!
নিয়মিত হালচাষ, আহত ঘাড়ের ক্ষতচিরে
জোয়ালের চকচকে ধারালো ইস্পাত, টান-টান
শ্রমরক্তে জমিও উর্বর হবে। ধানের ফলনে
হাজার হাজার পদ্মপাল বহু-বহুযুগ ধরে;
মাটিজল আকাশের যথবদ্ধ দারুণ নিয়তি।
কতদিন এইভাবে ক'বছর যুদ্ধ করা চলে?
১৯৫২ র অমর ২১ থেকে আজ
শহীদ চল্লিশ লক্ষ, তিন লক্ষ ধর্ষিতা নারীর
গোঙানী; মুনির চৌধুরীর রক্ত উজিয়ে এখন
কেমন সুবোধ, ভদ্র; লাঠি তুলতেই একদম
গোবেচারা, ভাজামাছ উল্টোতেও জানে না বোঝে না,
হুকুম তামিল ক'রে ঘর-দার রাস্তাঘাট খুব
পরিস্কার রাখলেই কালাআত্মা নিষ্পাপ নির্মল
ছিমছাম; কতোকাল এই ধুঁকে ধুঁকে মরা চলে?
নিজস্ব সম্মান বোধ, গরিমার সঙ্গে বেঁচে থাকা,
রূপকথা; দাদামশাইয়ের গালগল্প শুনে শুনে
আজকাল, কসাই-এর দোকানে গরুর কাটা মাথা
থেকে উঠে আসে ধোঁয়া, রোদে পোড়া কড়া আগুনের
গনগনে লাল ইট চেপে থাকে বুকের চুল্লিতে
ধমকের ত্রাহিস্বর একমাত্র নিস্তেজ মগজে
স্রোতের উৎসাহ আনে ধমনীতে জোয়ার ও ভাঁটা;
কতোদিন এইভাবে এই ঘাড় সোজা করে রাখা?
১৯৭১ এ স্বাধীনতা, উদ্দাম দাপটে
ভীষণ নদীর ঢল, মৃত কিশোরের ছেঁড়া চোখ,
শহীদুল্লাহ কায়সারের মরদেহ মাড়িয়ে এখন
ঢিলেঢালা মধ্যবিত্ত চলনে-বলনে, শাসনের
দণ্ডাদেশে কী-সুন্দর খোঁয়াড়ে বাছুর; আত্মসুখে
ঘৃণাহীন, লজ্জাহীন তকতকে কারাকুঠরিতে
আপন স্বভাবে, দাস; বন্দী, নিমজ্জিত স্বমেহনে।
এই তেরোনদী সাতসমুদ্দুর পেরিয়ে স্বপ্নপুরী
কোটাল রাজার দেশে দণ্ডবিধি জারি হ’লো—১;
গত দুই সন জনসংখ্যা বেড়ে গিয়েছে বিপুল
তাই এই আজ থেকে আগামী বছর কেউ, কোনো
স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ঘুমাতে বা এক বিছানায়
শুতে কিম্বা স্বামী স্ত্রীর মিলন কর্তব্য যথাযথ
পালন করতেও পারবেনা, যদি প্রমাণিত হয়
কোনো ব্যক্তি অথবা রমণী কামনার বাসনার
তাড়নায় নিয়ম ভেঙেছে ভাঙতে উদ্যত হয়েছে,
তা’হলে সশ্রম সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
রাজা জানে, আজ্ঞাবাহী মধ্যবিত্ত বহুদিন থেকে
সবকিছু তুষ্ট চিত্তে মেনে নিতে জো-হুকুম রাজী;
তাই যত আইনের অলৌকিক প্রতাপের বলে
তার প্রতারক স্বপ্ন রাজত্ব-শাসন টিকে আছে।
শমনের টান-টান দড়ি একটু ঢিল দিলে সব
সবকিছু নির্ঘাৎ-পড়বে ঝুলে রাজছত্র, রাজা,
চাপাবাজী একসঙ্গে টুপ করে ডোবার কাদায়;
যাচ্ছেতাই স্বপ্নপুরী, তার ইচ্ছেমত কাজকর্ম!
হবুচন্দ্র রাজা গবুচন্দ্র মন্ত্রী অমাত্য কোটাল
কাহিনীর আঁস্তাকুড় থেকে উঠে এসে রাজপাট
সাজিয়ে বসেছে। দোর খুলে বাইরে এলে দেখা যাবে;
পায়ে হেঁটে চলে রাজা, পাহারায় পুরুত লেঠেল
রথে আর হাতিতে সওয়ার। কী ব্যাপার! কী ব্যাপার!
আজব কথার ছিরি, কান পাতলেই শোনা যায়;
লুঙ্গি ছেড়ে স্যুট পরো, খড়ম বদলে জুতো, তবু
যেভাবেই পারো, অনাহারে থাকো, খরচ কমাও;
যার-যার মাপ মতো ঠুলি কেনাে, পরে নাও, কানে
তুলো আঁটো। সহজ চলার ঢঙ শিগগির পাল্টাও!
বেজন্মাকে শুয়োর বেজন্মা বলা ডাকাতকে ডাকাত
মুখ ফসকে বলে ফেলা আইনতঃ কড়াদণ্ডনীয়;
হাঁটতে বললেই, হাঁটো; হুকুম, দাঁড়িয়ে থাকো, চুপ!
বাতাসেরও কান আছে, শুনে ফেললেই হলো, ঘানি
টেনে চলো; উহ, আহ, করলেই শূলেতে গর্দান
কাটা যাবে, সোনা-পেতলের সত্যিমিথ্যে একদরে
বিকোচ্ছে বাজারে, হালে গরুর বদলে মরা ঘোড়া,
রুগ্ন গাধা; কবরের ঠান্ডা শান্তি, বিষাক্ত নিশ্চিতি,
ঘরেতে বেঁচেছে মাকড়সার বাসা; ব্যাঙ, গিরগিটি,
জনতার ছুঁড়ে ফেলা আঁস্তাকুড়ে ষড়যন্ত্র ফেঁদে
হবুচন্দ্র রাজা গবুচন্দ্র মন্ত্রী শানাচ্ছে শাসন;
শুভঙ্করে ফাঁকি গুলো কেমন অদ্ভুত যাচ্ছে মিলে।
এইবার কবিতার ছদ চিত্রকল্প হোগলার
ভেড়া, ছনে-ছাওয়া ঘর, দোঁ-আসলা মাটির কাঁচা ভিত,
উপড়ে ফেলে কীর্তন খোলার রক্ত মেদমজ্জা হাড়;
কয়েক হাজার পতিতার জংলা পুরোনো ভিটায়
অনাদি কালের ঘুঘুৃ পুলিশের ঘেয়োকুত্তা, পোষা,
বেদম চরিয়ে ; জন-মুনিষ্যির বৌ লোটা-ঘটি
ভূমিহীণ মজুরের ভূমির অপূর্ব সৎকারে
চিত্রল চাঁদের দেশী-বিদেশী চিতার চক্রান্তের
সাম্রাজ্যিক উলঙ্গ পেষণে এক হাজার বিঘার
চষা ভূঁই, ভাঙনের ঢলে চিরতরে ভেসে গেলে;
করিম আলীর থ্যাবড়া দন্তহীন মুখের চোয়াড়ে
চৈত্রের খরায় দগ্ধ ঘোলা-স্বপ্ন, চোখের কোটর,
অনাবাদী চোয়ালের, লাঙ্গলের নিরেট কর্ষন
খুঁড়ে তোলে বলিরেখা ; এইবার দেশ গড়া হবে।
কোন সমস্যা নেই। লুঙ্গি ছিঁড়ে গেছে? তালি মারো!
গেঞ্জি নেই ? ঘামে ভেজা উদম শরীর রোদে সেঁকো ।
সপ্তাহের ছ'টি দিন দানা পানি পড়েনি নালীতে ?
তাতে কি ? একটিবেলা কায়েক্লেশে অনাহারে থাকো ।
মেরুদণ্ড বেঁকে গেছে ? আরও একটু বেঁকে যেতে দাও ।
সোজা হয়ে দাঁড়াবার যত্তোসব অসহ যন্ত্রণা ;
এর থেকে মুক্তি পাবে । আজেবাজে সাধ ইচ্ছেগুলো
মরে যাচ্ছে ? যেতে দাও । অহেতুক হুল্লা চেঁচামেচি
মিছিল মিটিং বাদ-প্রতিবাদ ; কিছুটা শান্তিতে
থাকা যাবে । পোলাপান খেতে চায় ; বলে দাও, মানা !
খেতে মানা, পরতে মানা ; চতুর্দিকে ভুতুড়ে শাসন ;
বেয়াদব চুল রেখে রাস্তা ঘাটে বেরুতেও মানা ।
চুল ছেঁড়ো, মাথা ঠোকো ! কী অদ্ভুত ? এই অন্ধকার
এতোটুকু নড়েও বসে না । কোনো চিৎকার নেই ।
ঠোঁটের দু'ধারে হাসি জমে গেছে ! কোনো শব্দ নেই ।
এতোসব অনুভব ; এর কোনো প্রয়োজন আছে ?
কাটছাট করে ফেলো । পেট আছে ? খিদে নেই, ভালো !
খিদে আছে ? অন্ন নেই । এই গোলমেলে অনুভূতি
ঝটিয়ে বিদায় করো । কোথাও যাওয়ার গাড়ি নেই?
নাও নেই ? হেঁটে যাও ! ক্লান্ত লাগে ? থেমে থাকো ! চোখে
ধুলো বেঁধে ? চোখ বন্ধ করে রাখো । কোন সমস্যার
যথাযথ সমাধান কে কবে করেছে ? অতএব
‘কুচ্ছ্রতার সাধন’ করো । লুঙ্গি ছিঁড়ে গেছে ? তালি মারো ।
গেঞ্জি নেই ? ঘামে ভেজা উদম শরীর রোদে সেঁকো ।
গালের চোয়াল ভেঙে কান্না বিঁধে আছে ? বিঁধে থাক !
সপ্তাহের ছ'টি দিন দানা পানি পড়েনি নালীতে ?
আজ থেকে এক বেলা অনাহারে থাকো । মারা যাবে ?
বেশ যাও । কোথাও সমস্যা নেই, নিশ্চিন্তে ঘুমোবে ।
ইর্য়াকি থামাও। জব্বারের ঘামক্লেদ, দু:খশোক,
খেটে খাওয়া বুকের পাঁজরে উপবাসী ক্ষয়কাশ,
জরার্জীন হাতের তালুতে মঁরে আসা ভাগ্যরেখা,
উন্নত ললাট জুড়ে অনাবাদী রসুনের চষা
বালিয়াড়ি, আদিগন্ত ফুঁসে আসা ঝড়, শিরা-ফেটে
বোশেখের ভ্রু-কুটি, উড়ে যাওয়া চালের মাস্তুল
বানভাসি ভাতের বাসন, অনাহারী সন্তানের
পচালাশ, অভিশপ্ত ইতিহাস, দুর্বার খেয়াল;
ফতেমার কপিশ চোখের লোনাজল, ভাঙাহাড়,
চিমসানো বুকের দুধ, শরীরে লেপ্টানো কালোত্যানা,
পান্তার নলার সাথে দুটো লঙ্কা, অনাজ ছালুন
গায়েবান্ধা স্বামীরে সোহাগ , পেটে ভেড়ে ওঠা স্বাদ,
ঘোমটা-টানা মাটির বাসর ফুঁড়ে কামিনীর ঘ্রান,
অভাবের নিশুত শিথান, কাল নাগিনীর ফণা,
মেঘে-মেঘে চাঁদের ভুবনে ভূমিধ্বস, মহামারী
মেহেদীর রক্তলাল আলতা মাখা দু:স্বপ্নের শিস;
এই নিয়ে ভোজবাজি তামাম রঙ্গীলা জুয়োচুরি,
এবার থামাও শালা। শুয়োরেরা ইয়ার্কি থামাও।
এই স্বপ্ন মাটির বয়সী
বাঘা যতীনের রক্ত থেকে
জেগে উঠে প্রভাতী আকাশ
বায়ান্নর প্রথম রোদ্দুর
বাঁশের চালের ধার বেয়ে
জানালা গলিয়ে ঢুকে পড়ে
একাত্তর দাওয়ার ওপর
চুলোর আগুনে ফোটে চাল
নবান্নের বিলোল আঘ্রানে
এই সাধ মেঘের সমান
জলন্ত ক্ষু-ধায় মোটা ভাত
জল ছাতিফাটা পিপাসায়।।
এক নজরে কবি মোহাম্মদ রফিক
- জন্ম: ২৩ অক্টোবর ১৯৪৩; বৈটপুর, বাগেরহাট।
- মৃত্যু: ৬ আগস্ট ২০২৩ (৭৯ বছর বয়সে)।
- পেশা: শিক্ষক ও লেখক (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ২০০৯ সালে অবসর নেন)।
- রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা: ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ১ নং সেক্টরের কর্মকর্তা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
- আত্মপ্রকাশ: ১৯৬০-এর দশকে ‘সমকাল’, ‘কণ্ঠস্বর’ প্রভৃতি সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে।
- কাব্যিক ধারা: গ্রামীণ জনপদ, নদীনির্ভর জীবন, লোকজ ঐতিহ্য এবং আধুনিক মানস-চেতনার মেলবন্ধন। একই সাথে স্বৈরাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল আপসহীন ও ক্ষুরধার।
- বৈশাখী পূর্ণিমা (১৯৭০)- প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ।
- খোলা কবিতা (১৯৮৩) -সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে রচিত কালজয়ী ও বিস্ফোরক দীর্ঘ কবিতা।
- কপিলা (১৯৮৩) -অন্যতম বহুল আলোচিত কাব্য।
- গাওদিয়া (১৯৮৬) - তাঁর একটি বহুলপঠিত ও বিখ্যাত সৃষ্টি।
- অন্যান্য উল্লেখযোগ্য: কীর্তিনাশা, মৎস্যগন্ধা, মাতিকিসকু, বিষখালী সন্ধ্যা, নোনাঝাউ।
- উল্লেখযোগ্য গদ্য ও আত্মজীবনী:
- আত্মরক্ষার প্রতিবেদন (২০০১), ভালবাসার জীবনানন্দ (২০০৩)।
- পথিক পরান (১ম-৪র্থ খণ্ড) - তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গদ্য সিরিজ।
- বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬)
- একুশে পদক (২০১০) - ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য।
- মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার (২০১৫)
- ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার (২০২০)
- কবি জসীম উদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার (২০২৩)
মোহাম্মদ রফিকের ‘খোলা কবিতা’ বাংলা কবিতার এমন এক শক্তিশালী সৃষ্টি, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, গভীর সামাজিক বোধ এবং সাহসী উচ্চারণের মাধ্যমে কবি।
আমাদের সমাজের নানা অসঙ্গতি ও মূল্যবোধের সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছেন। এ কারণেই কবিতাটি পাঠককে ভাবতে ও আত্মসমালোচনা করতেও উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
