হ্যালোইন দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ইতিহাস: মৃত্যু ও রহস্য থেকে আলো আর আনন্দের উৎসব
হ্যালোইন উৎসবের প্রাচীন বিশ্বাস ও আধুনিক রূপ:
প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর পশ্চিমা বিশ্বে পালিত হয় এক রহস্যময় আনন্দঘন উৎসব হ্যালোইন (Halloween)। ভূতের সাজ, কুমড়ার মুখ, মিষ্টি সংগ্রহ আর ভয়ের মজা সব মিলিয়ে এটি এখন বিনোদন ও সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ। কিন্তু এই উৎসবের শুরুটা ছিল অনেক আগে একেবারে প্রাচীন কেল্টিক যুগে যেখানে ভয় ছিল বাস্তব বিশ্বাসের অংশ।
হ্যালোইন পশ্চিমা বিশ্বের একটি জনপ্রিয় উৎসব যা প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর পালন করা হয়। এটি মূলত প্রাচীন কেল্টিক জাতির সামহেইন (Samhain) নামের ফসল কাটার উৎসব থেকে উদ্ভূত। কেল্টরা বিশ্বাস করত, বছরের এই রাতে জীবিত ও মৃত জগতের সীমানা মুছে যায়, আর মৃত আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসে। তাদের শান্ত রাখার জন্য আগুন জ্বালানো ও মুখোশ পরার রীতি ছিল। পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্মে ১ নভেম্বরকে All Saints’ Day বা All Hallows Day ঘোষণা করা হয়। তার আগের সন্ধ্যা ৩১ অক্টোবর পরিচিত হয় All Hallows Eve যা পরে সংক্ষেপে Halloween নামে পরিচিত হয়।
৩১ অক্টোবর দিনের আলো ফুরোতেই যেন পৃথিবীর এক অংশ বদলে যায়। ইউরোপ আর আমেরিকার রাস্তায় শুরু হয় ভূতের নৃত্য। মনে হয় পৃথিবীর যত ভূতপ্রেত আছে তারা সবাই নেমে এসেছে লোকালয়েহাসিখুশি, রঙিন, কৌতুকপূর্ণ সাজে। বিভিন্ন রঙবেরঙের ভূতুড়ে পোশাকে সজ্জিত এই জ্যান্ত ভূতেরা দৌড়ে বেড়ায় বাড়ি থেকে বাড়ি Trick or Treat বলে চিৎকার করে। আর বাড়ির মানুষও তাদের হাতে তুলে দেয় মিষ্টি, চকলেট, বা ছোটখাটো উপহার। এইভাবেই প্রাণ ফিরে পায় ইউরোপ ও আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসব হ্যালোইন। ভয় আর আনন্দ মিশে যায় এক অদ্ভুত উল্লাসে যেখানে ভূতও হয় বন্ধু আর অন্ধকার হয়ে ওঠে আলোর উৎসব। হ্যালোইনের মূল ভাবনা ছিল ভয়, আত্মা ও মৃত্যুর উপস্থিতি। কিন্তু আধুনিক যুগে এটি পরিণত হয়েছে ভয়ের আনন্দে মেতে ওঠার উৎসবে। এখনকার হ্যালোইন হলো এক রঙিন উৎসব। যেখানে মানুষ ভুতুড়ে সাজে আনন্দ করে, শিশুদের হাতে থাকে ক্যান্ডির ঝুড়ি, আর রাস্তা জুড়ে থাকে আলোকিত কুমড়ার হাসি।
প্রায় দুই হাজার বছর আগে, বর্তমান আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও উত্তর ফ্রান্সে বসবাস করতো কেল্টিক জাতি। নভেম্বরের প্রথম দিনটি তারা নববর্ষ বা সাহ-উইন (Samhain) হিসাবে উদযাপন করতো। এই দিনটি তাদের কাছে ছিল গ্রীষ্মের শেষ এবং অন্ধকার বা শীতের সূচনা। তাদের বিশ্বাস, নতুন বছরের আগের রাতটি পৃথিবীর জীবিত ও মৃতের জগৎ একে অপরের সঙ্গে মিশে যায় সবকিছু একটু ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। এই সময় মৃতদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসে। ফসল বা প্রাণকে ক্ষতি না করতে, কেল্টিকরা মৃত আত্মাদের খুশি করার জন্য সাহ-উইন উৎসব পালন করতো। মৃত আত্মাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কেল্টরা নানান রকম খাদ্য ও ওয়াইন উপঢৌকন হিসেবে দরজার বাইরে রেখে দিত। আত্মার খারাপ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য বিভিন্ন রকম মুখোশ, পশুর খুলি ও চামড়া দিয়ে ভূতুড়ে সাজসজ্জায় নিজেদের সজ্জিত করতো। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩ শতকে অধিকাংশ কেল্টিক অঞ্চল রোমান সম্রাটের অধীনে চলে আসে। তখন কেল্টিকদের সাউইন উৎসবের সঙ্গে রোমানদের একটি উৎসব যৌথভাবে পালন করা শুরু হয়। সাউইনের প্রাধান্য অবশ্য একটু বেশিই ছিল। অক্টোবরে পালিত হতো কেল্টিকদের সাউইন উৎসব। আর নভেম্বরের প্রথম দিনে পালিত হতো রোমানদের পোমোনা উৎসব।
হ্যালোইনে ট্রিক অর ট্রিট এর জন্য দায়ী ছিল মধ্যযুগের ব্রিটেনের অধিবাসীরা। তাদের সৌলিং ও গাইজিং প্রথাই বর্তমানে ট্রিক অর ট্রিট হিসেবে প্রচলিত। অষ্টম শতকে চার্চ কর্তৃক পালিত অল সেইন্ট’স ডে’তে দরিদ্রদের জন্য বানানো হতো পিঠা যাকে বলা হতো সৌল কেক। দরিদ্ররা যে পরিবারের কেক খেত সেই পরিবারের মৃত মানুষের আত্মার জন্য প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হতো যাকে বলা হতো সৌলিং। আর গাইজিং ছিল এমন একটি প্রথা যেখানে মধ্যযুগের শিশুরা হ্যালোইনের সময় নানা রঙবেরঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে খাবার ওয়াইন বা টাকার বিনিময়ে গান কবিতা বা কৌতুক উপস্থাপন করতো। উনিশ শতকের দিকে ব্রিটিশ আইরিশ ও স্কটিশরা আমেরিকাতে বসতি স্থাপন করতে শুরু করলে ধীরে ধীরে তাদের সেই সৌলিং ও গাইজিং সংস্কৃতি রূপান্তরিত হয় ট্রিক বা ট্রিটে। অদ্ভুতুড়ে কস্টিউমে সজ্জিত শিশুকিশোররা বাসায়-বাসায় গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ে ট্রিক অর ট্রিট। হ্যালোইন উৎসবে দিনের আলো ফুরানো মাত্র ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ে। সবার গায়ে থাকে অদ্ভুতুড়ে কস্টিউম, হাতে থাকে টর্চ। বাসায়-বাসায় গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ার সময় কেউ যদি ট্রিক বেছে নেন তাকে কিছু করতে হয় না হলে ট্রিট দিতে হয়। তবে কেউই সাধারণত ট্রিক করতে দেয় না। সবাই চকলেট দিয়ে দেয়। আর সেই চকলেট নেওয়ার জন্য শিশুরা ব্যাগ নিয়ে ঘর থেকে ঘরে ঘুরে বেড়ায়।
হ্যালোইন উৎসবে মেকআপ ও কস্টিউম বিশেষ ভূমিকা পালন করে। নানা রকম মুখোশ, ভৌতিক চরিত্রের পোশাক যে যেমন খুশি, তেমন সাজতে পারে। কারো কোনো বাধা নেই। কেউ হয় রাজকুমার বা রাজকুমারী, কেউবা প্রজাপতি বা উইনি দ্যা পুহ্ এর টিগার। আবার কেউ ভূতুড়ে পোশাকে সাজতে পছন্দ করে যেমন ডাইনী পিশাচ বা জলদস্যু। নানা বৈচিত্র্যময় পেশাকে সজ্জিত শিশু কিশোরের দল হ্যালোইনের আনন্দকে আরও বর্ধিত করে। অনেকে বাড়ির সামনেটা ডেকোরেশন করতে ভালবাসে। তারা মাকড়সার জাল বিছিয়ে, কঙ্কাল টাঙিয়ে ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি করে রাখেন। হ্যালোইনের অপরিহার্য অংশ হলো মিষ্টি কুমড়া (Jack-o’-lantern)। ছুরি দিয়ে কুমড়ার গায়ে চোখের আকৃতির ছোট গর্ত করা হয়, ভেতরে বাতি জ্বালিয়ে তৈরি করা হয় প্রতীকী দৈত্য জ্যাক ও ল্যান্টার্ন। ছোটদের এবার এই ভৌতিক উঠোন পেরিয়ে ট্রিট নিতে হয়। সারা সন্ধ্যা তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ব্যাগ ভর্তি চকলেট সংগ্রহ করে। এই দিনটি বিশেষভাবে আমেরিকায় সারা দেশে পালন করা হয় যেখানে কেউ বিনা দ্বিধায় যে কারো বাড়ির আঙ্গিনায় যেতে পারে, দরজায় কড়া খটখটালেও কেউ আপত্তি জানায় না।
হ্যালোইন উৎসব এখন শুধু ইউরোপ বা আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। বাংলাদেশেও আজকাল এই উৎসব পালন করা হচ্ছে। বিদেশি সংস্কৃতি হিসেবে হ্যালোইন আমাদের দেশে দু-তিন বছর ধরে অনুষ্ঠিত হলেও এটি সেভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। তবে এই উৎসব উপলক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে নানান ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে গুলশান ও ধানমন্ডির অভিজাত পাড়াগুলোতে হ্যালোইন কেন্দ্র করে বেশ জমজমাট আয়োজন দেখা যায়। বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের কাছে হ্যালোইন জনপ্রিয়তা পেয়েছে, কিন্তু এটি দেশীয় সংস্কৃতির কোনো অংশ নয়। তবে কিছু নামীদামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল বহু বছর ধরে এই উৎসব পালন করে আসছে যেখানে শিক্ষার্থীরা হ্যালোইনের আনন্দ ও ভৌতিক সাজে অংশ নেয়।
হ্যালোইনের মূল ভাবনা ছিল ভয়, আত্মা ও মৃত্যুর উপস্থিতি। কিন্তু আধুনিক যুগে এটি পরিণত হয়েছে ভয়ের আনন্দে মেতে ওঠার উৎসবে। এখনকার হ্যালোইন হলো এক রঙিন উৎসব যেখানে মানুষ ভুতুড়ে সাজে আনন্দ করে, শিশুদের হাতে থাকে ক্যান্ডির ঝুড়ি, আর রাস্তা জুড়ে থাকে আলোকিত কুমড়ার হাসি। হ্যালোইনের এই দীর্ঘ যাত্রা প্রমাণ করে, মানুষের ভয়ও সময়ের সাথে উৎসবে রূপ নিতে পারে। মৃত্যুভীতি, রহস্য আর অজানার কৌতূহল এই তিনের মিশ্রণেই হ্যালোইন আজ বিশ্বজুড়ে এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। এটি শুধু আতঙ্ক নয় বরং মানবিক আবেগ ইতিহাস ও সৃজনশীলতার এক অনন্য মিলনমেলা। হ্যালোইন এখন সার্বজনীন উৎসব হিসেবে সারা বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ও বিস্তার ক্রমশ বাড়ছে। এই উৎসবকে ঘিরে সারা বিশ্বে যেটুকু আনন্দ-উল্লাস দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যের ছোঁয়া আর রয়েছে শিশু-কিশোরদের নিষ্পাপ খুশি ও আমোদ। বর্তমানে দিনটি ঘটা করে পালন করে ইউনিসেফও। তাদের সঙ্গে যুক্ত অনেক শিশু এই দিনটি ভূত সেজে ‘ট্রিক অর ট্রিট’ খেলার ছলে আয়োজন করে তহবিল সংগ্রহের জন্য। সেই তহবিল পরে খরচ হয় অসহায় ও হতদরিদ্র শিশুদের কল্যাণে, ফলে এই উৎসব শুধু আনন্দই নয় একটি সহমর্মিতা ও সাহায্যের বার্তাও বহন করে।
---- বাউল পানকৌড়ি
Read on mobile
