ভালো লাগে জোছনা রাতেমেঘ হয়ে আকাশে ভাসতেধানের শীষে বাতাস হয়েকৃষাণীর মন ছুঁয়ে যেতে...
আশির দশক বা নব্বইয়ের দশকের সোনালী দিনগুলোতে বড় হয়েছেন অথচ এই গানটি শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। ব্যান্ড রেনেসাঁর প্রথম অ্যালবামের এই গানটি আজও আমাদের এক স্নিগ্ধ মায়াবী জগতে নিয়ে যায়।
কিংবদন্তি সুরকার ও গায়ক নকীব খানের সুরে ও কণ্ঠে গানটি দশকের পর দশক ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে জানতাম না এই কালজয়ী গানটির স্রষ্টা আসলে কে? দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর জানলাম নিভৃতচারী এই গীতিকবির নাম ডা. মোহাম্মদ আরিফ।
তিনি কেবল নকীব খানের বন্ধু নন, তিনি আমাদের বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করা এক কিংবদন্তি গীতিকার। ডা. মোহাম্মদ আরিফের কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক কালজয়ী গান। তাঁর লেখা জনপ্রিয় কিছু গানের তালিকা দেখলে যে কেউ চমকে উঠবেন।
- আমি মুঠোর ভেতর পদ্ম নিয়ে ( তপন চৌধুরী, সোলস)
- ভালো লাগে জোৎস্না রাতে(রেনেসাঁ)
- আচ্ছা কেন মানুষ গুলো এমন হয়ে যায় (রেনেসাঁ)
- ও নদীরে তুই যাস কোথায় রে (রেনেসাঁ)
- ঐ ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায় (সামিনা চৌধুরী )
- নন্দিতা তোমার কথা আমি ভুলিনি এখনো ( শেখ ইশতিয়াক)
- ওগো হরিণী চোখের মনোহরিণী ( শেখ ইশতিয়াক)
- এলোমেলো বাতাসে উড়িয়েছি শাড়ির আঁচল ( বেবী নাজনীন)
- ও বন্ধুরে তুই কত দূরে ( বেবী নাজনীন)
- শাল পিয়ালের বনে কাছ এসেছিল ( কুমার বিশ্বজিৎ)
- একদিন ফুলের বনে একটি গোলাপ তুলতেই (তপন চৌধুরী)
- কবিতার বই (আইয়ুব বাচ্চু)
গানের পেছনের গল্প: ট্রেনের জানালা থেকে স্টুডিওর ডায়েরি
ডা. আরিফের লেখালেখির শুরুটা ছিল স্কুল জীবনে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় বন্ধু নকীব খানের অনুরোধে প্রথম গান লেখা শুরু করেন। ১৯৮০ সালের শেষের দিকে এক রাতে ট্রেনে করে ঢাকা যাওয়ার সময় জানালার পাশে ধানের ক্ষেত আর আকাশ দেখে লিখে ফেলেন ভালো লাগে জোছনা রাতে। আরেক জনপ্রিয় গান আচ্ছা কেন মানুষগুলো এমন হয়ে যায় লিখেছিলেন ১৯৮৪ সালে ফেরদৌস ওয়াহিদের স্টুডিওতে বসে মাত্র পাঁচ মিনিটে।
বন্ধু তাঁর নকীব খান তখনই গানটি দেখে বলেছিলেন এটি সুপারহিট হবে। আরেকটি আবেগঘন গান ঐ ঝিনুকফোটা সাগরবেলায় তিনি লিখেছিলেন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে। বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার স্বপ্ন থেকেই গানটির জন্ম। যদিও বাস্তব জীবনে সেই সুযোগ এসেছিল গানটি লেখার ১০ বছর পর।
ডা. আরিফের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যমানতা। তিনি যখন লেখেন "গাঁয়ের সেই পথে জামের মুকুল/পড়ে আছে পাকা লাল বটফল", শ্রোতার চোখের সামনে তখন গ্রামীণ বাংলার এক উদাস দুপুর জীবন্ত হয়ে ওঠে। পেশায় চিকিৎসক হলেও তাঁর ভেতরে বাস করত এক সংবেদনশীল কবিমন, যা নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও প্রকৃতির স্নিগ্ধতাকে নিখুঁতভাবে ছুঁয়ে যেতে পারত।
ডা. মোহাম্মদ আরিফের লেখা কালজয়ী পাঁচটি গানের লিরিক্স
কবিতার বই
- কথা: ডা. মোহাম্মদ আরিফ
- কন্ঠ: আইয়ুব বাচ্চু
- অ্যালবাম: রক্ত গোলাপ (১৯৮৬)
একদিন দুপুর বেলায় কবিতার বইটা মেলে
দেখি লিখেছ তুমি দু’ফোটা চোখের জলে
এই সুন্দর দিন গুলো যেন হয় না ভুল।
অভিমানী দু’চোখ তুলে আমার কথাটি শোন
তোমাকে কখন আমি দুঃখ দেব না জেনো
আমার প্রেমের সাগরে নেইতো নেই কোন কিনারা।
চন্দনের সুবাসমাখা যে ঘাসফুল পেয়েছিলাম
ভালবাসার ছোঁয়াতে সেই ফুল তোমাকে দিলাম
আমার প্রেমের সাগরে নেইতো নেই কোন কিনারা।
আমি মুঠোর ভিতর পদ্ম নিয়ে
- কথা: ডা. মোহাম্মদ আরিফ
- কন্ঠ: তপন চৌধুরী
- ব্যান্ড: সোলস
- অ্যালবাম: মানুষ মাটির কাছাকাছি (১৯৮৭)
আমি মুঠোর ভিতর পদ্ম নিয়ে
তোমার জন্যে স্বযত্মে
অনেক আশায় এ বুক বেধে
ভেবেছিলাম মনে মনে
তোমায় যখন কাছে পাবো
মুঠো ভরে পদ্ম দিবো।
হায় কি ভুল আমি করেছিলাম
তোমায় যখন কাছে পেলাম
দেখতে পেলাম তোমার হাতে
একটি রঙ্গিন গোলাপ কলি।
হায় এখন আমি কি করে বলি
দাও ফেলে ঐ গোলাপ কলি
এই মূঠোর পদ্ম তোমার জন্যে
নিয়ে আমায় কর ধন্য।।
ভালো লাগে জোৎস্না রাতে
- কথা: ডা. মোহাম্মদ আরিফ
- কন্ঠ: নকীব খান
- ব্যান্ড: রেনেসাঁ
- অ্যালবাম: রেনেসাঁ (১৯৮৮)
- ভালো লাগে জোৎস্না রাতে
মেঘ হয়ে আকাশে ভাসতে
ধানের শীষে বাতাস হয়ে
কিষানীর মন ছুঁয়ে যেতে
ভালো লাগে রোদ হয়ে
ঐ পাখির ডানা ছুঁয়ে খেলতে।
আমার জানালায় উদাস দুপুর
কবিতার বই খুলে দেখছে
গাঁয়ের সেই পথে জামের মুকুল
পড়ে আছে পাকা লাল বটফল
এক গরুর গাড়ি সেই যে পথে
ক্লান্তির ছাপ রেখে চলছে।
সেগুন কাঠের ঐ দরজা ভেঙে
বিকেলের রোদ এসে থামলে
আমার কবিতা শুকসারী হয়ে
মগ্ন চেতনার শীস দেয়
আমি পিয়ানোতে হাত রেখে
ভালো লাগা সব ধরে রাখছি।।
আচ্ছা কেন মানুষ গুলো
- কথা: ডা. মোহাম্মদ আরিফ
- কন্ঠ: পিলু খান
- ব্যান্ড: রেনেসাঁ
- অ্যালবাম: রেনেসাঁ (১৯৮৮)
আচ্ছা কেন মানুষগুলো এমন হয়ে যায়
চেনাজানা মুখগুলো সব কেমন হয়ে যায়
দিন বদলের খেলাতে মন বদলের মেলাতে
মানুষগুলো দিনে দিনে বদলে কেন যায়।
সুখের দিনে ভালোবাসা দেয় যে কতজন
কাছে আসে ভালোবাসে দেয় যে ভরে মন
দিন বদলের খেলাতে মন বদলের মেলাতে
মানুষগুলো দিনে দিনে বদলে কেন যায়।
দুঃখের দিনে কাছে এসে পথ ভুলে কি কেউ
একা ঘরে পড়েই রবে জানবে নাতো কেউ
দিন বদলের খেলাতে মন বদলের মেলাতে
মানুষগুলো দিনে দিনে বদলে কেন যায়।।
ও নদীরে তুই
- কথা: ডা. মোহাম্মদ আরিফ
- কন্ঠ: নকীব খান
- ব্যান্ড: রেনেসাঁ
- অ্যালবাম: রেনেসাঁ (১৯৮৮)
ও নদীরে তুই যাস কোথায় রে
কলকলাইয়া ছলছলাইয়া
কোন সাগরে
যাস যেথা নে না তুই আমারে।
ঐ যে মাঝিরা গান গাইয়া যায়
ঐ যে মাঝিরা ভাটিয়ালি গান গাইয়া যায়
পাল তুইলা
তুইলা কোন দুরে নাও বাইয়া যায়
যাস যেথা নে না তুই আমারে।
কইরে কইরে সাথীরা আয় ছুইটা আয়
কইরে কইরে সাথীরা তোরা সবে আয় ছুইটা আয়
হাত ধইরা
ধইরা যাই চইলা দুর অজানায়
যাস যেথা নে না তুই আমারে।।
প্রবাস জীবন ও এক বিশাল শূন্যতা
ডা. মোহাম্মদ আরিফ পেশাগত জীবনে একজন সফল চিকিৎসক। চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরায় বেড়ে ওঠা এবং ঢাকা মেডিকেল থেকে এমবিবিএস শেষ করে পাড়ি জমান বিদেশে। ইরান ও সৌদি আরব হয়ে তিনি এখন বসবাস করছেন কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডে।
পেশাগত ব্যস্ততা আর প্রবাস জীবনের দীর্ঘ বিরতিতে তাঁর কলম থেকে আমরা আর নতুন গান পাইনি। দেশীয় সংগীত জগত বঞ্চিত হয়েছে তাঁর সমৃদ্ধ কথা ও ভাবনা থেকে। গানগুলো তাঁর জীবনমুখী ও রোমান্টিক কথার কারণেই আজও নস্টালজিক করে তোলে আমাদের।
আমরা আশা করি, ডা. আরিফ ভাই আবারও কলম ধরবেন। তাঁর সেই স্নিগ্ধ শব্দমালা আবারও সুর হয়ে আমাদের কানে বাজবে। আজ যখন সস্তা চটকদার কথার ভিড়ে বাংলা গান তার চিরচেনা মাধুর্য হারাতে বসেছে, তখন ডা. মোহাম্মদ আরিফের গানগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় খাঁটি শব্দের শক্তি কতখানি।
প্রচারবিমুখ এই গুণী মানুষটি হয়তো সুদূর কানাডায় প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ে আবেগের সুর হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। বাংলা গানের সোনালী যুগের এই নেপথ্য কারিগরের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।
