বাংলা ব্যান্ড ও অ্যালবামের ধারাবাহিক গল্প: পর্ব-২ – সিম্ফনি, অডেসি, অরবিট, মনিটর, ব্যালেন্স ও এথেনা ব্যান্ডের যাত্রাপথ
বাংলা ব্যান্ড ও অ্যালবামের ধারাবাহিক গল্প: পর্ব-২
বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাসে নব্বই দশক ছিল এক অনন্য, রঙিন ও সৃজনশীল সময়। এই দশকেই ব্যান্ডসংগীত শহরের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যায় সারাদেশের তরুণ প্রজন্মের আবেগ, প্রতিবাদ, প্রেম আর স্বপ্নের ভাষায়। স্টুডিওর সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তির অভাব কিংবা পৃষ্ঠপোষকতার সংকট সত্ত্বেও কিছু ব্যান্ড নিজেদের মেধা, নিষ্ঠা ও সাহস দিয়ে তৈরি করেছিল এক নতুন সাংস্কৃতিক ধারার। দ্বিতীয় পর্বে যুক্ত হওয়া সিম্ফনি, অডেসি, অরবিট, মনিটর, ব্যালেন্স ও এথেনা সবাই মিলেই নব্বই দশকের সেই বিস্ময়কর সংগীতযাত্রার সাক্ষ্য। কেউ দীর্ঘ পথ হেঁটেছে, কেউ অল্প সময়েই হারিয়ে গেছে, কিন্তু প্রত্যেকেই রেখে গেছে নিজস্ব স্বর, নিজস্ব ছাপ। এই লেখা আসলে কেবল ব্যান্ডগুলোর ইতিহাস নয়, বরং এক প্রজন্মের অনুভূতির দলিল।
সিম্ফনি
১৯৮৯ সালে খুলনায় গঠিত এই ব্যান্ডটি অল্প সময়ের মধ্যেই শ্রোতাদের হৃদয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেয়। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে প্রকাশিত অনুভবে ও হৃদয়ের পালকি এই দুটি অ্যালবামই ব্যান্ডটির সৃজনশীলতা ও সংগীতবোধের পরিচয় বহন করে এবং প্রকাশের পরপরই দারুণ সাড়া ফেলে। তবে সম্ভাবনাময় এই যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৯৫ সালে ব্যান্ডটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তবু অল্প সময়ের মধ্যেই তারা যে সংগীত ও স্মৃতি রেখে গেছে, তা আজও বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ভালো আছি ভালো থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো ঐ সময়ে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। আরেকটি ছিল তাদের কালজয়ী গান ব্যান্ডের ভোকাল মনি জামানের কথা ও সুরে অনুভবে। তাদের প্রায় অধিকাংশ গানের গীতিকার ছিলেন মনি জামান।
অনুভবে কল্পনাতে যে মিশে রও
হাসির ঝলকে তুমি রজনীগন্ধা ফোঁটাও
উদাসী মন শুধু তোমার পানে চেয়ে রয়,
ভাবনাগুলো শুধু তোমার ছবি এঁকে যায়।
⭕️ব্যান্ড লাইনআপ ছিল: ভোকাল/গিটার: মনি জামান, বেস: আরেফীন, ড্রামস: সুজন, কী–বোর্ড: রিপন, ম্যানেজার: আনিস।
অডেসি
বারটিন, পিটার, লিটন ডি কস্তা, তিতি, টিটু, নোয়েল ও ইমতিয়াজ বাবু মিলে গড়ে তোলা একটি ব্যান্ড অডেসি। ১৯৯০ সালে অডেসি প্রকাশ করে তাদের সম্ভবত দ্বিতীয় অ্যালবাম মন মন কি যে চায় ভাল জনপ্রিয়তা পায় জানা যায়। মহুয়া বনে, মন মন কি যে চায়’ গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয় জয় করে নেয়। অডেসি তখন দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত শো করতে থাকে। এরপরেই এই সময়েই ব্যান্ডের ভোকাল ইমতিয়াজ বাবু প্রকাশ করেন তার একক অ্যালবাম এবং সোলো ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় ধীরে ধীরে অডেসি ভাঙনের পথে যায়। ১৯৯১ সালে ব্যান্ডটির পুরোনো কিছু সদস্য নিয়ে গঠিত হয় “নিউ অডেসি”। একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হলেও আগের দুই অ্যালবামের মতো সাফল্য আর আসেনি। এরপর ১৯৯৭ সালে ব্যান্ডের কয়েকজন মিলে রান করে ক্রসরোড নামে আরেকটি ব্যান্ড। আবার তার কিছুদিন পর ব্যান্ডটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় গ্রাম বাংলা। এর পরই ব্যান্ডটি হারিয়ে যায়। তাদের জনপ্রিয় গান ছিল মন মন কি যে চায়, প্রাণ প্রাণ কি যে চায়।
⭕️ব্যান্ড লাইনআপ ছিল: ভোকাল/গিটার: বাবু, বেস: বারটিন, গিটার: পিটার গোমেজ: রিপন, ড্রামস: লিটন ডি কস্তা।
অরবিট
নব্বই দশকের শুরুর দিকের এই ব্যান্ডটি স্বল্প সময়েই শ্রোতাদের মধ্যে আলাদা পরিচিতি গড়ে তোলে। তারা প্রকাশ করেছিল দুটি অ্যালবাম অরবিট ও প্রতীক্ষা। আধুনিক সুর, সহজ কথার গান আর আবেগী উপস্থাপনার কারণে সে সময়ের তরুণ শ্রোতাদের কাছে ব্যান্ডটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৯৭ সালেই ব্যান্ডটি শেষবারের মতো গান করে। এরপর ব্যান্ডের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তবু তাদের গান ও স্মৃতি নব্বই দশকের বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে। খুলনা থেকে এই ব্যান্ড অরবিট এর হাত ধরেই ১৯৯০ সালে গানের জগতে আত্মপ্রকাশ করেন কণ্ঠশিল্পী পলাশ। তার গাওয়া লাল শাড়ী’ গানটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পায়।
ঐ লাল শাড়ি রে
নিশি রাতে যায় কোন বনে লাল শাড়ি রে
চুল ভিজিয়ে সুগন্ধীতে লাল শাড়ি রে
যায় ছুটে মিলনের সাঁরে লাল শাড়ি রে
ঐ লাল শাড়ি রে
⭕️ ব্যান্ড লাইনআপ ছিল: ভোকাল/গিটার: পলাশ, লীড গিটার/ভোকাল: আলী আহমেদ বাবু, বেস: মবিন: রিপন, ড্রামস: লিটন ডি কস্তা, কি-বোর্ড: রাসেল, ভোকাল: আশরাফ বাবু, ড্রামস: সঞ্জয়।
মনিটর
ব্যান্ড মনিটর ১৯৯০ সালে তাদের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করে মনিটর (Self Titled) ভলিউম–১ নামে। অ্যালবামটি প্রকাশের পরপরই ভালভাবে জনপ্রিয় হয়। বিশেষ করে আমি একা এবং ছোট বেলার মতো এসো ফুল তুলিতে যা্ইই দুটি গান কথার গভীরতা ও সুরের মাধুর্যে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। নব্বই দশকের শুরুর দিকের বাংলা ব্যান্ডসংগীতে মনিটর একটি সংবেদনশীল ও পরিমিত ধারা উপহার দেয়। তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম চার দেয়াল।
⭕️ব্যান্ড লাইনআপ:ভোকাল: শামীম, আসলাম, দিপু, লিড গিটার: তারেক, বেস: আনিস, কিবোর্ড: রানা, ড্রামস: সোহেল।
ব্যালেন্স
নব্বই দশকের শুরুর দিকে জন্ম নেওয়া ব্যান্ডটি বাংলা ব্যান্ডসংগীতে এক ভিন্ন স্বাদ ও সংবেদনশীলতার ছাপ রেখে যায়। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাদের প্রথম অ্যালবাম ফ্রেন্ডশিপ দিয়েই শ্রোতাদের নজর কাড়ে ব্যান্ডটি। এরপর দীর্ঘ এক বিরতি। অনেকের কাছেই মনে হয়েছিল, ব্যান্ডটি হয়তো আর ফিরবে না। কিন্তু সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে আবারও নতুন উদ্যমে ফিরে আসে ব্যালেন্স। প্রকাশ করে তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম অপরাধ। এই অ্যালবামের বিশেষ করে আমি কার আশা নিয়ে বেঁচে থাকবো, চিরদিন’ ও অপরাধ এই গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীরভাবে জায়গা করে নেয় এবং ব্যালেন্সকে নতুন করে পরিচিত করে তোলে।
⭕️ব্যান্ড লাইনআপ:ভোকাল: বাবলু, আসলাম, দিপু, লিড গিটার: শাহরিয়ার, বেস: জুবরান, কিবোর্ড: বুলেট, ড্রামস: মাইকেল।
এথেনা
এথেনা (Athena) ছিল নব্বই দশকের শুরুর দিকের একটি স্বল্পস্থায়ী ব্যান্ড। ব্যান্ডটির একমাত্র অ্যালবাম Athena অ্যাথেনা’ প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। অ্যালবামটি প্রকাশ করে সারগাম (Sargam) লেবেল। বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকের ব্যান্ডসংগীতের উত্থানপর্বে এই অ্যালবামটি নিজস্ব সুর ও সময়ের আবেগকে ধারণ করেছিল। যাওগো আমায় ছেড়ে, সাত রংয়েতে, যেওনা চলে,কবিতার শিরোনাম গানগুলো সে সময় প্রসংশিত হয়েছিল।
⭕️ব্যান্ড লাইনআপ:ভোকাল: ফয়সাল, রোমেল , জাহিদ, নাইস, কচি ও মিউজকি জাহিদ হোসেন।
নব্বই দশকের বাংলা ব্যান্ডসংগীত ছিল সময়কে অতিক্রম করা এক আবেগী অধ্যায়। সিম্ফনি, অডেসি, অরবিট, মনিটর, ব্যালেন্স ও এথেনার মতো ব্যান্ডগুলো স্বল্প বা দীর্ঘ যাত্রায় যে গান ও স্মৃতি রেখে গেছে, তা আজও একটি প্রজন্মের অনুভূতিকে জীবন্ত করে রাখে। এই ধারাবাহিক গল্প আসলে সময়ের সঙ্গে বেঁচে থাকা এক নস্টালজিক ইতিহাসের দলিল।
--- বাউল পানকৌড়ি
বাংলা ব্যান্ড ও অ্যালবামের ধারাবাহিক গল্প: পর্ব-১ – চাইম, উইনিং, তীর্থক, ইন ঢাকা, রকস্ট্রাটা ও পেপার রাইমের যাত্রাপথ