সমাজের প্রতিচ্ছবি আর প্রতিবাদের সুর: বাংলা ব্যান্ড ইতিহাসের সেরা দশটি গান

বাংলা ব্যান্ড সংগীত এক অনন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যেখানে সুরের ভেতর লুকিয়ে থাকে সমাজ, রাজনীতি ও মানবতার গল্প। এটি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং সময়ের অভিঘাতে জন্ম নেওয়া এক প্রতিবাদের ভাষা। আশির দশকের উত্তাল রাজপথ, নব্বইয়ের গণআন্দোলনের অগ্নিশিখা কিংবা নতুন সহস্রাব্দের বিভ্রান্ত প্রজন্ম সব যুগেই ব্যান্ড সংগীত তার কণ্ঠে বলেছে মানুষের কথা, সমাজের কথা, পরিবর্তনের কথা। এই ধারার গানগুলোতে কখনও শোনা যায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা প্রতিবাদ, কখনও অবহেলিত জীবনের ব্যথা, আবার কখনও ভবিষ্যতের প্রতি এক আশাবাদী দৃষ্টি। সামাজিক কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে নূর হোসেন, রেললাইনের ঐ বস্তিতে বা পরাধীন বাংলা প্রতিটি গানই একেকটি সময়ের দলিল আর একেকটি বিবেকের প্রতিধ্বনি। আজকের লেখায় থাকছে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এরকম দশটি গান যেগুলো কেবল জনপ্রিয় নয়, সমাজচেতনার কথার শক্তিতে সমৃদ্ধ। প্রতিটি গানের সঙ্গে থাকছে লিরিক্স অ্যালবাম পরিচয় ও প্রকাশকাল, যাতে বোঝা যায় কীভাবে এই গানগুলো আমাদের সময়, চিন্তা ও সমাজকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে।

🎸🎵 রেল লাইনের ঐ বস্তিতে
🎸🎵 সামাজিক কোষ্ঠকাঠিন্য
🎸🎵 পরাধীন বাংলা
🎸🎵 রাজাকারের তালিকা চাই
🎸🎵 অসামাজিক
🎸🎵 নব জীবনের কথা বলছি
🎸🎵 পলাশীর প্রান্তরে 
🎸🎵 পরওয়ারদিগার
🎸🎵 স্বপ্ন বাজী
🎸🎵 নূর হোসেন


🎵 রেল লাইনের ঐ বস্তিতে 🎸
ব্যান্ড- উচ্চারণ/ গুরু আজম খান
কন্ঠ ও সুর- গুরু আজম খান
কথা- গুরু আজম খান ও লাবু রহমান
অ্যালবাম- বাংলাদেশ
সাল- ১৯৭৪

রেললাইনের ঐ বস্তিতে
জন্মেছিল একটি ছেলে
মা তাঁর কাঁদে
ছেলেটি মরে গেছে
হায়রে হায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ
বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ।

কত আশা ছিল তার জীবনে
সব স্মৃতি রেখে গেল মরনে,
মা তার পাসে চেয়ে বসে আছে
হায়রে হায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ
বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ।

কত মার অশ্রু আজ নয়নে
কে তা বোঝাবে বা কেমনে,
যে চলে যায় সে কি আসে
হায়রে হায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ
বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ।


🎵 সামাজিক কোষ্ঠকাঠিন্য 🎸
ব্যান্ড- ফিডব্যাক
কথা কন্ঠ ও সুর- মাকসুদুল হক
অ্যালবাম- বঙ্গাব্দ ১৪০০
সাল- ১৯৯৪

হেরোইনের ব্যবসা করে তুমি
বুলি আওড়াচ্ছো মানবতার
আর তেজস্ক্রিয় দুধ আমাদানি করে
গড়ে তুলছো কালো টাকার পাহাড়
তবে সন্ধ্যে এলে
কোনও শুদ্ধ সংগীতের আসরে
তুমি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করো আর
হুইসকি সেবন করো, হুইসকি সেবন করো।

এ যুগের পাদুকা, এ যুগের প্রসাধনী
এ যুগের বড় কথা, এ যুগের হয়রানি
তুমি যুগের দোহাই দিয়ে সেমিনারে লেকচারে
নাক সিটকিয়ে বলো
বন্ধ করো এই অশ্লীল ব্যান্ডবাজি।
তবে ব্যান্ডসংগীত যদি অশ্লীল হয়
আর নারীপক্ষ যখন নিরব রয়
প্রতিটি পণ্য বিক্রিতে ব্যবহার দেখি কেন
বিজ্ঞাপনের শত সুড়সুড়ি রমণী।

ত্যাগ করো এই সামাজিক কোষ্ঠকাঠিন্য
দিনগুলো নতুন সকালের জন্য
মেনো না বাধা
ঠুনকো আদব-বেয়াদবি
যে শোষণের মন্ত্র
তা জেনে গেছে আজকের প্রজন্ম
অস্থিরতা
আর এরপর কেউ চাপাবাজি করেন
ঢাকার ছেলেরা চিৎকার করে বলেন
ধন্যবাদ ভালো দিয়া গেলেন
ধন্যবাদ ভালোই দিয়া গেলেন।

ব্যান্ডসংগীতের ছত্রছায়ায় থেকে
দিচ্ছি ঝাড়ি
আমি টুয়েন্টি ফোর আওয়ার শুধু ইংরেজিতে
ইংরেজি কথা বলি বাংরেজি গান করি
ইংরেজি ভাব-চক্কর আর ইংরেজি স্বপ্ন দেখি
আমার মাকে ভালোবাসি
আমার দেশকে ভালোবাসি
তবে জানি না কেন আমি হেইট করি
এসব খ্যাঁৎ খ্যাঁৎ খ্যাঁৎ বেঙ্গলি।

ফেনসিডিল খেয়ে ফেন্সি মুডে
তুমি ফিজিকালি ইন বাংলাদেশ
বাট মেন্টালি ইন দা ইউএসএ।
দিনে ঘুমাচ্ছো আর রাতে ঝিমাচ্ছো
মিষ্টি গরম চা আ-হা
আর কপাল ঘামাচ্ছো
তবে কনসার্টে সুযোগ পেলে
করো মাদকবিরোধী গলাবাজি।
এ যে কুরুচির মহামারি
আর ভদ্রতার এক ভ্রান্ত ভন্ডামি।

একুশে ফেব্রুয়ারি গায়ে খাদি পাঞ্জাবি
হঠাৎ মনে পড়ে, আমি যে বাঙালি!
মিষ্টি কটকটি, বই মেলা চটপটি
তোমার বাঙালিত্বের কাছে হার মানি
আর ওরা এলো
শহীদ মিনার হলো লাঞ্ছিত
বাহান্নে যে শহীদ মিনার তৈরি হলো রক্ত দিয়ে
বাহাত্তরে যে শহীদ মিনার পুনর্নিমাণ হলো
লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে
এলো ঊনিশশো তিরানব্বই
বাঙালির তেরোশো তিরানব্বই-এর ক্রান্তিলগ্নে
আবারও সেই শহীদ মিনারের অবমাননা
আর তুমি গায়ে লাগালে বাতাস আর
রাখলে তোমার প্রতিবাদ
তাও কিছু উটকো ইংরেজিতে।

ডানপন্থী আর বামপন্থী আর উগ্রপন্থী আর এনজিও-পন্থী
গরিব মারার আছে হাজার পাঁয়তারা
লক্ষ লক্ষ ফিকির ফন্দি
দেখো ভিক্ষা বিতরণেও বাঙালি অক্ষম
তাই গঠিত হচ্ছে দিনে ও রাত্রে
প্রকাশ্যে আড়ালে
নব্য নব্য ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি।

গরিব গরিব রবে বড়লোক বড় হবে
বুদ্ধিজীবীগণ থাকবেন বেঁচে
বুদ্ধিদীপ্ত কোনো ছদ্মবেশে
ওদিকে গণতন্ত্রের নামে কাটা রাইফেল হাতে
মরবে যুবক অজানা কারো নির্দেশে।

তবু বাংলার ধুলো ওড়া আকাশে
আজও কেন শুনি রবি ঠাকুরের সেই হাহাকার বাণী
সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী
রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।।


🎵 পরাধীন বাংলা🎸
ব্যান্ড- ফিলিংস
কন্ঠ ও সুর- ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস
কথা- তানভীর মোর্শেদ
অ্যালবাম- টুগেদার ব্যান্ড মিক্সড
সাল- ১৯৯৪

চোখ বুজলেই দেখি পলাশীর প্রান্তর
বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর
পরাজিত নবাব সিরাজুদ্দৌলা
পরাস্ত স্বাধীনতা পরাধীন বাংলা
শুরু হলো ইংরেজ সালাদের শাসন
চুরি হলো সম্পদ ভেঙ্গে গেল মন হায়।

ইতিহাসে ইংরেজ সুসভ্য জাতি
বীভৎস দুশোবছর বীভৎস স্মৃতি হায়
মাঝে মাঝে জেগেছিল বাংলার জনতা
জেগেছিল তিতুমীর বিদ্রোহী নেতা
সিপাহীরা করে গেল সিপাহী বিপ্লব
বৃটিশের ট্যাঙ্ক নামে থেমে গেল রব হায়।

বেহিসেবি কামনাতে মুখ তুলে বাংলা
দেশ বড় চঞ্চল আগুন জালা
বেহিসেবি কামনাতে মুখ তুলে বাংলা
দেশ বড় চঞ্চল আগুন জালা
আগুন জালা
আগুন জালা
শঙ্কিত স্বাধীনতা শঙ্কিত বাংলা।

শেষ হলো ইংরেজ সাতচল্লিশ সাল
আসলো পাকিস্তান সেই এক দিনকাল
পড়ল শিকল গায়ে বাংলা ভাষা
ভাষার যুদ্ধে শুরু দিন চেতনা
শুরু হলো বর্বর শালাদের শাসন
চুরি হলো স্বাধীনতা ভেঙ্গে গেল মন হায়।

একাত্তরে হলো স্বাধীনতা যুদ্ধ
জলে উঠে বাংলা বারুদের গন্ধ
দুর্জয় এই দেশ দুর্জয় মাটি
দুর্জয় জনতা দুর্জয় ঘাটি
ঘুমন্ত নবজাত বাংলার দেহে
নয়মাস পরে তার স্বাধীনতা দেখে হায়।।


🎵 রাজাকারের তালিকা চাই🎸
ব্যান্ড- নোভা
কন্ঠ ও সুর- আহমেদ ফজল
কথা- আহমেদ ফজল
অ্যালবাম- রাজাকারের তালিকা চাই
সাল- ১৯৯১

কোনো রূপকথা গল্প গাঁথা নয়
আমার স্মৃতি কলুষিত বিস্ময়
আমি দেখেছি ধর্ষিত বাংলা মায়ের মুখ
ছিল বিজাতী শত্রুর জয়
শুনি সেই মহান নেতার বাণী 
রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব
এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

ধীরে ধীরে জাগে বিদ্রোহী এদেশ
বুকের তাজা খুনে রাঙা বেশ নিয়ে
আঘাত হানে ভেঙে দিতে শোষকের প্রাসাদ
স্বাধীনতার স্বপ্নতলে এলো সেই রাত।
এলো সেই প্রথম বিদ্রোহী
বীরের মহান কণ্ঠস্বর :
I, Major Ziaur Rahman,
do hereby declare,
the Independence of Bangladesh,
on behalf of our great national leader
Bongobondhu Sheikh Mujibur Rahman

কেড়ে নিয়েছে ওই হায়নার দল
ধর্ষিত মায়ের চোখের জল
লাখো লাখো শহীদ- তোমাদের কথা ভুলিনি
জীবন দান যদি মহান মূল্য হয়
তোমরাই তো চির বিস্ময়
তোমাদের সমমূল্য বিশ্বে
কোনো জাতি আজো দেয়নি
তবু কেন সেই থেকে মোরা
স্বাধীনতার নামে পরাধীন
নিষ্পেষিত গোটা জাতি ওই রাজাকারের হাতে?

আর নয়, আর কতকাল তারা পাবে প্রশ্রয়!
পরাজিত সব দালাল আজ দাও পরিচয়
আজ যারা এই মাটিতে হাতিয়ার শানে
আজ যাদের রক্ত চোখ মোদেরই পানে
ওই রাজাকার ছেড়ে যা এই দেশটা আমার
আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ করবে তোদের চির অবসান,
আসছে এই প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদেরই সন্তান
আমরা এই প্রজন্ম রাজাকারের তালিকা চাই
লাখো শহীদের সাথে
মুক্তিযোদ্ধা আমরা সবাই।।


🎵 অসামাজিক 🎸
ব্যান্ড- ওয়ারফেইজ
কন্ঠ ও সুর- সঞ্জয়
কথা- ইব্রাহিম আহমেদ কমল
অ্যালবাম- অসামাজিক
সাল- ১৯৯৮

জানালার বাহিরে দেখি
কত রং কত উৎসব
পর্দার আড়াল থেকে
দেখি আমি সব।

আসতেও চাইনা আমি
বাহিরে মাঝে সবার,
নিজেকেও ভাবিনা আমি
তোমাদেরই আরেকজন।
বিক্ষোভের ভাষা হারিয়ে
উন্মাদ আমার মন
সবই মিছে তোমার তামাশা
নিয়মের মুখোশ।

হে সমাজ আমি চাইনা তোমার আশ্রয়
হে সমাজ আমি হয়েছি আজ নির্ভয়
আমি দেখতে চাই আমার স্বকীয়তা
আমি থাকবো সবার ভিন্ন
হে সমাজ আজ নেই যে মনে সংশয়।

কত বদলে গেছে
সমাজের রীতিনীতি,
স্বার্থের ভূষণে মেকি
সমাজ সেবক নেতার দল।
অপরাধ সবারই আছে
দেখেও না দেখে সবাই,
ঝঞ্ঝাট এড়িয়ে চলে
সচকিত নাগরিক।

একদিন হবে মোদেরই জয়
থাকবেনা আর মনে কারো কোনো সংশয়,
সেইদিন হবে পৃথিবী যে
আলো ঝরা হাসি গানে ভরা।
হে সমাজ আমি অন্ধকারে আর নই
হে সমাজ আমি করবোনাকো আর ভয়,
আমি ভাঙতে চাই সেই রীতিনীতি
যেথা অন্যায় হয় স্বীকৃত।

হে সমাজ আমি অন্ধকারে আর নই
হে সমাজ আমি চাইনা তোমার আশ্রয়
হে সমাজ আমি হয়েছি আজ নির্ভয়
আমি দেখতে চাই আমার স্বকীয়তা
আমি থাকবো সবার ভিন্ন
হে সমাজ আজ নেই যে মনে সংশয়।


🎵 নব জীবনের কথা বলছি 🎸
ব্যান্ড- ফিলিংস
কন্ঠ ও সুর- ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস
কথা- আসাদুল্লাহ দেহলভী
অ্যালবাম- নগর বাউল
সাল- ১৯৯৬

অসম্ভবের যুগে জন্ম নিয়ে
সম্ভাবণার কথা বলছি
মৃত্যুর নগ্ন নৃত্যের তালে
নবজীবনের কথা বলছি।

গল্পে গল্পে কতরাত কাটিয়েছি
রাত জাগা কষ্টের সাথে
শুধু বেঁচে আছি
বেঁচে আছি
স্বপ্ন স্বপ্ন বুকে নিয়ে
শুধু বেঁচে আছি
নবজীবনের কথা বলছি।

শতাব্দীর মোড়ে মোড়ে 
বটবৃক্ষের মত যারা
দাড়িয়ে আছে বহুকাল ধরে 
তাদের-ই ডাকে চলছি একা
ভেঙ্গে ফেলে যাব এই 
কাঁচেরই দেয়াল
রাত জাগা কষ্টের সাথে বেঁচে আছি
স্বপ্ন বুকে নিয়ে
শুধু বেঁচে আছি
নবজীবনের কথা বলছি।

ব্যস্ত রাজপথে যারা 
মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে যারা
চেয়েছিল সোনালী সকাল 
তাদেরই গান আজ
গাইব আমি
রাতজাগা কষ্টের সাথে শুধু বেঁচে আছি
রাতজাগা কষ্টের সাথে শুধু বেঁচে আছি
স্বপ্ন বুকে নিয়ে শুধু বেঁচে আছি
নবজীবনের কথা বলছি।।


🎵 পলাশীর প্রান্তরে 🎸
ব্যান্ড- মাইলস
কন্ঠ- শাফিন আহমেদ
কথা- লতিফুল ইসলাম শিবলী
অ্যালবাম- প্রবাহ
সাল- ২০০০

কতটা তুমি হারালে বন্ধু কেঁদেছে অন্তর
জানো না তুমি হারাবার ব্যাথা
জানে পলাশীর প্রান্তর
হারিয়ে গেছে সেখানে মায়ের সোনার নোলকখানি
গোলাভরা খেতের ফসল সাজানো ফুলদানি
এই হারানোর বেদনা তুমি রেখো অন্তরে
দেখবে তোমার দুঃখ লুকাবে পলাশীর প্রান্তরে

কতটা তুমি হারালে বন্ধু কেঁদেছে অন্তর
জানো না তুমি হারাবার ব্যাথা
জানে পলাশীর প্রান্তর
হারিয়ে গেছে খুদিরামের স্বপ্ন ভরা চোখ
তিতুমীরের সফেদ পাগড়ী জ্যোতির্ময় আলোক
এই হারানোর বেদনা তুমি রেখো অন্তরে
দেখবে তোমার দুঃখ লুকাবে পলাশীর প্রান্তরে।।

🎵 পরওয়ারদিগার🎸
ব্যান্ড- মাকসুদ ও ঢাকা
কন্ঠ- মাকসুদুল হক
কথা- মাকসুদুল হক
অ্যালবাম- প্রাপ্ত বয়স্কের নিষিদ্ধ
সাল- ১৯৯৬

কোন পথে ওরা চলছে 
হায় পরওয়ারদিগার
যে হাতে তাদের কোরান-শরীফ 
সেই হাতে কেন তলোয়ার
নারায়ান-তাকবীর আল্লাহু-আকবার 
বলে দিচ্ছে জিহাদের ডাক
হত্যা করছে ওরা মানবজাতি 
তোমার আশরাফুল মাকলুকাত।

কোন পথে আমরা চলছি 
হায় পরওয়ারদিগার
বাড়িতে বাড়িতে আছে কোরান শরীফ 
তবে নেই তার কোন তেলাওয়াত
আল্লাহর আইন কায়েম হোক 
ওরা তুলছে দাবী প্রতিদিন
লাকুমদিনুকুম অল-ইয়াদিন আমার 
লাকুমদিনুকুম অল-ইয়াদিন।

প্রতিদিন বৈষম্য আর 
বিদ্বেষ দেশ জুড়ে
প্রতিওয়াক্ত প্রতিবাদ উঠুক 
আজানের সুরে সুরে
ওরা জয়তুনের ডাল মাটিতে 
ছুড়ে ফেলে অস্ত্র তাক করেছে
ওরা শান্তির পায়রাকে হত্যা করে 
শকুন পুষতে শিখেছে।

কোন পথে আমরা চলছি 
হায় পরওয়ারদিগার
তোমার অস্তিত্ব শিকার করি 
আমরা যে গুনাগার
ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদের 
নাম দিলাম মৌলবাদ
পালটে জবাব ওরা দিল আমাদের 
তোরা নাস্তিক-মুরতাদ।

একি আমরা দেখছি 
হায় পরওয়ারদিগার
হত্যাকারি যেনাকারিরা সেজেছে 
নব্য পয়গাম্বার।
একাত্তরের কাফের সরদারকে 
ক্ষমা করেছে আদালত
রোজ-হাশরে তুমি ক্ষমা করবেনা 
এই আমাদের এবাদত।
দেশ কাল আর শান্তির কথা ভেবে 
রয়েছি আমরা নিরব
যখন নিরবতা ওরা দুর্বলতা ভাবে 
রক্ত করে টগবগ।
ওদের প্রতিটি হুমকি প্রতিটি আঘাত 
লড়তে আমরা শিখেছি
ওদের স্বাধীন বাংলার পতাকাতলে 
আশ্রয় করে দিয়েছি।।

কোন পথে আমরা চলব 
হায় পরওয়ারদিগার
বাংলাদেশের সব ধর্মে আছে 
সম-অধিকার
অনেককাল তোমার কেটে গেছে মাবূদ 
মন্দিরে মসজিদে
এখন সময় এসেছে মাবূদ 
তুমি ফিরে এস অন্তরে।

কোন পথে চলছি আমরা 
হায় পরোয়ারদিগার
পৃথিবীর তামাম কালাম কিতাবে 
তুমি ফিরে এসেছো বারেবার
তাই তেহজ্বীব-তামদ্দুন নিয়ে 
যাদের অধিক মাথাব্যাথা
তারা ভুলে গেছে তোমার ভালোবাসা
 আর প্রাচীন পরম্পরা
প্রতিদিন বৈষম্য আর 
বিদ্বেষ দেশ জুড়ে
শঙ্খ আর আযানের ধ্বনি 
উঠুক মন্দিরে মসজিদে।
ওরা উৎকৃষ্ট মানবজাতির দাবীতে 
অস্ত্র তাক করেছে
ওরা তোমার বিধান লঙ্ঘন করে 
জল্লাদ হতে শিখেছে।
ওরা জয়তুনের ডাল মাটিতে 
ছুড়ে ফেলে অস্ত্র তাক করেছে
ওরা শান্তির পায়রাকে হত্যা করে 
শকুন পুষতে শিখেছে।।

🎵 স্বপ্নবাজি 🎸
ব্যান্ড- সঞ্জীব চৌধুরী/দলছুট
কন্ঠ- সঞ্জীব চৌধুরী
কথা- সঞ্জীব চৌধুরী
অ্যালবাম- স্বপ্নবাজি
সাল- ২০০৫

আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া সন্ধান করিয়া
স্বপ্নের ঐ পাখি ধরতে চাই
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই।

ওরা বলে ঐ গাড়িতে করে আমাদের জন্য
খাদ্য আর পানীয় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো
আমাদের জন্য খাদ্য আর পানীয়
কিন্তু বিশ্বাস করুন বন্ধুগণ
আমি জানি ঐ গাড়িতে আমাদের জন্য
কোন খাদ্য ছিলো না
আমাদের জন্য কোন পানীয় ছিলো না
তিনশটি লাশ, তিনশটি লাশ ঠান্ডা হিম
যাদের গুম করে ফেলা হবে
আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সমস্ত কথা
আর তখনই
তখনই আমার দিকে এগিয়ে আসে
উদ্ধত রাইফেল
আমার দিকে এগিয়ে আসে
 উদ্ধত বেয়নেট
ওরা বলে খামোশ
পৃথিবীতে শান্তি রক্ষিত হোক
আকাশে শান্তি বাতাসে শান্তি
ওহো শান্তি রক্ষিত হোক
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে ধরিয়ে দিন
আমাকে চুপ করতে হয়, 
আমাকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়
তবু, তবু বন্ধুগণ
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই।

বাংলাদেশে অন্ধকার নেমে আসে
আর সেই অন্ধকারের ভিতর
কতো গুলো গণ্ডার আর কতো গুলো বাইসন
তাদের হিংস্র তীক্ষ্ণ ধারালো শিং নিয়ে
তীব্রভাবে ছুটে আসে
আর একজন তাজুল ইসলামকে খুন করা হয়
একজন তাজুল ইসলামকে পিটিয়ে লাশ বানানো হয়
একজন ভালো মানুষ মাঝ রাতে বাড়ি ফিরে এলোনা
মাটি ভিজে যায়
মাটি ভিজে যায় রক্তে
আরেকজন কর্নেল তাহের
পৃথিবীর সমান বায়সী স্বপ্ন নিয়ে
আলিঙ্গন করেন ফাঁসির রজ্জু।
এভাবেই এভাবেইতো আরও আরও কতো শত
আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সমস্ত কথা
আর তখনই
তখনই আমার দিকে এগিয়ে আসে
উদ্ধত রাইফেল
আমার দিকে এগিয়ে আসে
 উদ্ধত বেয়নেট
ওরা বলে খামোশ
পৃথিবীতে শান্তি রক্ষিত হোক
আকাশে শান্তি বাতাসে শান্তি
ওহো শান্তি রক্ষিত হোক
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে ধরিয়ে দিন
আমাকে চুপ করতে হয়, 
আমাকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়
তবু, তবু বন্ধুগণ
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই।।


🎵 নূর হোসেন 🎸
ব্যান্ড- প্রমিথিউস
কন্ঠ- বিপ্লব
কথা- বিপ্লব
অ্যালবাম- সংগ্রাম
সাল- ১৯৯৩

জন্মানোর পর থেকে সংগ্রামকে
বুকে চেপে যার জীবন হয় শুরু
সে নুর হোসেন
এই নুর হোসেন কে চলতে দাও উদ্দাম গতিতে
উড়তে দাও শান্তির পায়রার মত
আর মিছিল করতে দাও বজ্রকন্ঠে
এই নুর হোসেনকে করো না কোন বাক্তির
কিংবা কোন গোত্রের কিংবা কোন গোষ্ঠীর
নূর হোসেন- নূর হোসেন
আমার বাংলা মায়ের দীপ্ত
কণ্ঠে জ্বলে উঠা এক অতন্ত্র প্রহরী।

যেই ছেলে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়
ঢাকার রাজপথ রাঙ্গিয়ে যায়
যার কথা মিশে আছে বাংলার দিকে দিকে
সৃষ্টি হয়েছে এক ইতিহাস
যুদ্ধ জয় করে দিয়ে যায় ঘরে ঘরে
নতুন স্বপ্ন আঁকা শতাব্দীর
মিছিলের তালে তালে বজ্র কন্ঠে বলে
জিরো পয়েন্টে আমি সংগ্রামী
সে বঙ্গবীর নুর হোসেন তুমি
বঙ্গবীর নুর হোসেন তুমি।

তোমার মৃত্যু যেন মৃত্যু হলো না
ছড়িয়ে পরলে তুমি শিখা হয়ে
আবার নতুন করে প্রমান করে দিলে
শক্তির অবিনাশী তাপ বারুদে
বাংলার আকাশে উঠেছে সুর্য
সে তো হায় ওগো বীর তোমারই কারন
মোদের প্রতিটি কাজে যুগে যুগে রয়ে যাবে
তোমার একেকটি প্রতিফলন
বঙ্গবীর নুর হোসেন শোনো।।



বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাস আসলে এক প্রজন্মের জাগরণের ইতিহাস। এই গানগুলো শুধু সুরে নয়, কথায়ও বলেছে স্বাধীনতার, প্রতিবাদের, এবং সমাজের অব্যক্ত বেদনার গল্প।এই গানগুলো প্রমাণ করে সঙ্গীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি হতে পারে বিবেকের কণ্ঠস্বর। যতদিন সমাজে অন্যায় অবিচার আর বৈষম্য থাকবে ততদিন বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এই প্রতিবাদী সুর থামবে না। কারণ গানই সেই ভাষা যা বন্দি হয় না, নীরব হয় না, বরং সময়ের সীমা পেরিয়ে প্রতিধ্বনিত হয় এক অনন্ত আহ্বানে



--- বাউল পানকৌড়ি
কনসার্ট ফর ফাইটার্স ২০০৫ এবং একজন সঞ্জীব চৌধুরী--Click to Read
ইব্রাহিম আহমেদ কমল - পর্দার আড়ালে থেকে দেখি আমি সব--Click to Read

Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url