ইদ্রাকপুর কেল্লা: মুন্সীগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে ৩৫০ বছরেরও পুরোনো ঐতিহাসিক মোগল জলদুর্গ

মুন্সীগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে চার শতাব্দীর ইতিহাস বহনকারী এক দূর্গ যার নাম ইদ্রাকপুর কেল্লা। মোঘল স্থাপত্যের অনন্য জলদুর্গ। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবাদার ও সেনাপতি মীর জুমলা ঢাকাকে জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষার কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইছামতী নদীর তীরে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। তখন মগ, পর্তুগিজ ও হার্মাদ জলদস্যুদের আনাগোনায় নদীবেষ্টিত এই অঞ্চল ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইদ্রাকপুর কেল্লা ছিল সেই সময়কার সামরিক প্রতিরক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। মোগল আমলের ইট-সুরকির গাঁথুনি নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সামরিক কৌশল এবং নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের প্রতিরক্ষার এক অনন্য দলিল। সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকাকে জলদস্যুদের কবল থেকে সুরক্ষিত রাখতে ইছামতী নদীর তীরে নির্মিত এই দুর্গটিই আজকের মুন্সিগঞ্জ শহরের জন্মকথা বহন করে চলেছে।


➡️ সামরিক কৌশল ও মীর জুমলার দূরদর্শিতা
ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা ক্রমাগতভাবে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের (হার্মাদ) আক্রমণে জর্জরিত হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সেনাপতি ও বাংলার সুবেদার মীর জুমলা ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে এই জলদুর্গটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৬৫৮ সালে এবং শেষ হয় ১৬৬০ সালে। কেল্লার অবস্থান ছিল সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় বিক্রমপুর পরগনার ইদ্রাকপুর এলাকাটি ছিল ইছামতী, ধলেশ্বরী, মেঘনা এবং শীতলক্ষ্যা নদীর সংগমস্থলের কাছাকাছি। নদীপথে শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা এবং নৌ-আক্রমণ প্রতিহত করাই ছিল এই কেল্লার প্রধান উদ্দেশ্য। দুর্গের কৌশলগত গুরুত্ব বোঝাতে এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল একটি সুসংগঠিত নৌ-সামরিক কেন্দ্র হিসেবে এর ব্যবহার। বিশেষ তথ্য: কেল্লায় আবুল হোসেন নামে একজন সেনাধ্যক্ষ (নৌবাহিনী প্রধান) নিয়োজিত থাকতেন। তাঁর নিয়ন্ত্রণে প্রায় ২০০টি ছোট-বড় নৌযান (যেমন: কোষা, জলবা, গুরব, বজরা) সর্বদা পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী ও ইছামতীর তীরে প্রস্তুত থাকত। কেল্লার এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রমাণ করে, এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ নৌ-সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।


➡️ স্থাপত্যের বিস্ময়: দুর্গের গঠনশৈলী 
ইদ্রাকপুর কেল্লা মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত এই চতুর্ভুজাকার দুর্গটি উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত। দুর্গটির আনুমানিক দৈর্ঘ্য ৮২ থেকে ৮৭ মিটার এবং প্রস্থ ৬০ থেকে ৭২ মিটার।
🟢 আয়তন : দুর্গটির আনুমানিক দৈর্ঘ্য ৮২ থেকে ৮৭ মিটার এবং প্রস্থ ৬০ থেকে ৭২ মিটার।
🟢 প্রতিরক্ষা বেষ্টনী: সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এই দুর্গের প্রত্যেক কোণে রয়েছে একটি বৃত্তাকার বেষ্টনী বা হেভি বুরুজ। দেওয়ালগুলো প্রায় ২ থেকে ৩ ফুট পুরু।
🟢গোলা নিক্ষেপের ফোঁকর: শত্রুদের ওপর গোলা ও বন্দুকের গুলি ছোড়ার জন্য প্রাচীরের গায়ে অসংখ্য চতুষ্কোণাকার ফোঁকর রয়েছে। প্রাচীরের পাপড়ির মতো নকশা আসলে ছিল রক্ষণব্যূহ হিসেবে ব্যবহৃত ছিদ্র।
🟢 পর্যবেক্ষণ মঞ্চ: পূর্ব দিকের মূল প্রাচীরের মাঝামাঝি অংশে ৩৩ মিটার ব্যাসের একটি গোলাকার উঁচু মঞ্চ রয়েছে। দূর থেকে শত্রুর চলাচল পর্যবেক্ষণ করাই ছিল এর প্রধান কাজ।
🟢 প্রবেশদ্বার: দুর্গে প্রবেশের একমাত্র খিলানাকৃতির দরজাটি উত্তর দিকে অবস্থিত। উত্তর ও দক্ষিণ পাশে কামান বসানোর জন্য একাধিক মঞ্চ নির্মিত হয়েছিল।


➡️   মোগল আমলের 'এসি' কৌশল!
এই কেল্লার স্থাপত্যে একটি অদ্ভুত কৌশল লক্ষ্য করা যায়, যা আধুনিক দর্শকদের জন্য খুবই কৌতূহলদ্দীপক। কেল্লার উপরের অংশে কুঠিরের মেঝে তৈরি করার সময় বিশেষ এক কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল। ১২ মে ২০১৫ সকালে সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে কেল্লার মুল মঞ্চের মেঝে ভাঙ্গার সময়  এই রকম কলস নির্মিত মেঝে আবিষ্কৃত হয় । প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উৎখনন ও সংস্কার কাজের সময় দেখা যায় ব্রিটিশ আমলে নির্মিত কাঠামোর নিচে সারিবদ্ধভাবে হাড়ি বা কলস রেখে তার ওপর টালি ও ইট বসানো হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ (Humidity Control) বা কেল্লার অভ্যন্তর ভাগকে তুলনামূলকভাবে শীতল রাখার জন্য এই বিশেষ কৌশলটি ব্যবহার করা হতো।  বাংলাদেশে  প্রথম আবিষ্কৃত হয় কলস দিয়ে তৈরি মেঝে। আর  এই মেঝে দেখা গেল   মুন্সীগঞ্জ শহরে অবস্থিত  ইদ্রাকপুর কেল্লায়।   


➡️ সুড়ঙ্গ পথের রহস্য: জনশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
ইদ্রাকপুর কেল্লা ঘিরে সবচেয়ে জনপ্রিয় জনশ্রুতি হলো, ঢাকার লালবাগ কেল্লা পর্যন্ত একটি গুপ্ত সুড়ঙ্গ পথ ছিল। এই পথটি দিয়ে নাকি কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে অন্যত্র সরে যাওয়া যেত। তবে বাংলাপিডিয়া এবং প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্গের নিচে অবস্থিত সিঁড়িটি আসলে ছিল ভূগর্ভস্থ একটি গোপন কুঠুরি বা অস্ত্রাগারে নামার পথ। ধারণা করা হয়, সেই কক্ষটি ছিল অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত রাখার গুদামঘর। জরুরি অবস্থার সময় সৈন্যরা সম্ভবত এই পথ দিয়ে অন্য কোথাও সংক্ষিপ্ত দূরত্ব অতিক্রম করে পালাবার চেষ্টা করত, কিন্তু লালবাগ কেল্লা পর্যন্ত সুড়ঙ্গ থাকার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।


➡️ সংরক্ষণের পথে: কেল্লা থেকে প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর
কালের পরিক্রমায় ইছামতী নদীর গতিপথ পরিবর্তন হলেও দুর্গের তিন কিলোমিটারের মধ্যেই আজও বহমান মেঘনা, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদী যা এই জলদুর্গের গুরুত্বের ঐ সময়কার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর দুর্গটি ব্রিটিশদের দখলে যায়। পরবর্তী সময়ে এটি মহকুমা প্রশাসকের বাসভবন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ১৬৬০ সালে নির্মিত এই কেল্লাটি ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৪৫ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এটি মহকুমা প্রশাসকের (এস.ডি.ও) এবং পরে জেলা প্রশাসকদের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।


বর্তমানে এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। কেল্লাটির পাশে থাকা পুরোনো জেলখানা ভবনে সম্প্রতি স্থাপিত হয়েছে মুন্সিগঞ্জ প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর। দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় থাকা এই প্রাচীন নিদর্শনটিকে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই জাদুঘর চালু হয়েছে (২০২২ সালের ১৯ মার্চ) এবং সেখানে পোড়ামাটির মৃৎপাত্র, ল্যাম্পস্ট্যান্ড, কলসসহ নানা প্রাচীন প্রত্নবস্তু স্থান পেয়েছে। যদিও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা বিক্রমপুরের সমৃদ্ধ প্রত্নসম্পদ জাতীয় জাদুঘর থেকে এনে এখানে প্রদর্শনের দাবি জানিয়েছেন। ইদ্রাকপুর কেল্লার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ৪টাকা মূল্যের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত করে। 


 ➡️ আপনার জন্য ভ্রমণ তথ্য
ঢাকা থেকে খুব সহজে অল্প সময়েই মুন্সিগঞ্জ পৌছানো যায়। দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসা যায়। ঢাকা থেকে স্থল এবং নৌপথে মুন্সিগঞ্জ যাওয়া যায়। সদরঘাট থেকে লঞ্চে যেতে লাগে এক ঘন্টার অল্প কিছু বেশি সময়। মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে অটো রিক্সায় দশ মিনিট পৌছানো যায় ইদ্রাকপুর কেল্লায়। ভারা নিবে ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকা। তাছাড়া ঢাকা গুলিস্থান থেকে এসি বাসে যাওযা যায় মুন্সিগঞ্জ মুক্তার ব্রীজ। সেখান থেকে অটোতে অল্প সময়ে পৌছানো যায় ইদ্রাকপুর কেল্লা। ইদ্রাকপুর কেল্লা ঠিক মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।  মোঘল স্থাপত্যের এই অনন্য নিদর্শনটি দেখতে চাইলে জেনে নিন এর সময়সূচী ও প্রবেশ মূল্য:


বিভাগ সময়সূচীসাপ্তাহিক ছুটি রবিবার
অন্যান্য দিন (শনি, মঙ্গল, বুধ) সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা
বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা
শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা (সারাদিন উন্মুক্ত)
সোমবার দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা (আধাবেলা)
সাধারণ দর্শক: ১০ টাকা
মাধ্যমিক পর্যন্ত শিশু: ৫ টাকা
সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক: ২৫ টাকা
বিদেশী নাগরিক: ১০০ টাকা।


মোগল আমলের স্থাপত্যরীতি, সামরিক কৌশল, নদীনির্ভর প্রতিরক্ষা ও প্রাচীন নগরগঠনের চমৎকার উদাহরণ হিসেবে ইদ্রাকপুর কেল্লা আজও গবেষকদের অনুপ্রেরণা দেয়। একই সাথে এটি ইতিহাসপ্রেমী, পর্যটক ও নতুন প্রজন্মের কাছে বিক্রমপুরের সমৃদ্ধ অতীতের আকর্ষণীয় এক দরজা খুলে দেয়। মুন্সিগঞ্জ শহরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা ইদ্রাকপুর কেল্লা শুধুমাত্র ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলীর এক মূল্যবান অংশ। নদীবেষ্টিত বাংলার এক সময়ের সামরিক কেন্দ্র এই দুর্গটি পরিদর্শনের মাধ্যমে আপনি অতীত ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক দেখতে পাবেন।
 
--- বাউল পানকৌড়ি
মুন্সিগঞ্জ জেলার একমাত্র গির্জা- শুলপুর সাধু যোসেফ গির্জা সিরাজদিখান--Click to Read
সুলতানি স্থাপত্যের নিদর্শন বাবা আদম শহীদ (র.) মসজিদ-মুন্সিগঞ্জ-Click to Read
ধানমন্ডির শাহী ঈদগাহ: ঢাকার ৩৮৫ বছরের প্রাচীন মুঘল স্থাপত্যের ঐতিহ্য--Click to Read

Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url